চাকমা সার্কেল
চাকমা সার্কেলের কোট অফ আর্মস | |
চাকমা সার্কেলের পতাকা | |
| পূর্বসূরী | রাজা ত্রিদিব রায় |
|---|---|
| সদরদপ্তর | রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা |
| অবস্থান | |
যে অঞ্চলে | পার্বত্য চট্টগ্রাম |
| রাজা দেবাশীষ রায় | |

চাকমা সার্কেল (চাকমা: 𑄌𑄇𑄴𑄟𑄳𑄦 𑄥𑄢𑄴𑄇𑄬𑄣𑄴), যা চাকমা রাজ নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি বংশগত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার (বা "সার্কেলের") একটি।[১] চাকমা সার্কেল রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার ৯টি ও কাপ্তাই উপজেলার ৫টি মৌজা বাদে সম্পূর্ণ জেলা এবং খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ২১টি মৌজা ও লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ১২টি মৌজা নিয়ে গঠিত। এই রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সদস্যরা চাকমা বংশোদ্ভূত।
নেতৃত্ব
[সম্পাদনা]চাকমা সার্কেল একজন বংশগত প্রধান যাকে রাজা নামে অভিহিত করা হয় তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, যার ভূমিকা বিচারিক, প্রশাসনিক, আনুষ্ঠানিক, আইনগত এবং সামাজিক দায়িত্বে বিস্তৃত। রাজনৈতিক ক্ষমতা পিতার কাছ থেকে বড় ছেলের কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর হয়।[২]
বর্তমান প্রধান (রাজা) হলেন দেবাশীষ রায় (জন্ম: ১০ এপ্রিল ১৯৫৯), যিনি চাকমা বিজক অনুযায়ী এই পদে রয়েছেন। চাকমা বিজক হল ১৮৭৬-১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চাকমা ইতিহাসের একটি সংকলন। চাকমা প্রধান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদ এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।[৩] চাকমা প্রধান রাজপুণ্যাহ উৎসবেরও নেতৃত্ব দেন।[৪]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]ঔপনিবেশিক যুগের পূর্ববর্তী সময়
[সম্পাদনা]চাকমা প্রধানদের বংশধারা ১১শ শতক বা ১৬শ শতকের মধ্যভাগে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।[৫] চাকমা লোককাহিনী এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী, চাকমাদের উৎপত্তি ভারতের আধুনিক ভাগলপুর এলাকার যোদ্ধা বর্ণ থেকে।[৬] বিশ্বাস করা হয় যে, কিংবদন্তিতুল্য রাজা বিজয় গিরি (প্রায় ১৬৩০) চাকমা জনগণের পূর্বপুরুষদের নাফ নদীর উত্তরে নিয়ে আসেন।[৭] রাখাইন জনগণের সাথে আন্তর্বিবাহের মাধ্যমে চাকমারা শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হয়।[৭] বিদ্যমান ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলি ১৭০০ সালের দিকের। মোগল সাম্রাজ্যের চাকমা অঞ্চলে সম্প্রসারণের পর, চাকমা প্রধানরা বিনিময়ে খাজনা প্রদানের শর্তে মোগল নাম এবং উপাধি (যেমন: খান) গ্রহণ করেন।[৬][৮]
ব্রিটিশ শাসন এবং আধুনিক যুগ
[সম্পাদনা]ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৮৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশাসনিকভাবে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল, প্রতিটি সার্কেল চাকমা এবং মারমা জনগণের বংশগত প্রধানদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো।[৭][৯] ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধিমালা দ্বারা এই সার্কেলগুলো আইনগতভাবে প্রণীত হয়, যা কর সংগ্রহ, ভূমি প্রশাসন পরিচালনা এবং সামাজিক মধ্যস্থতার দায়িত্ব প্রধানদের নিকট অর্পণ করে ব্রিটিশ প্রশাসনের উপর থেকে রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক বোঝা হ্রাস করে।[৯][১০] ১৯০১ সালে, বোমাং সার্কেলের আয়তন ছিল ২,৪২১ বর্গমাইল (৬,২৭০ বর্গকিমি)।[১১] এই প্রশাসনিক কাঠামো ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল, যখন স্থানীয় স্বশাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে এই সার্কেলগুলোর বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত করা হয় এবং স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।[১২]
