জন ক্লার্ক
জন ক্লার্ক | |
|---|---|
| শিক্ষা | ক্রাইস্টস কলেজ, কেমব্রিজ (বিএ, এমএ) ডারউইন কলেজ, কেমব্রিজ (পিএইচডি) |
| পুরস্কার |
|
| বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন | |
| কর্মক্ষেত্র | পদার্থবিজ্ঞান অতিপরিবাহিতা অতিপরিবাহী ইলেকট্রনিক্স |
জন ক্লার্ক (জন্ম ১৯৪২) হলেন একজন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলিতে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। তিনি ২০২৫ সালে জন এম. মার্টিনিস ও মিশেল দ্যভোরে এরসাথে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার জিতেন।
জীবনী
[সম্পাদনা]ক্লার্ক ১৯৬৪, ১৯৬৮ এবং ১৯৬৮ সালে যথাক্রমে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ক্রাইস্ট'স কলেজ, কেমব্রিজ এবং ডারউইন কলেজ, কেমব্রিজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে বিএ, এমএ এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।[১]
তিনি অতিপরিবাহিতা এবং অতিপরিবাহী ইলেকট্রনিক্সে, বিশেষ করে অতিপরিবাহী কোয়ান্টাম ইন্টারফেরেন্স ডিভাইসের (এসকিউআইডি) বিকাশ এবং প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, যা চৌম্বক ফ্লাক্সের অতি সংবেদনশীল সনাক্তকারী। তাঁর একটি চলমান প্রকল্প হল কোয়ান্টাম-নয়েজ সীমিত পরিবর্ধক হিসাবে কনফিগার করা এসকিউআইডিগুলিকে অ্যাক্সিয়নের সন্ধানে প্রয়োগ করা, যা ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তুর একটি সম্ভাব্য উপাদান।[২]
ক্লার্ক ১৯৮৬ সালে রয়েল সোসাইটির একজন ফেলো নির্বাচিত হন।[২] তাঁকে ১৯৯৯ সালে কমস্টক প্রাইজ ইন ফিজিক্স[৩] এবং ২০০৪ সালে হিউজ মেডেল প্রদান করা হয়।[৪] তিনি মে ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমীর একজন বিদেশী সহযোগী হিসেবে নির্বাচিত হন।[৫] তাঁকে ২০১৭ সালে আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটিতে নির্বাচিত করা হয়।[৬]
একটি বৈদ্যুতিক বর্তনীতে বৃহৎ কোয়ান্টাম বলবৈজ্ঞানিক সুড়ঙ্গ ও শক্তির কোয়ান্টায়ন প্রদর্শনের জন্য ক্লার্ক ২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।[৭]
২০২৫ নোবেল পুরস্কার বিজয়
[সম্পাদনা]জন ক্লার্ক, মিশেল দ্যভোরে ও জন মার্টিনিস যৌথভাবে ২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান তথা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম কণাগুলির (পরমাণু ও অতিপারমাণবিক কণা) আচরণের পদার্থবৈজ্ঞানিক সূত্রাবলী খালি চোখে দৃশ্যমান বৃহৎ মাপনীর ব্যবস্থাতেও (বহুসংখ্যক কণা নিয়ে গঠিত সামষ্টিক ব্যবস্থা) প্রদর্শনকারী যুগান্তকারী গবেষণাকর্মের জন্য তাঁদেরকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। কোয়ান্টাম আচরণ প্রদর্শনকারী কোনও ব্যবস্থা সর্বোচ্চ কত বড় হতে পারে, তা পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন। সাধারণত ইলেকট্রন, পরমাণু বা অতিপারমাণবিক কণাগুলিতেই এই আচরণ পরিলক্ষিত হয়। বৃহত্তর ব্যবস্থাগুলিতে এই ক্রিয়াগুলি সাধারণত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, কেননা অসংখ্য কণার সামষ্টিক চলন কোয়ান্টাম ধর্মগুলিকে গড়পড়তা ধর্মে রূপান্তরিত করে।
ক্লার্ক, দ্যভোরে ও মার্টিনিস এই ধারণাটির বিরোধিতা করেন এবং প্রস্তাব করেন যে বহুসংখ্যক আন্তঃক্রিয়াশীল কণা নিয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থাও কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে আচরণ করতে পারে। তাঁরা ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে একটি অতিপরিবাহী বৈদ্যুতিক বর্তনী ব্যবহার করে কিছু পরীক্ষা সম্পাদন করেন। অতিপরিবাহী পদার্থগুলি কোনও রোধ ছাড়াই বিদ্যুৎ প্রবাহকে বর্তনীতে প্রবাহিত হতে দেয়, অর্থাৎ এগুলিতে বিদ্যুৎশক্তি কোনও শক্তি ক্ষয় ছাড়াই অন্তহীনভাবে চলতে পারে। এই বর্তনীগুলিতে আরও ছিল অনেকগুলি জোসেফসন সংযোগস্থল (জাংশন), যেগুলি একটি পাতলা অন্তরক স্তর দ্বারা পৃথকীকৃত অতিপরিবাহী যন্ত্রাংশ দিয়ে গঠিত। এই সংযোগস্থলগুলি বিদ্যুৎ প্রবাহকে বর্তনীর ভেতরে সামষ্টিকভাবে ক্রিয়াশীল হতে সাহায্য করে, ফলে আহিত কণাগুলি কার্যত একটিমাত্র বৃহৎ-মাপনীর কোয়ান্টাম কণার মত আচরণ করে।
