বিষয়বস্তুতে চলুন

জিয়াউন্নবী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জিয়াউন্নবী
বইয়ের প্রচ্ছদ
লেখকমুহাম্মাদ করম শাহ আল-আজহারী
মূল শিরোনামضیاء النبی‎‎
প্রকাশনার স্থানপাকিস্তান
ভাষাউর্দু
বিষয়মুহাম্মাদ, ইসলাম
ধরননন-ফিকশন, সীরাত
প্রকাশিত১৯৯৯
প্রকাশকজিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স, মুহাম্মদ কাইয়ুম আওয়ান (ইংরেজি অনুবাদক)
মিডিয়া ধরনমুদ্রিত গ্রন্থ (শক্তমলাট)
পুরস্কার
  • পাকিস্তান ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পুরস্কার
  • ১৯৯৪ সীরাত কিতাব প্রতিযোগিতা (প্রথম স্থান)

জিয়াউন্নবী (উর্দু: ضیاء النبی) উর্দু ভাষায় লিখিত একটি সাত খণ্ডে সমাপ্ত গ্রন্থ, যেখানে সীরাতের প্রতিটি দিক বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।[] বইটি লিখেছেন পাকিস্তানি লেখক পীর মুহাম্মাদ করম শাহ আল-আজহারী। এ গ্রন্থে গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি প্রধান এবং প্রতিটি তথ্য প্রামাণ্য সূত্রসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রাচীন ও আধুনিক সব উৎস থেকেই ব্যাপকভাবে উপকৃত হওয়া হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রন্থটিকে প্রথম পুরস্কারের যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মুহাম্মদ কাইয়ুম আওয়ান বইটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন, যা জিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স থেকে সাত খণ্ডে প্রকাশ করা হয়।[]

বিষয়বস্তু

[সম্পাদনা]

পীর মুহাম্মদ করম শাহ আল-আজহারী রচিত ‘জিয়াউন্নবী’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে জিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স, লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়। জিয়াউন্নবী মোট সাত খণ্ডে সমাপ্ত একটি সীরাতগ্রন্থ। সাত খণ্ডের এই সীরাতগ্রন্থে প্রাচীন ও আধুনিক সমস্ত প্রামাণ্য উৎস থেকে উপকৃত হওয়া হয়েছে। লেখকের বর্ণনার ধরণ সহজ, যুক্তিনির্ভর এবং দলিলসমৃদ্ধ। এছাড়া বইটিতে পশ্চিমা চিন্তাবিদদের গ্রন্থ থেকেও ইসলাম এবং নবী করিমের সত্যতার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রন্থটি আরবি, ইংরেজি এবং উর্দু ভাষায় বিদ্যমান গবেষণার একটি জীবন্ত দলিল।[]

জিয়াউন্নবী ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে সীরাত কিতাব প্রতিযোগিতাতে প্রথম স্থান লাভ করে। আধুনিক যুগের সীরাত-সাহিত্যে এই গ্রন্থটির মর্যাদা খুবই উচ্চ।[] লেখক পীর মুহাম্মদ করম শাহ আল-আজহারী আরবি, উর্দু এবং ইংরেজি ভাষার উপর অগাধ জ্ঞান ও দখল থাকার কারণে এ গ্রন্থে তিন ভাষার সকল গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে গভীরভাবে উপকৃত হয়েছেন। এই গ্রন্থের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ষষ্ঠ ও সপ্তম খণ্ড সরাসরি প্রাচ্যবিদদের কুরআন ও সীরাত-সম্পর্কিত আপত্তিসমূহকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে, যাতে কুরআন, সীরাত ও ইসলাম সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও দলিলভিত্তিক প্রতিরক্ষামূলক আলোচনা রয়েছে। এটি পীর করম শাহ আল-আজহারীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে গণ্য হয়।[]

অধ্যায়সমূহ

[সম্পাদনা]

বইটির ৭ টি খণ্ডের প্রতিটা খণ্ডে ৪০০ থেকে ৬০০ পৃষ্ঠায় রচিত হয়েছে। অধ্যায়গুলোতে রাসূলের জীবনী ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা আছে।

প্রথম খণ্ড

[সম্পাদনা]

প্রথম খণ্ডে ৫২৫টি পৃষ্ঠা রয়েছে, এই খণ্ডে আরব জাতির ধর্মীয়, রাজনৈতিক, নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইসলাম প্রচারের জন্য আরবদের নির্বাচন কেন এবং কীভাবে তা একটি দিওয়ানবিশ্লেষণী আলোচনায় উপস্থাপিত হয়েছে। নবী করিমের পুণ্যবত পূর্বপুরুষদের বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া হয়েছে। এই খণ্ডের সূচনা হয়েছে একটি প্রারম্ভিক অংশ দিয়ে, যেখানে নবুওয়তের সময় মানবজাতির বিভ্রান্ত ও পতিত অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এরপর পারস্য সাম্রাজ্য, গ্রিক সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, মিশরীয় সভ্যতা ও ভারতীয় উপমহাদেশের রাজ্যগুলোর বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এ সকল সাম্রাজ্যের মানচিত্রও এই খণ্ডে প্রদান করা হয়েছে।

