জাতিসংঘ সদর দপ্তর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
UN HQ 157652121 5b5979da9e2.jpg
ইস্ট রিভার থেকে দৃশ্যমান জাতিসংঘ সদর দপ্তর
সাধারণ তথ্য
স্থাপত্য রীতি আন্তর্জাতিক রীতি
অবস্থান নিউ ইয়র্ক
(আন্তর্জাতিক অঞ্চল)
ঠিকানা ৭৬০ ইউনাইটেড ন্যাশনস প্লাজা, নিউ ইয়র্ক, নিউ ইয়র্ক ১০০১৭, যুক্তরাষ্ট্র
নির্মাণ শুরু হয়েছে ১৯৪৮ (১৯৪৮)[১]
সম্পূর্ণ ৯ অক্টোবর ১৯৫২ (১৯৫২-১০-০৯)[১]
ব্যয় $৬৫০০০০০০
স্বত্বাধিকারী জাতিসংঘ
উচ্চতা ১৫৫ মিটার (৫০৯ ফু)[১]
কারিগরী বিবরণ
তলার সংখ্যা ৩৯[১]
নকশা এবং নির্মান
স্থপতি অস্কার নিয়েমার
লে কর্বুজিয়ের
স্থাপত্য সংস্থা হ্যারিসন অ্যান্ড অ্যাব্রামোভিটজ্‌
প্রধান ঠিকাদার [Fuller, Turner, Slattery, and Walsh]

জাতিসংঘ সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত একটি কমপ্লেক্স। ১৯৫২ সালে নির্মাণের পর থেকে এটি জাতিসংঘের দাপ্তরিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যানহাটন বরোর টার্টল বে এলাকায় এটি অবস্থিত। এই কমপ্লেক্সের সামনে ইস্ট রিভার অবস্থিত। এর পশ্চিমে ফার্স্ট এভিনিউ, দক্ষিণে ইস্ট ফোর্টি সেকেন্ড স্ট্রিট, ইস্ট ফোর্টি এইটথ্‌ স্ট্রিট উত্তরে এবং পূর্বে ইস্ট রিভার অবস্থিত। টার্টল বে নামটি অনেক সময় জাতিসংঘের সদর দপ্তর বা পুরো জাতিসংঘকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

জাতিসংঘের তিনটি অতিরিক্ত, সহায়ক ও আঞ্চলিক সদর দপ্তর রয়েছে। এগুলো জেনেভা, ভিয়েনা ও নাইরোবিতে অবস্থিত। এই দপ্তরগুলো জাতিসংঘকে তার নির্দেশনা প্রতিনিধিত্বকরণে, কূটনৈতিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে ও কিছু অতিরাষ্ট্রিক সুবিধা লাভে সাহায্য করে। তবে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর কেবল জাতিসংঘের প্রধান ছয়টি অঙ্গসংগঠন ধারণ করে। এছাড়া জাতিসংঘের পনেরোটি বিশেষায়িত সংস্থার দপ্তরগুলো নিউ ইয়র্কের বাহিরে অন্যান্য দেশে অবস্থিত।

নিউ ইয়র্ক শহরে অবস্থিত হলেও জাতিসংঘ সদর দপ্তর কর্তৃক অধিকৃত জায়গাটি জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক অধিকারের আওতাভুক্ত। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে জাতিসংঘ কৌশলগতভাবে এই জায়গাটিকে অনেকটা অতিরাষ্ট্রিকভাবে ব্যবহার করে। তবে পুলিশ প্রশাসন, দমকল ব্যবস্থা ইত্যাদি ব্যবহারের জন্য জাতিসংঘ অধিকাংশ স্থানীয়, প্রাদেশিক ও রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলে।

এই ভবনের মূল অংশ ১৯৪৮-১৯৫২ সালে নির্মিত হয়। এটি ১৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এই জায়গাটি তৎকালীন নিউ ইয়র্কের এক শীর্ষস্থানীয় আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি নেলসন রকফেলার এই জমি ক্রয়ের ব্যবস্থা করেন। এই জমি ক্রয়ের জন্য প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ডলার তাঁর পিতা জন রকফেলার দান করেন।[২] রকফেলার পরিবারের ব্যক্তিগর স্থাপত্য উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট স্থপতি ওয়ালেস হ্যারিসনকে জাতিসংঘ সদর রপ্তর পরিকল্পনায় পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি এবং তাঁর ফার্ম, হ্যারিসন অ্যান্ড অ্যাব্রামোভিটজ্ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধান করে।[৩]

পরিকল্পনা ও নির্মাণ[সম্পাদনা]

সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় স্থপতিদের সমন্বয়ে একটি বহুজাতিক কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন স্থপতি ওয়ালেস হ্যারিসনকে এই পরিকল্পনার জন্য পরিচালক নিযুক্ত করা হয়। স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি পরিকল্পনা উপদেষ্টাদের একটি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডে সোভিয়েত ইউনিয়নের এন. ডি. ব্যাসোভ, বেলজিয়ামের গ্যাস্টন ব্রুনফট, কানাডার আর্নেস্ট কর্মিয়ার, ফ্রান্সের লে কর্বুজিয়ের, চীনের লিয়াং-সিউ চেং, সুইডেনের সভেন মার্কিলাস, ব্রাজিলের অস্কার নিয়েমার, যুক্তরাজ্যের হওয়ার্ড রবার্টসন, অস্ট্রেলিয়ার জি. এ. সলিউক্স এবং উরুগুয়ের জুলিও ভিলামাও ছিলেন।[৪]

জাতিসংঘ প্রথমে চিন্তা করেছিল সদর দপ্তরের জন্য একটি স্বাধীন-স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর নির্মিত হবে। কিন্তু নানাবিধ বাধা-বিপত্তির কারণে এই উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পরিকল্পনা বোর্ড কমপক্ষে ৪৫টি নকশা প্রস্তুত করে। অনেক পর্যলোচনার পরে হ্যারিসন, অস্কার নিয়েমারের ৩২ নং প্রকল্প ও লে কর্বুজিয়েরের ২৩ নং প্রকল্পের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নকশা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এই চূড়ান্ত নকশাকে পরবর্তিতে আরো কিছু পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয় এবং এর ভিত্তিতে ভবনটি নির্মিত হয়।[৫] নিউ ইয়র্ক সিটির সাথে করা চুক্ত অনুযায়ী ভবনটি স্থানীয় অগ্নি নিরাপত্তা ভবন নির্মাণের বেশ কিছু নীয়মনীতি মানলেও সব নিয়ম মানেনি। মহাসচিবের কার্যালয়টি ভবনের ৩৮তম তলায় অবস্থিত। ১৯৪৮ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলেও ভবনটির ভিত্তি প্রস্তর ১৯৪৯ সালের ২৪ অক্টোবর স্থাপিত হয়।[৪] এর কাজ শেষ হয় ১৯৫২ সালে। এই নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় ৬৫ মিলিয়ন ডলার অর্থ সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রদান করে।[৬]

বিকল্প প্রস্তাবনা[সম্পাদনা]

নিউ ইয়র্ক সিটি নির্বাচনের পূর্বে বিশ্বের অনেক দেশের শহর জাতিসংঘ সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য জমি দিতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও স্থান পর্যালোচলনা করার পরে ইস্ট রিভার তীরবর্তী স্থানটি নির্বাচিত হয়। একটি শক্তিশালী চক্রান্তকারী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় লীগ অফ নেশনস কমপ্লেক্সের জায়গাটিকে প্রস্তাব করেছিল। এছাড়া অনেক দেশের অনেক নেতৃবর্গ এই নির্মাণকাজের জন্য স্থানের ব্যাপারে প্রস্তাব করেছিলেন। ম্যানহাটনের ইস্ট রিভার পার্শ্ববর্তী স্থানটি নির্বাচনের আগে সান ফ্রান্সিসকো, মেরিন কাউন্টি, ফিলাডেলফিয়া, বোস্টন, কুইন্স, নিউ ইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টি এবং কানেক্টিকাটের ফেয়ারফিল্ড কাউন্টি বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু জন রকফেলার ইস্ট রিভার পার্শ্ববর্তী স্থানটি ক্রয়ের জন্য ৮.৫ মিলিয়ন ডলার দান করার ঘোষণা দেয়ার পরই জায়গাটি নির্বাচিত হয়।

অস্কার নিয়েমার এবং লে কর্বুজিয়ের[সম্পাদনা]

নিউ ইয়র্কে আসার পর লে কর্বুজিয়েরে অনুরোধে অস্কার নিয়েমার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইতোমধ্যে লে কর্বুজিয়ের তাঁর প্রস্তুতকৃত ডিজাইনটি নির্বাচন করার জন্য পরিকল্পনা বোর্ডে তদবীর করে আসছিলেন। তিনি নিয়েমারকে অনুরোধ করেন ডিজাইন জমা না দিতে। এর পরিবর্তে নিয়েমারকে কর্বুজিয়ের তাঁর কাজে সাহায্য করতে বলেন। কিন্তু বোর্ডের পরিচালক হ্যারিসনের ক্রমাগত অনুরোধ ও নির্দেশে নিয়েমার অবশেষে তাঁর করা ডিজাইন বোর্ডে জমা দিতে সম্মত হন।

পরিকল্পনা বোর্ড ৪৫টি ডিজাইন মূল্যায়ন করে। নিয়েমারের ৩২ নম্বর ডিজাইনটি এতে নির্বাচিত হয়। কর্বুজিয়েরের ২৩ নম্বর ডিজাইনে একটি ভবনের মধ্যে সাধারণ পরিষদ ও অধিবেশন হল প্রস্তাব করা হয়েছিল কিন্তু নিয়েমারের ডিজাইনে সাধারণ পরিষদকে অধিবেশন হল থেকে পৃথক করা হয়েছিল। নিয়েমারের এই ডিজাইনে পরিষদ অংশকে ইস্ট রিভারের পাশে এবং অধিবেশন হলকে সচিবালয় ভবনের ডান পাশে স্থান দেয়া হয়েছিল। এতে জমিকে খন্ডিত না করলেও একটি বড় জায়গাজুড়ে পুরো কমপ্লেক্স তৈরির প্রস্তাবনা ছিল।

