জীবন বৃক্ষ (পৌরাণিক উপকথা)



বিশ্বের অনেক পৌরাণিক, ধর্মীয় এবং দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যে জীবনবৃক্ষ একটি মৌলিক আদর্শ হিসাবে স্বীকৃত। বিশ্ব্যব্যাপীপ সমস্ত ধর্ম ও সংস্কৃতিতে পবিত্র বৃক্ষের ধারণার সাথে অস্তিত্বের খোজ পাওয়া যায়। [১] ইহুদি ধর্মগ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্বের অংশ হিসেবে, আদিপুস্তকে ইডেন উদ্যানের বর্ননায় জ্ঞান বৃক্ষ বা জীবনবৃক্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও স্বর্গ ও পাতালের সাথে সংযোগকারী জ্ঞানবৃক্ষের উল্লেখ পাওয়া যায় [২] বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনে এই জ্ঞানবৃক্ষের বর্ননা করা হয়েছে। [৩]
ধর্ম এবং পুরাণ
[সম্পাদনা]প্রাচীন মেসোপটেমিয়া
[সম্পাদনা]প্রাচীন অ্যাসিরীয় দন্তকথায় জীবনবৃক্ষকে একাধিক সংযোগ বিন্দু ও পরস্পর ছেদনকারী রেখার মাধ্যমে চিত্রিত করা হত। অ্যাসিরীয় ধর্মীয় বিশ্বাসে জীবনবৃক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন ভাস্কর্যে এই প্রতীককে চিত্রিত করা হয়েছে, যেখানে জীবন বৃক্ষের সাথে সাথে মানব অথবা ঈগল-মুখী পাখাযুক্ত প্রানী অথবা রাজার ছবি চিত্রিত করা থাকত। তবে অ্যাসিরীয়বিদরা এই প্রতীকের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে এখনো কোনো নিশ্চিত মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি। জীবনবৃক্ষ নামটি আধুনিক গবেষকদের দেওয়া, কারণ প্রাচীন অ্যাসিরীয় সমাজে এই নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে, জীবনবৃক্ষ হিসাবে চিহ্নিত এই বিশেষ প্রতীকের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো লিখিত প্রমাণও এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
উরার্তু
[সম্পাদনা]আর্মেনিয়ান পার্বত্য অঞ্চলের উরার্তু সভ্যতায় জীবনবৃক্ষ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতীক। বিভিন্ন দুর্গের দেয়ালে জীবনবৃক্ষের প্রতীক অঙ্কিত হতো এবং প্রাচীন যোদ্ধাদের বর্মের ওপর এই চিহ্ন খোদাই করা থাকত। উরার্তু সভ্যতায় চিত্রিত জীবনবৃক্ষের শাখাগুলি সমানভাবে কাণ্ডের ডান ও বাঁ পাশে সজ্জিত থাকত এবং প্রতিটি শাখায় একটি করে পাতা থাকত। বৃক্ষের শীর্ষদেশেও একটি পাতা দৃশ্যমান থাকত। বৃক্ষের দুপাশে দাস বা পরিচারকদের চিত্রিত করা হত যাদের কাজ ছিল বৃক্ষটির যত্ন নেওয়া। জীবনবৃক্ষ উরার্তু সংস্কৃতিতে জীবন ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত।
প্রাচীন ইরান
[সম্পাদনা]
আবেস্তান সাহিত্য এবং ইরানি পুরাণে জীবনের ধারাবাহিকতা, চিরন্তনতা ও নিরাময়ের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন পবিত্র উদ্ভিদের প্রতীক বর্তমান। প্রাচীন ইরানীয় সংস্কৃতিতে আমেশা স্পেনতা এবং আমেরেতাত ছিলেন গাছপালা ও অমরত্বের দেবী এবং বৃক্ষের রক্ষক। প্রাচীন তথ্য থেকে গাওকেরেনা বা শ্বেত হোমা নামে একটি গাছের উল্লেখ পাওয়া যায়, যার জীবনীশক্তি মহাবিশ্বের জীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। বাস তোখমাক নামের আরেকটি গাছের উল্লেখ পাওয়া যা দুঃখ নাশকারী হিসেবে পরিচিত ছিল। এছাড়াও, প্রাচীন ইরানে বার্সম নামে এক ধরনের গাছের ডাল জরথুস্ত্রপন্থীরা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করত। হোমা নামের একটি উদ্ভিদের উল্লেখ পাওয়া যায়, বর্তমানে যার খোজ পাওয়া যায়না। তবে এটি একসময় পবিত্র পানীয় তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। [৪]
হিন্দুধর্ম
