জুলজানাহ

জুলজানাহ (আরবি: ذو الجناح; অর্থ: দুই ডানার অধিকারী) হলো একটি ধূসর রঙের আরবীয় অশ্ব, যা হুসাইন ইবনে আলীর ছিল। শিয়া শোকপালন সংস্কৃতিতে এটি অত্যন্ত সুপরিচিত, কারণ আশুরার দিনে এবং কারবালার যুদ্ধে হুসাইন ইবনে আলী এই ঘোড়ার পিঠেই আরোহণ করেছিলেন। ঘোড়াটিকে প্রজনন ও লালন-পালন করেছিলেন মুহাম্মাদ। জুলজানাহ তার তীব্র আনুগত্য, শক্তি, সহনশীলতা ও ভক্তির জন্য বিখ্যাত ছিল।
কথিত আছে যে, কারবালার যুদ্ধে সে তার শরীর দিয়ে হুসাইন ইবনে আলীকে রক্ষা করেছিল এবং তার প্রভুর দিকে ধেয়ে আসা একটি তীর নিজের গায়ে নিয়ে আহত হয়েছিল। যখন হুসাইন ইবনে আলী তার আঘাতের কারণে শাহাদাতবরণ করেন, তখন জুলজানাহ রক্তমাখা অবস্থায় তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে এবং তাদেরকে হামলার বিষয়ে সতর্ক করে; এরপর তার চূড়ান্ত দায়িত্ব পালনের পর সে মারা যায়।
তাজিয়া এবং শিয়াদের তৃতীয় ইমামের শোকমিছিলে জুলজানাহ বিশেষ গুরুত্ব ও সম্মানের অধিকারী। জুলজানাহকে অনেক সময় সক্রিয় বুদ্ধি (আকল-এ ফায়াল) হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং একে বোরাকের সাথে তুলনা করা হয়। মুহররমের মিছিলের সময়, এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে একটি সুসজ্জিত আরোহীবিহীন ঘোড়াকে ভক্তদের দ্বারা সম্মান জানানো হয়।[১][২][৩]
নামকরণ
[সম্পাদনা]জুলজানাহ অত্যন্ত ক্ষিপ্র ছিল এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ গতিশীলতা প্রদর্শন করত। পাখিদের মতো দ্রুতগামী হওয়ার কারণেই তাকে এই নামে (যার অর্থ 'ডানাওয়ালা') ডাকা হতো।[৪]
কারও কারও মতে, জুলজানাহ ছিল মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর অন্যতম অশ্ব, যা হুসাইন ইবনে আলী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।[৫] জিয়ারতে নাহিয়াহ মুকাদ্দাসায় তাকে 'আল-জাওয়াদ' নামে উল্লেখ করা হয়।[৬]
শিয়া বিশ্বাস
[সম্পাদনা]বিশ্বস্ততা
[সম্পাদনা]« যখন হুসাইন ইবনে আলী নিজেকে ফুরাত নদীর তীরে নিয়ে গেলেন, তখন সেখানে ৪০০০ যোদ্ধা পাহারায় ছিল। তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে যখন জুলজানাহ ফুরাতের তীরে পৌঁছল, তখন সে প্রবল তৃষ্ণা ও আগ্রহ নিয়ে পানি পানের জন্য মাথা নিচু করল। তার আরোহী হুসাইন ইবনে আলী বললেন, "তুমি তৃষ্ণার্ত এবং আমিও তৃষ্ণার্ত। আল্লাহর কসম, তুমি তৃষ্ণা না মেটানো পর্যন্ত আমি পানি পান করব না।" ঘোড়াটি যখন হুসাইন ইবনে আলীর কথা শুনল, তখন সে মাথা তুলে ফেলল এবং পানি পান করল না, যেন সে হুসাইন ইবনে আলীর কথা বুঝতে পেরেছিল। এরপর হুসাইন ইবনে আলী তাকে নির্দেশ দিলেন, "পান করো, আমিও পান করব..." »
ইবনে শাহরাশুব, মানাকিব আল আবি তালিব, খণ্ড ৪, পৃ. ৫৮
মাকাতিল (শাহাদাতের ঘটনা) রচয়িতা এবং হাদিস বর্ণনাকারীরা জুলজানাহর বিশ্বস্ততা, বুদ্ধিমত্তা ও অন্তরঙ্গতা সম্পর্কে অনেক বর্ণনা উল্লেখ করেন[৭] এবং তাদের রচনায় অত্যন্ত মর্যাদার সাথে এর নাম স্মরণ করেন। বিশেষ করে যখন হুসাইন ইবনে আলী তৃষ্ণা, ক্ষত এবং রক্তপাতের কারণে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন, তখন সে অত্যন্ত দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে তার প্রভুকে (হুসাইন ইবনে আলীকে) যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের করে তাঁবুর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাঁবুতে পৌঁছার আগেই হুসাইন ইবনে আলী ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান। ইবনে সাদ চিৎকার করে বলে ওঠে, "ঘোড়াটিকে ধরো, আল্লাহর কসম, এটি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর সবচেয়ে মূল্যবান ঘোড়াগুলোর একটি।" উমর ইবনে সাদের বাহিনী যখন ঘোড়াটিকে ধরতে চাইল, তখন জুলজানাহ তাদের ওপর আক্রমণ করে এবং লাথি মেরে তাদের হত্যা করতে থাকে। ইবনে শাহর আশুব জুলজানাহ কর্তৃক নিহত যোদ্ধার সংখ্যা ৪০ জন বলে উল্লেখ করেছেন এবং অন্যরা এর চেয়ে বেশি সংখ্যার কথা বলেন। ইবনে সাদ তখন চিৎকার করে ওঠে, "ওকে ছেড়ে দাও, তা না হলে ও সবাইকে মেরে ফেলবে।"[৫][৮]
হুসাইনের শাহাদাতের খবর পৌঁছানো
[সম্পাদনা]শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, যখন শত্রুরা তার থেকে দূরে সরে যায় এবং জুলজানাহ নিশ্চিত হয় যে তারা তাকে ছেড়ে দিয়েছে, তখন সে হুসাইন ইবনে আলীর শিয়রে এসে তার নিথর দেহের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং তাকে শুঁকতে ও চুমু খেতে থাকে। এরপর সে তার কপাল হুসাইন ইবনে আলীর শরীরের রক্তে রঞ্জিত করে এবং মাটিতে পা ঠুকতে ঠুকতে ও তীব্র হ্রেষাধ্বনি করতে করতে তাঁবুর দিকে ফিরে যায়।[৯] সে যখন তাঁবুতে পৌঁছায়, তখন বিকট শব্দে হ্রেষাধ্বনি করতে থাকে এবং নিজের মাথা মাটিতে আছড়াতে থাকে। হুসাইন ইবনে আলীর পরিবারের সদস্যরা যখন জুলজানাহকে এই অবস্থায় দেখতে পান, তখন তারা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে জুলজানাহর চারপাশে জড়ো হন এবং তার মাথা, মুখমণ্ডল ও পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। উম্মে কুলসুম তার দুই হাত নিজের মাথার ওপর রেখে চিৎকার করে বলতে থাকেন: "ওয়া মুহাম্মাদাহ, ওয়া জাদ্দাহ, ওয়া নাবিয়্যাহ" (হায় মুহাম্মাদ, হায় দাদাজান, হায় নবী!)।[৯][১০]
হে জুলজানাহ, তোমার কেশরে যে রক্ত দেখা যাচ্ছে,
তা হলো মাওলার চিরপ্রবহমান রক্ত।
এক ফোঁটা রোদ এসে তোমার শরীরে বসল,
হে জুলজানাহ, তোমার কেশর থেকে খোদার সুবাস ভেসে এল।
পরিণতি
[সম্পাদনা]আশুরার দিনে জুলজানাহর পরিণতি সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
- একদলের মতে, হুসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতের খবর তার পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পর জুলজানাহ তার মাথা মাটিতে এত জোরে আছড়াতে থাকে যে তাঁবুর সামনে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়।[১১]
- কেউ কেউ বলেন যে সে হুসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতবরণের আগেই নিহত হয়েছিল এবং তিনি (হুসাইন) কিছুক্ষণ পায়ে হেঁটে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং এরপর শহীদ হন।[১২]
- আব্দুল্লাহ ইবনে কায়েস বলেন: "আমি সেই ঘোড়াটিকে দেখলাম যে, তার আশপাশ থেকে সব মানুষ দূরে সরে গেছে এবং সে দ্রুত তাঁবুর দিকে ছুটে গেল, কেউ তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারল না। এরপর সে ফুরাত নদীর দিকে রওনা হলো এবং দ্রুত ফুরাতের মাঝখানে গিয়ে পানিতে ডুবে গেল। আজ পর্যন্ত কেউ জানে না সে কোথায় গেছে এবং তার কী হয়েছে।" [১৩]
শিল্পকর্ম