প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থাটি এমন একটি অবস্থায় থাকে যেখানে বিদ্যুৎ কোনও বিভব বা ভোল্টেজ উৎপাদন ছাড়াই প্রবাহিত হয়। ধ্রুপদী নিয়ম অনুযায়ী এই অবস্থাটির একটি শক্তি প্রতিবন্ধকের পেছনে আবদ্ধ থাকার কথা, এবং বাইরে থেকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করলে ব্যবস্থাটির পরিবর্তন হবার কথা নয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ব্যবস্থাটি এই অবস্থাটি থেকে কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গ নামের একটি প্রক্রিয়ার দ্বারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গ একটি কণাকে (এই বিশেষ ক্ষেত্রে একক কণার ন্যায় আচরণশীল একটি সামষ্টিক বৃহৎ মাপনীর ব্যবস্থাকে) কোনও শক্তি প্রতিবন্ধককে টপকে যাবার মতো শক্তির অধিকারী না হওয়া স্বত্ত্বেও সেটির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সক্ষমতা দান করে। গবেষকরা আরও দেখান যে এই ব্যবস্থাটির শক্তি কোয়ান্টায়িত ছিল, অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট, বিচ্ছিন্ন পরিমাণে শক্তি অর্জন (শোষণ) বা হরণ (নিঃসরণ) করত। ব্যবস্থাটি কীভাবে বিশেষ বিশেষ কম্পাংকের আলোর সাথে আন্তঃক্রিয়া প্রদর্শন করে তা দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন যে শক্তির পরিবর্তন ধাপে ধাপে ঘটেছিল, অবিরতভাবে নয়। কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গ ও শক্তির কোয়ান্টায়ন – এই দুইটি ঘটনা আগে কেবলমাত্র আণুবীক্ষণিক কণাসমূহের মধ্যেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল।
এর বহু আগেই পদার্থবিজ্ঞানী অ্যান্থনি লেগেট ১৯৭০-এর দশকে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর ব্যবস্থাগুলিতে কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গ ক্রিয়াটি হয়ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। ক্লার্ক, দ্যভোরে ও মার্টিনিস প্রথমবারের মতো সাফল্যের এই পূর্বাভাসটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন। এই কাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম প্রমাণ করেছে, যে অনেকগুলি কণার বৃহৎমাপনীর সমষ্টিও কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
এই গবেষণাটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বাইরেও তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক সমস্ত ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন পরিগণক যন্ত্র (কম্পিউটার), মুঠোফোন, আলোকচিত্রগ্রহণ যন্ত্র (ক্যামেরা), আলোকীয় তন্তুভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (ফাইবার অপটিক), ইত্যাদির ট্রানজিস্টর প্রযুক্তির ভিত্তিই হল কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান। এই আবিষ্কার কোয়ান্টাম পরিগণন (কম্পিউটিং)-এর ভিত্তি স্থাপন করেছে, যার সুবাদে এমন দ্রুতগতিতে পরিগণনা সম্পাদন করা সম্ভব হবে, যা বর্তমান ধ্রুপদী পরিগণক যন্ত্রগুলির দ্বারা করা অকল্পনীয়। এর ফলে কোয়ান্টাম সুবেদী গ্রাহক (সেন্সর) ও কোয়ান্টাম গুপ্তলিখনবিদ্যার মতো ক্ষেত্রগুলির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, যে ক্ষেত্রগুলি উপাত্তের