গোপাল ভাঁড়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গোপাল ভাঁড়
Statue of Gopal Bhar 01.jpg
গোপাল ভাঁড়ের মূর্তি
জন্মগোপাল চন্দ্র প্রামাণিক
কৃষ্ণনগর, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
মৃত্যুনদিয়া, ভারত
ধর্মহিন্দুধর্ম
পেশারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এর রাজসভার রম্য গল্পকার ভাঁড় ও মনোরঞ্জনকারী

গোপাল ভাঁড় ছিলেন মধ্যযুগে নদিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত রম্য গল্পকার, ভাঁড় ও মনোরঞ্জনকারী।[১] তাঁর আসল নাম গোপাল চন্দ্র প্রামাণিক। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন।[২] তিনি ছিলেন সৎ ও বুদ্ধিমান। তিনি ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী। তার অসামান্য অবদানের জন্য রাজা ও তার রাণী উভয়েই তাকে পছন্দ করতেন। বুদ্ধি ও সৎসাহস থাকার কারণে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে তাঁর সভাসদদের মধ্যকার নবরত্নদের একজন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই আমলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদের সামনে নির্মিত তাঁর একটি ভাস্কর্য এখনো সেখানে অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর পৌরসভার সীমানায় ঘূর্ণীতে গোপাল ভাঁড়ের নতুন মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। তবে গোপাল ভাঁড়ের নাম ইতিহাসের কোথাও উল্লেখ নেই। তার অস্তিত্ব আদৌ ছিল কিনা এই বিষয়ে কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারে নি। অনেকে ধারণা করেন যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় গোপাল ভাঁড় নামক একজন বুদ্ধিমান ব্যাক্তি ছিলেন যে সর্বদা রাজাকে সুপরামর্শ দিতেন এবং তার কল্যাণের কথা চিন্তা করতেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র যখন বাংলার নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে কাজ করতে আরম্ভ করেন, তখন গোপাল ভাঁড় রাজাকে উক্ত কাজ করতে নিষেধ করেন। এজন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র গোপাল ভাঁড়কে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীতে নদীয়ায় অর্থাৎ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ্যে তাকে আর কেউ দেখতে পায় নি।

গল্প[সম্পাদনা]

প্রায় দুইশত বছরেরও অধিক আবহমানকাল ধরে প্রচলিত তার জীবন-রস সমৃদ্ধ গল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গবাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে, লোককথায় এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে। কতগুলি গল্প প্রায় প্রবাদের ন্যায় ব্যবহৃত হয়। তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিনবীরবলের সমতুল্য হিসাবে পরিগণনা করা হয়।

ইতিহাস ও বিতর্ক[সম্পাদনা]

গোপাল ভাঁড় চরিত্রটি ঐতিহাসিক, গবেষক ও ভাষাবিদদের কাছে বিতর্কের বিষয় বহুকাল থেকে। গোপালের গল্পগুলি সমাজে চূড়ান্ত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত হলেও গোপাল ভাঁড় বাস্তবে ছিলেন কিনা সে নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকেই মনে করেন গোপাল ভাঁড় নামে কেউ নির্দিষ্ট করে ছিলেননা। তবে কোনো না কোনো বিদূষক রাজার প্রিয়পাত্র হন। সেরকম গোপাল নাম্নী নাপিত বংশীয় কোনো ব্যক্তি ছিলেন। গোপালের জন্ম কত বঙ্গাব্দে তা কোথাও লেখা নেই। তার জন্মস্থানের পক্ষেও কোনো নথি নেই, কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার সম্পত্তির কিংবা জায়গা-জমির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। গোপালের বাবার নাম জানা গেলেও তার মা ও স্ত্রী সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। নগেন্দ্রনাথ দাসের মতে গোপালের পদবী ছিল 'নাই'। মহারাজ তাকে হাস্যার্ণব উপাধী দান করেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন বলেছেন ‘গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির কৌতূহল থাকার ফলে বাস্তব অথবা কল্পিত ব্যক্তিটির সম্পর্কে যে জনশ্রুতি জাতীয় ঐতিহ্য গজিয়ে উঠেছে ও উঠছে তার বীজ হচ্ছে ভাঁড় নামের অংশটি, গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়টুকু সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারের ‘ভাণ্ড’-জাত মনে করে অনেক গোপালের জাতি নির্ণয় করেছেন। পক্ষের ও বিপক্ষের যুক্তি যাই হোক, গোপাল ভাঁড় বাঙালি রসিক ও লৌকিক সংস্কৃতিতে অমলিন হয়ে আছেন। [৩]

বর্তমান যুগে গোপাল ভাঁড়[সম্পাদনা]

  • গোপাল ভাঁড়ের জীবনীকে কেন্দ্র করে সনি আট টিভিতে গোপাল ভাঁড় নামে একটি এনিমেশন কার্টুন নির্মিত হয়ে প্রচারিত হচ্ছে।
  • 'স্টার জলসা' চ্যানেলে গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হয়েছিল।
  • এছাড়া বিভিন্ন সময় গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সিরাজুল ইসলাম (২০১২)। "গোপাল ভাঁড়"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  2. Siegel, Lee (1987). Laughing Matters: Comic Tradition in India. University of Chicago Press, United States. আইএসবিএন ০-২২৬-৭৫৬৯১-২. pp. 314-318.
  3. শোয়েব সর্বনাম (১৩ মে ২০১৬)। "গোপাল ভাঁড়ের খোঁজে"। দৈনিক ইত্তেফাক। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০১৭ 

অধিক পঠন[সম্পাদনা]