বিষয়বস্তুতে চলুন

চেরকেজ় গণহত্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চেরকেজ় গণহত্যা
রুশ-চেরকেজ় যুদ্ধের অংশের অংশ
চেরকেজ় গণহত্যার পর পশ্চিম কাভকাশিয়ার জনসংখ্যাগত গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বেঁচে যাওয়া চেরকেজ়দের অধিকাংশই পালিয়ে যায় বা জোরপূর্বক নির্বাসিত হয়; কেউ কেউ জলাভূমি ও গুহায় আত্মগোপন করে, আর অল্পসংখ্যক মানুষ রুশ সাম্রাজ্য-বাহিনীর সঙ্গে সফলভাবে সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
স্থান চেরকেজ়িস্তান
তারিখ১৮৬৩–১৮৭৮ (গ্রেগরীয় সন)
লক্ষ্যচেরকেজ় এবং অন্যান্য কাভ়কাজ়ি জনগোষ্ঠীদল
হামলার ধরনগণহত্যা (গণহারে হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ) এবং জাতিগত নির্মূল (জোরপূর্বক উচ্ছেদ, মৃত্যুমিছিল)
নিহত১,০০০,০০০–২,০০০,০০০:
  • প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১০ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষ নিহত[১][২]
  • পালিয়ে যাওয়ার সময় ৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়[৩][৪]
ভুক্তভোগীচেরকেজ় জনসংখ্যার ৯৫–৯৭%
১০ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়[৫][৬]
অপরাধী রুশ সাম্রাজ্য
কারণ

চেরকেজ় গণহত্যা,[৭][৮] বা ত্সিত্সেকুন[ক] ছিল গ্রেগরীয় উনবিংশ শতকে চেরকেজ়িস্তানে রুশ আক্রমণের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত চেরকেজ় জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি। এতে চেরকেজ় জনগোষ্ঠীর ৯৫–৯৭% ক্ষতিগ্রস্ত হয়।[১০][১১][১২] এই অভিযানে ১৫ লক্ষ পর্যন্ত মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং চেরকেজ়িস্তান ধ্বংস হয়ে পরবর্তীতে রুশ সাম্রাজ্য কর্তৃক দখল ও সংযুক্ত হয়।[১৩] নির্মূলের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ চেরকেজ় জনগণ, তবে কাভ়কাশিয়ার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও কাভ়কাজ়ি যুদ্ধর অংশ হিসেবে এর শিকার হয়। রুশ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী আতঙ্ক সৃষ্টি ও চেরকেজ়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বন্দীদের শূলে চড়াত এবং গর্ভবতী নারীদের পেট চিরে ফেলত। রুশ সেনানায়কদের মধ্যে গ্রিগরি জাস-এর মতো ব্যক্তিরা চেরকেজ়দের "নীচ জাতি" বলে আখ্যায়িত করে তাদের নির্বিচার হত্যাকে ন্যায্য ও গৌরবময় হিসেবে তুলে ধরে। চেরকেজ়দের অনৈতিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় মানব পরীক্ষাবস্তু হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল। পাশাপাশি, রুশ সৈন্যদের চেরকেজ় নারীদের ধর্ষণেরও অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

চেরকেজ়িস্তানে স্থানীয় চেরকেজ় জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকেই হয় হত্যা করা হয়, নয়তো উসমানীয় সাম্রাজ্যে নির্বাসিত করা হয়। কেবল যারা রুশীকরণ মেনে নেয় এবং রুশ সৈন্যদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়, তারাই রেহাই পায়। চেরকেজ় গ্রামগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করা হয়; পরে এসব গ্রামের অনেকগুলোই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রুশ লেখক ল্যেভ তলস্তয় উল্লেখ করেন যে রুশ সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে গ্রামগুলোর বাড়িঘরে হামলা চালাত। ব্রিটিশ কূটনীতিক গিফোর্ড প্যালগ্রেভ লিখেছিলেন, তাদের "একমাত্র অপরাধ তারা রুশ ছিল না।" ১৮৬৪ সালে চেরকেজ় নেতারা রুশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে একটি আবেদনপত্র পাঠান, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তাদের কোনো সহায়তা করেনি। একই বছর রুশ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী চেরকেজ়িস্তানে অবশিষ্ট জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণনির্বাসন অভিযান শুরু করে। ১৮৬৭ সালের মধ্যে চেরকেজ়দের একটি বৃহৎ অংশকে নিজভূমি থেকে উৎখাত করা হয়। নির্বাসনের পথে বহু মানুষ মহামারি ও অনাহারে মারা যায়। মৃত্যুর পর অনেকের দেহ কুকুরে ছিঁড়ে খেয়েছিল বলেও বর্ণনা রয়েছে। আবার অনেকে কৃষ্ণসাগরে ঝড়ের সময় জাহাজডুবিতে প্রাণ হারায়।[১৪]

