জেন অস্টেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জেন অস্টেনের একটি জলরং ও পেন্সিল স্কেচ, অনুমিত হয় ছবিটি লেখকের ভগিনী ক্যাসান্ড্রার আঁকা (১৮১০ খ্রি.)[ক]

জেন অস্টেন (ইংরেজি: Jane Austen) (১৬ ডিসেম্বর, ১৭৭৫ – ১৮ জুলাই, ১৮১৭) একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক ছিলেন যিনি মূলত তাঁর ছয়টি প্রধান উপন্যাসের জন্য সুপরিচিত ছিলেন, যেগুলো আঠারো শতকের শেষভাগে ইংরেজ ভূস্বামীকেন্দ্রিক সমাজকে উপজীব্য করে আলোচনা এবং সমালোচনা করেছে। সমাজে উপযুক্ত অবস্থান তৈরি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য নারীদের বিয়ের উপর নির্ভরশীলতা অস্টিনের বেশির ভাগ উপন্যাসের মূল আখ্যান। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভাবপ্রধান উপন্যাসের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তার লেখাগুলো ঊনিশ শতকের ক্রান্তিলগ্নে বাস্তব নির্ভর সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।[১][২] তীক্ষ্ণ প্রহসনের সাথে সাথে তার বাস্তববোধ, হাস্যরস এবং সমাজ পর্যবেক্ষণ তাকে সমালোচক, বিদ্বান এবং অনুরাগী পাঠকদের মাঝে স্বমহিমায় উপস্থাপন করেছে।[৩]

সেনস অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি (১৮১১), প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডাইস (১৮১৩), ম্যানসফিল্ড পার্ক (১৮১৪) এবং এমা (১৮১৬) প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি লেখক হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। আরও দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি, নর্থেঙ্গার অ্যাবেই এবং পারসুয়েশন, উভয়ই তার মরণোত্তর ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। আরেকটি উপন্যাস তিনি শুরু করেছিলেন 'স্যান্ডিটন' শিরোনামে কিন্তু এটি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। কিশোরদের জন্য লেখা তিন খন্ড পান্ডুলিপিও তিনি রেখে গিয়েছিলেন যার মধ্যে একটি ছিল সংক্ষিপ্ত দিনলিপির আকারে লেখা উপন্যাস লেডি সুসান এবং আরেকটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস দ্য ওয়াটসন । তার ছয়টি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের উপন্যাসেরই সবসময় মুদ্রিত কপি ছিল, যদিও সেগুলি বেনামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাঁর জীবদ্দশায় সেগুলো সেভাবে তার জন্য সাফল্যও বয়ে আনেনি।

১৮৩৩ সালে তার মরণোত্তর খ্যাতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক নিয়েছিল, যখন তার উপন্যাসগুলি রিচার্ড বেন্টলির স্ট্যান্ডার্ড উপন্যাস সিরিজ থেকে ফার্দিনান্দ কিপারিং এর প্রচ্ছদ সহকারে পুনরায় প্রকাশিত হল এবং সেট আকারে বিক্রি হয়েছিল।[৩] ধীরে ধীরে এই সৃষ্টিকর্মগুলো আরও প্রশংসা এবং অসাধারণ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯৬৯ সালে, তার মৃত্যুর বায়ান্ন বছর পরে, তার ভ্রাতুষ্পুত্র জেন অস্টেনের মেমোয়ার বা স্মরণিকা প্রকাশিত হলে তার লেখক জীবনের নিরাভরণ এক চিত্র জনসম্মুখে উঠে আসে।

অস্টেন বহু সমালোচনামূলক প্রবন্ধ এবং সাহিত্যিক সংকলনকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার উপন্যাসগুলো ১৯৪০ এর প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস থেকে শুরু করে আরও সাম্প্রতিক প্রযোজনায় যেমন. সেনস এন্ড সেনসিটিবিলিটি (১৯৯৫), এমা (১৯৯৬), ম্যানসফিল্ড পার্ক (১৯৯৯), প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডাইস (২০০৫), লাভ অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ (২০১৬) এবং এমা (২০২০) ইত্যাদি অনেকগুলো চলচ্চিত্রকে অনুপ্রাণিত করেছে।

জীবনী সম্পর্কিত তথ্য[সম্পাদনা]

