গাড়োয়ান
গাড়োয়ান বা গাড়িয়াল পেশাজীবীরা গরু বা মহিষের গাড়ি চালনা করে থাকেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই গরু ও মহিষের গাড়ি দিয়ে মালামাল পরিবহণ ও যাতায়াতের প্রয়োজন মেটানো হতো।[১]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মানবসভ্যতা গড়ে ওঠে সিন্ধু নদের তীরে। মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা সভ্যতায় গরুর গাড়ির ব্যবহার ছিল বলে মনে করেন ঐতিহাসিকেরা। অবশ্য ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালার একটা গুহায় পৃথিবীতে গরুর গাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা পাওয়া যায়। সেখানকার দেয়ালচিত্রে গরুর গাড়ির ছবি আছে। ঐতিহাসিকদের ধারণা, এ দেয়ালচিত্র ব্রোঞ্জযুগে, অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০ বছর আগে আঁকা।
৫০০ বছর আগে সম্রাট বাবর উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিরাট অঞ্চল দখল করে পা বাড়িয়েছেন ভারতবর্ষের দিকে। তৎকালীন দিল্লির সম্রাট ইব্রাহিম লোদির আমলে ভারতবর্ষ আক্রমণের সাহস তখন বিশ্বের অনেক হাঁকডাকওয়ালা সম্রাটেরও ছিল না। কিন্তু বাবরের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল ভারতবর্ষ দখল করার। ইরানের বাদশাহর সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে তিনি বাবরকে দিয়েছিলেন পৃথিবীর প্রথম মারণাস্ত্র কামান। অনেক বড় আর বিশাল ভারী কামানগুলো বহন করা হতো গরুর গাড়িতে। বাবর কামান নিয়ে হাজির হলেন সিন্ধু নদের তীরে পানিপথ নামক জায়গায়। নদীর অপর পাড়ে বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ইব্রাহিম লোদী। সেই বাহিনীর তুলনায় বাবরের বাহিনী অনেক ছোট ছিল। কিন্তু বাবরের গরুর গাড়ি থেকে কামান ছোড়া হলে প্রথম আঘাতেই ধরাশায়ী হোন ইব্রাহিম লোদী। কামান আর বলদে টানা গরুর গাড়ি দিয়ে মাত্র মিনিট বিশেকের যুদ্ধে বাবর ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম প্রতাপশালী সম্রাটের মসনদ। ষাঁড়ে টানা সেই কামানবাহী গাড়িগুলোই মধ্যযুগের যুদ্ধ ময়দানে আতঙ্ক সৃষ্টি করত প্রতিপক্ষ শিবিরে।[২]
সামাজিক অবস্থান
[সম্পাদনা]বর্তনামে ধনী ব্যক্তিরা আধুনিক কলের গাড়ি হাঁকিয়ে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তেমনি ১৮ শতকে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গরু-মহিষের গাড়ি হাঁকিয়ে চলতে একই রকম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে গাড়োয়ানের বেশ কদর ছিল এবং গাড়োয়ানরা বিশ্বস্ত হতো। তাদের পরনে চমৎকার ও নান্দনিক লুঙ্গি বা ধুতি, গায়ে গেঞ্জি, মাথায় গামছা বাঁধা, কোমরে ট্যামর বা ট্যাওরে লম্বা চেইনযুক্ত পাঁচটারা ম্যাচ লাইট ও বিড়ির প্যাকেট গোঁজা থাকতো।[১]
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। বিছিন্নভাবে এখনো কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর গাড়ি ব্যবহার করা হয়। তবে এখন এই পেশা প্রায় বিলুপ্তির পথে।[২]
শিল্প ও সাহিত্য
[সম্পাদনা]
বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবিতা-উপন্যাসে ও শিল্পে অলংকরণ হয়ে আছে গরুর গাড়ি বা গাড়িয়াল। গাড়ি ও গাড়োয়ান নিয়ে একাধিক সিনেমা, নাটক আর গানও তৈরি হয়েছে। গাড়িয়ালরা গাড়ি চালাতে চালাতে ভাওয়াইয়া গান গাইতো। গাড়িয়ালের প্রেম-বিরহের কথা সংখ্য গানে ফুটে উঠেছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি গান হচ্ছে:[১]
"ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চায়ারে।
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মর ছুইরা রয় রে,
ওকি গাড়িয়াল ভাই-"
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত ছবি ‘দ্য স্ট্রাগল’-এর মূল বিষয় গরুর গাড়ি। বর্ষাকালে ষাঁড় প্রায়ই গাড়ি রাস্তায় কাদায় নেমে পড়লে তখন গাড়োয়ান গাড়ির চাকায় ঠেলে কাদা থেকে গাড়ি তোলার চেষ্টা করেন। সেই ছবিই ফুটে উঠেছে ‘দ্য স্ট্রাগল’-এ।[২]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 শেকড় (২০২২)। গাড়োয়ান। রাজশাহী: শাহ্ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও জাদুঘর। পৃ. ৬০–৬৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৩৫-৩১০৮-৭।
- 1 2 3 গাফফার, আবদুল (১৫ এপ্রিল ২০২২)। "ওকি গাড়িয়াল ভাই..."। কিশোর আলো। সংগ্রহের তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।