অধিকাংশ সূত্রের মতে, গণহত্যার পর চেরকেজ়িস্তানে চেরকেজ় জনসংখ্যার মাত্র ৩% অবশিষ্ট ছিল। মোট ১৫ লক্ষ পর্যন্ত মানুষকে নিজভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হয়, তবে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই যাত্রাপথে বেঁচে থাকতে পারেনি। উসমানীয় নথি অনুযায়ী, ১৮৭৯ সালের মধ্যে কাভ়কাশিয়া থেকে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী সেখানে পৌঁছায়, যাদের প্রায় অর্ধেককেই রোগে আক্রান্ত হয়ে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে মৃত্যুর মুখে পাওয়া যায়। এই পরিসংখ্যান সঠিক হলে, চেরকেজ়িস্তানে রুশিয়ার সামরিক অভিযান উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। উসমানীয় নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রুশ নথিতেও দেখা যায় যে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কাভ়কাশিয়ায় মাত্র ১,০৬,৭৯৮ জন চেরকেজ় অবশিষ্ট ছিল। রুশ ইতিহাসবিদদের অন্যান্য অনুমান আরও কম—প্রায় ৪০,৪০০ থেকে ৬৫,৯০০ জন। ১৮৯৭ সালের রুশ সাম্রাজ্যের আদমশুমারিতে দখলকৃত অঞ্চলে ১,৫০,০০০ জন চেরকেজ়ের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়।[১৫] [১৬]

গুর্জিস্তান সরকারের উদ্যোগে রুশ সাম্রাজ্যের গোপন নথি ইতিহাসবিদদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে রুশিয়ার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পূর্বে অজানা তথ্য প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২০ মে গুর্জিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে চেরকেজ় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি উক্রাইনাও, ২০২৪ সালের জুনে চেরকেজ়দের আবেদনের পর, গণহত্যাটিকে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ওয়েইন শহর এবং পূর্ব তুর্কিস্তান নির্বাসিত সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে চেরকেজ় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কাবার্দিনো-বালকারিয়া স্বায়ত্তশাসিত সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র চেরকেজ় গণহত্যার নিন্দা জানায়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ১২ মে কাবার্দিনো-বালকারিয়া প্রজাতন্ত্র এবং ১৯৯৬ সালের ২৯ এপ্রিল আদিগেয়া প্রজাতন্ত্র রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্র দুমায় গণহত্যার স্বীকৃতির আবেদন জমা দেয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে ২০টিরও বেশি চেরকেজ় সংগঠন ইউরোপীয় সংসদের কাছে এবং একই বছরের নভেম্বরে আদিগেয়া, কাবার্দিনো-বালকারিয়া ও কারাচাই-চেরকেসিয়া চেরকেজ় সংগঠনগুলো রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন-এর কাছে গণহত্যার স্বীকৃতির আবেদন জানায়। রুশ ফেডারেশন চেরকেসিয়ার ঘটনাগুলোকে গণঅভিবাসন (রুশ: Черкесское мухаджирство) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে এবং সেখানে কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে—এ কথা অস্বীকার করে। প্রতি বছর ২১ মে চেরকেজ় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠান ও শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রুশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানানো হয়। বর্তমানে চেরকেজ় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ তুরস্ক ও জর্দানে বসবাস করে, আর রুশিয়ার উত্তর কাভ়কাশিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭,৫০,০০০ চেরকেজ় বাস করেন।

