খারিয়া জনগণ
ঐতিহ্যবাহী পোশাকে খারিয়া নারীরা | |
| মোট জনসংখ্যা | |
|---|---|
| ৪৮২,৭৫৪ (২০১১)[১] | |
| উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল | |
| ওড়িশা | ২,২২,৮৪৪[১] |
| ঝাড়খন্ড | ১,৯৬,১৩৫[১] |
| ছত্তিশগড় | ৪৯,০৩২[১] |
| বিহার | ১১,৫৬৯[১] |
| মধ্যপ্রদেশ | ২,৪২৯[১] |
| ত্রিপুরা | ১,৪০৯[২] |
| ভাষা | |
| ধর্ম | |
| খ্রিস্টান ধর্ম, হিন্দুধর্ম, সরনা ধর্ম[৩][৪] | |
| সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী | |
| অন্যান্য মুন্ডা জনগোষ্ঠী | |
খারিয়া বা খড়িয়া হলো অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠী, যারা পূর্ব-মধ্য ভারতে বসবাস করে।[৫] তারা মূলত খারিয়া ভাষা ভাষায় কথা বলে, যা অস্ট্রো-এশীয় ভাষাসমূহের অন্তর্গত। এই জনগোষ্ঠী তিনটি উপশাখায় বিভক্ত— পাহাড়ি খারিয়া, দেলকি খারিয়া এবং দুধ খারিয়া।[৬] এর মধ্যে দুধ খারিয়া সবচেয়ে শিক্ষিত সম্প্রদায়।[৭]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]
ভাষাবিদ পল সিডওয়েলের মতে, মুন্ডা ভাষা প্রায় ৪০০০–৩৫০০ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ওড়িশার উপকূলে পৌঁছেছিল।[৮] অস্ট্রো-এশীয় ভাষাভাষীরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বিস্তার লাভ করে এবং স্থানীয় ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিশে যায়।[৯]
সামাজিক বিভাজন
[সম্পাদনা]খারিয়া জনগোষ্ঠী মূলত তিনটি উপদলে বিভক্ত: দুধ খারিয়া, দেলকি খারিয়া এবং পাহাড়ি খারিয়া। প্রথম দুটি উপদল অস্ট্রো-এশীয় ভাষা খারিয়া ভাষায় কথা বলে। কিন্তু পাহাড়ি খারিয়ারা ইন্দো-আর্য ভাষা খারিয়া থার গ্রহণ করেছে। তবে খারিয়া থার ভাষার উন্নয়নে কোনো প্রচেষ্টা চালানো হয়নি।
দুধ খারিয়া ও দেলকি খারিয়া একত্রে একটি শক্তিশালী জনগোষ্ঠী গঠন করেছিল। একসময় এই খারিয়ারা আহির সম্প্রদায়ের এক প্রধানের আক্রমণের শিকার হয়। এরপর তারা ছোট নাগপুর মালভূমিতে চলে আসে।[১০]

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার জশিপুর ও করঞ্জিয়া ব্লকে পাহাড়ি খারিয়াদের মূলত পাওয়া যায়। কিছু গ্রাম মোরাদা ব্লকেও রয়েছে। ঝাড়খণ্ডে, পূর্ব সিংভূম, গুমলা ও সিমডেগা জেলায় তারা বসবাস করে। বিশেষ করে মুসলাবনী, দুমরিয়া ও চাকুলিয়া ব্লকে তাদের সংখ্যা বেশি। পশ্চিমবঙ্গে, তারা পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে পুরুলিয়াতে তাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।[১১]
পাহাড়ি খারিয়াদের "পাহাড়ি খারিয়া", "সাভরা/সবর", "খেরিয়া", "এরেঙ্গা" বা "পাহাড়" নামেও ডাকা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] বহিরাগতরা তাদের "খারিয়া" বলে ডাকে, কিন্তু তারা নিজেদের শবর বলে পরিচয় দেয়। তাদের "পাহাড়ি খারিয়া" বলা হয় কারণ তারা সাধারণত বনাঞ্চলের মধ্যে বসবাস করে এবং বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।[৫]
পাহাড়ি খারিয়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোত্র রয়েছে, যেমন আলকোসি, বা, ভূঁইয়া, বিলুং, ধর, দিগার, দলাই, ডুংডুং, গিদি, গোলগো, কেরকেট্টা, খারমোই, খেলাড়ি, কিরো, কোটাল, কুল্লু, লাহা, নাগো, পিচরিয়া, রাই, সাল, সদর, সন্দি, সিকারি, সোরেং, সুয়া, তেসা, তেতে ও তোলং। এর মধ্যে বিলুং গোত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।[১২]
জনসংখ্যার বন্টন
[সম্পাদনা]তারা প্রধানত ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং মহারাষ্ট্রে বসবাস করে। এছাড়া ত্রিপুরাতেও কিছু পরিবার রয়েছে। সামান্য সংখ্যক খারিয়া পরিবার আসাম এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও পাওয়া যায়।[১৩] ১৯৮১ সালের জনগণনা অনুসারে, তাদের সংখ্যা বিহারে (যার বেশিরভাগ অঞ্চল বর্তমানে ঝাড়খণ্ড) ছিল ১,৪১,৭৭১। ওড়িশায় তাদের সংখ্যা ছিল ১,৪৪,১৭৮ এবং মধ্যপ্রদেশে ৬,৮৯২।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
