জর্জেট মূলহেইর
জর্জেট মূলহেইর ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা 'লুমোসের' প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লুমোস মূলত বিশ্বজুড়ে অনাথ শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বন্ধের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা জে. কে. রাউলিং কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯৩ সাল থেকে মূলহেইরের প্রবর্তিত 'এতিমখানা ব্যবস্থার বিলোপ' বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিরসন মডেলটি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।
জীবনকাহিনী
[সম্পাদনা]মূলহেইর ১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারে দুই ভাই ও এক বোন রয়েছে। তার বাবা ছিলেন একজন সূত্রধর এবং মা ছিলেন আবাসিক সমাজকর্মী। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি ১৯৯১ সাল থেকে শেফিল্ডের সমাজসেবা দপ্তরে একটি মা ও শিশু কেন্দ্রে কাজ শুরু করেন।[১] ১৯৯৩ সালে তিনি রোমানিয়ায় চলে যান এবং রাজধানী বুখারেস্টে প্রথম মা ও শিশু কেন্দ্র স্থাপন করেন। সেই সময় থেকেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিরসনের এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যা বর্তমানে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কার্যকর হচ্ছে।[২] তার প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে রোমানিয়ার এতিমখানাগুলোতে শিশুদের সংখ্যা ২,০০,০০০ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০,০০০ এ নেমে এসেছে।[৩]
মূলহেইর ২০০৭ সালে লুমোসের অপারেশন ডিরেক্টর নিযুক্ত হন এবং ২০১১ সালে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।[১][৪] তিনি ২০০৯ সালে ইউরোপীয় কমিশনের একটি বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ছিলেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা থেকে সম্প্রদায়-ভিত্তিক যত্নে উত্তরণ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত 'গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর চিলড্রেনের' গভর্নিং কাউন্সিলেরও সদস্য তিনি। এছাড়াও তিনি শিশুসেবা সংস্কারের বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের একজন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।
২০১৪ সালে মার্কিন ওয়েবসাইট 'সোশ্যাল ওয়ার্ক ডিগ্রি গাইড' কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্বের ৩০ জন প্রভাবশালী সমাজকর্মীর তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।[৫] তিনি রোমানীয় ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন এবং ফরাসি, আরবি ও ক্রোয়েশীয় ভাষায় অত্যন্ত সাবলীল।
পেশাগত জীবন
[সম্পাদনা]কৈশোরে মূলহেইর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি যৌন নিগ্রহের শিকার নারী এবং উদ্বাস্তুদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের নারীদের ইংরেজি শেখাতেও সহায়তা করতেন। লুমোসে যোগ দেওয়ার আগে তিনি রোমানিয়ায় বিভিন্ন সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে তার অন্যতম প্রারম্ভিক প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি রোমানিয়ার কিশোরী মায়েদের তাদের সন্তান নিজেদের কাছে রাখতে সহায়তা করেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বন্ধের লক্ষ্যে তিনি রোমানিয়ার সরকার ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে ১০ বছর ধরে কাজ করেন এবং এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন যার ফলে সেখানকার এতিমখানার শিশুদের সংখ্যা ৯৫% হ্রাস পায়। এরপর থেকে তিনি ২৩টি দেশে এই প্রাতিষ্ঠানিক সেবা সংস্কারের কাজ করেছেন।
বর্তমানে তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে ইউক্রেন এবং হাঙ্গেরিতে নতুন কর্মসূচি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তিনি মূলত মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে তার কাজের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন কারণ এই অঞ্চলেই সমস্যাগুলো সবচেয়ে প্রকট। তার নেতৃত্বে মলদোভাতেও ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যেখানে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে এতিমখানাগুলোতে শিশুদের সংখ্যা ৭০% কমেছে। লুমোস মলদোভাতে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং শিশুদের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসার প্রস্তুতিতে বাবা-মায়েদের প্রশিক্ষণ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মূলহেইর শিশু অধিকার বিষয়ক চারটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তিনি সিভিল সোসাইটি অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক এনগেজমেন্ট কমিশনের একজন সদস্য। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৬ষ্ঠ ট্রাইবেকা ডিসরাপটিভ ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি 'হোপ অ্যান্ড হোমস' নামক সংস্থার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১২ সালের মে মাসে তিনি এতিমখানার করুণ পরিস্থিতি নিয়ে একটি 'টেড টক' প্রদান করেন এবং শিশুদের সহায়তায় বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন।
লুমোস কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী "ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বিষয়ক কিছু চ্যালেঞ্জ" মোকাবিলায় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে তাকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ করা হয়।[৬]
গ্রন্থ ও প্রকাশনা
[সম্পাদনা]- রোমানিয়ার শিশুসেবার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিরসন (২০০৪), ইউনিসেফ এবং রোমানিয়া সরকার।
- ব্যক্তিগত যাতনা, সামাজিক পদক্ষেপ: যুদ্ধ ও শান্তিতে নারীদের ওপর সহিংসতা (২০০০), পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ সেন্টার, লিমেরিক বিশ্ববিদ্যালয়।
- অতীতের নিরাময় ও ভবিষ্যতের নির্মাণ: মলদোভা প্রজাতন্ত্রে পারিবারিক ধরন (২০০৮)।
- প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিরসন - প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি মানবাধিকার অগ্রাধিকার (২০১২), দ্য ইকুয়াল রাইটস রিভিউ।
- কেন অন্য অর্থায়নকে প্রভাবিত করা আপনার লক্ষ্য অর্জনের সেরা উপায় (২০১৫), অ্যালায়েন্স ম্যাগাজিন।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 Attwood, Karen (১৬ নভেম্বর ২০১৪)। "JK Rowling's Lumos charity striving to end the institutionalisation of all children in Europe by 2030"। The Independent। সংগ্রহের তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০১৫।
- ↑ "About Us"। Global Alliance for Children। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Why you should listen"। TED। সংগ্রহের তারিখ ১৯ অক্টোবর ২০১৫।
- ↑ Laja, Sade (৭ জুন ২০১১)। "Leading questions: Georgette Mulheir, Lumos"। The Guardian। সংগ্রহের তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০১৫।
- ↑ Rufener, Brenda (অক্টোবর ২০১৪)। "The 30 Most Influential Social Workers Alive Today"। Social Work Degree Guide। সংগ্রহের তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০১৫।
- ↑ "JK Rowling charity boss leaves post" (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ জুলাই ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]২০১২ সালের বসন্তে লন্ডনে জর্জেট মূলহেইরের দেওয়া টেড টক: এতিমখানার বিয়োগান্তক কাহিনী