পটভূমি 

[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে—যদিও অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই এ ধরনের প্রচেষ্টা চলছিল—রুশ সাম্রাজ্য প্রতিবেশী উসমানীয় সাম্রাজ্য ও কাজার ইরান-এর ভূখণ্ডের বিনিময়ে দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ নীতি সক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যেই তারা কাভ়কাশিয়াকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক কাঠামোর ভিন্নতার কারণে কিছু অঞ্চল অন্যগুলোর তুলনায় সহজে দখল করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব গুর্জিস্তান—যার অন্তর্ভুক্ত ছিল শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কার্ত্লি ও কাখেতি রাজ্য—১৫৫৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে কাজার ইরানের অধীনস্থ ছিল। পরবর্তীতে গুর্জিস্তানের ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে রুশিয়া উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পূর্ব গুর্জিস্তানকে দখল করে এবং ১৮০৩ সালের গুলিস্তান চুক্তির মাধ্যমে সেই দখল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।[১৭]

রুশিয়া সমগ্র কাভ়কাশিয়া অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। তারা হায়াস্তান, কাভ়কাশীয় আজারবাইজান, এবং দক্ষিণ দাগেস্তান দখল করে, পাশাপাশি নিম্ন কাবারদা ও দাগেস্তানের কিছু অংশের অভিজাতদের নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে। যদিও দাগেস্তান ও গুর্জিস্তানকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে রুশরা প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং ইমেরেতির স্থানীয় সরকারের সামরিক প্রতিরোধও মোকাবিলা করতে হয়, তবু তাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল সেই অঞ্চলগুলো দখল করা যেগুলো আগে কখনো কোনো বিদেশি সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল না, এবং যেখানে ক্ষমতার কোনো একক স্থানীয় কেন্দ্রও ছিল না। চেরকেজ়িস্তানের অধিকাংশ ভূখণ্ডই ছিল এমন, ফলে রুশ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে চেরকেজ়দের প্রতিরোধ ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ়। জারশাসিত রুশিয়ার পরিচালিত গণহত্যার আগে কাভ়কাশিয়ায় তাদের নিজভূমিতে ৪০ লক্ষেরও বেশি চেরকেজ় বাস করত।[১৮] [১৯]

চেরকেজ়দের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে রুশ সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্তের পেছনে মুসলিমবিরোধী মনোভাব এবং অখ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্ব সনাতন খ্রিস্টধর্মের রক্ষক হিসেবে জারশাসিত রুশিয়ার তথাকথিত 'মসীহসুলভ' আত্মপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রুশ জাররা কাভ়কাশিয়ার চেরকেজ় জনগোষ্ঠীকে 'আদিম' মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতো, যাদের হয় জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হবে, নয়তো নির্মূল বা নির্বাসিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনীর জেনারেলরা চেরকেজ়িস্তানকে কাভ়কাশিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রুশ সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণের জন্য একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে দেখতো। [২০]

ভূমিকা: রুশ-চেরকেজ় যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

চেরকেজ়িস্তানের সাথে সংঘাতের সূচনা

[সম্পাদনা]
১৭৫০ সালে চেরকেজ়িস্তান

পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাইজেন্টাইন প্রভাবের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী চেরকেজ়রা সাধারণত গুর্জিদের মিত্র ছিল। ষোড়শ শতাব্দী থেকে চেরকেজ় ও গুর্জিদেরদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক মিত্রতা গড়ে ওঠে। উভয় জাতিই নিজেদের কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের একটি অভিন্ন খ্রিস্টান দ্বীপ হিসেবে বিবেচনা করত এবং যৌথভাবে রুশিয়ার কাছে সুরক্ষার আবেদন জানিয়েছিল। যদিও এর আগেও চেরকেজ়িস্তানে অল্পসংখ্যক মুসলিম ছিল, ১৭১৭ সালের পর ইসলাম গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সে বছর সুলতান চতুর্থ মুরাদ ক্রিমীয়দের চেরকেজ়দের মধ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। উসমানীয়রা বিশেষত অভিজাত শ্রেণির সদস্যদের ইসলাম গ্রহণে সফল হয়, যারা পরে নিজেদের অধীনস্থদের মধ্যেও ধর্মটি ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে রুশ সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিরক্ষামূলক জোট সুদৃঢ় করার মাধ্যম হিসেবেও ইসলাম গ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।[২১] [২২]

