বিষয়বস্তুতে চলুন

জানকীনাথ ঘোষাল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জানকীনাথ ঘোষাল
জন্ম১৮৪০ (1840)
জয়রামপুর নদীয়া ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ভারত)
মৃত্যু১৯১৩ (বয়স ৭২৭৩)
দাম্পত্য সঙ্গীস্বর্ণকুমারী দেবী (বি.১৮৬৮)
সন্তানহিরণ্ময়ী দেবী (কন‍্যা)
জ‍্যোৎস্নানাথ ঘোষাল (পুত্র)
সরলা দেবী চৌধুরানী (কন‍্যা)
পিতা-মাতাজয়চন্দ্র ঘোষাল (পিতা)

জানকীনাথ ঘোষাল (১৮৪০ - ১৯১৩) ছিলেন ঊনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি ব্যক্তিত্ব। আদি ব্রাহ্মসমাজের একজন ভক্ত, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জামাতা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকের সম্পাদক।[]

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

[সম্পাদনা]

জানকীনাথ ঘোষালের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার জয়রামপুরের এক জমিদার পরিবারে। জানকীনাথ ছিলেন জয়চন্দ্র ঘোষালের দুই পুত্র সন্তানের কনিষ্ঠ। জানকীনাথের পড়াশোনা কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে। শৈশবেই লাঠিখেলা, বর্ষাখেলা, ঘোড়ায় চড়া ইত্যাদির অনুশীলনে শারীরিক শক্তিতে বলীয়ান জানকীনাথ অধ্যক্ষ উমেশচন্দ্র দত্তের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তার সহপাঠিরা ছিলেন রামতনু লাহিড়ী, রাধিকাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, কালীচরণ ঘোষ, রায় যদুনাথ রায় বাহাদুর প্রমুখেরা। রামতনু লাহিড়ীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতিভেদাভেদ প্রথা ও উপবীতধারণ বিষয়ে তাঁর বিরূপতা গড়ে ওঠে।[] উপবীত পরিত্যাগ করলে তার পিতা জানকীনাথকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। এমনকি, জানকীনাথের অগ্রজ মারা গেলেও জানকীনাথকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে একটি অংশ বিক্রি করে দেন। এসব কিছুতেই জানকীনাথ দমে না গিয়ে নিজের আদর্শ ত্যাগ করেনি। নিজের খরচের জন্য পুলিশের চাকরি করেন। পরে ডেপুটি কালেক্টর হন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর বন্ধু। সুদর্শন জানকীনাথকে দেখে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ দ্বাদশবর্ষীয়া স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে তার বিবাহ দেন ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির বনেদিয়ানা জানকীনাথের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করতে পারেনি। বিবাহকালে উপবীত গ্রহণ করে ব্রাহ্ম হওয়া এবং ঘরজামাই থাকা, ঠাকুরবাড়ির এই দুটি রীতির কোনটিই তিনি মানেন নি। বিবাহের পর জানকীনাথ প্রথমে শিয়ালদহের বৈঠকখানা অঞ্চলে, পরে শিমলা অঞ্চলে এবং তারপর কাশিয়াবাগনের বাড়িতে থাকতেন। বিবাহের পর জানকীনাথের বিলেত গমনের প্রস্তাব হওয়ায় তিনি ডেপুটি কালেক্টরের পদে ইস্তফা দেন।

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

কিন্তু নানা অভাবিত কারণে বাধা পড়ায় তিনি স্বাধীন জীবিকার জন্য ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন। নিজ অধ্যবসায়ে সাফল্য অর্জন করেন এবং নিজস্ব জমিদারি গড়ে একদা রাজা উপাধি লাভ করেন।[] অন্যদিকে কলকাতায় জনহিতকর কাজে তিনি যেমন অংশ নিতেন, ত্যাগ স্বীকার ও দয়া ছিল তার চরিত্রে অপর এক দিক।। ব্যবসার সূত্রে তিনি বেরিনী অ্যান্ড কোম্পানি নামের এক হোমিওপ্যাথিক পুস্তকের দোকান ক্রয় করেন। খুব অল্পদিনেই লাভজনক হওয়ায় পূর্বের মালিক তাহা পুনর্লাভে ইচ্ছুক হন এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মধ্যস্থতায় শরণাপন্ন হন। বিদ্যাসাগর ছিলেন তার বিশেষ বন্ধু। বিদ্যাসাগরের অনুরোধে জানকীনাথ স্বার্থত্যাগ করে দোকানটি ফিরিয়ে দেন। []

তিনি বহুবছর তৎকালীন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কমিশনার ছিলেন। ম্যেকেঞ্জি বিলের প্রতিবাদে যে ২৮ জন কমিশনার পদত্যাগ করেন, তন্মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। শিয়ালদহ ও লালবাজার দুই কোর্টেই তিনি অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন।

শেষের দিকে বৎসরাবধি তিনি অসুস্থ ছিলেন, মাঝে মধ্যে শয্যাশায়ী থাকতেন, কিন্তু সুস্থ হলেই সবায়ের নিষেধ অমান্য করে কোর্টে ও অন্যান্য কাজে লিপ্ত হতেন।

