গ্রিনিচ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
গ্রিনিচ
312SFEC LONDON-20070917.JPG
Royal Observatory, Greenwich
Greenwich arms.png
One-time Coat of arms of Greenwich
গ্রিনিচ যুক্তরাজ্য-এ অবস্থিত
গ্রিনিচ
গ্রিনিচ
জনসংখ্যা৩০,৫৭৮ (Peninsula and Greenwich West wards 2011)
ওএস গ্রিড তথ্যTQ395775
• চারিং ক্রস৫.৫ মা (৮.৯ কিমি) WNW
লন্ডন বরো
আনুষ্ঠানিক কাউন্টিগ্রেটার লন্ডন
অঞ্চল
দেশইংল্যান্ড
সার্বভৌম রাষ্ট্রযুক্তরাজ্য
পোস্ট শহরLONDON
পোস্টকোড জেলাSE10
ডায়ালিং কোড020
পুলিশ 
অগ্নিকাণ্ড 
অ্যাম্বুলেন্স 
ইউকে সংসদ
লন্ডন পরিষদ
স্থাসমূহের তালিকা
যুক্তরাজ্য
৫১°২৯′ উত্তর ০°০০′ পূর্ব / ৫১.৪৮° উত্তর ০.০০° পূর্ব / 51.48; 0.00স্থানাঙ্ক: ৫১°২৯′ উত্তর ০°০০′ পূর্ব / ৫১.৪৮° উত্তর ০.০০° পূর্ব / 51.48; 0.00

গ্রিনিচ (ইংরেজি: Greenwich, /ˈɡrɛnɪ/ (এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন) GREN-itch, /ˈɡrɪnɪ/ GRIN-ij, /ˈɡrɪnɪ/ GRIN-itch, অথবা /ˈɡrɛnɪ/ GREN-ij[১][২]) ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহর। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫.৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েকশ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল, এরপর ১৮৮৯ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত এটি লন্ডন প্রদেশের অংশ ছিল, তবে পরবর্তীতে এ প্রদেশ ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং রাজধানী লন্ডন গঠিত হয়।

গ্রিনিচ এর সমুদ্রের সাথে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য 'টিউডর' রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সাথে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়।

থেম্স‌ নদীর দক্ষিণে অবস্থিত উলউইচ মহানগর পৌরসভা ও গ্রিনিচ মহানগর পৌরসভাকে একত্র করে ১৯৬৫ সালে গ্রিনিচের লন্ডন পৌরসভা (London Borough of Greenwich) গঠিত হয়। এই পৌরসভা গ্রিনিচে পশ্চিম গ্রিনিচ ও পেনিনসুলা ওয়ার্ড তৈরী করেছে এবং এটিই গ্রিনিচের সরকার। এ পৌরসভা বেশ কয়েকটি এলাকা যেমন, ব্ল্যাকহেথ ওয়েস্টকম্ব, চার্লটন, গ্লিন্ডন, উলউইচ রিভারসাইড, উলউইচ কমোন ইত্যাদি এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এবং একজন পার্লামেন্ট সদস্য বা এমপি নির্বাচন করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

গ্রিনিচের নাম সর্বপ্রথম 'গ্রোনেউইক' নামে ৯১৮ সালে 'স্যাক্সন চার্টার' সনদে উল্লেখ করা হয়। ৯৬৪ সালে এর নাম 'গ্রেনেউইক' ও ১০১৩ সালে 'গ্রেনাউইক' হিসেবে 'অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকেল' সনদে তালিকাভুক্ত করা হয়। ১০৮৬ সালে এটির নাম গ্রেনভিচ হিসেবে ডুমসডে বই(Domesday Book)-এ উল্লেখ করা হয়, এরপর ১২৯১ সালে টাক্সাটিও এক্লেসিয়াসতিকা নামের একটি ডাটাবেসে এটিকে গ্রেনেউইচ নামে যুক্ত করা হয়। তৎকালীন গ্রিনিচের পশ্চিম অঞ্চলটি অর্থাৎ তৎকালীন পশ্চিম গ্রিনিচ থেম্স‌ নদী সংলগ্ন ডেপ্তফোর্ড অঞ্চলের অংশ ছিল এবং দুই অংশের মীমাংসার মাধ্যমে পশ্চিম গ্রিনিচকে পূর্ব গ্রিনিচ থেকে বিভক্ত করে দেয়া হয়। এ কারণে গ্রিনিচের নাম ল্যাটিন ভাষার 'ভিকাস' শব্দ হতে আগত 'গ্রিন উইক' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ মীমাংসা বা নিষ্পত্তি। অবশ্য সমগ্র গ্রিনিচ শহরকে পূর্ব গ্রিনিচ বলে অভিহিত করার চল ১৯ শতকেই শেষ হয়ে যায়। এ গ্রিনিচকে বৃটিশ গৃহযুদ্ধের সময় ১৮৩৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনিচ উপজেলায় বিভক্ত করা হয়। সে সময়ের দুই গ্রিনিচের মধ্যবর্তী সীমানা বর্তমানের গ্রিনিচ চার্চ স্ট্রিট ও ক্রমস পাহাড়ের এলাকাটিতে অবস্থিত ছিল এবং সেই পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনিচ মূলত বর্তমানে পশ্চিম গ্রিনিচ ওয়ার্ডের সাথে সংলগ্ন রয়্যাল নেভাল কলেজ ও জাতীয় মেরিটাইম যাদুঘরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ।

মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে প্রচলিত এক ধরনের জমিদার প্রথার নাম ম্যানোর যা মূলত একটি আঞ্চলিক সরকার ব্যবস্থা ছিল। বৃটিশ রয়্যাল চার্টার সনদে পূর্ব গ্রিনিচে প্রচলিত এই ম্যানোরকে প্রায়শই করমুক্ত ম্যানোর হিসেবে অভিহিত করা হতো অর্থাৎ এ ম্যানোর থেকে কোন প্রকার কর মূল সরকারকে প্রদান করা হয় না। নিউ ইংল্যান্ড চার্টার সনদে এ বিষয়ে বলা হয়েছিল যে, সকল জমিদার বা ভূস্বামী তাদের প্রধান সরকারের ভূমি দখলদারীর মাধ্যমে বসবাস করছে। তৎকালীন বৃটিশ নিয়মানুযায়ী কোন জমিদারের জমি তাদের নিজেদের ছিল না যদিও এ জমির দলিল তাদের নামে তৈরী এবং তারাই এদের আসল মালিক। তবে টিউডর যুগে এ নিয়মের পরিবর্তন করে ফেলা হয় এবং পূর্ব গ্রিনিচে প্রচলিত টাকায় (ইংল্যান্ডের গ্র‍্যান্ট) এই জমিদারদের নাম উল্লেখ করার প্রচলন ঘটে। তবে ১৭ শতকের অনেকগুলো গ্র‍্যান্টে ইংল্যান্ডের বার্কশার প্রদেশে অবস্থিত উইন্ডসোর প্রাসাদের নাম উল্লেখ করা হতো।