দ্বিতীয় কাতেরিনার শাসনামলে রুশ সেনাবাহিনী দ্রুত চেরকেজ়িস্তান দখলের উদ্দেশ্যে চেরকেজ়দের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন দুর্গ নির্মাণ করে। ১৭৬৩ সালে রুশ বাহিনী পূর্ব চেরকেজ়িস্তানের মেজ়দেউগ দখল করে সেটিকে একটি রুশ দুর্গে পরিণত করে। এর মাধ্যমেই চেরকেজ়দের সঙ্গে রুশ সাম্রাজ্যের প্রথম সশস্ত্র সংঘর্ষের সূচনা হয়।

১১৭৬৪ সালে চেরকেজ় যুবরাজ মিসোস্ত বেমাতুক়ো হাতোখশোক়ো পূর্ব চেরকেসিয়ায় রুশবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের সূচনা করেন। পরে ১৭৬৮ সালের ১৮ অক্টোবর, রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পর উসমানীয় সুলতান বেমাতুক়োর কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে তিনি খলিফা হিসেবে কাভ়কাশিয়ার সব মুসলিম জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন। ১৭৭৪ সালের কায়নারজা চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্য ক্রিমীয় খানাতের ওপর তাদের রক্ষাকর্তার মর্যাদা হারায়। এর পরবর্তী সময়ে অঞ্চলে রুশ উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি পায় এবং চেরকেজ়রা উসমানীয়দের কাছে সাহায্য ও মিত্রতার আবেদন জানায়।

১৭৯০-এর দশকের শুরুর দিকে রুশরা কারবাদায় (পূর্ব চেরকেজ়িস্তান) নিজেদের বিচারব্যবস্থা চালু করে এবং ঘোষণা দেয় যে চেরকেজ়দের প্রথাগত আইন আদিগ়ে খাবজে আর কার্যকর থাকবে না। এই সিদ্ধান্ত চেরকেজ়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।[২৩]

গণহত্যার পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

১৭৯৯ সালে রুশ জেনারেল ফিওদর বুরসাক পশ্চিম চেরকেজ়দের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে এবং তার সৈন্যদের রুশ সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত গ্রামসহ বহু চেরকেজ় গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ১৮০২ থেকে ১৮০৬ সালের মধ্যে জেনারেল পাভেল ত্সিত্সিয়ানভ চেরকেজ়িস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে এবং চেরকেজ় গ্রামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। তিনি চেরকেজ়দের “অবিশ্বস্ত শূকর” বলে অপমান করে তাদের রুশিয়ার তুলনায় “তুচ্ছ” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।[ সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] 

১৮০৫ সালে কাবারদায় একটি মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জেনারেল গ্লাজ়েনাপ তার বাহিনীকে প্রায় ৮০টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়, যাতে কাবারদীয় জনগণকে ভয় দেখিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় এবং তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যায়।[২৩]

চেরকেজ় গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেয়ার একটি সুসংগঠিত অভিযান শুরু হয়, যেখানে কোনো ধরনের পার্থক্য না করে পুরো চেরকেজ় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। প্রথমে রুশ সেনাবাহিনী একটি চেরকেজ় গ্রামে প্রবেশ করে লুটপাট চালাত। এরপর যারা প্রতিরোধ করত বা অভিযোগ জানাত, তাদের হত্যা করা হতো। সবশেষে গ্রামটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হতো এবং যতদূর সম্ভব নিশ্চিৎ করা হতো যে সব বাসিন্দা নিহত হয়েছে। ১৮১০ সালে প্রায় ২০০টি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৭৬৩ সালে কাবারদার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩,৫০,০০০, কিন্তু ১৮১৭ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩৭,০০০-এ।[২৪]

১৮০৮ সালে একটি রুশ কমিশন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে চেরকেজ়দের প্রতিরোধের অবসান ঘটাতে হলে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমি থেকেই নির্মূল করতে হবে। ১৮১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল ফিওদোর বুরসাকের বাহিনী সোপ নদীর কাছে একটি চেরকেজ় গ্রামে প্রবেশ করে এবং গ্রামটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা পরবর্তী গ্রামে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করে। একই বছরের ডিসেম্বরে শাপসুগ অঞ্চলেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয় এবং একাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু বেসামরিক মানুষ বনাঞ্চলে আশ্রয় নেয়ার পর, তাদের বের করে আনতে ওই বনেও আগুন লাগানো হয়। ১৮১১ সালে অধিকৃত এলাকায় বসবাসকারী চেরকেজ়দের মৌলিক অধিকার রক্ষার আবেদন জানিয়ে রুশিয়ার সান্ক্ত পিয়েতেরবুর্গে একাধিক আবেদনপত্র পাঠানো হয়।[২৩]