| ক্র. নং | ছবি | নাম ও পরিচয় | রাজত্বকাল | জীবনকাল |
|---|---|---|---|---|
| নিম্নোক্ত রাজাগণ প্রাচীন রাজবংশের রাজা। এই তালিকা অস্পষ্ট বলে অনেকে মনে করেন। | ||||
| ১ | সুধান্য | ৬০৮ খ্রিঃ | ||
| ৪ | লাঙ্গল ধন (দ্বিতীয় মহিয়সীর সন্তান) | |||
| ৫ | ক্ষুদ্রজিৎ | |||
| ৬ | সমুদ্রজিৎ (বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যান) | |||
| ৭ | শ্যামল (সুভল মন্ত্রীর পুত্র) | |||
| ৮ | চম্পকলী (চম্পকনগর তার নাম অনুসারে হয়) | |||
| ৯ | সাদেং গিরি | |||
| ১০ | চঙ্গ্যেসুর | |||
| ১১ | ধর্মসুর (বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যান) | |||
| ১২ | চান্দাসুর | |||
| ১৩ | চম্পাসুর | |||
| ১৪ | বিশ্বসুর | ৮০০ খ্রিঃ | ||
| ১৫ | ভীমঞ্জয় (বিশ্বসুরের ভ্রাতা সুমেশ্বরের পুত্র) | |||
| ১৬ | সাম্বুদ্ধ | |||
| ১৭ | উদয়গিরি | |||
| নিম্নোক্ত রাজাগণ আরাকানে চাকমা রাজ্য স্থাপন করে রাজত্ব করেন | ||||
| ১৮ | বিজয়গিরি | ৮১২ খ্রিঃ | ||
| ১৯ | সিরিত্তম চাক (উত্তম চাক) | |||
| ২০ | সরলনামা (সিরিত্তমার ভ্রাতুষ্পুত্র) | |||
| ২১ | উলত নামা | |||
| ২২ | জমু | |||
| ২৩ | কমলা জনু | |||
| নিম্নোক্ত রাজাগণ ৯ম শতাব্দীর শেষ হতে ১১ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত উচ্চ ব্রহ্মে (বর্তমান মায়ানমারের উত্তর অংশে) রাজত্ব করেন। | ||||
| ২৪ | মনিজগিরি | |||
| ২৫ | মদন যুগ | |||
| ২৬ | জীবন যুগ | |||
| ২৭ | রত্নগিরি | |||
| ২৮ | কালা থংজা | |||
| ২৯ | বুদ্ধং গিরি | |||
| ৩০ | ধর্মগিরি | ১০৭৫ খ্রিঃ | ||
| ৩১ | শ্বেতব্রত | |||
| এই অংশ মূলত বিজয়গিরি রাজার সাথে আসা চাকমার যোদ্ধাদের মধ্য থেকে মনোনিত রাজবংশ | ||||
| ৩২ | সাকালিয়া - সকলের মনোনিত বলে এই নাম (গণতান্ত্রিক রাজা) | ১১১৮ খ্রিঃ | ||
| ৩৩ | বাঙ্গালি সর্দার (সাকালিয়ার কন্যা মাণিকীর স্বামী) | |||
| ৩৪ | মাণিক | |||
| ৩৫ | মাধলিয়া | |||
| ৩৬ | রামতোংজা | |||
| ৩৭ | কমলা চেগে | |||
| ৩৮ | রত্ন গিরি | |||
| ৩৯ | হালা তোংজা | |||
| ৪০ | চক্র ধন | |||
| ৪১ | ফেলা ধাবেঙ | |||
| ৪২ | শেরমুত্ত ধাবেঙ | ১৩০০ খ্রিঃ | ||
| ৪৩ | অরুণযুগ | ১৩৩৩ খ্রিঃ | ||
| ৪৪ | চৌধুথংজা | |||
| ৪৫ | মইশাং | |||
| ৪৬ | মারিক্যা | ১৪১৮ খ্রিঃ | ||
| ৪৭ | কদমথংজা | |||
| ৪৮ | রসদংসা | |||
| ৪৯ | তৈন সুরেশ্বরী | ১৬শ শতকের শুরু | ||
| ৫০ | জনু | ১৫১৬ খ্রিঃ (রাজ্যাভিষেক) | ||
| ৫১ | সাওয়া বড়ুয়া (জনু রাজার দ্বিতীয় কন্যার পুত্র) | ১৬শ শতকের শেষ | ||
| ৫২ | কাটুয়া রাণী (সাওয়া বড়ুয়া রাজার রাণী) | ১৭শ শতকের শুরু | ||
| ৫৩ | ধবনা | ১৭শ শতকের মাঝামাঝি | ||
| ৫৪ | ধরম্যা | ১৬৬১ খ্রিঃ (রাজ্যাভিষেক) | ||
| ৫৫ | মোগল্যা | ১৭শ শতকের শেষ | ||
| ৫৬ | যুবল খাঁ বা সুবল খাঁ | ১৭শ শতকের শেষ | ||
| ৫৭ | ফতেহ খাঁ (যুবল খাঁর ভ্রাতা) | ১৮শ শতকের মাঝামাঝি | ||
| ৫৮ | শেরজ্জা খাঁ | ১৮শ শতকের মাঝামাঝি | ||
| ৫৯ | শেরমুস্ত খাঁ | ১৭৩৭ খ্রিঃ | ||
| ৬০ | রাজা শুকদেব রায় (শেরমুস্ত খাঁর পোষ্য পুত্র) | ১৭৭৬ খ্রিঃ | ||
| ৬১ | শের দৌলত খাঁ (ফতেহ খাঁর দ্বিতীয় পুত্র রহমত খাঁর পুত্র) | ১৭৭৭ - ১৭৮২ খ্রিঃ | ||
| ৬২ | জানবক্স খাঁ | ১৭৮২ - ১৭৮৯ খ্রিঃ | ||
| ৬৩ | তব্বর খাঁ | ১৮০১ - ১৮১১ খ্রিঃ | ||
| ৬৪ | জব্বর খাঁ (তব্বর খাঁর ভ্রাতা) | ১৮১১ - ১৮১৪ খ্রিঃ | ||
| ৬৫ | ধরম বক্স খাঁ | ১৮১৪ - ১৮৩২ খ্রিঃ | ||