[সম্পাদনা]হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ এবং পুরাণে কল্পবৃক্ষ নামের একটি ঐশ্বরিক বৃক্ষের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পৌরাণিক নগরী অমরাবতীর বাগানে গন্ধর্বগণ এই দিব্য বৃক্ষকে পাহারা দেয়। প্রাচীন পুরান অনুসারে দেবতা এবং অসুররা অমৃত প্রাপ্ত করার জন্য সমুদ্র মন্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মন্থনের সময় সমুদ্র থেকে অন্যান্য অনেক পৌরাণিক মূল্যবান জিনিসের সাথে কল্পবৃক্ষের আবির্ভাব ঘটে। এই বৃক্ষে সোনালী রঙের এবং তার আভা মন্ত্রমুগ্ধকর। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে যে কল্পবৃক্ষকে সন্তুষ্ট করবে তার সমস্ত ইচ্ছা পূরণ হবে। হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে পাঁচটি পৃথক কল্পবৃক্ষ রয়েছে এবং প্রতিটি কল্পবৃক্ষ বিভিন্ন ধরণের ইচ্ছা পূরণ করে। জৈন ধর্মের বিশ্বাসেও কল্পবৃক্ষের উল্লেখ আছে। [৫]
চীনা পুরাণ
[সম্পাদনা]
চীনা পুরাণে জীবনবৃক্ষের একটি প্রচলিত খোদাই চিত্র আছে যার সাথে কাল্পনিক অমর ফিনিক্স পাখি এবং কাল্পনিক প্রানী ড্রাগনের উপস্থিতি দেখা যায়। ড্রাগন সাধারণত অমরত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাওবাদী বিশ্বাস অনুসারে, একটি বিশেষ গাছ রয়েছে যা প্রতি তিন হাজার বছর পর অমরত্বের ফল বা পীচ উৎপন্ন করে। যে এই ফল খাবে সে অমরত্ব লাভ করবে। এই ধারণা চীনা সংস্কৃতিতে দীর্ঘ জীবন এবং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
খ্রিস্টধর্ম
[সম্পাদনা]
পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট বলেছেন যে ক্রস হল জীবনের আসল বৃক্ষ। [৬] সেন্ট বোনাভেঞ্চার শিক্ষা দিয়েছিলেন যে জীবনবৃক্ষের ঔষধি ফল হলেন স্বয়ং খ্রীষ্ট। [৭] সন্ত অ্যালবার্ট দ্য গ্রেট শিক্ষা দিয়েছিলেন যে খ্রিস্টের দেহ এবং রক্ত জীবনবৃক্ষের ফল। [৮] হিপ্পোর অগাস্টিন বলেছিলেন যে জীবনবৃক্ষ হলেন খ্রীষ্ট স্বয়ং।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Giovino, Mariana (2007). The Assyrian Sacred Tree: A History of Interpretations, Saint-Paul. p 129. আইএসবিএন ৯৭৮৩৭২৭৮১৬০২৪.
- ↑ "World tree | Origins, Symbolism & Meaning | Britannica"। www.britannica.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২৩।
- ↑ Mettinger, Tryggve N. D. (২০০৭)। The Eden Narrative: A Literary and Religio-historical Study of Genesis 2–3। Eisenbrauns। পৃ. ৫। আইএসবিএন ৯৭৮-১৫৭৫০৬১৪১২। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৪।
- ↑ Taheri, Sadreddin (২০১৩)। "Plant of life, in Ancient Iran, Mesopotamia & Egypt"। Tehran: Honarhay-e Ziba Journal, Vol. 18, No. 2, p. 15.। ডিওআই:10.22059/jfava.2013.36319।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য) - ↑ Roshen Dalal (২০১৪)। Hinduism: An Alphabetical Guide। Penguin Books। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৮৪৭৫২৭৭৯। Entry: "Kalpa-vriksha/kalpa-drum/kalpa-tura"
- ↑ Gheddo, Piero (২০ মার্চ ২০০৫)। "Pope tells WYD youth: the Cross of Jesus is the real tree of life"। AsiaNews.it। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
- ↑ "The Tree of Life"। Yale University। ৩ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
- ↑ "The Eucharist as the Fruit of the Tree of Life | Saint Albert the Great"। CrossroadsInitiative.com। ২ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।