১৮১৭ সালে রুশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ জেনারেল আলেকসেয় ইয়েরমোলোভ কাভ়কাশিয়ায় এসে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে চেরকেজ়রা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবে না এবং তাই রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ‘সন্ত্রাস’ প্রয়োগই সবচেয়ে কার্যকর হবে। যদিও এর আগেও সন্ত্রাসমূলক কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছিল, ইয়েরমোলভের নির্দেশের পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক নীতিতে পরিণত হয়। তাঁর নেতৃত্বে রুশ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে চেরকেজ় গ্রাম ও জনপদ ধ্বংস করতে এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে শুরু করে, যাতে আতঙ্ক সৃষ্টি করে প্রতিরোধ ভেঙে ফেলা যায়। প্রতিরোধযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার সন্দেহে গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হতো, পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং পুরো পরিবারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। যেহেতু চেরকেজ় প্রতিরোধ স্থানীয় গ্রামগুলোর খাদ্য ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই রুশ সেনাবাহিনী পদ্ধতিগতভাবে ফসল ও গবাদিপশু ধ্বংস করে এবং বেসামরিক কৃষকদের হত্যা করে তাদের রসদ সরবরাহ ভেঙে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এর জবাবে চেরকেজ়রা নিজেদের বিভিন্ন গোত্রকে একত্রিত করে একটি উপজাতীয় ফেদেরাত্সিয়াগঠন করে এবং প্রতিরোধ আরও সুসংগঠিত করে।

১৮১৮ সালের মে মাসে জেনারেল ইভান পেত্রোভিচ দেলপোত্সোর নেতৃত্বাধীন রুশ বাহিনী, যিনি ইয়েরমোলভের নির্দেশে কাজ করছিল, ত্রাম গ্রাম ঘেরাও করে, আগুনে পুড়িয়ে দেয় এবং এর বাসিন্দাদের হত্যা করে। এরপর দেলপোত্সো চেরকেজ় বাহিনীর উদ্দেশে লিখেছিল: [২৫]

এইবার আমি নিজেকে সংযত রাখিতেছি; কিন্তু ভবিষ্যতে অপরাধী দস্যুদের প্রতি আমি কোনো দয়া প্রদর্শন করিব না। তাহাদের গ্রামসমূহ বিধ্বস্ত করা হইবে, সম্পত্তি জব্দ করা হইবে, এবং তাহাদের স্ত্রী ও সন্তানগণকেও নিধন করা হইবে।

— ইভান পেত্রোভিচ দেলপোত্সো

গ্রামসমূহের সম্পূর্ণ ধ্বংস—ভিতরে যা কিছু ছিল সবসহ—রুশ সেনাবাহিনী ও কোজ়াক ইউনিটগুলোর একটি মানক সামরিক কৌশলে পরিণত হয়। তা সত্ত্বেও চেরকেজ়দের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকে। যেসব গ্রাম আগে রুশ শাসন মেনে নিয়েছিল, সেগুলোকেও আবার প্রতিরোধে অংশ নিতে দেখা যায়, যা রুশ সেনা কমান্ডারদের তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়।[২৬]

১৮২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রুশ বাহিনী পূর্ব চেরকেজ়িস্তানের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক পুনর্বাসন শুরু করে। কাবারদায় সেনা পাঠানো হয়, যেখানে গবাদিপশু হত্যা করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ পাহাড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেসব জমিতে তারা আগে বসবাস করত, তা পরবর্তীতে কুবান কোজ়াকদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এরপর সমগ্র কাবারদা (পূর্ব চেরকেজ়িস্তান)কে রুশ সরকারের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।[২৭][ যাচাইকরণ ব্যর্থ হয়েছে ]

জেনারেল ইয়েরমোলভ কাবারদায় তার অভিযান আরও তীব্র করে। শুধু ১৮২২ সালের মার্চ মাসেই তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ১৪টি গ্রাম ধ্বংস করা হয়। ১৮২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল ভ্লাসভের নেতৃত্বাধীন রুশ সেনাবাহিনী জামবুত, আসলান, মোরজ়া, এবং ত্সাব দাধিকা নামের চেরকেজ় গ্রামগুলো আক্রমণ করে। গ্রামগুলো রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও তাদের অধিবাসীদেরসহ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ১৮২৮ সালে জেনারেল এমানুয়েল নাতুখাজ চেরকেজ়দের ৬টি গ্রাম এবং আরও বহু শাপসুগ চেরকেজ় গ্রাম ধ্বংস করে। এরপর তিনি কুবান অতিক্রম করে আরও ২১০টি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়।

