জালালুদ্দীন সুয়ুতী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
AsyutAsyutiMosqueInside.jpg

জালালুদ্দীন সুয়ুতী ( 'সুয়ুতী' বা 'সিয়ুতী') প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার , বিখ্যাত তাফসিরকারক , মুহাদ্দিস , ফকিহ , সাহিত্যিক , কবি, ইতিহাসবিদ এবং তিনি হিজরি নবম শতকের সমসাময়য়িক কালের একজন মুজাদ্দিদ ছিলেন ।

জন্ম ও বংশ পরম্পরা[সম্পাদনা]

জালালুদ্দীন সুয়ুতী ৮৪৯ হিজরির ১ রজব ; ১৪৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ অক্টোবর তারিখে মিসরের কায়রোতে জন্ম গ্রহণ করেন । তার পিতা তখন কায়রোতে খলিফার প্রাসাদে ইমামের দায়িত্ব পালনরত ছিলেন ।[১]

পিতা[সম্পাদনা]

তার পিতা শায়খ কামালুদ্দীনও ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও কাজী । তিনি 'আসয়ুত্ব' থেকে কায়রোয় চলে আসলে সেখানে 'ইবনে তুলুন জামে মসজিদ-এ খতিব হিসেবে দাতিত্ব পালন করেন । পাশা পাশি শায়খুনী জামে মসজিদ সংলগ্ন মাদরাসায় তিনি 'ফিকহ'-এর ওস্তাদ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন । হিজরি ৮৫৫ সালে তিনি ইন্তিকাল করেন । এ সময় জালালুদ্দীন সুয়ুতীর বয়স ছিল পাঁচ কিংবা ছয় বছর ।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

বাবার মৃত্যুর পর তার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার পিতার ঘনিষ্ঠ এক সুফি বন্ধু । জালালুদ্দীন সুয়ুতী পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ও মেধাবী ছিলেন । আট বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্ত করে ফেলেন । তারপর তিনি নাহভ ও ফিকহ'র 'মতন' মুখস্থ করতে মশগুল হন । হাদিস শাস্ত্রে তিনি বদরুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি হানাফি (রাহ), হাফিজ সাখাভী (রাহ) সহ অন্যান্য বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের নিকট শিক্ষা লাভ করেন । তিনি তাসাউফ তথা আধ্যাত্নবাদে দীক্ষিত হতে প্রসিদ্ধ সুফি বুজুর্গ কামালুদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ মিসরি শাফেয়ি (রাহ) এর আশ্রয়ে উপনীত হন এবং তার মুবারক হাতে খিরকায়ে তাসাউফ পরিধান ও খালকে খোদার ফয়েজ (অনুকম্পা) লাভে ধন্য হন ।

একটি তথ্যের অবতারণা[সম্পাদনা]

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতীর জীবনী লেখকদের কেউ কেউ এরকম উল্লেখ করেছেন যে , তিনি ( আল্লামা সুয়ুতী ) হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর ছাত্র ছিলেন । তিনি হাদিস শাস্ত্রে [[ইবনে হাজার আসকালানীর (রাহঃ) নিকট থেকে সনদ প্রাপ্ত ছিলেন ।[২] আর কেউ কেউ এর বিপরীত মত উল্লেখ করে বলেন যে, এরুপ মন্তব্য সঠিক নয় । যেহেতু হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ৮৫২ হিজরিতে ইন্তেকাল করেছেন আর আল্লামা সুয়ুতী জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮৪৯ হিজরিতে । সেহেতু এ সন তারিখ বিবেচনা অনুসারে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর মৃত্যুর সময় জালালুদ্দীন সুয়ুতীর বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর । এ বয়সে ইবনে হাজার আসকালানীর ছাত্র হওয়ার দাবী উত্তাপন অমুলক । তবে এ কথা উল্লেখ্য যে, তিন বছর বয়সে তার পিতা তাকে ইবনে হাজার আসকালানীর (রহ) মজলিসে উপস্থিত করেছিলেন ।[৩]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রাহ.) তখনকার মিসরের সর্বোচ্চ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপিনার মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা করেছিলেন । তিনি ৮৭১ হিজরিতে জামেয়া শায়খুনিয়া (কায়রু)-তে শায়খুল হাদিস পদ অলংকৃত করেন । সেখানে তিনি পাঠদান কালীন সময়ে কাজী আয়াজের আশ শিফা-এর পাঠ মজলিসে পূর্ণরূপে সমাপ্ত করেন ।

স্বভাব চরিত্র[সম্পাদনা]

আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সিয়ুতী (রহ) অত্যন্ত পরহেযগার তাকওয়াবান খোদাভীরু ছিলেন । দ্বীনি খেদমতে কাটিয়েছন জীবনের বেশির ভাগ সময় । তার বয়স যখন চল্লিশ হয় , তখন তিনি ক্ষণিকের জীবনের প্রতি আরও সতর্ক হয়ে পড়েন । দুনিয়ার আরাম আয়েশকে উপেক্ষা করে মহান স্রষ্টার ইবাদতে আরও মশগোল হয়ে যান । বেশির ভাগ সময় নির্জনতায় থাকতে তিনি পছন্দ করতেন । ঘরের দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলতেন না । তার কাছে লেখালেখি , বই-পুস্তক, গ্রন্থ আর গবেষণা কর্মে নির্জনতাই উতকৃষ্ট সহায়ক মনে হতো । [৪]

তীসার্রোফ ও কারামত[সম্পাদনা]

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ) কুরআন ও সুন্নাহ'র নুরানি স্রোতে অবগাহনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসুল (দঃ)-এর এত্তেবায় নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন । তার রুহানি ক্ষমতা ছিল খুবই প্রবল । আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ)-এর এক বিশেষ খাদেম ছিল নাম তার মুহাম্মদ ইবনে আলী হাব্বাক । ইবনে আলী হাব্বাক বর্ণনা করেন যে , একদিন দুপুরে খাবারের পর জালালুদ্দীন সুয়ুতী আমাকে বললেন ,- তুমি আমার জীবদ্দশায় আমার উপস্থিতিতে কিংবা অনুপস্থিতিতে কখনও কারো কাছে এ রহস্যের কথা যদি ব্যক্ত না কর, তাহলে আল্লাহ চাহেতো আজ আসরের সালাত তোমাকে মক্কা শরিফে পড়ার ব্যবস্থা করবো - ইনশাআল্লাহ । আমি বললাম , আলহামদুলিল্লাহ । ঠিক আছে, তাই হবে । তিনি বললেন , তাহলে চোখ বন্ধ করো । আমি চোখ বন্ধ করলাম । সুয়ুতী (রহ) আমার হাত ধরে প্রায় ২৭ কদম সামনে অগ্রসর হলেন । তারপর তিনি বললেন , চোখ খোল । আমি চোখ খুললাম । চোখ খুলে দেখি আমরা দু'জন 'বাবে মুয়াল্লা'য় দাঁড়িয়ে আছি । এরপর হেরেম শরিফে পৌছে আমরা তাওয়াফ করলাম । পবিত্র জমজমের পানি পান করলাম । আসরের সালাত আদায় করলাম । আল্লামা সুয়ুতী (রহ) বললেন , মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দার দু'আ কবুল করলেন । আমাদের জন্য জমিন সংকোচিত হয়ে গেল । ইন্নাল্লাহা আ'লা কুল্লী শায়য়িন কাদির । এ যে আল্লাহ তায়ালার কুদরতময় অনুগ্রহ ! ইবনে আলী হাব্বাক বলেন , অতঃপর জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ) বললেন, - হেরেমের আশে পাশে আমাদের পরিচিত মিশরের অনেক লোক রয়েছে । আমাদেরকে তারা চিনতে পারেনি । তুমি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গেই চলো, অথবা হাজীদের সঙ্গে চলে এসো । আমি বললাম , আপনার সঙ্গেই যাব । সুতরাং আমরা রওয়ানা হলাম । 'বাবে মুয়াল্লা' পর্যন্ত যাওয়ার পর জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ) আমাকে বললেন, চোখ বন্ধ করো । আমি চোখ বন্ধ করলাম । এ অবস্থায় ৭ কদম সামনে অগ্রসর হলে তিনি বললেন , এবার চোখ খোল । আমি চোখ খুললাম । খুলে দেখি আমরা মিশরে পৌছে গেছি ।

রচনাবলি[সম্পাদনা]

  • আল ইতকান ফি উলুমুল কুরআন।
  • আদ দুররুল মানসুর ফি তাফসিরি বিল মা'ছুর ।
  • লুবানুন নুকুল ফি আসবাবিন নুজুল ।
  • তাফসির আল জালালাইন

