গোর্গো, স্পার্টার রানী
গোর্গো ( গ্রিক: Γοργώ [ɡorɡɔ͜ɔ́] ; ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ছিলেন স্পার্টার রাজা লিওনিডাস প্রথম (শাসনকাল- ৪৮৯-৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) -এর স্ত্রী। গোর্গো রাজা লিওনিডাসের সৎ ভাই এবং স্পার্টার রাজা (খ্রিস্টপূর্ব ৫২০-৪৯০) ক্লিওমেনেস প্রথমের কন্যা এবং তার একমাত্র উত্তরাধীকারীনি ছিলেন। [১] গোর্গো রাজা লিওনিডাস প্রথমের একমাত্র পুত্র রাজা প্লাইস্টারকাসের মা। [২] বিখ্যাত গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের রচনায় তার উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন সূত্রে গোর্গোকে বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ নারীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। [৩][৪] তার জন্মতারিখ নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, হেরোডোটাসের বিবরণ অনুযায়ী ধারণা করা হয় যে, তার জন্ম আনুমানিক ৫১৮ থেকে ৫০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ঘটেছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন][ তথ্যসূত্র প্রয়োজন ]
প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা
[সম্পাদনা]হেরোডোটাসের তথ্য অনুযায়ী, গোর্গো ছিলেন স্পার্টার রাজা প্রথম ক্লিওমেনেসের একমাত্র সন্তান। দ্য হিস্টোরিজ বইতে তার প্রাথমিক জীবনের বর্ননা পাওয়া যায়। হিস্টোরজের এক উপাখ্যান অনুসারে, আয়োনিয়ান বিদ্রোহের পর অ্যারিস্টাগোরাস স্পার্টায় আসেন এবং রাজা ক্লিওমেনেসকে পারস্য সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেন। অ্যারিস্টাগোরাস পারস্য সাম্রাজ্য কর্তৃক আনাতোলিয়ার আয়োনীয়দের উপর হওয়া অপমানের কথা জানান এবং পারস্য সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদের গল্পও ক্লিওমেনেসকে বলেন।[৫] তবে যখন ক্লিওমেনেস জানতে পারেন যে এশিয়ায় পৌঁছাতে তিন মাস সময় লাগবে তখন তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে স্পার্টানরা এমন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করতে পারবেনা।[৬]
কিন্তু সে রাতেই অ্যারিস্টাগোরাস ক্লিওমেনেসের বাসায় এসে তাকে ঘুষ দিয়ে তার প্রস্তাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। সেই সময় গোর্গোর বয়স ছিল মাত্র আট বা নয় বছর। হেরোডোটাসের মতে, অ্যারিস্টাগোরাসের ঘুষ সম্পর্কে গোর্গো তার বাবাকে সতর্ক করেন এবং সুপরামর্শ দেন। ক্লিওমেনেস তার কন্যার পরামর্শ শোনেন এবং অ্যারিস্টাগোরাস স্পার্টা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।[৭]
স্পার্টান নারীদের প্রধান দায়িত্ব ছিল শক্তিশালী সন্তান জন্ম দেওয়া। এজন্য গোর্গো তার সমবয়সী পুরুষদের ন্যায় শারীরিক শিক্ষায় অংশ নেন। [৮] তিনি দৌড়, চাকতি ও বর্শা নিক্ষেপ এবং কুস্তির মতো খেলাধুলা শিখেছিলেন এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন।[৯] স্পার্টান সমাজে বিশ্বাস ছিল, যদি বাবা-মা উভয়ই শারীরিকভাবে শক্তিশালী হন, তবে সন্তানও শক্তিশালী হবে।[৮]
শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি, গোর্গো পুঁথিবাদী শিক্ষাও গ্রহণ করেন। অভিজাত বংশের নারী হওয়ার দৌলতে তিনি পড়া-লেখা শেখার সুযোগ পান। তিনি সংগীত, নৃত্য ও কবিতা রচনায় দক্ষতা লাভ করেছিলেন। স্পার্টার নারীদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরুষদের সমান বা কখনো কখনো তাদের থেকেও উন্নত ছিল।[৯] এই শারীরিক ও মানসিক শিক্ষার কারণে গোর্গো সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। প্লুটার্ক একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেখানে একজন বিদেশি নারী গোর্গোকে অভিযোগের সুরে একবার বলেছিলেন যে, তোমরা স্পার্টার নারীরা পুরুষদের শাসন করো। উত্তরে গোর্গো বলেন, হ্যাঁ, কারণ আমরাই একমাত্র পুরুষদের জন্ম দি। [১০]
বিবাহ এবং রাজত্ব
[সম্পাদনা]৪৮৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্লিওমেনিসের মৃত্যুর পর, গোর্গোকে তার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত করা হয়। ৪৯০ সালের মধ্যে তার সৎ কাকা লিওনিডাস প্রথমের সাথে তার বিবাহ হয়। [৪] স্পার্টান রাজাদের কন্যা এবং স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও গোর্গোকে রানী হিসেবে বিবেচনা করা যেত না, কারণ স্পার্টার রাজকীয় নারীরা সাধারণত সমাজে সেরকম বিশেষ কোন ভূমিকা পালন করতেন না। গ্রীক নারীদের বর্ণনা করার জন্য রাণী উপাধি হেলেনিস্টিক যুগের শেষের দিকে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তবে স্পার্টান রাজনীতিতে গোর্গোর বিশেষ কর্তৃত্ব এবং প্রভাব ছিল। [৯]
যুক্তিসঙ্গতভাবে, গোর্গোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য আক্রমণের আগে। হেরোডোটাসের হিস্টোরিজ অনুসারে পারস্যের দরবারে নির্বাসিত ডেমারাটাস তার নিজ দেশ স্পার্টায়, পারস্য সম্রাট জেরক্সেসের আসন্ন আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক বার্তা প্রেরন করার চেষ্টা করেন। বার্তাটি যাতে পারস্য বা তাদের অনুগত রাজ্যদের হাতে না পড়ে, এজন্য ডেমারেটাস একটি কাঠের ফলকে বার্তা লিখে তার ওপর মোম দিয়ে ঢেকে দেন। ফলে ফলকটি দেখতে সাধারণ এবং ফাঁকা মনে হয়েছিল। স্পার্টানরা কী করবে বুঝতে পারছিল না, তখন গোর্গো পরামর্শ দেন ফলকের মোম পরিষ্কার করতে। তার পরামর্শ অনুযায়ী মোম পরিষ্কার করা হলে বার্তাটি দৃষ্টিগোচর হয়ে ওঠে। [১১] ডেভিড কাহান তার দ্য কোডব্রেকার্স গ্রন্থে গোর্গোকে বিশ্বের প্রথম মহিলা গুপ্তবার্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।[১২]
ইতিহাসবিদ এবং ঔপন্যাসিক হেলেনা পি. শ্র্যাডার অনুমান করেন যে ম্যারাথনের যুদ্ধের পর এবং থার্মোপাইলের যুদ্ধের আগে, লিওনিডাস প্রথম গ্রীক জোটের সমন্বয় সাধনের জন্য অন্যান্য নগর-রাজ্যে ভ্রমণ করছিলেন এবং তিনি গোর্গোকে তার সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সময় গোর্গো তার বিখ্যাত মন্তব্যটি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। মূলত এই দেশ পরিভ্রমন কালেই তিনি এক অ্যাথেনিয়ান নারীকে বলেছিলেন যে, স্পার্টান নারীরাই একমাত্র গ্রীক নারী যারা পুরুষদের জন্ম দেন। [১৩]
প্লুটার্কের বর্ননা অনুযায়ী থার্মোপাইলে যুদ্ধের আগে, গোর্গো তার স্বামী লিওনিডাসকে জিজ্ঞেস করেন যে, লিওনিডাসের মৃত্যুর পর তিনি কি করবেন। লিওনিডাস উত্তরে বলেন, ভাল একজন পুরুষকে বিয়ে কোরো, যে তোমাকে ভালোবাসবে, তার সন্তানের মা হবে এবং সুন্দর জীবন যাপন করবে। [১৪]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Herodotus, The Histories, Book 5, chapter 48, section 1"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ Rahe, Paul Anthony (১৯৯৪)। Republics Ancient and Modern। UNC Press Books। পৃ. ৩১৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০৭৮-৪৪৭৩-১।
- ↑ Herodotus (২০০৭)। The Landmark Herodotus: The Histories। Pantheon Books। পৃ. ৭৩৫–৭৩৬। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩০৭-৫৩৬৫৪-৯। ওসিএলসি 464268448।
- 1 2 Lightman, Marjorie (২০০৮)। A to Z of Ancient Greek and Roman Women (English ভাষায়)। Facts on File, Inc.। পৃ. ১৪৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০৮১৬০৬৭১০৭।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক) - ↑ Herodotus। The Histories। Book 5, chapter 49। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- ↑ Herodotus। The Histories। Book 5, chapter 50। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- ↑ Herodotus। The Histories। Book 5, chapter 51। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- 1 2 Xenophon। Constitution of the Lacedaimonians। chapter 1, section 4। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- 1 2 3 Pomeroy, Sarah B. (২০০২)। Spartan Women। Oxford University Press। পৃ. ৪–১৯। আইএসবিএন ০-১৯-৫১৩০৬৬-৯। ওসিএলসি 716513737।
- ↑ Plutarch। Lycurgus। chapter 14, section 4। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- ↑ Herodotus। The Histories। Book 7, chapter 239। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২১ – Perseus Digital Library এর মাধ্যমে।
- ↑ Kahn, David (১৯৯৬)। The Codebreakers: The Story of Secret Writing (English ভাষায়)। Scribner। পৃ. ৮২। আইএসবিএন ০-৬৮৪-৮৩১৩০-৯।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক) - ↑ "Leonidas and Gorgo of Sparta – Spartan Queen Gorgo"। sparta-leonidas-gorgo.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২১।
- ↑ Roberts, Andrew (১ নভেম্বর ২০০৮)। The Art of War: Great Commanders of the Ancient and Medieval Worlds 1600 BC – AD 1600। Quercus। পৃ. ৮৩।