১৮২৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এদিরনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উসমানীয় সাম্রাজ্য চেরকেজ়িয়া রুশ সাম্রাজ্যের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু চেরকেজ়রা এই চুক্তিকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, চেরকেজ়িয়া উসমানীয়দের অধীনস্থ ছিল না, বরং স্বাধীন ছিল; ফলে ইস্তাম্বুলের তাদের ভূমি রুশিয়ার কাছে সমর্পণ করার কোনো অধিকার ছিল না। চুক্তিকে তারা সব পরিস্থিতিতেই অগ্রাহ্য করে বলে ঘোষণা দিতে চেরকেজ় রাষ্ট্রদূতদের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও উসমানীয় সাম্রাজ্যে পাঠানো হয়।

১৮৫৫ সালে রুশ সামরিক ও চেরকেজ় প্রতিনিধিরা আলোচনার জন্য মিলিত হন

১৮৩১ সালে রুশ সরকার কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূলে কোজ়াকদের বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে নাতুখাজ গোত্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পরিকল্পনা বিবেচনা করে। একই বছরের শেষদিকে, চেরকেজ়দের কোজ়াক সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে রুশ জেনারেল ফ্রোলভ ও তার বাহিনী একাধিক গ্রাম ধ্বংস করে। ২০ নভেম্বরের রাত থেকে একটি "ভয়াবহতা অভিযান" শুরু হয়, যার সময় গ্রামগুলোকে কামান দিয়ে ঘিরে নির্বিচারে গোলাবর্ষণ করা হতো। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সাধারণ মানুষের বাড়িঘর এবং মসজিদ। অভিযানের বিবরণ একটি প্রতিবেদনে এভাবে তুলে ধরা হয়:[২৮]

এই সমরকার্যে রুশবাহিনীর দশজন সৈনিক নিহত হইয়াছিল এবং একজন আধিকারিক ও ষোলোজন সৈনিক আহত হইয়াছিল। রণক্ষেত্রে বেয়নেট-প্রহারে নিহত দেড় শতাধিক চেরকেজ়ের শবদেহ পরিদৃষ্ট হইয়াছিল। তদুপরি, রুশ গোলন্দাজবাহিনীর তোপবর্ষণের ফলে প্রায় পঞ্চাশজন নারী ও শিশুর প্রাণসংহার সংঘটিত হইয়াছিল।

আরেকটি প্রতিবেদনে জেনারেল রোজ়েন উল্লেখ করে যে, ১৮৩১ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বাহিনী ৩৮১ জন চেরকেজ়কে বন্দী করেছিল। তিনি গর্বের সঙ্গে লেখে যে, তার বাহিনী গ্রামগুলোতে গোলাবর্ষণ চালিয়ে ১০০ জন পুরুষ ও ৫০ জন নারীকে হত্যা করেছিল। তিনি আরও বর্ণনা করে যে, একটি গ্রামে আগুন লাগানোর সময় মিদভিদেইভ (অথবা মেদভেদেভ) নামের এক রুশ সৈনিক মসজিদে অগ্নিসংযোগ ঠেকানোর চেষ্টা করা এক চেরকেজ়কে হত্যা করে।

প্রবল চেরকেজ় প্রতিরোধের মোকাবিলায় রুশরা ভূপ্রকৃতি নিজেদের অনুকূলে বদলে দিতে শুরু করে। তারা বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণ করে, সেসব সড়কের আশপাশের বনভূমি পরিষ্কার করে, স্থানীয় গ্রামগুলো ধ্বংস করে এবং সেখানে রুশ বা অন্যান্য সনাতন স্লাভ জনগোষ্ঠীর নতুন কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপন করে। সংঘাত ক্রমশ আরও রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠলে, সমগ্র গ্রাম ধ্বংস করা রুশবাহিনীর একটি নিয়মিত সামরিক কৌশলে পরিণত হয়।

