জুলিয়ান (রোমান সম্রাট)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জুলিয়ান
রোমান সম্রাট
JulianusII-antioch(360-363)-CNG.jpg
ভূমধ্যসাগরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এন্টিওখ শহরে উদ্ঘাটিত সম্রাট জুলিয়ানের ব্রোঞ্জ মুদ্রা
রাজত্ব৩ নভেম্বর ৩৬১ – ২৬ জুন ৩৬৩
পূর্বসূরিদ্বিতীয় কন্সট্যান্টিয়াস (মহান কন্সট্যান্টাইনের পুত্র এবং জুলিয়ানের চাচাতো ভাই)
উত্তরসূরিজোভিয়ান
উত্তরসূরিহেলেনা (মহান কন্সট্যান্টাইনের কন্যা)
জন্ম৩৩১ খ্রিষ্টাব্দ
কনস্টান্টিনোপল, রোমান সাম্রাজ্য
মৃত্যু২৬ জুন ৩৬৩ খ্রিষ্টাব্দ
ফ্রিজিয়াম, মেসোপটেমিয়া, পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য
পূর্ণ নাম
ফ্ল্যাভিয়াস ক্লোডিয়াস জুলিয়ানাস
রাজবংশকনস্ট্যান্টিনিয়ান রাজবংশ
পিতাজুলিয়াস কন্সট্যান্টিয়াস (মহান কন্সট্যান্টাইনের সৎভাই)
মাতাব্যাসিলিনা
ধর্মগ্রেকো-রোমান পৌত্তলিক ধর্ম

সম্রাট জুলিয়ান (ল্যাটিন: Julianus Imperator; গ্রীক: Αυτοκράτορας Ἰουλιανός; ৩৩১ – ২৬ জুন ৩৬৩) ছিলেন ৩৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩৬৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একজন রোমান সম্রাট। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য দার্শনিক ও গ্রীক ভাষায় লেখক।[১] তার খ্রিষ্ট ধর্ম প্রত্যাখান ও নয়াপ্লাতোবাদী গ্রেকো-রোমান পৌত্তলিক ধর্ম পুনরানয়ন করার চেষ্টার ফলে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তাকে Julian the Apostate (ধর্মত্যাগী জুলিয়ান) বলে আখ্যাত করা হয়।[২]

কনস্ট্যান্টিনিয়ান রাজবংশের সদস্য, জুলিয়ানের পিতা ছিলেন সম্রাট মহান কন্সট্যান্টাইনের সৎভাই। তার পিতা-মাতা দুইজনই ছিলেন খ্রিষ্টান। জুলিয়ান খুব অল্প বয়সে এতিম হয়ে যায়: জুলিয়ানের মাতা তার জন্মের এক বছর পরেই মৃত্যুবরণ করেন এবং জুলিয়ানের বয়স যখন ৫ বা ৬ বছর তখন তার পিতাকে তার চাচাতো ভাই সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্টিয়াসের নির্দেশে হত্যা করা হয়। জুলিয়ান পরবর্তীতে গথিক ক্রীতদাস মার্ডোনিয়াস দ্বারা লালিত পালিত হন। মার্ডোনিয়াস জুলিয়ানকে সাহিত্যিক শিক্ষা দিয়েছিলেন[৩] এবং তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। জুলিয়ান ৩৫৫ সালে সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্টিয়াসের আদেশক্রমে রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম প্রদেশগুলির ‘সিজার’ খেতাব গ্রহণ করেন এবং এই ভূমিকায় তিনি আলামানি ও ফ্রাঙ্কদের বিরুদ্ধে সফলভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ৩৫৭ সালে আর্জেন্টোরেটাম (স্ট্র্যাসবুর্গ)-এর যুদ্ধে আলামানিদের বিরুদ্ধে জুলিয়ানের বিজয়। এই যুদ্ধে তিনি তার ১৩,০০০ সৈন্যদের তার চেয়ে তিন গুণ অধিক জার্মানিক সৈন্যর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ৩৬০ সালে জুলিয়ানকে তার সৈন্যরা লুটিশিয়া (প্যারিস) শহরে ‘অগাস্টাস’ উপাধি দান করে সম্রাট ঘোষণা করে এবং এর ফলে সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্টিয়াসের সাথে তার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তবে যুদ্ধে দু'জন একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার আগেই কন্সট্যান্টিয়াস মৃত্যুবরণ করেন এবং জুলিয়ানকে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে নামকরণ করে যান।