জার্মানি হতে আগত স্যাক্সন জাতি গ্রিনিচের একদম প্রথমদিকের বসতিস্থাপনকারীদের মধ্যে অন্যতম। গ্রিনিচ পার্কে আবিষ্কৃত ফ্ল্যামস্টিড হাউসের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি সমাধিস্তূপ তাম্র যুগে (Bronze Age) নির্মাণ করা হয়েছিল যা ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে কবর হিসেবে এ স্যাক্সন জাতিগোষ্ঠী দ্বারা পুনঃব্যবহৃত হয়। গ্রিনিচের পূর্বদিকে অবস্থিত ভ্যানবার্গ ও মেজ-হিল-গেটসের এলাকাটিতে এক সময় একটি রোমান ভিলা বা রোমান মন্দির অবস্থিত ছিল। ১৯০২ সালে এটি খুঁড়ে ৩০০টি মুদ্রা পাওয়া যায় যেগুলো ৫ম শতকে ক্লোডিয়াস ও অনারিয়াস সম্রাটের আমলে তৈরী। ১৯৯৯ সালে চ্যানেল ভি নামের একটি বৃটিশ টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টিম টাইম নামের একটি প্রোগ্রামে এই মন্দির্টি আবারো খনন করা হয় এবং একই সংস্থা ২০০৩ সালে এটি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাও চালিয়েছিল। বর্তমানে লোহার রেলিং দ্বারা সংরক্ষিত লাল বর্ণের মোজাইক করা একটি পাঁকা রাস্তা এই মন্দিরটিকে চিহ্নিত করা যায়।

একটি প্রাচীন রোমান রাস্তা লন্ডন থেকে বেরিয়ে ডোভার হয়ে ওয়াটলিং স্ট্রিটের মধ্য দিয়ে ব্ল্যাকহেথ পেরিয়ে দক্ষিণ গ্রিনিচে এসে শেষ হয়েছে। এ রাস্তাটি একটি প্রাচীন কেল্টিক রুটের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে যা ক্যান্টারবিউরি থেকে সেইন্ট অ্যালবান্স পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। এই রুটটি অর্থাৎ এই রাস্তাটি থেকে গ্রিনিচে একসময়ে ইন্দো-ইউরোপীয়ান জাতিগোষ্ঠী 'কেল্ট' জাতির আগমনের নমুনা পাওয়া যায়। এরপর ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি ভি-এর রাজত্বকালের শেষের দিকে অর্থাৎ ১৪ শতকের শুরুর দিকে গ্রিনিচ একটি জেলে শহরে পরিণত হয় এবং এখান থেকেই সমুদ্র ও নদী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের জন্য গ্রিনিচ খ্যাতি লাভ করতে শুরু করে।

৮ম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড,ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করতো। সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে ৩,০০০ রূপা দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হন নি। ফলে ইস্টার সানডের যে আটদিন ব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদন্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাঁড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, এক পর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাঁড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাঁড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেইন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়। হক্সমুরের নকশায় সেইন্ট আলফেজ চার্চটি গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয় যা ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। এছাড়াও কয়েকটি ড্যানিশ শিবিরেরও কিছু চিহ্ন ব্ল্যাকহেথের সীমানার নিকটবর্তী ইস্টকম্ব ও ওয়েস্টকম্ব এলাকায় পাওয়া যায় (ব্ল্যাকহেথ গ্রিনিচের রয়্যাল পৌরসভার সীমান্তে অবস্থিত)।

৫ম বা ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যকালে উত্তর জার্মানিতে বিদ্যমান একটি জাতির নাম ছিল নর্স যাদের একটি অংশ ভাইকিংদের সাথে মিলিত হয়ে নরম্যান নামের আরেকটি জাতিসত্ত্বা তৈরী করে। ডুমসডে বইয়ের একটি বর্ণনায় বলা আছে ১০৮২ সালে বেয়াক্সের বিশপ ওডো-এর এলাকায় এই জাতি আক্রমণ করে নিজেদের শাসন স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় কেন্ট প্রদেশের হানড্রেড (এক ধরনের প্রশাসনিক বিভাগকে হানড্রেড বলা হয় যা অনেক দেশেই ঔপনিবেশিক বিভাগ হিসেবে প্রচলিত) বিভাগটি ব্ল্যাকহেথ হানড্রেডে পরিণত হয়ে যায় কারণ ১২ শতকে হানড্রেড আদালতটি এখানে স্থানান্তর করে দেয়া হয়। ইংল্যান্ডের রাজা এডয়ার্ড লংশ্যাংক্স (এডয়ার্ড ১ম বা Edward 1 অর্থাৎ এডওয়ার্ড পরিবারের ১ম বংশধর) -এর আমলের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৩০০ সালের কিছু আগে থেকে ব্ল্যাকহেথে এলথাম প্রাসাদ নামের একটি রাজকীয় প্রাসাদ অবস্থিত ছিল যেখানে প্রায়শই অতিথিদের আমন্ত্রণ করা হতো এবং তাদের জন্য এলাকার ভেতর শিকারেরও ব্যবস্থা ছিল, প্রাসাদটি এখনও এখানে বিদ্যমান।

প্লান্টাজেনেট বংশের রাজাদের আধিপত্যও গ্রিনিচে বিদ্যমান। হেনরি ৪র্থ তার শপথবাক্য গ্রিনিচে পাঠ করেছিলেন, হেনরি ৫ম ইংলিশ মিলিটারি কমান্ডার থমাস বিউফোর্টকে গ্রিনিচের ম্যানোর প্রদান করেছিলেন। হেনরি ৫মের সৎভাই, বৃটিশ রাজকুমার, সৈনিক ও সাহিত্যিক হাম্প্রে ১৪৪৩ সালে গ্রিনিচ প্রাসাদ তৈরী করে, যা হাম্প্রের মৃত্যুর পর হেনরি ৬ষ্ঠ প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ (Palace of Placentia) নামে নামকরণ করেন। এডয়ার্ড ৪র্থ এটিকে আরো বড় করে পুনঃনির্মাণ করেন এবং ১৪৬৬ সালে এ প্রাসাদটি রাণী এলিজাবেথকে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে এই প্রাসাদটি চার্লস ২য়-এর রয়্যাল পর্যবেক্ষণাগার হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং এই প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদই হলো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিনিচ মানমন্দির যার উপর দিয়ে পৃথিবীর মূল মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে।