| ৬৬ | রাণী কালিন্দী (ধরম বক্স খাঁ এর দ্বিতীয় রাণী) | ১৮৩২ - ১৮৭৩ খ্রিঃ | ||
| ৬৭ | রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় বাহাদুর (ধরম বক্স খাঁ এর তৃতীয় রাণীর মেয়ে মেনকার পুত্র) | ১৮৭৩ - ১৮৮৫ খ্রিঃ | ||
| ৬৮ | কোর্ট অফ ওয়ার্ডস (নীল চন্দ্র দেওয়ান এবং ত্রিলোচন দেওয়ান) | ১৮৮৫ - ১৮৯৭ খ্রিঃ | ||
| ৬৯ | রাজা ভুবনমোহন রায় | ৭ মে ১৮৯৭ - ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ | ||
| ৭০ | রাজা নলিনাক্ষ রায় | ৭ মার্চ ১৯৩৫ - ৭ অক্টোবর ১৯৫১ | ||
| ৭১ | রাজা ত্রিদিব রায় | ২ মার্চ ১৯৫৩ - ১৯৭১ | ||
| ৭২ | সমিত রায় | ১৯৭১ - ১৯৭৭ | ||
| ৭৩ | রাজা দেবাশীষ রায় ওয়াংজা | ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ - বর্তমান | ||
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Deakin, Liz; Kshatriya, Mrigesh; Sunderland, Terry (২০১৬)। Agrarian change in tropical landscapes (ইংরেজি ভাষায়)। CIFOR। পৃ. ১৯৪। আইএসবিএন ৯৭৮৬০২৩৮৭০২২৬।
- ↑ Ahmed, Kawser (২০১০)। "Defining 'Indigenous' in Bangladesh: International Law in Domestic Context"। International Journal on Minority and Group Rights। ১৭ (1): ৪৭–৭৩। ডিওআই:10.1163/157181110X12595859744169। জেস্টোর 24675834।
- ↑ "Chittagong Hill Tracts Peace Accord" (পিডিএফ)। ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭। ২১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
- ↑ "Rajpunnah in Bandarban today"। দ্য ডেইলি স্টার। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
- ↑ Dowlah, Caf (অক্টোবর ২০১৩)। "Jumma insurgency in Chittagong Hills Tracts: how serious is the threat to Bangladesh's national integration and what can be done?"। Small Wars & Insurgencies। ২৪ (5): ৭৭৩–৭৯৪। ডিওআই:10.1080/09592318.2013.866419। আইএসএসএন 0959-2318।
- 1 2 Serajuddin, A. M.; Buller, John (১৯৮৪)। "The Chakma Tribe of the Chittagong Hill Tracts in the 18th Century"। Journal of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland। ১১৬ (1): ৯০–৯৮। ডিওআই:10.1017/S0035869X00166146। জেস্টোর 25211628।
- 1 2 3 Hutchinson, Robert Henry Sneyd (১৯০৬)। An Account of the Chittagong Hill Tracts (ইংরেজি ভাষায়)। Bengal Secretariat Book Depot। পৃ. xvii।
- ↑ Jhala, Angma D. (জানুয়ারি ২০১৩)। "Daughters of the Hills: legacies of colonialism, nationalism and religious communalism in the Chakma Raj family, Chittagong Hill Tracts, Bengal c. 1900–1972"। South Asian History and Culture। ৪ (1): ১০৭–১২৫। ডিওআই:10.1080/19472498.2012.750460। আইএসএসএন 1947-2498।
- 1 2 Kundu, Debasish; Samadder, Mrinmoy; Khan, Ashrafuzzaman; Shajahan Naomi, Sharin (জানুয়ারি ২০১১)। State of Justice in Chittagong Hill Tracts: Exploring the Formal and Informal Justice Institutions of Indigenous Communities (প্রতিবেদন)। BRAC।
- ↑ "Bandarban wears festive look as Rajpunyah starts"। দ্য ডেইলি স্টার। ১৫ জানুয়ারি ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
- ↑ Hutchinson, Robert Henry Sneyd (১৯০৬)। An Account of the Chittagong Hill Tracts (ইংরেজি ভাষায়)। Bengal Secretariat Book Depot। পৃ. ১২২।
- ↑ Zaman, M. Q. (১৬ জানুয়ারি ১৯৮২)। "Crisis in Chittagong Hill Tracts: Ethnicity and Integration"। Economic and Political Weekly। ১৭ (3): ৭৫–৮০। জেস্টোর 4370578।
- ↑ রায়, রাজা ভুবনমোহন। চাকমা রাজবংশের ইতিহাস।