সংস্কৃতি
[সম্পাদনা]জীবনধারা
[সম্পাদনা]ব্রিটিশ শাসনকালে যে খারিয়ারা জমিদারদের অধীনে ছিলেন, স্বাধীন ভারতে তারা এখন ভূমির মালিক ও কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সব খারিয়াই তাদের ঐতিহ্যবাহী উপভাষায় কথা বলে। তাদের ভাষা মুন্ডা ভাষার অংশ, যা অস্ট্রো-এশীয় ভাষার অন্তর্ভুক্ত। তারা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বাস করে, এবং তাদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত।

পোশাক
[সম্পাদনা]পাহাড়ি খারিয়ারা এখনও তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক সংরক্ষণ করেছে। তবে অন্যান্য খারিয়ারা আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে তাদের পোশাকের ধরন পরিবর্তন করেছে। প্রথাগতভাবে, পুরুষরা 'ভগবান' নামে পরিচিত ধুতি পরিধান করে। নারীরা এমন শাড়ি পরিধান করে যা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলে থাকে, এবং শাড়ির এক অংশ দিয়ে তারা উপরের অংশ ঢেকে রাখে। তবে বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। নারী-পুরুষ উভয়ই সাধারণত পিতল, নিকেল, অ্যালুমিনিয়াম, রুপা এবং কখনও কখনও সোনার গহনা পরেন। তবে দুধ খারিয়া নারীরা সোনার গহনাকেই বেশি পছন্দ করে।[১৪]
অর্থনীতি
[সম্পাদনা]খারিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন স্তরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি খারিয়ারা প্রধানত খাদ্য সংগ্রহ, শিকার এবং মজদুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দেলকি খারিয়ারা কৃষিশ্রমিক এবং কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, দুধ খারিয়ারা সম্পূর্ণভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল।[৫]
খারিয়া জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে দক্ষ।[১৫]
ধর্ম
[সম্পাদনা]২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী খারিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪৬.১% খ্রিস্টান এবং ৪৩.৪% হিন্দু। এছাড়া, অল্পসংখ্যক মানুষ ইসলাম, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, শিখধর্ম এবং অন্যান্য ধর্ম অনুসরণ করে।[৪]
নৃত্য
[সম্পাদনা]খারিয়ারা দক্ষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত। তাদের যুবক-যুবতীরা একসঙ্গে নৃত্যে অংশ নেয়। কখনও কখনও তারা ছেলেদের একটি দল এবং মেয়েদের আরেকটি দল গঠন করে, এবং পালাক্রমে গান গেয়ে একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনের মতো পরিবেশন করে।[১৬]
খারিয়াদের মধ্যে প্রচলিত কয়েকটি জনপ্রিয় নৃত্যশৈলী হলো হারিও, কিনভার, হালকা, কুধিং এবং জাধুরা।[১৭]
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি
[সম্পাদনা]এই অনুচ্ছেদটিতে কোনো উৎস বা তথ্যসূত্র উদ্ধৃত করা হয়নি। |
- গ্ল্যাডসন ডাংডাং – আদিবাসী অধিকার কর্মী
- সিলভানাস ডাংডাং – হকি খেলোয়াড়
- রোজ কেরকেটা – লেখক
- তেলঙ্গা খড়িয়া – স্বাধীনতা সংগ্রামী
- জ্যোতি সুনিতা কুল্লু – হকি খেলোয়াড়
- অর্চনা সোরেং – সমাজকর্মী
- সালিমা তেতে – হকি খেলোয়াড়
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 6 "Census of India Website : Office of the Registrar General & Census Commissioner, India"। www.censusindia.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০১৭।
- ↑ "A-10 Appendix: District wise scheduled caste population (Appendix), Tripura - 2011"। Office of the Registrar General & Census Commissioner, India।
- ↑ "ST-14 Scheduled Tribe Population By Religious Community - Jharkhand"। census.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯।
- 1 2 "ST-14 Scheduled Tribe Population By Religious Community - Odisha"। census.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
- 1 2 3 Vidyarthi ও Upadhyay 1980।