জেনারেল ইয়েরমোলভ মন্তব্য করেছিল, “আমাদের চেরকেজ়দের ভূমি দরকার, কিন্তু চেরকেজ়দের নিজের কোনো দরকার নেই।” রুশ সামরিক কমান্ডাররা, যেমন ইয়েরমোলভ ও বুলগাকভ, প্রায়ই নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে—যুদ্ধক্ষেত্রে গৌরব অর্জন ও বিজয়ের মাধ্যমে সম্পদ লাভের জন্য—কাভ়কাশিয়ায় অভিযান পরিচালনা করত; কারণ পশ্চিম রণাঙ্গনের তুলনায় এখানে সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ ছিল। তারা অনেক সময় কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করত এবং চেরকেজ়দের রুশিয়ার সঙ্গে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টাকে গোপন বা আড়াল করতেন।[২৯]

রুশ সেনাপতি গ্রিগরি জ়াস রুশ-চেরকেজ় যুদ্ধ এবং চেরকেজ় গণহত্যার সময় চেরকেজ়দের বিরুদ্ধে অত্যন্ত নির্মম নীতি প্রয়োগের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। তিনি শুধু চেরকেজ় নারী ও শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালায়নি, বরং তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে তিনি চেরকেজ়দের কাটা মাথার খুলি এবং দেহের বিচ্ছিন্ন অঙ্গ সংগ্রহ করত।[৩০] [৩১]

১৮৩৩ সালে কর্নেল গ্রিগরি জাসকে বাতালপাশিন্স্ক দুর্গে সদর দপ্তরবিশিষ্ট কুবান সামরিক রেখার একটি অংশের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। তাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজ বিবেচনায় ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। তিনি বর্ণবাদী ছিল এবং চেরকেজদের নিকৃষ্ট জাতি বলে মনে করত। তার মতে, চেরকেজদের দমনের একমাত্র উপায় ছিল তাদের ‘বন্য পশুর মতো’ আতঙ্কিত করে তোলা। এই ধারণার ভিত্তিতে তিনি নির্মম সামরিক কৌশলের পক্ষে ছিল, যার মধ্যে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, শিরশ্ছেদ করে প্রকাশ্যে প্রদর্শন, জনবসতিপূর্ণ গ্রাম ভস্মীভূত করা, ইচ্ছেকৃতভাবে মহামারী ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিশুদের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি নিজের শয্যার নিচে চেরকেজদের বিচ্ছিন্ন দেহাংশের সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য একটি বাক্স রাখত। সমগ্র চেরকেজিস্তানজুড়েই তিনি এসব কার্যকলাপ পরিচালনা করে।

