জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
283x412
জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
জন্ম(১৮০৮-০৮-২৪)২৪ আগস্ট ১৮০৮
উত্তরপাড়া, হুগলি ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ)
মৃত্যু১৯ জুলাই ১৮৮৮(1888-07-19) (বয়স ৭৯)
সন্তানপ্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়
পিতা-মাতাজগন্মোহন মুখোপাধ্যায় (পিতা)
রাজেশ্বরী দেবী (মাতা)

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (২৪ আগস্ট ১৮০৮ – ১৯ জুলাই ১৮৮৮ [১]) ছিলেন ভারতীয় বাঙালি জমিদার ও সমাজ সংস্কারক। [২]

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট (১২১৫ বঙ্গাব্দের ৯ ভাদ্র) ব্রিটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার উত্তরপাড়ার এক কেরানীর পরিবারে। জগন্মোহন মুখোপাধ্যায় ও রাজেশ্বরী দেবীর পাঁচ সন্তানদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন জয়কৃষ্ণ। অন্যেরা হলেন রাজকৃষ্ণ, নবকৃষ্ণ, বিজয়কৃষ্ণ ও নবীনকৃষ্ণ। বাল্যকালে কিছুদিন হিন্দুস্কুলে পড়াশোনা করে আট বৎসর বয়সে পিতার কর্মস্থল মিরাটে চলে যান জয়কৃষ্ণ। সেখানে রেজিমেন্টাল স্কুলে ভর্তি হন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে তিনি দেশীয় রাজ্য ভরতপুর আক্রমণের সময় পিতার সঙ্গে ব্রিটিশ সেনাদলে যুক্ত হয়েছিলেন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির ভূমি রাজস্ব বিভাগের রেকর্ড রক্ষকের চাকরীতে নিযুক্ত হন এবং বিবাহসূত্রে সাবর্ণরায় চৌধুরী পরিবারের জামাতা হন। সেসময় বন্যার কারণে চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জমিদারি এস্টেট একের পর এক বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। জয়কৃষ্ণ সেগুলি একে একে কিনে নেন এবং এক সময় তার সম্পত্তির পরিমাণ দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমতুল হয়ে দাঁড়ায়। শেষে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে চাকরি ছেড়ে উত্তরপাড়া জমিদারির পত্তন করেন। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত জমিদার সংঘের সভ্যও হন।

অবদান[সম্পাদনা]

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় হুগলির উত্তরপাড়াকে যেমন শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগতে প্রতিষ্ঠা করেন তেমনই বহু কল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে সুনির্দিষ্ট অবদান রেখে গেছেন।

১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ১৫ই এপ্রিল এশিয়ার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি- বর্তমানে উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরী তার উদ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় করে হুগলি নদীর তীরে গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণসহ ব্যক্তিগত সংগ্রহের তিন হাজার বই পত্র-পত্রিকা দান করা ছাড়াও প্রথমদিকের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন। হুগলি জেলার এই জেলা গ্রন্থাগার বাঙালির গৌরব ও এক ঐতিহাসিক স্থান। এই লাইব্রেরিতে বহু বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সমাগম ঘটেছিল সেসময়। উল্লেখযোগ্য অতিথিরা ছিলেন- ঋষি অরবিন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী,রেভারেণ্ড জেমস লঙ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত। জয়কৃষ্ণের উদ্যোগে ও সাহায্যে উত্তরপাড়া হাই স্কুল ও উত্তরপাড়া কলেজ (পরবর্তীতে রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় কলেজ) প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময় তিনি সর্বসমেত একত্রিশটি বিদ্যালয়ে অর্থ সাহায্য করতেন। কলকাতার প্রথম মহিলাদের বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দশ হাজার টাকা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার গঠনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ভার্নাকুলার লিটারেচার সোসাইটি গঠনের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ছিল তার অন্যতম কীর্তি। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের কলেরা মহামারীর পর তার উদ্যম ও অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপাড়া পৌরসভা গঠিত হয়।

জমিদার জয়কৃষ্ণ ছিলেন প্রজাবৎসল। নিজের জমিদারিতে কৃষি সংস্কারের সঙ্গে তিনি সামাজিক ভাবেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গীয় কৃষকদের জীবনযাত্রা-প্রণালী উপলক্ষ করে হুগলি কলেজের অধ্যাপক লালবিহারী দে রচিত গোবিন্দ সামন্ত: অর হিস্ট্রি অফ এ বেঙ্গলি রায়ত গ্রন্থটির জন্য তিনি লেখককে পুরস্কৃত করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক ছিলেন। বিদ্যাসাগরের আবেদনের প্রথম স্বাক্ষরকারী ছিলেন জয়কৃষ্ণ। উদারপন্থী মানুষ, জয়কৃষ্ণ তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ব্যতিক্রম হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। উত্তরপাড়ায় নারী শিক্ষার প্রসার তার উদ্যোগে শুরু হয়। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন।

জয়কৃষ্ণ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ব্রিটিশ জাতির পক্ষে অবাধ বাণিজ্যনীতির তিনি প্রতিবাদ করেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হয়েছিলেন এবং কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে দাদাভাই নওরোজিকে মনোনীত করেন। জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে বাঙালি রক্ষণশীলদের নেস্টর বলে আখ্যায়িত করেন অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম[৩]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই পরলোক গমন করেন। [৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Manohar Mookerjee vs Raja Peary Mohan Mookerjee And ..."। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৮-২৪ 
  2. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬, পৃষ্ঠা ২৩৬, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  3. Mukherjee, Sibnarayan (১৯১২)। Jaikrisna Mukharji: An Appreciation। The Art Press, Calcutta: Sibnarayan Mukherjee। 
  4. "Manohar Mookerjee vs Raja Peary Mohan Mookerjee And ..."। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৮-২৪