হেনরি ৭ম থেকে টিউডর রাজবংশের যাত্রা শুরু হয়। প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদটি মূলত হেনরি ৭মের বাসস্থান ছিল এবং এখানেই তার ছেলে হেনরি ৮ম ও এডমন্ড টিউডরের জন্ম হয় ও সেইন্ট আলফেজের চার্চে তাদের খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষালাভ সম্পন্ন হয়। হেনরি গ্রিনিচ প্রাসাদকে এলথাম প্রাসাদ হতে বেশি পছন্দ করতেন এবং ১৫৩০ সালে হোয়াইট-হল প্রাসাদ তৈরী হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লন্ডনে তার প্রধান সিংহাসন ছিল প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ। হেনরি ইংল্যান্ডের দুই রাণী 'ক্যাথারিন অফ অ্যারাগন' ও 'অ্যান অফ ক্লিভস' -কে গ্রিনিচেই বিয়ে করেন এবং তার দুই কন্যা এলিজাবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম -এর জন্মস্থানও গ্রিনিচ। তার ছেলে এডওয়ার্ড ৪র্থ মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই গ্রিনিচেই মৃত্যুবরণ করে। এলিজাবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম, এই দুই বোনই তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই প্রাসাদটিকে ব্যবহার করেছিলেন। ১৫৮৮ সালে ১৩০ টি স্প্যানিশ জাহাজ বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনী নিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমণ করতে যাত্রা করেছিল যাদের একত্রে স্প্যানিশ আর্মাডা নামে অভিহিত করা হয়। এদেরকে প্রতিহত করার জন্য এলিজাবেথ ১ম -এর পরিষদ 'স্প্যানিশ আর্মাডা' নামের একটি ক্যাম্পেইন আয়োজন করে যা প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদে সংগঠিত হয়। এলিজেবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম -এর একটি প্রিয় বেড়ানোর জায়গা ছিল এই প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ যেখানে তারা প্রতিবছর গ্রীষ্মের সময় কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে আসতে ভালোবাসতেন।

টিউডরদের পরে গ্রিনিচে স্থাপিত হয় স্কটল্যান্ড ও বৃটেনের প্রসিদ্ধ রাজবংশ স্টূুয়ার্টদের আমল। গ্রিনিচ প্রাসাদের চূড়ান্ত নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন জেমস ১ম এবং গ্রিনিচের ম্যানোর তার স্ত্রী 'রানী অ্যান অফ ডেনমার্ক' -কে প্রদান করেন। গ্রিনিচের একটি প্রাচীন রয়্যাল রেসিডেন্সের নাম 'কুইন্স হাউস (Queen's House)' এবং অনেক রাজবংশের পরিবার বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে এসে বা প্রাশাসনিক কাজে গ্রিনিচে এসে এই কুইন্স হাউসে থাকতেন। কুইন্স হাউসের ভেতরে একটি ভীষণ সুন্দর ও বিরাট প্যাঁচানো সিঁড়ি রয়েছে যা এর নির্মাণকার্যের জন্য অতি বিখ্যাত। রাণী অ্যান গ্রিনিচ প্রাসাদে এই কুইন্স হাউস একটি অতিরিক্ত অতিথিঘর হিসেবে স্থাপন করেছিলেন যেটি প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদের সর্বশেষ সংস্করণ ছিল এবং রেনেঁসা যুগের প্রথমদিকে স্থাপত্যশৈলীতে বৃটেনের সর্বপ্রথম বিখ্যাত ব্যক্তি ইনিগো জোন্স দ্বারা এর নকশা ও নির্মাণকার্য শুরু করা হয়। এরপর চার্লস ১ম,তার স্ত্রী রাণী হ্যানরিয়েটা মারিয়াকে গ্রিনিচের ম্যানোর প্রদান করে এবং এ রাণীর আমলেই ইনিগো জোন্স গ্রিনিচ প্রাসাদের কুইন্স হাউস নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন। বৃটিশ গৃহযুদ্ধের সময় এ প্রাসাদটিতে একটি বিস্কুট তৈরীর কারখানা চালু হয় ও একই সাথে প্রাসাদটিকে যুদ্ধকালীন বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ সময় রাজা চার্লস ১ম-কে গণসম্মুখে শিরচ্ছেদের (শরীর থেকে মাথা কেটে আলাদা করে ফেলা) মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ১৬৬০ সালে তার ছেলে চার্লস ২য়-এর আগমন ঘটে এবং এর মাধ্যমেই স্টূুয়ার্ট রাজবংশের শাসনের পুনরুদ্ধার ঘটতে শুরু করে। এই সময়টিকে 'ইন্টেরেগনাম' বা বিরতিকাল বলা হয়। ইন্টেরেগনাম সময়কালে প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ এবং এর পার্কটিকে একত্রে এই এলাকার বিভাগীয় প্রধানের ম্যানসনে পরিণত করা হয়।

স্টূুয়ার্ট শাসনের পুনরুদ্ধারের সময়কালকে 'রেস্টোরেশন' বলে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদটির ব্যবহার থেমে যায় এবং পর্যায়ক্রমে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। চার্লস ২য়-এর জন্য নতুন নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা শুরু হয়। এদের মধ্যে একমাত্র 'কিং চার্লস ব্লক' সম্পন্ন করা হয়েছিল, বাকিগুলোর কোনটিই করা হয়নি। রাজা চার্লস ২য়, গ্রিনিচ পার্কের নতুন নকশা তৈরী ও পুনঃনির্মাণ সম্পাদন করেন। এছাড়াও তিনি গ্রিনিচের রয়্যাল অবসার্ভেটোরি (রাজবংশীয় ব্যক্তিত্বদের জন্য গঠিত একটি মানমন্দির) নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করেন। ইংল্যান্ডের রাজা জেমস ২য় যিনি একইসাথে স্কটল্যান্ডেরও রাজা ছিলেন ও স্কটল্যান্ডে তাকে জেমস ৭ম বলে অভিহিত করা হতো, সর্বপ্রথম গ্রিনিচে একটি রয়্যাল নেভাল হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দেন, নাবিকদের জন্য আলাদাভাবে তৈরী একটি বিশেষ হাসপাতাল। তার মেয়ে ম্যারী ২য় দ্বারা এটি স্থাপিত হয়। ম্যারী ২য়-এর স্বামী ও রাজা উইলিয়াম ৩য়-এর তত্ত্বাবধানে ১৬৯৬ সালে এর নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং বৃটিশ স্থপতি নিকোলাস হক্সমুরের তত্ত্বাবধানে এই নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়। রয়্যাল নেভেল হসপিটাল বর্তমানে প্রাচীন রয়্যাল নেভাল কলেজ (Old Royal Naval College) নামে সুপরিচিত।

জার্মানির হ্যানোভার শহর থেকে গ্রেট বৃটেন ও আয়ারল্যান্ডের রাজা জর্জ ১ম, ১৭১৪ সালে গ্রিনিচে আগমন করেন। তার মাধ্যমেই হ্যানোভারিয়ান রাজবংশের সময়কাল শুরু হয়, শুধুমাত্র গ্রিনিচে নয়, বরং হ্যানোভারিয়ান নামক রাজবংশের স্থপতি হলেন এই রাজা জর্জ ১ম। ১৭১৫ সালে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে স্টূুয়ার্ট রাজবংশের শাসন পুনঃস্থাপিত করার জন্য জেমস ফ্রান্সিস এডয়ার্ড স্টূুয়ার্ট দ্বারা বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময়ে জর্জ ১ম-এর উত্তরসূ্রি জর্জ ২য়, যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত এলাকাগুলো জন্য রয়্যাল নেভাল হসপিটালটি উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। জর্জ ৩য় ১৮০৫ সালে গ্রিনিচ কুইন্স হাউসকে অনাথ-এতিমদের জন্য স্থাপিত স্কুল 'রয়্যাল নেভাল অ্যাসাইলাম'-এর কাছে প্রদান করেন। এই স্কুলটি ১৮২১-১৮২৫ সালের মধ্যে গ্রিনিচ হসপিটাল স্কুল (একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল)-এর সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এই সম্পূর্ণ ভবনটিকে ১৮৯২ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া 'রয়্যাল হসপিটাল স্কুল' নামে নামকরণ করেন এবং এটিতে নতুন রুম স্থাপনসহ আরো কিছু সংস্করণ করা হয়। বর্তমানযুগে এটি একটি যাদুঘরে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় ম্যারীটাইম যাদুঘর নামে এটি পরিচিত। জর্জ ৪র্থ এটিতে একটি চিত্র গ্যালারীর জন্য প্রায় ৪০টি চিত্রকর্ম দান করেছিলেন, উইলিয়াম ৪র্থ ও রাণী অ্যাডেলেইডও এই গ্যালারীতে অনেককিছু প্রদান করেছেন ও প্রায়ই এটি দেখতে আসতেন। রাণী 'ম্যারী অফ টেক' বা রাণী ম্যারীও এখানে অনেক ঐতিহাসিক সংগ্রহ প্রদান করেছিলেন। রাজা জর্জ ৬ষ্ঠ এখানে ফাউন্ডেশন স্টোন নামের একটি পাথরের তৈরী ফলক স্থাপন করেন।

রাণী ভিক্টোরিয়া কদাচিৎ অর্থাৎ খুব কমই গ্রিনিচ পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। ১৮৩৮ সালে লন্ডনের সর্বপ্রথম যাত্রীবাহী বাষ্পচালিত ট্রেন চালু হয় এবং এর রেলওয়ে লন্ডন থেকে গ্রিনিচ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল যেটি লন্ডন অ্যান্ড গ্রিনিচ রেলওয়ে নামে পরিচিত। গ্রিনিচ স্টেশনটি অ্যাশবার্নহাম ট্রায়াঙ্গেল নামের একটি সংরক্ষিত আবাসিক এলাকার উত্তরে অবস্থিত, এই আবাসিক এলাকাটি অ্যাশবার্নহাম পদবি বিশিষ্ট একটি পরিবারের মাধ্যমে গঠিত হয় ১৮৩০ থেকে ১৮৭০ সালে। রেলওয়েটির শেষপ্রান্তের বিপরীতদিকে ১৮৬৪ সালে সেফটন পেরি একটি ১,০০০ সিটের মুভি থিয়েটার নির্মাণ করেন, নাম- নিউ গ্রিনিচ থিয়েটার। ১৯৩৭ সালে এ থিয়েটারটিকে ভেঙ্গে ফেলে সেখানে একটি টাউন হল স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এর স্থানে কয়েকটি বড় বড় ভবন তৈরী হয় বর্তমানে যাদেরকে একত্রে 'মেরিডিয়ান হাউস' নামে অভিহিত করা হয়। গ্রিনিচ থিয়েটারটি ভিক্টোরিয়ান মিউজিক হলের ভেতর পুনঃনির্মাণ করা হয়। তবে এই মিউজিক হলটিও পুনঃনির্মিত হয় ১৮৭১ সালে চার্লস ক্রাউডারের মাধ্যমে যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে নানা ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে।

১৯৭৭ সালে রাণী এলিজাবেথ ২য়-এর রাজত্বের ২৫তম বর্ষপূর্তিতে তিনি গ্রিনিচে আমন্ত্রিত হন এবং গ্রিনিচের একটি জাহাজে এ বর্ষপূর্তিতে আয়োজিত একটি নাট্যাভিনয় তাকে প্রদর্শন করা হয়। এছাড়াও প্রাচীন রয়্যাল নেভাল কলেজের ১৫০তম বর্ষপূর্তিতে তিনি এসেছিলেন। তার রাজত্বের ৬০তম বর্ষপূর্তিতে গ্রিনিচ পৌরসভাকে লন্ডনের প্রধান পৌরসভার একটিতে পরিণত করা হয় এবং গ্রিনিচ এই প্রধান পৌরসভাগুলোর মধ্যে ৪র্থ।


ভূগোল[সম্পাদনা]

থেম্‌স নদীর অববাহিকার দক্ষিণদিকের একটি প্রশস্ত প্লাটফর্মের উপর গ্রিনিচ অবস্থিত। গ্রিনিচ ও এর আশেপাশের নদীগুলো বেশ গভীর। গ্রিনিচের দক্ষিণদিকের অঞ্চলটি গ্রিনিচ পার্ক থেকে ব্ল্যাকহেথ পর্যন্ত খাড়াভাবে উপরের দিকে উঠে গেছে যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০ ফিট। এখানকার উচ্চতর এলাকাগুলো এক ধরনের পাথুরে পাললিক মাটির স্তর দ্বারা গঠিত। এই মাটিকে ব্ল্যাকহেথ বেড বলা হয়। দক্ষিণ-পূর্বদিকের বেশিরভাগ এলাকা এই ব্ল্যাকহেথ বেড দিয়ে গঠিত, বিশেষত চক পাথরের তৈরী পাহাড়গুলো যাদেরকে 'চক আউটকর্প (chalk outcrop)' বলা হয়, এদের প্রত্যেকেই ব্ল্যাকহেথ বেড দিয়ে গঠিত। নদীর নিকটবর্তী এলাকাগুলোর মাটিও ব্ল্যাকহেথ বেড দিয়ে গঠিত তবে এ মাটিগুলো অনেক বেশি বালু ও কাদামাটিযুক্ত।

গ্রিনিচের পশ্চিমদিকে থেম্‌স নদীর শাখা নদী ডেপ্তফোর্ড ক্রিক(Deptford Creek) ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ডেপ্তফোর্ড(Deptford, লন্ডনের একটি জায়গা) অবস্থিত। গ্রিনিচের পূর্বদিকে ব্ল্যাকহেথের ওয়েস্টকম্ব পার্ক এলাকার আবাসিক এলাকা, উত্তরে থেম্‌স নদী এবং দক্ষিণে ব্ল্যাকহেথ ও A2(এ-টু, দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের একটি অন্যতম প্রধান রাস্তা) বিদ্যমান। দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের একটি জেলার নাম 'গ্রিনিচ পেনিনসুলা' যাকে উত্তর গ্রিনিচও বলা হয়ে থাকে। এই এলাকাটি থেকে গ্রিনিচের প্রধান চিত্রটি দেখা সম্ভব, যা মূলত উত্তর-পূর্ব গ্রিনিচ থেকে গ্রিনিচ টাউন সেন্টার পর্যন্ত এলাকাটিকে প্রদর্শন করে। গ্রিনিচের আশেপাশের এলাকাগুলো হলো- ব্ল্যাকহেথ, চার্লটন, ডেপ্তফোর্ড, গ্রিনিচ পেনিনসুলা, এলথাম, কিডব্রূুক, লিউইসহাম, নিউ ক্রস, প্লামস্টেড, শুটার্স হিল, সারে কেইস, থেম্স‌মেড, ওয়েস্টকম্ব পার্ক, উলউইচ, ওয়েলিং, ফ্যালকন-উড, অ্যাবি-উড। এরা প্রত্যকেই উত্ত-পূর্ব লন্ডনে অবস্থিত। এদের মধ্যে কয়েকটি জেলা, কয়েকটি জায়গা বা শহর, শুধুমাত্র ওয়েস্টকম্ব পার্ক ও সারে কেইস হলো আবাসিক এলাকা বা পাড়া। গ্রিনিচ এই শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ও সর্বাধিক জনপ্রিয়।


আবহাওয়া[সম্পাদনা]

গ্রিনিচ মূলত শীতপ্রধান এলাকা। মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এখানকার তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। বাকি সময় এখানে ২ থেকে ১০ বা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় থাকে। গ্রিনিচের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা ১৯১১ সালের আগস্ট মাসের তাপমাত্রা ছিল এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা্র রেকর্ড -১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।


দর্শনীয় স্থানসমূহ[সম্পাদনা]

গ্রিনিচ নদী ও সমুদ্রপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িত। এখনো এখানকার সংস্কৃতি ও অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ হলো এই নদী। এই ইতিহাস ও গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে গ্রিনিচের কিছু ঐতিহাসিক জাহাজ এর নদীঘাটে রাখা আছে। 'দ্য কাটি সার্ক' নামের একটি ১৯ শতকের বাণিজ্যিক জাহাজ গ্রিনিচ নদীঘাটে এখনও বিদ্যমান, ২০০৭ সালের একটি মারাত্নক অগ্নিকান্ডে জাহাজটি খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাই বর্তমানে ঘাটের একটি অধিক সুরক্ষিত জেটিতে এটিকে রাখা হয়েছে এবং জাহাজটি গ্রিনিচের দর্শনার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও 'জিপসি মথ ৪' নামের একটি ৫৪ ফিটের জাহাজ এখানে অনেক বছর ধরে রাখা ছিল যা বিখ্যাত বৃটিশ নাবিক স্যার ফ্রান্সিস চার্লস চিচেস্টার ব্যবহার করতেন, জাহাজটি ২০০৭ সালে সরিয়ে ফেলা হয়। জোসেফ রেনে বেলোট নামের একজন সুপরিচিত আর্কটিক অভিযাত্রীর স্মরণে গ্রিনিচ হসপিটাল অর্থাৎ প্রাচীন নেভাল কলেজের উত্তর-পশ্চিমে একটি স্মৃতিসৌধও এখানে বিদ্যমান। কাটি সার্ক জাহাজটি যেখানে রাখা আছে সেটিকে প্রায়ই কাটি সার্ক এলাকা নামে অভিহিত করা হয়। এই এলাকাটির কাছে গ্রিনিচের সার্কুলার বিল্ডিং বিদ্যমান এবং এ বিল্ডিংটির প্রবেশপথটি থেম্স‌ নদীর নীচে নির্মিত একটি টানেল থেকে শুরু হয় যাকে 'গ্রিনিচ ফুট টানেল' বলে। বিল্ডিংটি গোলাকৃতির হওয়ায় একে সার্কুলার অর্থাৎ চক্রাকার বিল্ডিং বলা হয়। এর টনেলটি গ্রিনিচকে থেম্স‌ নদীর উত্তরাংশের সাথে যুক্ত করে এবং টনেলটির উত্তরদিকের শেষপ্রান্ত থেকে গ্রিনিচ হসপিটালের বিখ্যাত দৃশ্যটি দেখা যায়।

গ্রিনিচে প্রতিবছর নৌকা চালনার একটি প্রতিযোগীতা হয় যা মূলত নৌকাবাইচের মতো একটি অনুষ্ঠান, একে 'গ্রেট রিভার রেস (Great River Race)' বলে। থেম্স‌ নদীর যে অংশটিতে জোয়ারের জল প্রবেশ করে সে জায়াগাটিকে থেম্স‌ টাইডওয়ে বলা হয়। এই থেম্স‌ টাইডওয়ে হয়ে কাটি সার্কের এলাকাতে এসে এ রিভার রেস শেষ হয়। গ্রিনিচের ক্রেন স্ট্রিটে কারলিউ ও গ্লোব নামের দু'টি নৌচালনার ক্লাবও রয়েছে। এছাড়াও পিয়ার ট্রি ওয়ার্ফ এলাকায়, যেখানে এক সময়ে লন্ডনের কয়লা পরিবহন ও গ্যাস উত্তোলনের সাথে জড়িত ছিল, সেখানে এরকম আরেকটি ক্লাব বিদ্যমান যার নাম 'দ্য ইয়ট ক্লাব', বাইচ খেলার জন্য ব্যবহৃত এক ধরনের নৌকা 'ইয়ট' থেকে এই নামকরণ করা হয়েছে।

এক সময়ে গ্রিনিচের প্রধান অর্থনীতি ছিল এর জলপথের বাণিজ্য। গ্রিনিচের এই জলপ্রধান বাণিজ্যকাল বা যুগটিকে ম্যারীটাইম (Maritime) বলা হয়। প্রাচীন নেভাল কলেজ এই ম্যারীটাইমে প্রতিষ্ঠিত সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম বলে ধারণা করা হয়। এই কলেজটি গ্রিনিচ হসপিটাল থেকে আগত এবং গ্রিনিচ হসপিটালের মূল নকশাটি তৈরি করেছিলেন স্যার ক্রিস্টোফার রেন, এজন্য এই কলেজটিকে স্যার ক্রিস্টোফার রেনের মাস্টারপিস বলা হয়। এর ভবনগুলোর কয়েকটি গ্রিনিচ ইউনিভার্সিটির অধীনে রয়েছে, চার্লস ব্লকের ভবনটি ট্রিনিটি কলেজ অফ মিউজিক (Trinity College of Music) এর আওতায় বিদ্যমান। নেভাল কলেজের কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গার মধ্যে রয়েছে- কলেজের বিশাল ডাইনিং রুম, দ্য পেইন্টেড হল, সেইন্ট পিটার ও সেইন্ট পল চ্যাপেল ইত্যাদি। পেইন্টেড হলটি মূলত একটি হলরুম এবং এই সম্পূর্ণ হলটির সকল দেয়ালজুড়ে চিত্রকর্ম আঁকা রয়েছে। এই সম্পূর্ণ অঙ্কন ঐতিহাসিক বৃটিশ আঁকিয়ে জেমস থর্নহিল দ্বারা সম্পাদিত। সেইন্ট পিটার ও সেইন্ট পল চ্যাপেল (Chapel of Saint Peter and Saint Paul)-এর ভেতরের অংশটির ডিজাইন অর্থাৎ ইন্টেরিয়োর ডিজাইনটি অপূর্ব সুন্দর যা জেমস অ্যাথেনিয়ান স্টূুয়ার্ট নামের একজন সুপরিচিত স্কটিশ আর্টিস্ট সম্পন্ন করেছেন। নেভাল কলেজে একটি পারমাণবিক চুল্লিও ছিল যার নাম ছিল জ্যাসন পারমাণবিক চুল্লি। এটি 'রাজা উইলিয়াম বিল্ডিং'-এ ১৯৬২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। ১৯৯৯ সালে এটিকে বাতিল করে সরিয়ে ফেলা হয়। কলেজটির ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর বিশেষত্বের কারণে ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো থেকে কলেজটিকে 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট'-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় (ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট একটি তালিকা বা সনদ যেখানে বিশ্বের সকল প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অর্থাৎ মানুষ দ্বারা নির্মিত বিশেষ বিশেষ জায়গা, স্থাপনা, মূর্তি, চিত্রকর্ম ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এদেরকে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ও আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে ঘোষণা দেয়া হয়, এক কথায় যেকোন দেশের অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যেকোন কিছুকেই ইউনেস্কো এই তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে)।

নেভাল কলেজ ও গ্রিনিচ পার্কের পশ্চিমে গ্রিনিচ শহরের কেন্দ্রস্থল অর্থাৎ শহরটির মূল কেন্দ্র অবস্থিত। এ এলাকাটিকে গ্রিনিচ টাউন সেন্টার বলা হয়। এখানকার বেশিরভাগ বাড়ি-ঘরে জর্জিয়ান ও ভিক্টোরিয়ান আমলের স্থাপত্যশৈলীর প্রাধান্য বিদ্যমান। এখান থেকে একটি একমুখী রাস্তা গ্রিনিচ মার্কেট ও গ্রিনিচ সিনেমা থিয়েটারের দিকে চলে গিয়েছে। টাউন সেন্টারের উপরের পাহাড়গুলোতে জর্জিয়ান আমলের বেশ কিছু স্থাপনা বিদ্যমান যাদের মধ্যে ক্রূুম্‌স পাহাড়ে অবস্থিত ফ্যান মিউজিয়াম উল্লেখযোগ্য। এই মিউজিয়ামটি বিশ্বের সর্বপ্রথম হাতপাখা যাদুঘর যেটি শুধুমাত্র অসংখ্য ধরনের হাতপাখা, দেশ ও সময়ভেদে তৈরি বিভিন্ন হাতপাখা ইত্যাদি নিয়ে গঠিত। নেভাডা স্ট্রিটের সাথে সংযুক্ত ক্রূুম্‌স পাহাড়ের জাংকশনের নিকটে গ্রিনিচ থিয়েটার অবস্থিত। গ্রিনিচে 'দ্য গ্রিনিচ প্লে-হাউস' নামের একটি নাট্যশালাও ছিল যা ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে টাউন সেন্টারে বিদ্যমান সকল বিল্ডিং-এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো ট্রিনিটি হসপিটাল অনাথআশ্রমের ভবনটি যা ১৬১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নেভাল কলেজের পূর্বদিকে অবস্থিত। এর ঠিক পাশেই অবস্থিত 'গ্রিনিচ পাওয়ার স্টেশন' যা ১৯০২ থেকে ১৯১০ সালের মাঝে নির্মিত হয়। এটি এক সময় লন্ডনের ট্রাম ব্যবস্থাপনাগুলোতে কয়লা সরবরাহ করতো। বর্তমানে এটি লন্ডনের ভূ-গর্ভস্থ টানেলগুলোতে অর্থাৎ আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলগুলোতে ব্যাক-আপ স্টেশন হিসেবে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে। ইস্ট গ্রিনিচ গ্যাস ওয়ার্ক্‌স (East Greenwich Gas Works) কোম্পানি দ্বারা লন্ডনের সর্বশেষ গ্যাস উত্তোলনকার্য সম্পাদন করা হয় যা গ্রিনিচ পৌরসভার একটি জেলা পেনিনসুলাতে সংঘটিত হয়।

গ্রিনিচের পেনিনসুলাতে 'O₂ (ওটু)' নামের একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন রয়েছে। এটি মূলত অর্ধবৃত্তের মতো দেখতে একটি ভবন। ওটু গ্রিনিচের একটি বিনোদনকেন্দ্র যেখানে মিউজিক ক্লাব, বার, রেস্টূু্রেন্ট, মুভি থিয়েটার, প্রদর্শনী গ্যালারী, পিয়াজেস(Piazzas) নামক এক ধরনের পাবলিক স্পেস, এমনকি একটি অ্যারেনা (ছোট স্টেডিয়াম আকৃতির একটি স্থান যা গান বা সিনেমার পরিবেশনা কিংবা কোন খেলার আয়োজন করতে ব্যবহার করা হয়) পর্যন্ত বিদ্যমান। ওটুর আরেক নাম মিলেনিয়াম ডোম কারণ মিলেনিয়াম অর্থাৎ একশ বছর পূর্তীতে আয়োজিত অসংখ্য উৎসব এখানে সম্পাদিত হয়। এর নির্মাণকার্য ১৯৯৭ সালে শুরু হয় যা ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে সম্পন্ন হয়েছিল। গ্রিনিচে 'এন্ডারবাইস ওয়ার্ফ' নামের একটি এলাকায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাব-মেরিন ক্যাবল উৎপাদন করা হয়।

১৪ শতকে গ্রিনিচে একটি মার্কেট স্থাপিত হয়। এরপর ১৭০০ সালে লর্ড হেনরির আদেশ অনুযায়ী গ্রিনিচে আরো একটি মার্কেট স্থাপন করা হয়, এই মার্কেটটিই বর্তমানে গ্রিনিচে বিদ্যমান। এটি জাতীয় ম্যারীটাইম যাদুঘর ও রয়্যাল অবসার্ভেটোরির নিকটে অবস্থিত। বৃটিশ আর্কিটেক্ট জোসেফ কে-এর নির্দেশনায় ১৮২৭ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে মার্কেটের আশেপাশের বাড়িগুলো নির্মিত হয়। ১৯০২ থেকে ১৯০৮ সালের মাঝে মার্কেটটিতে একটি ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা নতুন করে নির্মাণ করা হয় ২০১৬ সালে। এছাড়াও ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ সালে, ১৯৮০ সালে, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে বেশ কিছু উন্নয়ন সম্পন্ন করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের শেষের দিকে সূচিত কোভিড-১৯ রোগের মহামারীর সময়ে মার্কেটের স্টলগুলোর ভাড়া ৬০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয় কারণ মার্কেটের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সপ্তাহে মাত্র চারদিন মার্কেট খোলা রাখার আদেশের কারণে এর উপার্জনও অনেক বেশি কমে যেতে শুরু করেছিল। এ মার্কেটটিও গ্রিনিচের দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে অন্যতম।

গ্রিনিচের কুইন্স হাউসের দক্ষিণদিকে ১৮৩ একরের একটি পার্ক বিদ্যমান যেটির নাম গ্রিনিচ পার্ক বা রয়্যাল পার্ক। প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদের শিকারের জন্য ব্যবহৃত বিশাল মাঠটিকে ১৭ শতকে এই পার্কে পরিণত করা হয়। পার্কটির যে প্রান্তটি ব্ল্যাকহেথের কাছে গিয়ে শেষ হয়, সেখানকার ঠিক উপরের পাহাড়ে জেমস ওল্‌ফ-এর একটি মূর্তি বিদ্যমান, যিনি একজন বৃটিশ আর্মি অফিসার এবং কানাডার কুয়েবেক প্রদেশ আক্রমণ অভিযানের কমান্ডার ছিলেন। পার্কটির আশেপাশে অবস্থিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়্যাল অবসার্ভেটোরি, প্রাইম মেরিডিয়ান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বৈশ্বিক সময় নির্ধারণে গ্রিনিচ মানমন্দির ও এই রয়্যাল অবসার্ভেটোরি এক সময় ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে দু'টোই বন্ধ করে দেয়া হয়। গ্রিনিচে বর্তমানে আর কোন জ্যোতির্বিদ্যার মানমন্দির চালু নেই, তবে রয়্যাল অবসার্ভেটোরির ভবনটির ছাদের উপরে অবস্থিত একটি বৃহৎ তীরের মাঝে একটি বড় লাল বর্ণের বল তীরটির একদম শীর্ষে গাঁথা আছে যা এখনো ঠিক দুপুর একটার সময় তীরটি বেয়ে তীরের একদম নীচে নেমে আসে। প্রাচীনকালে এর মাধ্যমে দুপুর ১টার সময়টি নির্ধারণ করা হতো, রয়্যাল অবসার্ভেটোরি এখন বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু এর কার্যকারিতা এখনো সম্পূর্ণরুপে বিদ্যমান।

রয়্যাল অবসার্ভেটোরির কাছে একটি যাদুঘর বিদ্যমান। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দিকনির্দেশনার যন্ত্রপাতি নিয়ে গঠিত, বিশেষত বিখ্যাত বৃটিশ কার্পেন্টার জন হ্যারিসনের নির্মিত মেরিন ক্রোনমিটার এখানে বিদ্যমান। জর্জিয়ান আমলে নির্মিত একটি জনপ্রিয় ম্যানসন 'দ্য রেঞ্জার্স হাউস (The Ranger's House)' যা গ্রিনিচ পার্কের শেষ মাথায় ব্ল্যাকহেথে অবস্থিত। এ ম্যানসনটিতে জার্মান আর্কিটেক্ট রেনহার ভন ব্রাউনের অসংখ্য শিল্পকর্ম রয়েছে, এছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর বাড়ি এই ম্যানসনের অন্তর্ভুক্ত যাদের মাঝে মেজ পাহাড়ের দিকে অবস্থিত ভ্যানবার্গ্‌স হাউস (Vanbrugh's house) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ বৃটেনের সুপরিচিত আর্কিটেক্ট স্যার জন ভ্যানবার্গ্‌স দ্বারা এটি নির্মিত।

গ্রিনিচের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আরো একটি জায়গা হলো গ্রিনিচ টাউন সেন্টার থেকে ১ মাইল দূরে পূর্ব গ্রিনিচে অবস্থিত মিলেনিয়াম লেইজার পার্ক (Millennium Leisure Park)। এখানে কিছু ছোট রেস্টূুরেন্ট যেমন, আইকিয়া(IKEA) ও বি-অ্যান্ড-কিউ(B&Q) এবং ওডিয়োন সিনেমা থিয়েটার রয়েছে। এখান থেকে আরো পূর্বে আধা মাইল দূরে চার্লটন জেলায় গ্রিনিচ শপিং পার্ক বিদ্যমান। পূর্ব গ্রিনিচে আরেকটি ছোট পার্ক রয়েছে যার নাম ইস্ট গ্রিনিচ প্লেজেন্স(East Greenwich Pleasaunce)। এই জায়গাটিকে একসময় গ্রিনিচ হসপিটালের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তবে বর্তমানে জায়গাটি ইস্ট গ্রিনিচ প্লেজেন্স নামেই সকলের কাছে পরিচিত।


বৈশ্বিক সময় নির্ণয়ে গ্রিনিচ[সম্পাদনা]

পৃথিবী বিষুবরেখা, মধ্যরেখা ইত্যাদি বিভিন্ন রেখা দ্বারা বিভক্ত। এই রেখাগুলো পৃথিবীকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে এবং এদের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো দেশের অবস্থান, সময়, আবহাওয়া ইত্যাদি জানা সম্ভব। এই রেখাগুলোর মধ্যে পৃথিবীর মূল অর্থাৎ প্রধান মধ্যরেখাটি গিয়েছে ঠিক গ্রিনিচের উপর দিয়ে। গ্রিনিচের প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ পৃথিবীর একদম মূল মধ্যরেখায় অবস্থিত। এ কারণে গ্রিনিচের সময়ের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর সকল দেশের সময় নির্ণয় করা যায়। প্রাচিনকালে এটি আবিষ্কার করার পর গ্রিনিচের সময়কে 'সময় নির্ণয়ের প্রতীক' বলে আখ্যায়িত করা হয় যাকে ইংরেজিতে বলা হয় গ্রিনিচ মিন টাইম(Greenwich Mean Time) বা জিএমটি(GMT)। মোবাইল ফোনের ওয়ার্ল্ড ক্লকে প্রায়ই (GMT) শব্দটি দেখা যায় যা Greenwich Mean Time-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি দ্বারা গ্রিনিচের সময়ের উপর ভিত্তি করে নির্ণিত কোন নির্দিষ্ট দেশের সময়কে বোঝানো হয়। প্রাচীনকালে গ্রিনিচের সময় নির্ণয় করা হতো এর রয়্যাল অবসার্ভেটোরির মাধ্যমে এবং গ্রিনিচের সময়কে সোলার টাইম বা সৌরসময়ও বলা হয় কারণ সেসময় সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করেই কোন জায়গার সময় বের করা হতো। বর্তমান সময়ে যুক্তরাজ্যের এলাকাগুলোতে GMT-এর পাশাপাশি ইউটিসি(UTC)-ও ব্যবহার করা হয় যা সমন্বিত আন্তর্জাতিক সময় (Coordinated Universal Time)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ এবং এই ব্যবস্থায় নির্ণিত সময়ে GMT-এর সাথে মাত্র ০.৯ সেকেন্ডের কমবেশি থাকতে পারে। বৃটেনের বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, রয়্যাল নেভি, দ্য মেট অফিস ইত্যাদি সংস্থার পাশাপাশি অনেকগুলো প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে UTC ব্যবহার করা হয়। এটিকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক সময় বা Universal Time (UT) এবং কখনো কখনো 'জুলু টাইম(Zulu time)'-ও বলা হয়ে থাকে।

প্রাচীনকালে বৃটিশ নাবিকেরা সবসময় একটি করে GMT ব্যবস্থা সম্পন্ন ক্রোনমিটার রাখতেন যাতে করে গ্রিনিচ থেকে তাদের দ্রাঘিমা অর্থাৎ গ্রিনিচ থেকে কোনদিকে(উত্তর/দক্ষিণ/পূর্ব/পশ্চিম) এবং কতদূরে তারা অবস্থিত তা নির্ণয় করা যায়। যেহেতু গ্রিনিচ পৃথিবীর মূল মধ্যরেখায় অবস্থিত তাই এর দ্রাঘিমা হলো ০ ডিগ্রি, একারণে গ্রিনিচ থেকে জাহাজের দুরত্ব নির্ণয় করা নাবিকদের জন্য সহজ হতো এবং এর মাধ্যমে জাহাজের অবস্থানও সহজেই জানা যেতো। এর ফলে ধীরে ধীরে GMT ব্যবস্থা সম্পন্ন ক্রোনমিটারের ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে যেতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে এটি আন্তর্জাতিকভাবে ভীষণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। শুরুর দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন টাইম জোনে GMT-এর মাধ্যমে সেখানকার নির্দিষ্ট সময়, এক ঘন্টা ও আধা ঘন্টা (যেমন, ২টো বেজে আধা ঘন্টা অর্থাৎ আড়াইটা, তিনটা বেজে আধা ঘন্টা বা সাড়ে তিনটা) বের করা যেতো এবং দুরত্বের জন্য গ্রিনিচ থেকে কতখানি সামনে বা পেছনে ("ahead of GMT" or "behind GMT") এই পরিমাপগুলো ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে ডিজিটাল ক্যালকুলেশন ব্যবস্থায় অতি সহজেই GMT থেকে সময় এর করে ফেলা যায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাথে গ্রিনিচ জড়িত থাকায়, ১৯৮০ সালে আবিষ্কৃত 'গ্রহাণু ২৮৩০(Asteroid 2830)'-কে 'গ্রিনিচ' নামটি প্রদান করা হয়।


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. টেমপ্লেট:OED
  2. Roach, Peter; Setter, Jane; Esling, John, সম্পাদকগণ (২০১১)। Cambridge English Pronouncing Dictionary (David Jones) (18th সংস্করণ)। Cambridge: Cambridge University Press।