জটায়ু (রামায়ণ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
জটায়ু (রামায়ণ)
জটায়ু
রাবণ ও জটায়ুর আকাশযুদ্ধ এবং চিত্রের মাঝ বরাবর সীতাদেবীর অবস্থান৷
তথ্য
পরিবারঅরুণ (পিতা)

হিন্দু ধর্মের চর্চিত অন্যতম মহাকাব্য রামায়ণ অনুসারে জটায়ু (সংস্কৃত ভাষার দেবনাগরী লিপিতে : जटायुः) ছিলো একটি দৈবপক্ষী এবং সূর্যদেবের অশ্বচালক অরুণের কনিষ্ঠ পুত্র৷ তার জ্যেষ্ঠভ্রাতা সম্পাতি ছিলেন একজন অর্ধদেহী দেবতা এবং রামের পিতা দশরথের পরমমিত্র৷[১]

জটায়ুর ইতিহাস[সম্পাদনা]

জটায়ু পক্ষী হত্যা - বলসাহেব পন্ত প্রতিনিধির রং-তুলিতে

হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ অনুসারে রাবণ যখন সীতাকে হরণ করে নিজ রাজ্যে নিয়ে যেতে চান, সেই দৃশ্য দেখে জটায়ু তাকে রাবণের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন৷ জটায়ু রাবণের বিপক্ষে যথেষ্ট বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন কিন্তু বার্ধক্যের কারণে রাবণ অতি চতুরতার সাথে জটায়ুর বিপক্ষে জয় লাভ করেন৷

রাবণের জটায়ু হত্যা

রামলক্ষ্মণ; সুগ্রীবের বানরসেনা সহ সীতাদেবীর খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে জটায়ুর সাক্ষাৎ পান৷ তিনি তাদেরকে জটায়ু-রাবণ যুদ্ধের বিষয়ে জানান এবং এও জানান যে রাবণ সীতাসহ দক্ষিণ দিকের সমুদ্রের নিকট অগ্রসর হয়েছে৷

জটায়ু এবং তার অগ্রজ সম্পাতি যুবাকালে সবচেয়ে উঁচুতে উড়াল দেওয়ার প্রতিযোগিতা করতেন৷ একটি বর্ণিত ঘটনা অনুসারে কোনো এক সময়ে জটায়ু উচ্চতর উড়াল দিলে সূর্যতেজে তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে৷ সম্পাতি ঐসময়ে নিজের ডানা প্রসারিত করে সূর্যের তেজ আটকে জটায়ুকে বাঁচান৷ এই ঘটনার ফলে সম্পাতি নিজে এতটাই জখম হন যে সে তার ডানাদুটিই হারান৷ এর ফলে সম্পাতি তার পরবর্তী জীবনে পক্ষহীন পক্ষীর জীবন অতিবাহিত করেন৷

রাবণের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে জটায়ু মূর্চ্ছিত হয়ে মাটি পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি রামের সাক্ষাৎ পান৷ সমস্ত ঘটনা শুনে রাম তাকে তার মোক্ষ লাভের কথা বলেন৷ জটায়ু সীতার বিরহে বিব্রত রামকে সান্ত্বনা দিয়ে আশ্বস্ত করেন যে সীতার কোনো ক্ষতি হবে না এবং শীঘ্রই তারা তাকে খুঁজে পাবেন৷ তার মুখে সীতার কুশল সংবাদ ও আশ্বস্তবাণী শুনে রাম জটায়ুকে আলিঙ্গন করেন৷ জটায়ুর কথায় তৃপ্ত হয়ে তাকে আশীর্বাদ করেন৷ রাম জটায়ুর মৃৃত্যুতে সীতার বিরহের থেকেও অধিক মর্মাহত হন৷ রাম জটায়ুকে নিজের পিতার সমান ও পিতৃৃতুল্য মনে করে তার অন্ত্যেষ্টি ও প্রয়োজনীয় শ্রাদ্ধশান্তি নিষ্ঠাসহ সম্পন্ন করেন৷ ভগবান বিষ্ণুর রাম অবতার তার সমস্ত জীবন এক সাধারণ মানুষের মতো দুঃখ কষ্ঠ সুখ বিলাস ইত্যাদির আস্বাদ নিলেও এই ক্ষেত্রে তিনি অলৌকিকতার প্রকাশ ঘটান৷ নিজের তীর ভূমিতে নির্দেশিত করে তিনি সপ্তনদীর জল একত্রিত করে সঙ্কল্প করার পরিকল্পনা করেন৷ ছয় নদীর জল তার আদেশ মেনে ঐ স্থানে উপস্থিত হলেও একটি নদী তার আদেশ অবজ্ঞা করেন৷ ফলে বিষ্ণুর অবতার হওয়ার দরুন রাম গয়াধামকে উক্তস্থানে উপবিষ্ট হওয়ার জন্য একপ্রকার বাধ্য করেন৷

