গঙ্গা খাল
| গঙ্গা খাল | |
|---|---|
| Ganges Canal | |
হরিদ্বারে গঙ্গা খালের প্রধান হেডওয়ার্কস | |
| অবস্থান | উত্তরাখণ্ড ও উত্তর প্রদেশ, ভারত |
| স্থানাঙ্ক | ২৯°৫৭′৩০″ উত্তর ৭৮°১০′০০″ পূর্ব / ২৯.৯৫৮৩৩° উত্তর ৭৮.১৬৬৬৭° পূর্ব |
| ধরন | সেচ খাল ব্যবস্থা |
| স্থানীয় নাম | गंगा नहर |
| ব্যুৎপত্তি | গঙ্গা নদী থেকে |
| যার অংশ | গঙ্গা নদী অববাহিকা |
| প্রাথমিক অন্তর্প্রবাহ | গঙ্গা নদী |
| প্রাথমিক বহিঃপ্রবাহ | যমুনা নদী অববাহিকা |
| অববাহিকার দেশসমূহ | ভারত |
| পরিচালনা সংস্থা | উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড সেচ বিভাগ |
| নির্মিত | ১৮৪২–১৮৫৪ |
| নির্মাণ প্রকৌশলী | প্রোবি কটলি |
| সর্বাধিক দৈর্ঘ্য | ২৭২ মাইল (৪৩৮ কিলোমিটার) |
| জনবসতি | হরিদ্বার, রুড়কি, আলিগড়, কানপুর |
| প্রাতিষ্ঠানিক নাম | উচ্চ গঙ্গা নদী |
| মনোনীত | ৮ নভেম্বর ২০০৫ |
| সূত্র নং | 1575 |

গঙ্গা খাল হলো একটি খাল ব্যবস্থা যা ভারতের গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলে সেচ প্রদান করে।
খালটি মূলত সেচের উদ্দেশ্যে নির্মিত হলেও এর কিছু অংশ নৌপরিবহণের কাজেও ব্যবহৃত হতো, বিশেষত নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের জন্য। বিভিন্ন জলপ্রপাত বা উচ্চতার পার্থক্য অতিক্রম করে নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে এই ব্যবস্থায় লক-গেটযুক্ত পৃথক নৌপথও নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৮৪২ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে নির্মিত মূল উচ্চ গঙ্গা খালের প্রাথমিক জলপ্রবাহক্ষমতা ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৬,০০০ ঘনফুট (১৭০ ঘনমিটার)। পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে এর সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বর্তমান জলপ্রবাহক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১০,৫০০ ঘনফুট (২৯৫ ঘনমিটার) করা হয়েছে। সমগ্র ব্যবস্থায় ২৭২ মাইল দীর্ঘ প্রধান খাল এবং প্রায় ৪,০০০ মাইল দীর্ঘ জলবণ্টন খাল রয়েছে। এই খাল ব্যবস্থা উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের ১০টি জেলায় প্রায় ৯,০০০ বর্গকিলোমিটার উর্বর কৃষিজমিতে সেচের জল সরবরাহ করে। বর্তমানে এই দুই রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষিসমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি গঙ্গা খাল, এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সেচ দফতর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি আদায়ের মাধ্যমে খালটির রক্ষণাবেক্ষণ করে।
খালের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে, যেগুলি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকলে মোট প্রায় ৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই কেন্দ্রগুলি নির্গাজিনি, চিতৌরা, সালাওয়া, ভোলা, জানি, জাউলি এবং দাসনায় অবস্থিত।<ref>
কাঠামো
[সম্পাদনা]

প্রশাসনিকভাবে খালটি দুটি ভাগে বিভক্ত: হরিদ্বার থেকে আলিগড় পর্যন্ত বিস্তৃত উচ্চ গঙ্গা খাল (কিছু শাখাসহ) এবং আলিগড়ের নিচের বেশ কয়েকটি শাখা নিয়ে গঠিত নিম্ন গঙ্গা খাল।
উচ্চ গঙ্গা খাল