দিব্যজ্ঞান ও রাজনীতি

[সম্পাদনা]

জনসংযোগে তাঁর সব চেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল - ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস তথা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাজকর্ম। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিভাময়ী মাদাম ব্লাভাট্স্কি ভারতে এসে তৎকালীন মাদ্রাজের আডিয়ারে থিয়সফি'র প্রচার শুরু করলে সে সময় জানকীনাথ দিব্যজ্ঞানী সংঘভুক্ত অর্থাৎ থিয়সফিষ্ট সম্প্রদায়ভুক্ত হন। বৎসরান্তে মাদ্রাজে থিয়সফিক্যাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হত এবং ভারতবর্ষের নানা স্থান হতে থিয়সফিষ্টেরা অংশ নিতেন। এইরূপ সম্মেলন হতে হিউম সাহেবের মনে ভারতবাসীর মঙ্গল সাধনে থিয়সফিক্যাল সম্মেলন ধরনে রাজনৈতিক সম্মেলনের ভাবনার উদয় হয়। []এই ভাবনা হতেই ভারতে কংগ্রেসের উৎপত্তি এবং সেটি বাস্তবায়িত করার মূলে তিনি পেলেন থিওসফিক্যাল সোসাইটির জানকীনাথ ঘোষালকে। দিব্যজ্ঞানবাদী (থিওজফিস্ট) জানকীনাথ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা আদিযুগের সক্রিয় সদস্য।[]তিনি কিছুসময় এলাহাবাদে অবস্থানকালে "Indian Union" নামের সাপ্তাহিক সম্পাদনা ভার গ্রহণ করেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মহাত্মা গান্ধী তাঁর সংস্পর্শে আসেন। জানকীনাথ ঘোষাল ব্রিটিশ শাসনকালে ঔপনিবেশিক ভারতে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক বিচারের, Celebrated Trials in India নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ড ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেন।[]

রামকৃষ্ণ সকাশে

[সম্পাদনা]

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ২ মে জানকীনাথ ব্রাহ্মভক্তদের সাথে কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ি নন্দনবাগানে যান শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে ঈশ্বরীয় কথা শুনতে। তাঁর মুখে কৃষ্ণের কথা স্মরণে এসে যায় এমন কোন পার্থিব বস্তু প্রত্যক্ষ করলে রাধার উন্মাদনা উল্লেখিত হলে, বাস্তববাদী মানুষ জানকীনাথ পার্থিব জিনিসের কারণে মানসিক উদ্দীপনা অর্থহীন ভেবে মন্তব্য করেন - উন্মাদনা কাম্য নয়। অতঃপর, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতিবাদ করে পার্থিব বিষয় নিয়ে পাগলামি আর ঈশ্বরচিন্তায় পাগলামির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রীম রচিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। []

জীবনাবসান

[সম্পাদনা]

জানকীনাথ ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর ও স্বর্ণকুমারী দেবীর এক পুত্র জ্যোৎস্নানাথ এবং দুই কন্যারা হলেন হিরণ্ময়ী দেবীসরলা দেবী চৌধুরানী

শিবনাথ শাস্ত্রী জানকীনাথের হিতকর কাজ সম্পর্কে উল্লেখ করেন-

"দুঃখীর দুঃখ নিবারণ, বিপন্নের বিপদ উদ্ধার, স্বদেশে শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তার প্রভৃতি যে দিকে যে কোন কার্য্যে তাঁহার সহায়তার প্রয়োজন হইত, সর্বদাই তিনি তাহাতে আপনার শক্তি ও সামর্থ্য নিয়োগ করিতেন । কোন ভাল কাজের প্রস্তাব লইযা তাঁহার কাছে আসিলে কাহাকেও কখনও নিরাশ হইতে হয় নাই। সেই সকল প্রসঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলিয়া যাইত, তাঁহার যেন আহার নিদ্রা মনে থাকিত না, কতই যুক্তি আঁটিতেছেন, কতই উপায় উদ্ভাবন করিতেছেন, কতই সাহায্যের পথ আবিষ্কার করিতেছেন । সে সময়ে তাঁহার কাছে বসিয়া থাকাও একটি আনন্দ ।"

[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "Family tree of Pandit Rambhuj DUTT CHOUDHRY"। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুন ২০২৫
  2. "স্কুলে পড়তে পড়তেই শিক্ষয়িত্রী: ঠাকুর বাড়ির হিরণ্ময়ী"। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জুন ২০২৫
  3. 1 2 সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৮৩৮, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  4. 1 2 3 "জীবনের ঝরাপাতা/জানকীনাথ ঘোষাল (১৮৪০-১৯১৩)"। সংগ্রহের তারিখ ৮ আগস্ট ২০২৫
  5. ঘোষাল, জে (জানকীনাথ) (১৯০২)। Celebrated Trials in India VI। ব্যানার্জি, ভবানীপুর, কলকাতা (কিসিংগার পাবলিকেশন্স, ২০০৯ সংস্করণ)। আইএসবিএন ৯৭৮-১১০৪০৭৯২৯১ {{বই উদ্ধৃতি}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য)
  6. "Janakinath Ghoshal (1840-1913)"। সংগ্রহের তারিখ ৯ আগস্ট ২০২৫