খাজিম ইবনে খুজাইমা আল-তামিমি
খাজিম ইবনে খুজাইমা আল-তামিমি | |
|---|---|
| জন্ম | মারও আল-রুজ |
| মৃত্যু | ৭৬৮ এর পরে |
| আনুগত্য | |
| কার্যকাল | ৭৪৯–৭৬৮ |
| যুদ্ধ |
|
| সম্পর্ক | খুজাইমা, শোয়ায়েব, আবদুল্লাহ, ইবরাহিম (পুত্র) |
খাযিম ইবনে খুজাইমা আল-তামিমি ( আরবি: خازم بن خزيمة التميمي; বি. ৭৪৯–৭৬৮ ) ছিলেন একজন খোরাসানি আরব সামরিক নেতা। খোরাসানে আব্বাসীয় বিদ্রোহের প্রাথমিক সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে তিনি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে আব্বাসীয় বিপ্লবে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এর পরবর্তী দুই দশকে তিনি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। আব্বাসীয় শাসনের ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র খুরাসানি বাহিনীর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে খাজিম নিজের পরিবারকে ক্ষমতা ও প্রভাবের এক সুদৃঢ় অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তার পুত্ররাও খিলাফতের কার্যকলাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জীবনী
[সম্পাদনা]তার পরিবার বনু তামিমের নাহশাল শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা সম্ভবত ইসলামি বিজয়ের প্রাথমিক সময়ে খুরাসানের মার্ভ আল-রুজে বসতি স্থাপন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারটি কিছুটা পারসিক সংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণ করে। জানা যায় যে, খাজিম তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফার্সি ভাষা ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন এবং তাঁর বোন এক ইরানির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।[১]
খাজিম খুরাসানে আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রথম দিককার সমর্থকদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আব্বাসীয় বিপ্লবের সূচনালগ্নে তিনি নিজের শহরকে আব্বাসীয়দের নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে তিনি সেই সেনাবাহিনীর একটি অংশের নেতৃত্ব দেন, যারা পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে ৭৪৯–৭৫০ সালে উমাইয়াদের সমূলে উৎখাত করে।[২]
৭৫০ সালে তিনি ওয়াসিত অবরোধে অংশগ্রহণ করেন।[১] এরপর ৭৫১–৭৫২ সালে তাঁকে ওমান পাঠানো হয়, যেখানে তিনি স্থানীয় খারিজি বিদ্রোহ দমন করেন। ৭৫৫–৭৫৬ সালে তিনি উত্তরাঞ্চলে ফিরে এসে জাজিরাতে আরেকটি খারিজি বিদ্রোহ দমন করেন এবং সিরিয়ায় আব্বাসীয় বিদ্রোহী আবদুল্লাহ ইবনে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।[২][৩]
৭৫৮–৭৫৯ সালে তিনি খলিফার পুত্র ও ভবিষ্যৎ খলিফা আল-মাহদির সঙ্গে খুরাসানে যান। সেখানে স্থানীয় গভর্নর আবদুল জব্বার আল-আজদি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।[২] খাজিমকে এই বিদ্রোহ দমন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু মার্ভ আল-রুজের জনগণ তাঁর নিয়োগের খবর পেয়ে নিজেরাই বিদ্রোহ করে গভর্নরকে পরাজিত ও বন্দি করে এবং তাকে খাজিমের কাছে হস্তান্তর করে। এই সময়ে তিনি খুরশিদ নামক তাবারিস্তানের পারসিক শাসকের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করেন।[৩]
৭৬২–৭৬৩ সালের দিকে আলীয় বিদ্রোহের সময় পশ্চিমে আহওয়াজ পুনর্দখলের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত অভিযানে অংশ নেওয়া ছাড়া তিনি মূলত খুরাসানেই অবস্থান করেন। সেখানে ৭৬৮ সালে তিনি উস্তাযিসিসের বিদ্রোহও দমন করেন।[১] এরপর তাঁর সম্পর্কে আর তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না এবং ধারণা করা হয় যে, তিনি খুরাসানেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পুত্রদের মতো তিনি কোনো প্রদেশের গভর্নর ছিলেন বলে জানা যায় না।[৩]
প্রভাব
[সম্পাদনা]খাজিম ছিলেন প্রাথমিক খুরাসানি বাহিনীর অন্যতম প্রধান সামরিক কমান্ডার। এই খুরাসানি বাহিনী ছিল খুরাসানের আরব সেনাবাহিনী, যারা আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আনতে এবং পরে সেই ক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ক্যানেডি মন্তব্য করেন, “কাহতাবা ইবন শাবিবের মৃত্যুর পর প্রথম প্রজন্মের খুরাসানি বাহিনীর মধ্যে খাজিমই সম্ভবত সবচেয়ে সফল সেনাপতি ছিলেন।”[৩][৪]
ক্যানেডির মতে, খাজিম ছিলেন একদিকে সতর্ক ও বিচক্ষণ সেনাপতি, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী ছিলেন। তার সামরিক কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল শত্রুর পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালানোর জন্য নিজের বাহিনীর একটি অংশকে আলাদা করে প্রেরণ করা, যা তখন অত্যন্ত কার্যকর ও কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।[৪]
এছাড়াও, তিনি অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন এক ধরনের উন্নত ও অভিনব কৌশল প্রদর্শন করেন, যা সেই যুগে খুবই বিরল ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ওমানিদের বিরুদ্ধে খাজিম পেট্রোল-ভেজানো মশাল ব্যবহার করেন এবং খারিজিদের অশ্বারোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে লোহার কাঁটা ব্যবহার করেন, যা শত্রুর অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে বিশেষভাবে কার্যকর ছিল।[৫]
পরিবার
[সম্পাদনা]তার পুত্র আবদুল্লাহ, ইবরাহিম, শোয়ায়েব ও বিশেষভাবে খুযায়মা তার মৃত্যুর পরও আব্বাসীয় দরবারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে (৭৮৬–৮০৯ খ্রি.) তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[১][৬] খুরাসানি গোষ্ঠীর অধিকাংশ পরিবারের মতোই হারুনের মৃত্যুর পর সৃষ্ট গৃহ যুদ্ধের সময় তার বংশধরেরা নিজেদের বিশেষ প্রভাব ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।[১]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- Crone, Patricia (১৯৮০)। Slaves on horses: the evolution of the Islamic polity। Cambridge and New York: Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-৫২৯৪০-৯।
- Kennedy, Hugh N. (২০০১)। The Armies of the Caliphs: Military and Society in the Early Islamic State। London and New York: Routledge। আইএসবিএন ০-৪১৫-২৫০৯৩-৫।