এ গ্রন্থটি ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতীর একক রচনা নয় । জালালুদ্দীন সুয়ুতীর বিশিষ্ট শিক্ষক যার নাম ছিল জালালুদ্দীন মহল্লী , তিনি আল কুরআনের তাফসিরের একটি গ্রন্থ রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন । তিনি আল কুরআনের শেষার্ধের তাফসির প্রথমে সমপন্ন করেন । পরে আল কুরআনের প্রথমার্ধের তাফসির লিখতে মনোনিবেশ করেন । সুরা ফাতিহার তাফসির শেষ করার পর তিনি আর বাকী অংশের তাফসির সম্পন্ন করে যেতে পারেননি । এর আগেই তার জীবন সমাপ্তির ডাক এসে যায় । একপর্যায়ে একদিন তিনি পরলোক গমন করেন । প্রিয় শিক্ষকের রেখে যাওয়া এই অসমাপ্ত তাফসির গ্রন্থ রচনার বাকী কাজটুকু নিষ্ঠার সাথে বিচক্ষণতায় সম্পন্ন করেন আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী। কথিত আছে যে, আল্লামা সুয়ুতী এটি চল্লিশ দিনে সমপন্ন করেছিলেন । গ্রন্থটি যেহেতু দুই জালালের দ্বারা রচিত হয়েছে, তাই মুসলিম বিশ্বে এটি তাফসিরে জালালাইন নামে পরিচিতি লাভ করে । আর এ কথা সত্য যে, জালালুদ্দীন সুয়ুতী যদি এর বাকি অংশের প্রণয়ন না করতেন হয়তো তা প্রকাশের মুখ দেখতো কিনা কে জানে ।

  • হাশিয়াতু আলা তাফসিরি বায়জাবী ।
  • শারহু ইবনি মাজাহ ।
  • তাদরিবুর রাওয়ী ।
  • শারহুস সুদুর বি শারহে হালিল মাওতা ওয়াল কুবুর ।
  • আল বুদুরুস সাফিরাহ আন উমুরিল আখিরাহ ।
  • আত তিব্বুন নাবাওয়ী ।
  • আল আশবাহ ওয়ান নাজারাহ ।
  • আল হাবি লিল ফাতাওয়া ।
  • তারিখুল খুলাফা
  • ইসআফুল মুবাত্তা বি রিজালিল মুয়াত্তা ।
  • আল আয়াতুল কুবরা ফি শারহি কিসসাতিল ইসরা ।
  • আল জামিউস সাগির মিন হাদিসিল বাশিরিন নাজির ।
  • আল জামিউল কাবির ।
  • ইহয়াউল মাইয়িত বি ফাজাইলি আহলি বাইত ।
  • আল হাবাইকু ফি আখবারিল মালাইক ।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রাহ.) ৯১১ হিজরি ১৯ জুমাদাল উলা , ১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. হুসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ ও ইম্বাউল আজকিয়া বি হায়াতিল আম্বিয়া- এর লেখক পরিচিতি অংশ ; অনুবাদক - মাওলানা ছালিক আহমদ, সহ অধ্যাপক সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা ; প্রকাশনায়: আল আমিন প্রকাশন, বিয়ানী বাজার, সিলেট । প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারী ২০১০ ইং ; মহরম ১৪৩১ হিজরি ।
  2. বাংলা খাসায়েসুল কুবরা- (১ম খন্ড)-এর 'অনুবাদকের আরজ' অংশ দ্রষ্টব্য । অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান । মদীনা পাবলিকেশান্স ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ । প্রথম প্রকাশ: রবিউল আওয়াল ১৪১৯ হিজরি, শ্রাবণ: ১৪০৫ বাংলা । তৃতীয় সংস্করণ : শাওয়াল ১৪১৯ হি: , মাঘ: ১৪০৫ বাংলা , ফেব্রুয়ারি : ১৯৯৯ ইংরেজি । * ৯ম সংস্করণ : সফর: ১৪৩২ হি:, জানুয়ারি : ২০১১ ইংরেজি । ISBN 984-8367-98-5
  3. বাংলা ভাষায় অনুবাদকৃত : তাফসীরে জালালাইন - ১ ; পৃষ্ঠা : ৫২ ; প্রকাশনায় : ইসলামিয়া কুতুবখানা ৩০/৩২ নর্থব্রুক হল রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০
  4. الکوکب الساءرة باعيان المائة العاشر :লেখক - নাজমুদ্দীন আল কুরী ।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  • Tafsir al-Jalalayn কুরআনের তাফসীর (ইংরেজী ভাষায়)।
  • Radiant Cosmography (আল হায়া আল-সানিয়া ফাই-হায়া আল-সুননিয়া) আর্কাইভ.ওআরজি ইংরেজীতে।
  • The Dead become Alive by the Grace of the Holy Five (ইহাইয়া আল-মায়ায়িত)আর্কাইভ.ওআরজি ইংরেজীতে।