জাসের প্রধান কৌশল ছিল সর্বদা উদ্যোগ নিজের হাতে রাখা, চেরকেজদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং তাদের জনবসতিগুলো ধ্বংস করা। কোনো অভিযানে বিজয় অর্জনের পর তিনি প্রায়শই একাধিক গ্রামে অগ্নিসংযোগ করতেন এবং নিজের শক্তির প্রদর্শন হিসেবে গবাদিপশু ও ঘোড়া লুট করে নিয়ে যেত—যা তিনি নিজেই গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেছিল। তার সরকারি প্রতিবেদনে তিনি নিয়মিতভাবে গ্রাম ধ্বংসের বিবরণ দিয়ে আত্মপ্রশংসা করত এবং নিরীহ বেসামরিক মানুষের গণহত্যাকে গৌরবজনক কীর্তি হিসেবে তুলে ধরত।[৩২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ "Circassian Genocide on its 159th Anniversary"। Human Rights Association। ২১ মে ২০২৩। ২২ আগস্ট ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  2. ↑ Levene, Mark (২০০৫)। "6: Declining Powers"। Genocide in the Age of the Nation-State। খণ্ড II: The Rise of the West and the Coming of Genocide। 175 Fifth Avenue, New York NY 10010। পৃ. ৩০১। আইএসবিএন ১-৮৪৫১১-০৫৭-৯। anything between 1 and 1.5 million Circassians perished either directly, or indirectly, as a result of the Russian military campaign
  3. ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; ":11" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  4. ↑ Karpat 1985, পৃ. 69।
  5. ↑ Levene, Mark (২০০৫)। "6: Declining Powers"। Genocide in the Age of the Nation-State Volume II: The Rise of the West and the Coming of Genocide। 175 Fifth Avenue, New York NY 10010। পৃ. ৩০০। আইএসবিএন ১-৮৪৫১১-০৫৭-৯।
  6. ↑ Shenfield 1999, পৃ. 153–154।
  7. ↑ Richmond 2013, পৃ. 1–2; Shenfield 1999, পৃ. 154; King 2008;[পৃষ্ঠা নম্বর প্রয়োজন] Jones 2016, পৃ. 109
  8. ↑ "UNPO: The Circassian Genocide" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে. Unrepresented Nations and Peoples Organization. 2 November 2009. Retrieved 26 September 2020.
  9. ↑ "Зумысыжмэ, ущхьэхуитщ!"। Жьынэпс Гъазэтэ (কাবার্ডিয়ান ভাষায়)। ২০ মে ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
  10. ↑ Richmond 2013, back cover।
  11. ↑ Yemelianova, Galina (এপ্রিল ২০১৪)। "Islam, nationalism and state in the Muslim Caucasus"। Caucasus Survey। ১ (2): ৩। ডিওআই:10.1080/23761199.2014.11417291।
  12. ↑ Geçmişten günümüze Kafkasların trajedisi: uluslararası konferans, 21 Mayıs 2005 [The tragedy of the Caucasus from past to present: international conference, 21 May 2005] (তুর্কি ভাষায়)। Kafkas Vakfı Yayınları। ২০০৬। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৭৫-০০৯০৯-০-৫ – Google Books এর মাধ্যমে।
  13. ↑ Sources:
  14. ↑ King 2008, পৃ. 96।
  15. ↑ Abzakh, Edris (১৯৯৬)। "Circassian History"। University of Pennsylvania, School of Arts and Sciences। ৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ মার্চ ২০০৭।
  16. ↑ "The Circassian Genocide"। Unrepresented Nations and People Organisation। ১৪ ডিসেম্বর ২০০৪। ৩ নভেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ এপ্রিল ২০০৭।
  17. ↑ Dowling, Timothy C. (২ ডিসেম্বর ২০১৪)। Russia at War: From the Mongol Conquest to Afghanistan, Chechnya, and Beyond। ABC-CLIO। পৃ. ৭২৮–৭২৯। আইএসবিএন ৯৭৮-১৫৯৮৮৪৯৪৮৬ – Google Books এর মাধ্যমে।
  18. ↑ Messenger, Evan (৬ ডিসেম্বর ২০২৩)। "The Circassian Genocide: The Forgotten Tragedy of the First Modern Genocide"। American University: Journal of International Service। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  19. ↑ Unrepresented Nations and Peoples Organization Yearbook 1997। Kluwer Law International। ১৯৯৮। পৃ. ৬৭। আইএসবিএন ৯০-৪১১-১০২২-৪।
  20. ↑ Karpat 1985, পৃ. 67।
  21. ↑ Natho 2009, পৃ. 123–124।
  22. ↑ Shenfield 1999, পৃ. 150।
  23. 1 2 3 Jaimoukha, Amjad। A Brief History of Kabarda [from the Seventh Century AD]। পৃ. ১৯।
  24. ↑ Richmond 2013, পৃ. 56।
  25. ↑ Natho, Kadir (২০০৫)। "The Russo-Circassian War"। ১২ মে ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ মার্চ ২০২২।
  26. ↑ King 2008, পৃ. 93–94।
  27. ↑ Baddeley 1908, পৃ. 135।
  28. ↑ F. A. Cherbin, The History of Cossack Kuban Forces
  29. ↑ Richmond 2013, পৃ. 13–18।
  30. ↑ Duvar, Gazete (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০)। "Kafkasya'nın istenmeyen Rus anıtları: Kolonyal geçmişi hatırlatıyorlar"। Gazeteduvar (তুর্কি ভাষায়)। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২১।
  31. ↑ "Velyaminov, Zass ve insan kafası biriktirme hobisi"। Jıneps Gazetesi (তুর্কি ভাষায়)। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩। ১৩ অক্টোবর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০।
  32. ↑ Dönmez, Yılmaz (৩১ মে ২০১৮)। "General Zass'ın Kızının Adigeler Tarafından Kaçırılışı"। ÇERKES-FED (তুর্কি ভাষায়)। ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২১।
  1. ↑ টেমপ্লেট:Lang-uby, цӀыцӀэкӀун.[৯]
উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামক গ্রুপের জন্য <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি