গল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

গল বলতে প্রাচীনকালে পশ্চিম ইউরোপে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়, যেটি পূর্বে রাইন নদীআল্পস পর্বতমালা, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরপিরেনিজ পর্বতমালা, এবং পশ্চিমে ও উত্তরে আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে বেষ্টিত ছিল। বর্তমানকালে এর বেশির ভাগ অংশ নিয়ে ফ্রান্স রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাচীন গল[সম্পাদনা]

খ্রিস্টপূর্ব ১১১০ থেকে ১৫০ অব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন কেল্টীয় জাতি গল অঞ্চলে বাস করত। গল ছিল সেসময় প্রায় ৯০টি গোষ্ঠীর বাসভূমি। বৃহৎ সামন্তদের নিয়ে গঠিত একটি অভিজাত শ্রেণী পুরোহিতদের (যাদেরকে druide বলা হত) সাহায্য নিয়ে দেশ পরিচালনা করত। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে গল অঞ্চলে নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল।

রোমান প্রদেশ প্রোভিঙ্কিয়ার প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

ইতালি উপদ্বীপে বাসরত রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক নাগাদ গলের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলটিকে গাল্লিয়া ত্রান্সাল্পিনা (Gallia Transalpina, "আল্পসের ওপারের গল") নামে ডাকা শুরু করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তারা আল্পস পর্বতমালার দক্ষিণে অবস্থিত উত্তর ইতালি অঞ্চলকে ডাকত গাল্লিয়া সিসাল্পিনা (Gallia Cisalpina, "আল্পসের এপারের গল" ) নামে।

ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত গল অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্ব অংশটিতে (বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্স ও উত্তর-পূর্ব ইতালি) কেল্টীয়রা ছাড়াও গ্রিক ও ফিনিসীয় জাতির লোকেরা বাস করত। তারা মাসিলিয়া (বর্তমান ফ্রান্সের মার্সেই) বন্দরটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। গলের কেল্টীয় ও লিগুয়ারীয় জাতিরা মাসিলিয়ার গ্রিকদেরকে আক্রমণ করা শুরু করলে তারা সেখানে রোমানদের হস্তক্ষেপ কামনা করে। ১২৫-১২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানরা এই অঞ্চলটিতে অভিযান চালায় এবং এখানে রোমান সাম্রাজ্যের অধীন প্রদেশ প্রোভিঙ্কিয়া (Provincia) প্রতিষ্ঠা করে, যার রাজধানী ছিল নার্বন শহর।

রোমান অভিযানের পূর্বে গল[সম্পাদনা]

খ্রিস্টপূর্ব ৫৪ অব্দে গল অঞ্চল

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের লেখা কোম্মেনতারি দে বেল্লো গাল্লিকো (Commentarii de Bello Gallico "গলের যুদ্ধসমূহের বর্ণনা") নামের বই থেকে জানতে পারা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৬০ অব্দ নাগাদ গল অঞ্চলটি দুইটি অংশ নিয়ে গঠিত ছিল।

একটি ছিল দক্ষিণ-পূর্বে রোমান-শাসিত প্রোভিঙ্কিয়া নোস্ত্রা (Provincia Nostra "আমাদের প্রদেশ"), বা সংক্ষেপে কেবল প্রোভিঙ্কিয়া (Provincia)।

অন্যদিকে উত্তর-পূর্বে মার্ন ও সেন নদীর উত্তরে অবস্থিত বেলগাই (Belgae) নামক জার্মান-কেল্টীয় মিশ্র জাতির অধিকৃত অংশ (বর্তমান বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণভাগ যেখানে অবস্থিত), মধ্যভাগে বিরাট এলাকা জুড়ে অবস্থিত কেল্টীয় জাতি-অধ্যুষিত গল ও দক্ষিণ-পশ্চিমে গারন ও লোয়ার নদীর দক্ষিণে আকুইতানি (Aquitani) জাতির লোকের অধিকৃত অংশ - এই তিনটি অঞ্চল ছিল রোমান শাসনের বাইরে; এদেরকে একত্রে গাল্লিয়া কোমাতা (Gallia Comata, "লম্বা চুলওয়ালা গল") ডাকা হত। তবে এই তিনটি অঞ্চলের মধ্যে কোন স্বাভাবিক সংহতি ছিল না; তাদের রীতিনীতিতে অনেক পার্থক্য ছিল।

রোমানদের গল বিজয়[সম্পাদনা]

৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার সমগ্র গল অঞ্চলটি দখলের জন্য অভিযান শুরু করেন। এ ব্যাপারে তিনি স্থানীয় কিছু গলীয় গোষ্ঠীর সহায়তা পান এবং প্রায় সমগ্র গল অঞ্চল দখল করে ফেলেন। কিন্তু আর্ভের্নি গোত্রের লোকেরা রোমানদেরকে প্রতিহত করতে থাকে। ৫২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেজিয়াতে আর্ভের্নিদের শেষ নেতা ভেরসাঁজেতোরিক্সের পতন ঘটে। ৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সমগ্র গল রোমানদের অধীনে আসে।

গলের সংস্কৃতির রোমানীকরণ[সম্পাদনা]

রোমান সাম্রাজ্যে গলের চারটি প্রদেশের অবস্থান

২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানরা গল অঞ্চলকে চারটি প্রদেশে ভাগ করে:

  • গাল্লিয়া নারবোনেনসিস (Gallia Narbonensis, প্রাচীন Provincia প্রোভিঙ্কিয়া), যার রাজধানী ছিল নার্বো মার্তিউস (Narbo Martius, বর্তমান ফ্রান্সের নার্বন শহর)।
  • গাল্লিয়া লুগদুনেনসিস (Gallia Lugdunensis), যার রাজধানী ছিল লুগুনদুম (Lugundum, বর্তমান ফ্রান্সের লিয়োঁ শহর)।
  • গাল্লিয়া আকুইতানিয়া (Gallia Aquitania) এবং
  • গাল্লিয়া বেলগিকা (Gallia Belgica)

খ্রিস্টীয় ১ম থেকে ৩য় শতকে রোমানদের অধীনে গল অঞ্চলে বিস্তৃত সড়কব্যবস্থা গড়ে ওঠে, কৃষিকাজের জন্য বনজঙ্গল সাফ করা হয় এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশার লোক নিয়ে গঠিত শিল্পের বিকাশ ঘটে, এবং এর ফলে গলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটে। এসময় গলের স্থানীয় কেল্টীয় উপভাষাগুলির জায়গায় লাতিন ও তার অপভ্রংশগুলি প্রচলিত হতে শুরু করে। একই সময়ে গলের পুরোহিত ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। গলের অধিবাসীরা রোমানদের সভ্যতা, আচার ও কৃষ্টি পুরোদমে গ্রহণ শুরু করে। এখনও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন রণক্ষেত্র, সেতু, বাসভবন, থিয়েটার, ইত্যাদিতে রোমানদের সভ্যতার এই প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

জার্মান জাতিদের আক্রমণ এবং রোমান গলের পতন[সম্পাদনা]

খ্রিস্টীয় ৩য় শতকে জার্মান জাতিগুলি রোমান গল অঞ্চলে আক্রমণ করা শুরু করে। ৪৮১-৫১১ খ্রিস্টাব্দের সময় জার্মানীয় ফ্রাংক জাতির রাজা ক্লোভিস সর্বশেষ রোমান কর্মকর্তা সিয়াগ্রিউসকে পরাজিত করে সমগ্র গল অঞ্চলটি বিজয় করেন এবং পুরো গলের ভৌগোলিক সীমানা জুড়ে একতা প্রতিষ্ঠা করেন। ক্লোভিসকে ফ্রান্সের প্রথম রাজা বলা হয়। তিনি যে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন, তার নাম ছিল মেরোভিঙ্গীয় রাজবংশ (ক্লোভিসের পিতামহের নামে)। ইতিহাসের এই পর্যায়ে গলের অবসান ঘটে এবং এটি বৃহত্তর ফ্রাংকীয় সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশে পরিণত হয়। ৮ম শতকে মেরোভিঙ্গীয় রাজবংশের পতন ঘটে।

ফ্রাঙ্কীয় সাম্রাজ্যের বিভাজন ও ফ্রান্সের উদ্ভব[সম্পাদনা]

৮৪৩ সালে ভের্দুন-এর চুক্তিতে ফ্রাঙ্কীয় সাম্রাজ্যকে প্রথমে তিন ভাগে এবং শেষ পর্যন্ত দুই ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। এগুলির নাম ছিল পশ্চিম ফ্রাংকরাজ্য (Francia Occidentalis) ও পূর্ব ফ্রাংকরাজ্য (Francia Orientalis)। পূর্ব ফ্রাংকরাজ্যের শাসকেরা ফ্রাংকীয় সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করতে চাইছিলেন। তারা পূর্ব ফ্রাংকরাজ্য নাম বর্জন করেন এবং তাদের রাজ্যের নাম দেন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য। কিন্তু পশ্চিম ফ্রাংকরাজ্যের শাসকেরা এটা মেনে নেননি এবং পশ্চিম ফ্রাংকরাজ্যকে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য থেকে পৃথক ও স্বাধীন একটি রাজ্য হিসেবে রক্ষা করেন। ১২১৪ সালে বুভিনের যুদ্ধে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম ফ্রাংকরাজ্য তথা বর্তমান ফ্রান্স অঞ্চল দখলের প্রচেষ্টার অবসান হয়।

যেহেতু পূর্ব ফ্রাংকরাজ্য বলে আর কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না, সেকারণে পশ্চিম ফ্রাঙ্করাজ্যের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে কেবল "ফ্রান্সিয়া" বলে ডাকা শুরু করে। বর্তমান ফ্রান্স রাষ্ট্রটি তাই পশ্চিম ফ্রাংকরাজ্য হিসেবেই ৮৪৩ সালে যাত্রা শুরু করেছিল।