সীমান্ত চিহ্নিতকরণসহ এসব সভ্যতার নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ রয়েছে। এরপর আরব উপদ্বীপ, তার ভৌগোলিক মানচিত্র, প্রখ্যাত গোত্রসমূহ এবং বনী হাশিম বংশের পরিচয় আলোচনা করা হয়েছে। এই খণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর অন্তিম অংশে ইনজিল (বাইবেল)-এর আলোকে নবী করিমের আবির্ভাব সম্পর্কে সুসংবাদসমূহ প্রমাণসহ উপস্থাপন করা হয়েছে।

দ্বিতীয় খণ্ড

[সম্পাদনা]

এই খণ্ডে মোট ৬১০টি পৃষ্ঠা রয়েছে। এতে নবী করিমের পবিত্র জন্ম, শৈশব, জীবিকার সন্ধান, খাদিজার সঙ্গে বিবাহ, অহি, নবুওয়ত ও রিসালতের সূচনা, ইসলামের দাওয়াতের সূচনা, কুরাইশদের অত্যাচার, হাবশায় হিজরত, শিয়াবে আবু তালিবে অবরুদ্ধ জীবন এবং মি‘রাজ সংক্রান্ত ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

তৃতীয় খণ্ড

[সম্পাদনা]

এই খণ্ডে ৬৫৭টি পৃষ্ঠা রয়েছে। জিয়াউন্নবী এর তৃতীয় খণ্ডের সূচনা হয়েছে নবী করিমের ইয়াসরিব (মদিনা) অভিমুখে হিজরত প্রসঙ্গ দিয়ে। এই খণ্ডে প্রাথমিক মুহাজিরগণ, হিজরতের সূচনাপর্ব, পথিমধ্যবর্তী ঘটনাবলি, হিজরতের রুটম্যাপ এবং উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহের ব্যাখ্যা সংযোজিত হয়েছে। মদিনায় হিজরতের পর মুয়াখাত (ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা), মদিনার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং এর পরপরই সংঘটিত গাযওয়াসারিয়াহ-সমূহের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এই খণ্ডে পঞ্চম হিজরী পর্যন্ত সব প্রধান ঘটনাবলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

চতুর্থ খণ্ড

[সম্পাদনা]

এই খণ্ডে মোট ৮৫৪টি পৃষ্ঠা রয়েছে। এর সূচনা হয়েছে গাযওয়াে খন্দক থেকে এবং এতে ১০ হিজরি পর্যন্ত সংঘটিত সব গাযওয়াতসারিয়াহসমূহ বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। আরবের বিভিন্ন গোত্রের পক্ষ থেকে আগত প্রতিনিধিদলের আগমন নিয়েও একটি পৃথক অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে। এরপর হজ্জ্বাতুল বিদার সব গুরুত্বপূর্ণ দিক ও বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই খণ্ডের অন্তিম অংশে নবী করিমের ইন্তেকাল, পবিত্র দেহ মোবারকের গোসল, জানাজার নামাজ, কবর মোবারক এবং দাফনের বিবরণ বিবৃত হয়েছে।

পঞ্চম খণ্ড

[সম্পাদনা]

এই খণ্ডে মোট ৯৯৬টি পৃষ্ঠা রয়েছে। জিয়াউন্নবীর পঞ্চম খণ্ডে কুরআনের ঐসব আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেগুলো নবী করিমের প্রশংসা ও মর্যাদা বর্ণনা করে। এছাড়াও এই খণ্ডে রাসূলুল্লাহর গুণাবলি ও পূর্ণতা, সামাজিক আদব-কায়দা, নববী মুজিযাসমূহ এবং দরুদ শরীফের ফজিলত নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।

ষষ্ঠ খণ্ড

[সম্পাদনা]

এই খণ্ডে মোট ৬৪৮টি পৃষ্ঠা রয়েছে। খণ্ডটি একটি প্রারম্ভিক বক্তব্য দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর ইসলাম-পূর্ব যুগে ইহুদিখ্রিস্টানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে একটি পূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। পরে মুসলিম-খ্রিস্টান সম্পর্ক এবং সালিবি যুদ্ধের প্রভাবসমূহের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর পাশ্চাত্যে প্রাচ্যবিদ্যার প্রতি আগ্রহের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর তাহরিকে ইস্তিশরাক বা প্রাচ্যবিদ্যা আন্দোলনের (তাত্ত্বিক সংজ্ঞা, উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন) উপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এই আন্দোলনের ইতিহাসকে ছয়টি যুগে বিভক্ত করে প্রতিটি যুগের মুস্তাশরিকগণের উদ্দেশ্য ও কৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই খণ্ডে প্রাচ্যবিদদের কুরআন নিয়ে করা অভিযোগসমূহ যেমন: আয়াতের নাসিখ-মানসুখ, বিভিন্ন ক্বিরাআতের পার্থক্য, কুরআনের সংকলন ও তথাকথিত ঘরানীক কাহিনী সম্পর্কে তোলা আপত্তিগুলোর পর্যালোচনা করা হয়েছে। কুরআন, হাদীস ও বাইবেলের আলোকে যুক্তিসম্মত জবাব প্রদান করা হয়েছে। প্রাচ্যবিদদের নিজস্ব ভাষাতেই তাদের অভিযোগ খণ্ডন করে ইসলাম ও কুরআনের সত্যতা প্রমাণ করা হয়েছে।