জেন অস্টেনের জীবন সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তেমন তথ্য পাওয়া যায় না কেবলমাত্র বেঁচে যাওয়া কয়েকটি চিঠি আর তার পরিবারের সদস্যরা যে জীবনীমূলক নোটগুলি লিখেছিলেন সেগুলো ছাড়া।[৪] জীবদ্দশায়, অস্টেন সম্ভবত ৩,০০০ টিরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন যার মধ্যে ১৬১ টি চিঠি হয়তো অক্ষত থাকতে পারে।[৪] অনেকগুলো চিঠী অস্টেন তার বড় বোন ক্যাসান্দ্রার কাছে লিখেছিলেন, যিনি সেগুলোর বেশির ভাগ ১৮৪৩ সালে তাদের পুড়িয়ে ফেলেছিলেন এবং বাকি নিজের কাছে রাখা চিঠিগুলোকেও টুকরা করে ফেলেছিলেন। স্পষ্টতই, কাসান্দ্রা তার বোনের চিঠিগুলো আত্মীয়দের হাতে যেন না যায় সে উদ্দেশ্য একাজটি করেছিলেন এবং বিশেষ করে তার ছোট ভ্রাতুষ্পুত্রীরা যেন কখনোই একথা জানতে না পারে যে অস্টেন অনেক সময়ই তার প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের সম্পর্কে স্পষ্টভাষায় তীর্যক মন্তব্য করেছেন।[৫][৬] ক্যাসান্দ্রা বিশ্বাস করতেন যে কৌশল হিসেবে কলহ এড়ানোর স্বার্থে এবং জেনের স্বার্থেও এই লেখাগুলো ধ্বংস করা উচিত। ফলে অস্টেনের জীবনের রেকর্ডের স্বল্পতা আধুনিক জীবনীবিদদের কাজ করার করার জন্য তেমন কিছু অবশিষ্ট রাখেনি বলাই শ্রেয়।[৭]

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছিল যখন তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যরা অস্টেনের জীবনের যেটুকু অস্বচ্ছ তথ্য অবশিষ্ট ছিল তাও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। জেনের বড় ভাইয়ের উত্তরাধিকারিদের সূত্রে জানা যায়, বড় ভাই অ্যাডমিরাল ফ্রান্সিস অস্টেনের আরও চিঠি ধ্বংস করেছিলেন; ১৮১৮ সালে তার ভাই লিখেছেন "জীবনী বিজ্ঞপ্তি" থেকে বিশদ বিবরণ বাদ দেয়া হয়েছে; এবং এই বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া ১৮৬৯ ও ১৯১৩ সালে তার ভ্রাতুষ্পুত্রদের দ্বারা প্রকাশিত স্মৃতিকথা এ মেমোয়ার অফ জেন অস্টেন এবং উইলিয়াম ও রিচার্ড আর্থার অস্টেন লিঘের জেন অসটেন: হার লাইফ অ্যান্ড লেটারস- পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যেখানে অস্টেনের জীবনের অনেক কিছুই অনুপস্থিত ছিল।[৮] এভাবে তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা যে কিংবদন্তি তৈরি করেছিলেন তা তাদের সৌম্য শান্ত চাচী জেনের পক্ষে তাদের পক্ষপাতিত্বকে প্রতিফলিত করেছে এবং অস্টেনকে তারা এমন একজন নারী হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন যার পারিবারিক পরিস্থিতি সুখী এবং যার পরিবারই তার জীবনের মূল ভিত্তি ছিল।[৪] অস্টেন পণ্ডিত জ্যান ফার্গাস বলেন, আধুনিক জীবনীগুলোতে অস্টেনের চিঠিপত্র ও পারিবারিক জীবনী সম্পর্কিত বাদ দিয়ে দেয়া তথ্যগুলোকে আবারো সংযোজনের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে অস্টেন চরম অসুখী জীবনযাপন করতেন এবং তিনি "পুরোপুরি অপ্রীতিকর পারিবারিক পরিবেশে বন্দী একজন তিক্ত, হতাশাগ্রস্ত নারী ছিলেন" এ ধরনের বৈপরীত্যমূলক ধারণাকে এড়িয়ে থাকাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।[৯]

সমাজের এক একান্নবর্তী পরিবারে।[১০] তিনি মূলত তার পিতা ও ভাইদের কাছে লেখাপড়া শেখেন এবং কিছুটা নিজে পড়াশোনা করেও শেখেন। পেশাদার লেখক হিসেবে তার উত্থানের পিছনে তার পরিবারের স্থায়ী সমর্থনের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।[১১] কৈশোর থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি শিল্পের শিক্ষানবিশি করে গেছেন। এই সময়কালের মধ্যে তিনি একাধিক সাহিত্যিক রূপ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এর মধ্যে তিনি পত্রোপন্যাস রচনার কাজেও হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই রূপটি পরিত্যাগ করেন। তিনি তিনটি উপন্যাস রচনা করে সেই উপন্যাসগুলি বারংবার সংশোধন করেন এবং চতুর্থ একটি উপন্যাস রচনায় হাত দেন।[খ] ১৮১১ থেকে ১৮১৬ সালের মধ্যে তার সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি (১৮১১), প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস (১৮১৩), ম্যানসফিল্ড পার্ক (১৮১৪) এবং এমা (১৮১৬) নামে চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। লেখক হিসেবে তিনি সাফল্যও অর্জন করেন। এছাড়া তিনি নরদ্যাঙ্গার অ্যাবিপারসুয়েশন নামে দুটি উপন্যাসও রচনা করেন। এগুলি তার মৃত্যুর পর ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। অস্টেন স্যান্ডিটন শিরোনামে আরও একটি উপন্যাস রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।

অস্টেনের উপন্যাসগুলি অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ভাবোপন্যাসের সমালোচনামূলক পুনরীক্ষণ। এগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতাবাদের উত্থানের একটি সোপানও বটে।[১২][গ] তার উপন্যাসের প্লট মূলত হাস্যোদ্দীপক হলেও[১৩] তা সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সেকালের মেয়েরা যে বিবাহ ব্যবস্থার উপর কতটা নির্ভরশীল ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটায়।[১৪] তার জীবদ্দশায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। এই সময় মাত্র কয়েকজন সমালোচকই তার রচনার সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন। ১৮৬৯ সালে তার এক ভ্রাতুষ্পুত্র আ মেমোয়ার অফ জেন অস্টিন নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলে, তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০-এর দশকের মধ্যে বিদ্বজ্জন সমাজে তিনি একজন মহান ইংরেজ সাহিত্যিকরূপে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অস্টেনকে নিয়ে প্রচুর গবেষণামূলক কাজ হয় এবং একটি জেনীয় অনুরাগী সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

২০১০ সালে অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যানি'জ কলেজের ক্যাথরিন সুদারল্যান্ড অস্টেনের ১০০০ পৃষ্ঠা পত্রাবলি ও পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, যে পরিশীলিত গদ্যের জন্য অস্টিন বিখ্যাত তা অপর কারোর দ্বারা ব্যাপকভাবে সম্পাদিত। এই সম্পাদনার কাজটি সম্ভবত করেছিলেন অস্টেনের সম্পাদক তথা বিশিষ্ট কবি ও ধ্রুপদি সাহিত্য বিশারদ উইলিয়াম গিফোর্ড। পাণ্ডুলিপিতে অস্টিনের নিজের যে লেখা ও বানান পাওয়া যায় তা ব্যক্তিগত ধাঁচের লেখা এবং কিছুটা ভ্রান্তিজড়িত। যে তিন বছরের গবেষণার ফলে এই তথ্যটি জানা গিয়েছে তা চালিয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কিংস কলেজ, লন্ডন।[১৫]

রচনাবলী[সম্পাদনা]

উপন্যাস[সম্পাদনা]

  • সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি (১৮১১)
  • প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস (১৮১৩)
  • ম্যান্সফিল্ড পার্ক (উপন্যাস)|ম্যান্সফিল্ড পার্ক (১৮১৪)
  • এমা (১৮১৬)
  • নর্থাঙ্গার অ্যাবি (১৮১৭) মরণোত্তর প্রকাশিত
  • পারসুয়েশন (১৮১৭) মরণোত্তর প্রকাশিত

বড় গল্প[সম্পাদনা]

  • লেডি সুসান (novella)
  • দি ওয়াটসন্স (incomplete novel)
  • স্যান্ডিটন (incomplete novel)

কিশোর উপন্যাস[সম্পাদনা]

  • দি থ্রি সিস্টার্স
  • লাভ অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ
  • দি হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড
  • ক্যাথেরিন, অর দি বাওয়ার
  • দি বিউটিফুল ক্যাসান্ড্রা

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Grundy (2014), 195–197
  2. MacDonagh (1991), 65, 136–137. Oliver MacDonagh says that Sense and Sensibility "may well be the first English realistic novel" based on its detailed and accurate portrayal of what he calls "getting and spending" in an English gentry family
  3. Scheidt, Deborah (২০১৭)। "LOOSER, Devoney. The making of Jane Austen. Baltimore: John Hopkins University Press, 2017. 291 p"Revista Scripta Uniandrade15 (2)। আইএসএসএন 1679-5520ডিওআই:10.5935/1679-5520.20170023 
  4. Fergus (2005), 3–4
  5. Le Faye (2004), 270; Nokes (1998), 1; Le Faye (2005), 33
  6. Nokes (1998), 1–2; Fergus (2005), 3–4 Important details about the Austen family were almost certainly elided by intention, such as mention of Austen's brother George, whose undiagnosed developmental challenges led the family to send him away from home; the two brothers sent away to the navy at an early age; or mention of the sisters' wealthy Aunt Leigh-Perrot, arrested and tried on charges of larceny.
  7. Nokes (1998), 1–2; Fergus (2005), 3–4
  8. Nokes (1998), 2–4; Fergus (2005), 3–4; Le Faye (2004), 279
  9. Fergus (2005), 4
  10. Lascelles, 2; for detail on "lower fringes", see Collins, ix–x.
  11. Lascelles, 4–5; MacDonagh, 110–28; Honan, 79, 183–85; Tomalin, 66–68.
  12. Litz, 3–14; Grundy, "Jane Austen and Literary Traditions", The Cambridge Companion to Jane Austen, 192–93; Waldron, "Critical Responses, Early", Jane Austen in Context, p. 83, 89–90; Duffy, "Criticism, 1814–1870", The Jane Austen Companion, 93–94.
  13. Litz, 142.
  14. MacDonagh, 66–75; Collins, 160–161.
  15. Singh, Anita. "Jane Austen's famous prose may not be hers after all", The Daily Telegraph, 22 October 2010.

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

Primary works Primary works

Secondary works

Biographies

Essay collections

Monographs and articles

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

কর্মকাণ্ড[সম্পাদনা]

লেখকের তথ্য[সম্পাদনা]

ভক্তদের সাইট ও সংস্থা[সম্পাদনা]

অন্যান্য[সম্পাদনা]