জটায়ু সম্বন্ধিত স্থান[সম্পাদনা]

জনশ্রুতি অনুযায়ী, এটা বিশ্বাস করা হয় যে রাবণ জটায়ুর পক্ষচ্ছেদ ঘটালে সে বর্তমান ভারতের কেরালা রাজ্যের জটায়ুমঙ্গলম নামক স্থানে একটি পাথরের ওপর এসে পতিত হলে স্থানটির এরূপ নাম হয়৷ যদিও স্থানীয় উচ্চারণে এটি "চডয়মঙ্গলম" নামে পরিচিত৷ এই গ্রামের যে স্থানে শিলার ওপর জটায়ু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন সেই স্থানে কিছু বছর আগে অবধিও উন্মুক্ত আকাশে তার চঞ্চুচিহ্ন ও রামের পাদুকাচিহ্ন ছিলো, যা বর্তমানে আবৃত করা হয়েছে৷ আবার অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের লেপক্ষী অঞ্চলের সাথেও একই ইতিহাস জড়িত এবং কেরালার রামক্কলমেট্টুতে তার শেষকৃৃত্য সম্পন্ন হয়৷ রাম জটায়ুকে শায়িত অবস্থা থেকে অঠতে বলেন, যা তেলুগু ভাষাতে "লে পক্ষী" (বা ওঠো পক্ষী) উচ্চারিত হয়, এভাবেই এই স্থানটির নাম হয় লেপক্ষী৷[২][৩]

কিন্তু বাল্মিকী রামায়ণ অনুসারে রাম কখনোই বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করেন নি৷ সর্বতীর্থ গ্রন্থ অনুসারে জটায়ু মহারাষ্ট্রে আকোলা আহমদনগর অঞ্চলে পতিত হন৷ সেখানে জটায়ুর নামে একটি মন্দির রয়েছে এবং মন্দিরের নিকটে পুকুরটিকে ছয় নদীর সম্মিলিত ধারার উপস্থিতির কথা বিশ্বাস করা হয়৷ রামায়ণের একাধিক আঞ্চলিক সংস্করণে কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশের উক্ত স্থানগুলির নাম পাওয়া যায়, মূল বাল্মিকী রামায়ণে নয়৷

জটায়ু পরিবেশ উদ্যান[সম্পাদনা]

জটায়ু আর্থ'স সেন্টার, যা জটায়ু পরিবেশ উদ্যান বা জটায়ু রক নামেও পরিচিত, এটি হলো কেরালা রাজ্যের কোল্লম জেলার জটায়ুমঙ্গলমে অবস্থিত একটি উদ্যান ও পর্যটনকেন্দ্র৷ এটি সমুদ্রপৃৃষ্ঠ থেকে ৩৫০ মিটার (১২০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত৷ এই পরিবেশ উদ্যানটিতে বিশ্বের একমাত্র বৃহত্তম ২০০ ফুট লম্বা, ১৫০ ফুট চওড়া ও ৭০ ফুট উচ্চতাযুক্ত পাখির ভাস্কর্য রয়েছে, যা জটায়ুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃৃত৷[৪][৫] এই উদ্যানটি নির্মান-সংরক্ষণ-হস্তান্তর নীতিভুক্ত কেরালা রাজ্যে অবস্থিত প্রথম প্রকাশ্য ব্যক্তিগত পর্যটন কেন্দ্র৷ ভাস্কর রাজীব অঞ্চল হলেন জটায়ুর মূর্তি তৈরীর নকশাকর৷ জটায়ুমঙ্গলম গ্রাম তথা পর্যটনস্থলটি জেলাসদর কোল্লম থেকে ৩৮ কিলোমিটার ও রাজ্যসদর তিরুবনন্তপুরম থেকে ৪৬ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত৷

উদ্যানটির দ্বিতীয় ক্ষেপের সংস্কারমূলক কাজ ১৭ই আগস্ট ২০১৮ খ্রিস্টিব্দে সম্পন্ন হয় ও তা জনসাধারণের দর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয়৷[৬][৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. https://hinduism.stackexchange.com/questions/3044/how-did-dasharatha-become-friends-with-jatayu
  2. http://www.bangaloremirror.com/index.aspx?Page=article&sectname=Specials%20-%20Trippin&sectid=38&contentid=2009100120091001181345687b8670cd2[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  3. Lepakshi Temple - Lepakshi:: The Treasure House of Art and Sculpture
  4. "Jatayu Nature Park Website"। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৫ 
  5. "Kerala park to welcome visitors in Jan - Khaleej Times"। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৫ 
  6. "Adventure Rock Hill open for visitors"। Times of India। সংগ্রহের তারিখ ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ 
  7. "Enjoy a day of adventure at Jatayu Earth's Center"। Outlook Traveller। সংগ্রহের তারিখ ৭ ডিসেম্বর ২০১৭