[সম্পাদনা]উচ্চ গঙ্গা খালই মূল ও প্রাচীন গঙ্গা খাল। এটি হরিদ্বারে হর কি পৌড়ির নিকটে অবস্থিত ভীমগোদা ব্যারাজ থেকে শুরু হয়ে রুড়কি, পুরকাজি, সারধানা (মীরাট জেলা), মুরাদনগর, দাসনা, বুলন্দশহর, খুর্জা, হারদুয়াগঞ্জ অতিক্রম করে আলিগড় জেলার আকরাবাদের নিকট নানাউ পর্যন্ত বিস্তৃত। নানাউয়ে এসে এটি কানপুর শাখা এবং ইটাওয়া শাখায় বিভক্ত হয়েছে।
নিম্ন গঙ্গা খাল
[সম্পাদনা]বুলন্দশহর জেলার নারোরায় অবস্থিত চৌধুরী চরণ সিং ব্যারাজ থেকে উৎপন্ন একটি খাল নানাউ (আলিগড় জেলা) থেকে ৪৮ কিলোমিটার নিম্নপ্রবাহে এসে এই খাল ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর এটি সেঙ্গার নদী ও সেরসা নদী অতিক্রম করে ফিরোজাবাদ জেলার শিকোহাবাদ হয়ে ভোগনীপুর শাখায় পরিণত হয়েছে, যা ১৮৮০ সালে চালু হয়। মৈনপুরী জেলার জেরা গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই শাখাটি ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কানপুর পর্যন্ত বিস্তৃত।
৬৪ কিলোমিটার স্থানে অবস্থিত বালরাই এস্কেপ অতিরিক্ত জলকে ৬.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খালের মাধ্যমে খাদাঞ্চল অতিক্রম করে যমুনা নদীতে নিষ্কাশন করে। এই শাখার অধীনে ৩৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতরণ খাল রয়েছে।
ভোগনীপুর শাখা, কানপুর শাখা এবং ইটাওয়া শাখা—এই তিনটিকে একত্রে নিম্ন গঙ্গা খাল নামে অভিহিত করা হয়। নানাউ থেকে নারোরা-উৎপন্ন সংযোগ খালের মিলনস্থল পর্যন্ত পুরোনো কানপুর ও ইটাওয়া শাখার পূর্ববর্তী খালগুলিকে স্টাম্পস (stumps) বলা হয়। নিম্ন গঙ্গা খাল ব্যবস্থায় জল সরবরাহ কমে গেলে কেবল তখনই এই পুরোনো খালগুলি ব্যবহার করা হয়।[১]
প্রধান খালটি আইআইটি কানপুর ক্যাম্পাসের পেছন দিয়ে কানপুর অতিক্রম করার পর একাধিক শাখায় বিভক্ত হয়েছে। এর একটি শাখা জে. কে. মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কানপুর জল সংস্থানের (Kanpur Jal Sansthan) কাছে শেষ হয়েছে।
ইতিহাস
[সম্পাদনা]

১৮৩৭–৩৮ সালের ভয়াবহ আগ্রা দুর্ভিক্ষর পর একটি সেচব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ত্রাণকার্যে প্রায় এক কোটি রুপি ব্যয় হওয়ায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্বে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। এই খাল নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন কর্নেল প্রোবি কটলি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল নির্মাণ করা সম্ভব। যদিও তাঁর প্রকল্পটি আর্থিকসহ নানা আপত্তি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছিল, কটলি হাল ছাড়েননি। তিনি ছয় মাস ধরে পায়ে হেঁটে ও ঘোড়ায় চড়ে এলাকাজুড়ে জরিপ চালিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাপ সংগ্রহ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রকল্পটির অর্থায়নে সম্মত করাতে সক্ষম হন।
১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে খননকাজ শুরু হয়।[২] কটলিকে নির্মাণের জন্য নিজস্ব ইট, ইটভাটা এবং গাঁথুনির মশলা প্রস্তুত করতে হয়েছিল। প্রথমদিকে হরিদ্বারের হিন্দু পুরোহিতেরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, পবিত্র গঙ্গা নদীর জল বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া হবে। কটলি তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে বাঁধে একটি ফাঁক রাখা হবে, যার মাধ্যমে নদীর জল অবাধে প্রবাহিত হতে পারবে। পাশাপাশি তিনি নদীতীরবর্তী স্নানঘাটগুলির সংস্কারের দায়িত্বও নেন। শুভ সূচনার দেবতা ভগবান গণেশ-এর পূজার মাধ্যমে তিনি বাঁধের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেন।
নির্মাণকালে বহু প্রকৌশলগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পাহাড়ি জলধারা, যা খালের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছিল। রুড়কি-র কাছে ভূমির উচ্চতা হঠাৎ কমে যাওয়ায় কটলিকে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জলসেতু নির্মাণ করতে হয়, যাতে খালটি সেই অংশ অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে রুড়কিতে খালটি মূল নদীর স্তর থেকে প্রায় ২৫ মিটার উঁচু দিয়ে প্রবাহিত হয়।
১৮৫৪ সালের ৮ এপ্রিল খালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।[২] সে সময় এর প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৪৮ মাইল (৫৬০ কিলোমিটার), শাখা খালের দৈর্ঘ্য ৩০৬ মাইল (৪৯২ কিলোমিটার) এবং বিভিন্ন উপশাখার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ছিল ৩,০০০ মাইল (৪,৮০০ কিলোমিটার)-এরও বেশি। ১৮৫৫ সালের মে মাসে[২] সেচ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ৫,০০০টি গ্রামের ৭,৬৭,০০০ একর (৩,১০০ বর্গকিলোমিটার)-এরও বেশি কৃষিজমি সেচের আওতায় আসে।
১৮৭৭ সালে নিম্ন দোয়াব অঞ্চলের সমগ্র খালব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। নরৌরা থেকে জলপ্রবাহ সরবরাহকারী একটি চ্যানেলের সাহায্যে নিম্ন গঙ্গা খাল ইটাওয়ার ঘর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে সম্প্রসারিত করা হয় এবং তা ভোগনিপুর শাখায় পরিণত হয়। ১৯০০ সালের দিকে, ১৯০৭ সালের নাটল এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে, সমগ্র খালব্যবস্থার মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৩,৭০০ মাইল (৬,০০০ কিলোমিটার), যার মধ্যে ৫০০ মাইল (৮০০ কিলোমিটার) নৌচলাচলের উপযোগী ছিল। এই খাল নির্মাণের ফলেই ভারতে প্রথম প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রুড়কির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, রুরকি) প্রতিষ্ঠিত হয়।[৩][৪]
- গঙ্গা খাল।
- মূল অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সেই একই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেতুটির অপর পাশ থেকে তোলা ছবি।
- খালের উপর একটি জলকল।
- খালের ১৫০ বছরের পুরোনো লকগুলো।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- Cautley, Proby T. (১৮৬০)। Report of the Ganges Canal Works from their Commencement Until the Opening of the Canal in 1854। Smith, Elder।
- Cautley, Proby T. (১৮৬৪)। Ganges Canal: a disquisition on the heads of the Ganges and Jumna canals, North-Western Provinces, in reply to strictures by Major-General Sir Arthur Cotton।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "District Gazetter: Etawah (UP), Chapter IV: Agriculture and Irrigation"। Describes the canal works in central UP under the fifth plan
- 1 2 3 Upper Ganges Canal ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে Imperial Gazetteer of India, খণ্ড ১২, পৃ. ১৩৮।
- ↑ "History, Indian Institute of Technology Roorkee"। IIT Roorkee Website। IIT Roorkee। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জুলাই ২০১৩।
- ↑ Account of Roorkee College, Agra: Secundra Orphan Press, ১৮৫১, ওএল 7157290M