আন্তর্জাতিক বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের স্থানটির একটি বৈশ্বিক মর্যাদা রয়েছে। একারণে মাঝেমধ্যে জাতিসংঘের নিয়ম-নীতি নিউ ইয়র্ক শহরের আইনকে উপেক্ষা করে, কিন্তু অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে এসব নীতি প্রযোজ্য হয় না। জাতিসংঘ সদর দপ্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনের এখতিয়ারের মধ্যে পরে। জাতিসংঘের কিছু সদস্যের কূটনৈতিক অব্যাহতি সুবিধা রয়েছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ব্যবসা ও মুদ্রা আদান-প্রদানে মার্কিন ডলার ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দৈনিক তথ্যের আদান-প্রদানে ও সদর দপ্তরের সকল চিহ্ন ইংরেজি ও ফরাসি ভাষাতে লিখিত। ফরাসি ও স্প্যানিশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের দাপ্তরিক ভাষা। আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান ও স্প্যানিশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দাপ্তরিক ভাষা।

এই ভবনের ঠিকানা হল জাতিসংঘ সদর দপ্তর, নিউ ইয়র্ক, এনওয়াই ১০০১৭, যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তার কারণে এই ঠিকানায় প্রেরিত সব চিঠি জীবাণুমুক্ত করা হয়।[৭] জাতিসংঘ ডাক প্রশাসন জাতিসংঘের জন্যে স্ট্যাম্প প্রণয়ন করে যা এই ভবন থেকে প্রেরিত সব চিঠিতে যুক্ত করা হয়। সাংবাদিকরা যখন এই ভবন থেকে রিপোর্টিং করে তখন তারা তাদের অবস্থান হিসেবে "নিউ ইয়র্ক"-এর পরিবর্তে "জাতিসংঘ" ব্যবহার করে।[৮]

কাঠামো[সম্পাদনা]

জাতিসংঘ সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ সচিবালয় ভবনটি এই সদর দপ্তরের চিত্রায়নে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। এছাড়া সাধারণ পরিষদ ভবন, কনফারেন্স ও ভিজিটরস সেন্টারও গুরুত্বপূর্ণ ভবন হিসেবে কমপ্লেক্সে দৃশ্যমান। সদর দপ্তরের সীমানার ঠিক অভ্যন্তরে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের পতাকার সারি অবস্থিত। এখানে জাতিসংঘের পতাকাও অবস্থিত। পতাকাগুলি ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে স্থাপিত।

সাধারণ অধিবেশ ভবনে অধিবেশ হল অবস্থিত। এর ধারণক্ষমতা ১৮০০। ১৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১১৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট এই হলটি কমপ্লেক্সের সর্বাধিক বড় ঘর। এই হলে ফরাসি ফের্নাড লিগার নির্মিত দুইটি প্রাচীরচিত্র রয়েছে। হলের সামনের ভাগে বক্তৃতা মঞ্চ অবস্থিত। সাধারণ অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট, মহাসচিবের জন্য বক্তৃতা মঞ্চে সবুজ মার্বেলের তৈরি ডেস্ক রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে সোনালী পটভূমিতে অঙ্কিত জাতিসংঘের প্রতীক।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hamilton, Thomas J. (১০ অক্টোবর ১৯৫২)। "Work Completed on U.N. Buildings"The New York Times। পৃষ্ঠা 1। সংগ্রহের তারিখ ২০ আগস্ট ২০১১ 
  2. Boland, Ed Jr. (৮ জুন ২০০৩)। "F.Y.I."The New York Times। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০১০ 
  3. Phipps, Linda S. "'Constructing' the United Nations Headquarters: Modern Architecture as Public Diplomacy" PhD Thesis, Harvard University, 1998. Phipps' account affords a detailed overview of the site acquisition, the selection of architects, the design of the complex and its reception.
  4. "Fact Sheet: United Nations Headquarters"। United Nations। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১১ 
  5. Dudley, Geoge A., A Workshop for Peace: Designing the United Nations Headquarters, (Cambridge, MA and London, England: MIT Press and the Architectural History Foundation, 1994) p. 314. Dudley provides an accurate and detailed account of the Design meetings as well as discussing the evolution of the final design.
  6. Childers, Erskine (২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫)। "Financing the UN"। Global Policy Forum। সংগ্রহের তারিখ ২৪ অক্টোবর ২০১১ 
  7. "Security Notice – United Nations Headquarters"। United Nations। ২০০১। সংগ্রহের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০১০ [অকার্যকর সংযোগ]
  8. For example, Richard Roth is CNN's UN correspondent, while Ian Williams is his counterpart at The Nation and Carola Hoyos is the UN correspondent for the Financial Times.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]