[সম্পাদনা]আশুরার সাহিত্যে জুলজানাহর কথা উল্লেখ করা হয় এবং শিয়ারা আরবি, ফার্সি ইত্যাদি কবিতায় ইমামের প্রতি তার বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বস্ততার কথা তুলে ধরেন। আশুরার দিনে একটি আরোহীবিহীন ঘোড়াকে লাল রঙে রাঙিয়ে এবং শরীরে তীর বিদ্ধ করে হুসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতের প্রতীক হিসেবে শোকমিছিল ও ইমামবাড়াগুলোর সামনে ঘোরানো হয়।
শিয়া চিত্রশিল্পীরাও দীর্ঘকাল ধরে কাপড় ও কাচের ওপর জুলজানাহর শোকাহত, যন্ত্রণাদায়ক ও বিষাদময় চিত্র এঁকে আসছেন। সম্প্রতি সমসাময়িক শিল্পী মাহমুদ ফার্শচিয়ান তাঁবুতে ফিরে আসা জুলজানাহ এবং তাকে ঘিরে থাকা হুসাইন ইবনে আলীর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি চিত্রকর্ম তৈরি করেন। এই চিত্রকর্মের মূল কপিটি আস্তান কুদস রাজাভি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এবং এর বিভিন্ন আকার ও আয়তনের লাখ লাখ কপি মুদ্রিত হয়ে বিশ্বব্যাপী শিয়া কেন্দ্রগুলোতে বিতরণ করা হয়।[১৪]
ওমান সামানি তার গাঞ্জিনাতুল আসরার গ্রন্থে শিয়াদের কাছে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত ঘোড়া এবং আশুরার দিনে হুসাইন ইবনে আলীর বাহন জুলজানাহকে বোরাকের সাথে তুলনা করেন।[১৫]
সাহসিকতার সাথে তিনি রেকাবে পা রাখলেন
এবং স্নেহের সাথে ঘোড়াটিকে সম্বোধন করলেন:
হে হালকা ডানাযুক্ত, দ্রুতগামী জুলজানাহ
তোমার খুরের ধুলো ফেরেশতাদের চোখের সুরমা
হে স্বর্গীয় মহিমা, পবিত্র পদচারণা
উৎপত্তি থেকে গন্তব্য পর্যন্ত তোমার মাত্র অর্ধেক কদম
হে চিন্তার চেয়েও দ্রুতগামী
এবং বুদ্ধির বোরাকের চেয়েও ক্ষিপ্র
বন্ধুর ঠিকানায় যাওয়াই আমার পথ
চোখ খোলো, এখন আমার মেরাজের সময়
সেই বিশ্ব-আলোকিত নবীর মেরাজ হয়েছিল রাতে
আশ্চর্যের বিষয়, আমার মেরাজ হচ্ছে দিনে
তুমি আমার আকাশ-ভ্রমণের বোরাক
আর আশুরার দিনটি আমার ইসরার (শবে মেরাজ) রাত
আমার প্রতি তোমার অনেক অধিকার রয়েছে
হে আমার আদরের ঘোড়া, এখন সাহসিকতার সময়
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- জুলজানাহ - একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৪-১২-০৪ তারিখে
- এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Hussain, Sameer (২৯ জুলাই ২০২৩)। "Zuljanah: Behind symbol of Imam Hussain's last companion"। The Kashmir Walla। ২৯ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৩।
- ↑ "Zuljanah - Islam Guidance"। sibtayn। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৩।
- ↑ Nakshawani, Sayed Ammar। "What Do We Know About Dhul Janah, The Horse Of Imam Husayn (A)?"। Al-Islam TV। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৩।
- ↑ তারিখে জিন্দেগানি, ইমাম হুসাইন, পৃ. ৬৮০, ৬৪৭
- 1 2 আল-মুকাররম, পৃ. ২৯৭
- ↑ জিয়ারতে নাহিয়াহ মুকাদ্দাসাহ
- ↑ দ্রষ্টব্য: হুসাইনের জীবনী, পৃ. ৬৮۰, ৬৪৭
- ↑ ইবনে শাহর আশুব, আল-মানাকিব, খণ্ড ৪, পৃ. ৫৮
- 1 2 বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড ۴۴, পৃ. ۳۲۱
- ↑ কুমি, মুনতাহাল আমাল, খণ্ড ۲, পৃ. ۹۱۰
- ↑ আব্বাস কুমি, মুনতাহাল আমাল, খণ্ড ২, পৃ. ৯০৯
- ↑ দ্রষ্টব্য: হুসাইনের জীবনী, পৃ. ৬৮৪
- ↑ আসরারুশ শাহাদাহ, পৃ. ৪৩৬
- ↑ দায়েরাতুল মা'আরিফ তাশাইয়্যু (শিয়া বিশ্বকোষ), খণ্ড ৮, পৃ. ৪৫–৪৬
- ↑ মুজাহিদী, মোহাম্মদ আলী। "ইয়াদকার্দি আজ শায়ের আরেফ, ওমান সামানি ওয়া গাঞ্জিনেহ আসরার উ"। ২৪ মার্চ ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০১০। (সংগৃহীত: ১২ এপ্রিল ২০০৯)।