৩৬৩ সালে জুলিয়ান পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে উচ্চাভিলাষী সামরিক অভিযান শুরু করেন। অভিযানটি প্রাথমিকভাবে সফলও হয়; মেসোপটেমিয়ায় পারস্যের রাজধানী তিসফুন শহরের বাইরে একটি যুদ্ধে জুলিয়ান বিজয় অর্জন করেছিলেন। তবে তিনি রাজধানীটি ঘেরাও করে দখল করার চেষ্টা করেননি এবং পরবর্তীতে তার সৈন্যদের নিয়ে জুলিয়ান পারস্য অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে চলে গিয়েছিলেন যেখানে শীঘ্রই রোমান সৈন্যদের সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয় এবং পারস্যের সৈন্যদের হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণের ফলে জুলিয়ান উত্তর দিকে পিছু হটতে বাধ্য হন। ৩৬৩ সালের জুন মাসে সামাররার যুদ্ধে পারস্যের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় জুলিয়ান রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে আহত হন। সামাররার যুদ্ধের পর শত্রু-দেশ পারস্য সাম্রাজ্যের অঞ্চলে জুলিয়ান তার সৈন্যদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলে রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার রাজকীয় রক্ষী বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, জোভিয়ান সম্রাট হিসাবে জুলিয়ানের স্থলাভিষিক্ত হন। নতুন সম্রাট জোভিয়ান আটকে থাকা রোমান সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে নিসবিসসহ আরো অনেক রোমান অঞ্চল পারস্যের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।[৪]

জুলিয়ান ছিলেন অস্বাভাবিক জটিল চরিত্রের মানুষ: তিনি ছিলেন “সামরিক কমান্ডার, থিওসোফিস্ট, সমাজ সংস্কারক এবং একজন শিক্ষিত মানুষ”[৫]। তিনি ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ অ-খ্রিষ্টান শাসক, এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাম্রাজ্যের বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য প্রাচীন রোমান মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। জুলিয়ান রাষ্ট্রের শীর্ষ-শক্তিশালী আমলাতন্ত্রকে নির্মূল করেন, এবং খ্রিষ্টধর্মের বিনিময়ে ঐতিহ্যবাহী রোমান ধর্মীয় অনুশীলনকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। জেরুজালেমে তৃতীয় মন্দির নির্মাণে তার প্রচেষ্টা সম্ভবত ইহুদিদের খুশি করার চেয়ে খ্রিষ্টানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল।[৩] জুলিয়ান খ্রিষ্টানদের উপর শাস্ত্রীয় পাঠগুলি শেখানো এবং শেখার থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. গ্র্যান্ট, মাইকেল, Greek and Latin authors, 800 B.C.–A.D. 1000, Part 1000 (১৯৮০)। JULIAN THE APOSTATE (Flavins Claudius Julianus), Roman emperor and Greek writer, was born at Constantinople in AD 332 and died in 363.। H. W. Wilson Co.। পৃষ্ঠা ২৪০। আইএসবিএন 978-0-8242-0640-6 
  2. গিবন, এডওয়ার্ড, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, Chapter 23 (১৭৭৬–১৭৮৯)। The character of Apostate has injured the reputation of Julian; and the enthusiasm which clouded his virtues has exaggerated the real and apparent magnitude of his faults.। Strahan & Cadell, London। 
  3. কপ্ফ, ই. খ্রিষ্টান। "Julian, Roman Emperor"Encyclopædia Britannica Online। সংগ্রহের তারিখ ২৩ আগস্ট ২০১৮ 
  4. Rome in the Ancient World - From Romulus to Justinian, পোটার, ডেভিড স্টোন (২০০৯)। Julian dies in battle in Persia; Jovian selected as Augustus by the army (363)। Thames & Hudson। পৃষ্ঠা 253। আইএসবিএন 978-0500251522 
  5. গ্ল্যানভিল ডাউনি, Church History, Volume 8, No. 4 (ডিসেম্বর ১৯৩৯)। Julian the Apostate at Antioch। Cambridge University Press। পৃষ্ঠা ৩০৫।