সপ্তম খণ্ড

[সম্পাদনা]

জিয়াউন্নবী গ্রন্থের এই সপ্তম ও শেষ খণ্ডে মোট ৬১৭টি পৃষ্ঠা রয়েছে। এই খণ্ডে রাসূলুল্লাহর হাদীস ও সীরাতে মুবারক সম্পর্কে পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের (মুস্তাশরিকিন) করা আপত্তি ও অপবাদসমূহ আলোচিত হয়েছে এবং সেগুলোর যুক্তিপূর্ণ খণ্ডন উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, হাদীস সংরক্ষণ নিয়ে প্রাচ্যবিদরা যে আপত্তি করেছে, তার উত্তর দিতে গিয়ে হাদীসের সংকলনের বিভিন্ন যুগ ও হাদীস সংরক্ষণের প্রচলিত পদ্ধতিসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাদীস সম্পর্কে অনেক প্রাচ্যবিদের ইতিবাচক অভিমতও তুলে ধরা হয়েছে।

এরপর নবী করিমের বংশ নিয়ে করা আপত্তির উত্তরে তার ইসমাঈলের বংশধর হওয়ার বিষয়টি বিশদভাবে প্রমাণসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এছাড়াও রাসূলের সামাজিক মর্যাদা খাটো করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মৃগীরোগ (এপিলেপসি) আক্রান্ত হওয়ার মিথ্যা অপবাদ, চরিত্র হননের প্রচেষ্টা, বহুবিবাহ নিয়ে অভিযোগ এবং রাসূলের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভিযানগুলোকে সহিংসতা বা হিংস্রতা আখ্যা দিয়ে সমালোচনার সব যুক্তির যুক্তিভিত্তিক খণ্ডন পেশ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে কুরআন, হাদীস ও বাইবেল থেকে দলিল পেশ করে প্রাচ্যবিদদের বক্তব্যের যথাযথ জবাব প্রদান করা হয়েছে। এই খণ্ডে তাঁদের মধ্য থেকে যারা ন্যায়পরায়ণ ও নিরপেক্ষভাবে নবী করিমের প্রশংসা করেছেন, তাঁদের মূল্যায়নও তুলে ধরা হয়েছে এবং ইসলাম ও নবী বিরোধীদের যুক্তিসমূহকে যুক্তিভিত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

আরো দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Mughal, Justice (R) Dr. Munir Ahmad (১২ জুলাই ২০২০)। "Ziya'-un-Nabī (ﷺ) in the Words of Pīr Muḥammad Karam Shāh al-Azharī (Being an English Translation of Book Ziya'-un-Nabi)"papers.ssrn.com (ইংরেজি ভাষায়)।
  2. "Zia un Nabi : English 7 Vol's: Madani Propagation"। islam786books.com। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০১৫
  3. Ahmed, Fraz; Yasin, Hafiz Muhammad Usman; Mehmood, Dr Hafiz Asif (৩ নভেম্বর ২০২৪)। "Genealogy of Prophet Muhammad (PBUH): A Research and Comparative Study of 'Zia-un-Nabi' by Pir Karam Shah Al-Azhari and 'Seerat-un-Rasool' by Dr. Muhammad Tahir-ul-Qadri: نسب نامہ محمد ﷺ :ضیاءالنبی از پیر کرم شاہ الازہری اور سیرۃالرسول ازڈاکٹر محمد طاہرالقادری کے حوالے سے تحقیقی و تقابلی مطالعہ"Al-Marjān (المرجان) (ইংরেজি ভাষায়)। (3): ১৩৬− ১৪৮–১৩৬− ১৪৮। আইএসএসএন 3006-0370
  4. Ullah, Sami; Haq, Dr Zia Ul (৩০ জুন ২০১৭)। "A Scholarly Review of the Style and Characteristics of Tafseer"www.prdb.pk (ইংরেজি ভাষায়)।
  5. জিয়াউন্নবী, পীর মুহাম্মদ করম শাহ আল-আজহারী, জিয়াউলকুরআন পাবলিকেশন্স, লাহোর, ১৪২০ হিজরি।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]