জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলা
জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলা বা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা হলো বাংলাদেশে আলোচিত একটি মামলা। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন।[১] এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও অভিযুক্তদের একজন ছিলেন। বিদেশ থেকে আসা এতিমখানার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন।[২] মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ, তারেক রহমানসহ অন্যান্য আসামীদের ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ হয়। তারেক রহমান সহ বাকি ৫ আসামীর ২ কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়।[৩] ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি এই অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানসহ সব আসামি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে খালাস পান।[৪][৫]
পটভূমি
[সম্পাদনা]জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টসহ বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে বিএনপি সরকারের সময়ে বেশ কিছু দাতব্য সংস্থা চালু করা হয়। বিএনপি সরকারের (১৯৯১-১৯৯৬) আমলে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” নামে একটি হিসাব চালু করা হয়। ১৯৯১ সালের ৯ই জুন একাউন্টটিতে এক সৌদি দাতার কাছ থেকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ৪,৪৪,৮১,২১৬ টাকা বিদেশী অনুদান আসে। পরবর্তী দুই বছরে এই অনুদানের অর্থ কোনো এতিমখানায় দান করা হয়নি। দুই বছর পর, ১৯৯৩ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের দুই ছেলে তারেক রহমান, আরাফাত রহমান এবং তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্ট গঠনের পর অনুদানটি দুই ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া এবং বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।[৬]
মামলার ক্রম ও অভিযোগ
[সম্পাদনা]ট্রাস্টের কাজে শরফুদ্দিন আহমেদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা তুলে নেওয়া এবং এই টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সময়কালে এই মামলা দায়ের করে দুদক। তদন্ত শেষ হলে তদন্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ই আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।[৭]
মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯শে মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ গঠন করে খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামির বিচার শুরু করেন।[৮]
রায়
[সম্পাদনা]অবশেষে ২০১৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ-৫ আদালতের বিচারক আকতারুজ্জামান ৮ই ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার মামলার দিন ধার্য করেন। সকাল দশটার দিকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।[৯] রায়ের মোট ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত পড়েন বিচারক।[১০] মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ, তারেক রহমান সহ অন্যান্য আসামীদের ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ হয়। তারেক রহমান সহ বাকি ৫ আসামীর ২ কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়।।[৩]
খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আপিল রায়
[সম্পাদনা]২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর এই মামলাসহ সকল মামলা থেকে খালেদা জিয়া মুক্তি পান।[১১] রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।[১২] রাষ্ট্রপতি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুইটি দুর্নীতি মামলার সাজা মওকুফ করলেও আদালতের মাধ্যমে এসব মামলা নিষ্পত্তি চান খালেদা জিয়া।[১৩] ১১ নভেম্বর ২০২৪ তারিখ এই মামলায় খালেদা জিয়ার দশ বছরের সাজা স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ।[১৪][১৫] ২৭ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা থেকে সকল[১৬][১৭] আসামিদের খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।[১৮][১৯] অতঃপর ১৫ জানুয়ারি এই অরফানেজ বা এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় তারেক রহমান, খালেদা জিয়াসহ বাকি আসামিদের খালাস দেন আপিল বিভাগ।[২০]
পর্যবেক্ষণসহ মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছেন,
‘সর্বসম্মতিক্রমে সবার আপিল মঞ্জুর করা হলো। সেইসঙ্গে হাইকোর্ট ও বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করা হলো। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হলো। মামলাটি বিদ্বেষপূর্ণ বলে গণ্য হলো। যারা আপিল করেননি, এই রায় তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।’ এরমধ্য দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রমের অবসান ঘটবে বলেও উল্লেখ করেন আপিল বিভাগ।[২১]
রায় ঘোষণার সময় আপিল বিভাগ আরও বলেছেন,
প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এ মামলা করা হয়েছিল। মামলার বিচার ছিল সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সামাজিকভাবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে।[২২]
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ সমূহ
[সম্পাদনা]| ঘটনা | তারিখ |
|---|---|
| দুদকের মামলা | ২০০৮ সালের ৩ জুলাই |
| অভিযোগপত্র | ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট |
| অভিযোগ গঠন | ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ |
| রায় ঘোষণা | ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি |
| জামিনের জন্য আপিল | ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি |
| জামিন আদেশ | ২০১৮ সালের ১২ মার্চ |
| সাজা স্থগিত | ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর |
| আপিল রায় | ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি |
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "খালেদা জিয়ার মামলায় কোন ধারায় কী সাজা?"। দৈনিক প্রথম আলো। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- ↑ "এতিমখানা দুর্নীতি: কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- 1 2 "খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড"। দৈনিক প্রথম আলো। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- ↑ "অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া-তারেক রহমানসহ সব আসামি খালাস"। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ১৫ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা: খালেদা জিয়াসহ সব আসামি খালাস"। বাংলা ট্রিবিউন। ১৫ জানুয়ারি ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "কীভাবে হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা?"। দেশ টিভি। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ "এতিমখানা দুর্নীতি: খালেদার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ২৫ জানুয়ারি ২০১৮। ২৫ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- ↑ "এতিমখানা দুর্নীতি: খালেদার বিচার শেষ পর্যায়ে"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ৫ ডিসেম্বর ২০১৭। ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- ↑ "রায় ঘোষণায় প্রস্তুত আদালত"। দৈনিক প্রথম আলো। ১৯ অক্টোবর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
- ↑ "রায় পড়া শুরু, আদালতে খালেদা জিয়া"। দৈনিক ইত্তেফাক। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
- ↑ "সাড়ে ছয় বছর পর মুক্ত খালেদা জিয়া"। দৈনিক যুগান্তর। ৭ আগস্ট ২০২৪।
- ↑ "বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্ত"। দৈনিক প্রথম আলো। ৬ আগস্ট ২০২৪। ৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০২৪।
{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক) - ↑ "খালেদা জিয়া: বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে"। বিবিসি বাংলা। ১১ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা: খালেদা জিয়ার ১০ বছরের সাজা স্থগিত"। VOA বাংলা। ১১ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "খালেদা জিয়ার ১০ বছরের সাজা স্থগিত"। দ্য ডেইলি স্টার। ১১ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ সব আসামি খালাস"। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ২৭ নভেম্বর ২০২৪। ২৭ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৭ নভেম্বর ২০২৪।
{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক) - ↑ "জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন খালেদা জিয়া"। দ্য ডেইলি স্টার। ২৭ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াসহ সব আসামিকে খালাস"। দৈনিক সমকাল। ২৭ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে খালাস"। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ২৭ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ "জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া খালাস"। দ্য ডেইলি স্টার। ১৫ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "মামলাটি বিদ্বেষপূর্ণ, খালেদা জিয়া নির্দোষ ছিলেন: আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ"। বাংলা ট্রিবিউন। ১৫ জানুয়ারি ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ছিল প্রতিশোধমূলক: প্রধান বিচারপতি"। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ১৫ জানুয়ারি ২০২৫।