- ↑ "খারিয়া জনগোষ্ঠী"। Britannica (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুলাই ২০২৩।
- ↑ খড়িয়া-ইংরেজি লেক্সিকন (পিডিএফ)। Universität Leipzig, Germany: Himalyan Linguists। ২০০৯। পৃ. VIII। ৪ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত (পিডিএফ) – Open Edition এর মাধ্যমে।
দুধ খারিয়ার ভারতের অন্যতম উচ্চশিক্ষিত নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি, যাদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৯০% বলে অনুমান করা হয়।
- ↑ Sidwell, Paul. 2018. Austroasiatic Studies: state of the art in 2018 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ মে ২০১৯ তারিখে। ২২ মে ২০১৮ তারিখে, ন্যাশনাল সিং হুয়া ইউনিভার্সিটি, তাইওয়ানের গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অফ লিঙ্গুইস্টিকসে উপস্থাপিত।
- ↑ Schliesinger, Joachim (২০১৬)। Origin of the Tai People 3: Genetic and Archaeological Approaches (ইংরেজি ভাষায়)। Booksmango। পৃ. ৭১। আইএসবিএন ৯৭৮১৬৩৩২৩৯৬২৩। সংগ্রহের তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
- ↑ Robin D. Trubhuwan; Preeti R. Trubhuwan (১৯৯৯)। Tribal Dances of India। Discovery Publishing House। পৃ. ১২৯। আইএসবিএন ৮১-৭১৪১-৪৪৩-৫। ওসিএলসি 41143548।
- ↑ Vidyarthi ও Upadhyay 1980, পৃ. 7-25।
- ↑ Suvendu Kundu। HEALTH CARE PRACTICES AMONG THE HILL KHARIA OF DISTRICT PURULIA AND BANKURA, WEST BENGAL (পিডিএফ) (অভিসন্দর্ভ)। সংগ্রহের তারিখ ৪ মার্চ ২০২৩।
- ↑ Vidyarthi ও Upadhyay 1980, পৃ. 5, 214।
- ↑ Vidyarthi ও Upadhyay 1980, পৃ. 50-51।
- ↑ N. Jayapalan (২০০১)। Indian Society and Social Institutions। Atlantic Publishers & Distri। পৃ. ২৭০। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৭১৫৬৯২৫০।
- ↑ Robin D. Trubhuwan; Preeti R. Trubhuwan (১৯৯৯)। Tribal Dances of India। Discovery Publishing House। পৃ. ১৩২। আইএসবিএন ৮১-৭১৪১-৪৪৩-৫। ওসিএলসি 41143548।
- ↑ Robin D. Trubhuwan; Preeti R. Trubhuwan (১৯৯৯)। Tribal Dances of India। Discovery Publishing House। পৃ. ১৩৩, ১৩৪, ১৩৫। আইএসবিএন ৮১-৭১৪১-৪৪৩-৫। ওসিএলসি 41143548।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- Mukhopadhyay, C. (1998). Kharia: the victim of social stigma. কলকাতা: K.P. Bagchi & Co. আইএসবিএন ৮১-৭০৭৪-২০৩-X
- Dash, J. (1998). Human ecology of foragers: a study of the Kharia (Savara), Ujia (Savara), and Birhor in Similipāl hills. নয়া দিল্লি: Commonwealth. আইএসবিএন ৮১-৭১৬৯-৫৫১-৫
- Sinha, A. P. (1989). Religious life in tribal India: a case-study of Dudh Kharia. নয়া দিল্লি: Classical Pub. Co. আইএসবিএন ৮১-৭০৫৪-০৭৯-৮
- Sinha, D. (1984). The hill Kharia of Purulia: a study on the impact of poverty on a hunting and gathering tribe. কলকাতা: Anthropological Survey of India, Govt. of India.
- Banerjee, G. C. (1982). Introduction to the Khariā language. নয়া দিল্লি: Bahri Publications.
- Doongdoong, A. (1981). The Kherias of Chotanagpur: a source book. [রাঁচি]: Doongdoong.
- Biligiri, H. S. (1965). Kharia; phonology, grammar and vocabulary. পুনে: [Deccan College Postgraduate and Research Institute].
- Sachchidananda; Prasad, R. R. (১৯৯৬)। Encyclopaedic profile of Indian tribes (1st সংস্করণ)। নয়া দিল্লি, ভারত: Discovery Pub. House। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৭১৪১২৯৮৩। ওসিএলসি 34119387।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- আরও তথ্যের জন্য
- প্রথম খরিয়া অনলাইন ম্যাগাজিন
- প্যাট্রিসিয়া ডোনেগান ও ডেভিড স্ট্যাম্পের অনলাইন খরিয়া অভিধান ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ মার্চ ২০১৬ তারিখে