নিরাপত্তা ও পরিমাপের সূক্ষ্মতার ক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারে। মার্টিনিস নিজে গুগলের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে কোয়ান্টাম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। তাঁরা কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন একটি পরিগণনা সম্পন্ন করেন, যা করতে একটি অতিপরিগণক যন্ত্র (সুপারকম্পিউটার) বহু লক্ষ কোটি বছর সময় নেবে। দ্যভোরে-ও বর্তমানে গুগলের কোয়ান্টাম বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মার্টিনিস কোয়ান্টাম পরিগণন ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় নবীন কোম্পানি কিউওল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্যভোরে ও মার্টিনিস উভয়েই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত পদার্থবিজ্ঞানী ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলির অধ্যাপক ক্লার্কের অধীনে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও ডক্টরেটোত্তর গবেষক হিসেবে মূল পরীক্ষাগুলি সম্পাদন করেছিলেন। ক্লার্ক নিজে অতিপরিবাহী ইলেকট্রন বিজ্ঞানের আদিপিতা হিসেবে স্বীকৃত এবং তিনি বর্তমানে অ্যাক্সিয়ন তমোপদার্থ পরীক্ষার সাথে জড়িত। তাদের এই গবেষণা অদ্ভূত ও গাণিতিক সম্ভাবনানির্ভর কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের পরিধি আণুবীক্ষণিক বিশ্ব থেকে দৈনন্দিন জীবনে প্রসারিত করেছে।
সম্মাননা ও পুরস্কার
[সম্পাদনা]- পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ২০২৫
- মিসিউস কোয়ান্টাম প্রাইজ ২০২১
- · হিউজ মেডেল ২০০৪
- · কমস্টক প্রাইজ ইন ফিজিক্স ১৯৯৯
- · জোসেফ এফ. কেইথলি অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যাডভান্সেস ইন মেজারমেন্ট সায়েন্স ১৯৯৮
- · গুগেনহাইম ফেলোশিপ ১৯৭৭-৭৮
- · মিলার গবেষণা অধ্যাপক ১৯৭৫-৭৬, শরৎ ১৯৯৪, শরৎ ২০০৭
- · আলফ্রেড পি. স্লোয়ান ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ (১৯৭০–৭২)
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "John Clarke (E) | UC Berkeley Physics"।
- 1 2 "John Clarke"। Royal Society। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০১৭।
- ↑ "Comstock Prize in Physics"। National Academy of Sciences। ২৯ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১।
- ↑ "Physics @ Berkeley - Faculty -John Clarke"। সংগ্রহের তারিখ ৪ মে ২০০৮।
- ↑ "National Academy of Sciences Members and Foreign Associates Elected"। National Academy of Sciences। ১ মে ২০১২। ৪ মে ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "American Philosophical Society: Newly Elected - April 2017"। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জুন ২০১৭।
- ↑ Nobel Prize (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। Announcement of the 2025 Nobel Prize in Physics। সংগ্রহের তারিখ ৭ অক্টোবর ২০২৫ – YouTube এর মাধ্যমে।
- ১৯৪২-এ জন্ম
- জীবিত ব্যক্তি
- ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী
- রয়েল সোসাইটির সভ্য
- ক্রাইস্ট কলেজ, কেমব্রিজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী
- আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির বিশিষ্ট সভ্য
- আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের সভ্য
- আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের বিশিষ্ট সভ্য
- মার্কিন ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সদস্য
- নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী