গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্ম ১৮৪১
কলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু ১৬ মে, ১৮৬৯
কলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
পেশা সংগীতজ্ঞ, নাট্যব্যক্তিত্ব, জাতীয়তাবাদী

গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি সংগীতজ্ঞ ও নাট্যব্যক্তিত্ব। তিনি জাতীয়তাবাদী ধারায় সাহিত্য রচনা করতেন। গণেন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রদের অন্যতম এবং হিন্দু মেলার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক।[১][২]

পরিবার[সম্পাদনা]

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছিল তিনটি পুত্র - দেবেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ। গিরীন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ অকালেই প্রয়াত হন। নগেন্দ্রনাথ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।[৩] কিন্তু গিরীন্দ্রনাথের সন্তানাদি হয়। গণেন্দ্রনাথ ছিলেন গিরীন্দ্রনাথ ও স্বীয় পত্নী যোগমায়া দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। গণেন্দ্রনাথও নগেন্দ্রনাথের মতো নিঃসন্তান অবস্থায় অকালে মারা যান। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা গুণেন্দ্রনাথের পুত্রকন্যারা হলেন - গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিনয়িনী দেবী ও সুনয়নী দেবী।[৪]

তাঁরা জোড়াসাঁকো ভদ্রাসনের 'বৈঠকখানা বাড়ি'তে বসবাস করতেন। এই বাড়িটি বর্তমানে অবলুপ্ত।[৫] গণেন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রনাথের থেকে ছোটো ও সত্যেন্দ্রনাথের থেকে বড়ো ছিলেন। তাই ঠাকুরবাড়িতে তাঁর ভ্রাতৃস্থানীয়েরা তাঁকে 'মেজদাদা' বলে ডাকতেন।[৬]

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

গণেন্দ্রনাথ হিন্দু স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষা চালু করেন। এই পরীক্ষাতে তিনি ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

গণেন্দ্রনাথ উৎসাহী লেখক ছিলেন। ১৮৬৯ সালে তিনি কালিদাসের বিক্রমোর্বশীয় বাংলায় অনুবাদ করেন।[২] তিনি ব্রহ্মসংগীত ও দেশাত্মোবোধক গানও লিখতেন।[১] ২০০৭ সালে প্রকাশিত একটি কমপ্যাক্ট ডিস্কে সুবিনয় রায়ের কণ্ঠে তাঁর "গাও হে তাঁহারি নাম" ব্রহ্মসংগীতটি রেকর্ডকৃত হয়।[৭] গবেষিকা চিত্রা দেব লিখেছেন, "অন্যান্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর তুলনায় এই গোষ্ঠী (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তানাদি) ও তাঁদের জ্ঞাতিভ্রাতারা (গণেন্দ্রনাথ ও গুণেন্দ্রনাথ) বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবপ্রবাহিত ধারাটিকে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।[৮]

জোড়াসাঁকো নাট্যশালা[সম্পাদনা]

গণেন্দ্রনাথ নাটকের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি ১৮৬৫ সালে কলকাতায় স্বগৃহে জোড়াসাঁকো নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করেন। এই বছরই এই নাট্যশালায় অভিনীত হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী নাটকটি। কিশোর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই নাটকে অহল্যাদেবীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।[৬] প্রথম দিকে পুরুষেরা মহিলাদের ভূমিকায় অভিনয় করলেও, পরের দিকে বাড়ির মহিলারা আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের সামনে নাট্যাভিনয় শুরু করেন।[৮]

সেই সময় বাংলা ভাষায় ভাল নাটকের সংখ্যা কম ছিল। গণেন্দ্রনাথ ভাল সামাজিক নাটক লেখার জন্য একটি পুরস্কারের ঘোষণা করেন। রামনারায়ণ তর্কালঙ্কারের নবনাটক প্রথম পুরস্কার জয় করে। গণেন্দ্রনাথ তাঁকে ২০০ টাকা পুরস্কার দেন ও নাটকটির ১০০০ কপি মুদ্রণের খরচ বহনে সম্মত হন।[১][৯] অক্ষয় মজুমদার, সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অন্যান্যরা নাটকটি মঞ্চস্থ করেন।[১০]

হিন্দু মেলা[সম্পাদনা]

১৮৬৭ সালে দেশাত্মবোধের প্রসার ও দেশীয় শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতার উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসুনবগোপাল মিত্রের সহায়তায় গণেন্দ্রনাথ হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। গণেন্দ্রনাথই ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "এই সম্মেলন সাধারণ ধর্মীয় কার্যকলাপের জন্য নয়, কোনো প্রকার আমোদ-আহ্লাদের জন্যও নয়, এটি দেশের জন্য, এটি মাতৃভূমির জন্য।"[১][৬][১১] আরেকটি ভাষণে তিনি বলেন, "ভারতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হল আমরা অন্যের থেকে আমদানিকৃত জিনিস নিয়েই গর্ববোধ করি। খুবই লজ্জার কথা। আমরা কী মানুষ নই? তাই মেলার অন্যতম লক্ষ্য হল দেশের আত্মনির্ভরতার চেতনাটির প্রসার ঘটানো।"[১২]

গণেন্দ্রনাথের "লজ্জায় ভারতযশ গাইবো কী করে" গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং হিন্দু মেলায় বহুবার গীত হয়।[১৩]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Sengupta, Subodh Chandra and Bose, Anjali (editors), 1976/1998, Sansad Bangali Charitabhidhan (Biographical dictionary) Vol I, (বাংলা), p. 127, আইএসবিএন ৮১-৮৫৬২৬-৬৫-০
  2. Islam, Sirajul। "Gagendranath Tagore"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৪ 
  3. Bannerjee, Hiranmay, Thakurbarir Katha, (বাংলা), p.52 , Sishu Sahitya Sansad.
  4. Bannerjee, Hiranmay, family chart on p. 225.
  5. Bannerjee, Hiranmay, p. 6.
  6. Bannerjee, Hiranmay, pp. 103-104.
  7. "Gaao Hey Taahaari Naam"Subinoy Roy। Inreco। আসল থেকে ২০০৭-১০-০৯-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৪ 
  8. Deb, Chitra, Jorasanko and the Thakur Family, in Calcutta, the Living City, Vol I, edited by Sukanta Chaudhuri, pp. 65-66, Oxford University Press, আইএসবিএন ০-১৯-৫৬৩৬৯৬-১
  9. Bannerjee, Hiranmay, p. 219.
  10. Mukhopadhyay, Ganesh। "Theatre Stage"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৪ 
  11. "The Tagores and society"। Rabindra Bharati University। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৪ 
  12. Sastri, Sivanath, Ramtanu Lahiri O Tatkalin Banga Samaj {Bn icon}, 1903/2001, p. 151, New Age Publishers Pvt. Ltd.
  13. Goswami, Karunamaya। "Music"। amrakajon.org। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৪