খংজোমনুবি নোংগারোল
| প্রকাশনার স্থান | প্রাচীন কাংলেইপাক |
|---|---|
| ভাষা | মৈতৈ |
| ধরন | মৈতৈ সাহিত্য, মৈতৈ লোককথা ও মৈতৈ ধর্ম |
খংজোমনুবি নোংগারোল ( প্রাচীন মৈতৈ : খংচোমনুপি নোংকালল ) প্রাচীন মৈতৈ ভাষায় রচিত এক সাহিত্যিক আখ্যান বা পুয়া। এতে মূলত দুটি প্রধান কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। প্রথম গল্পে লুয়াং বংশের ছয়জন কন্যার আকাশগঙ্গা বা কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জে রূপান্তরিত হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এই ছয় কন্যার মধ্যে একজন একটি 'হারিনোংনাং' (মৈতৈ ভাষায় যার অর্থ ঝিঁঝিঁ পোকা বা সিকেডা) -এর জন্ম দেয়। দ্বিতীয় গল্পটি হাওসি নামৈনু নামক এক বালিকাকে কেন্দ্র করে, যে তার বাবার অনুপস্থিতিতে সৎ মায়ের অত্যাচার সইতে না পেরে শেষে একটি হারিনোংনাং বা ঝিঁঝিঁ পোকায় রূপান্তরিত হয়েছিল। [১] [২] [৩] [৪]
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]খংজোমনুবি বা খংচোমনুপি শব্দের অর্থ কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জ এবং নোংগারোল বা নোংকালল শব্দের অর্থ স্বর্গে আরোহণ। [২] [৫] [৩] [৪]
গল্পসমূহ
[সম্পাদনা]প্রথম গল্প
[সম্পাদনা]একদা লুয়াং বংশের ছয়জন তরুণী মাছ কেনার উদ্দেশ্যে ছয়জন আদিবাসী পুরুষের রক্ষণাবেক্ষণাধীন এক নদীবক্ষস্থ বাঁধের দিকে রওনা হলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর একে অপরের সাথে তাদের দেখা হ্য এবং তরুণীদের মধ্যে দ্রুত সখ্যতা গড়ে ওঠে। কিন্তু সন্ধ্যা অবধি পর্যাপ্ত মাছ ধরতে না পারায় যুবকেরা তরুণীদের অনুরোধ করলেন যেন তারা রাতটুকু সেই খোলা চালাঘরে তাদের সাথেই কাটিয়ে দেন; যাতে পরের দিন তারা মনোমতো মাছ নিয়ে ফিরতে পারেন। ছয়জন তরুণী প্রথমে তরুণীরা তাদের বাবা-মা এবং ভাইদের ভয়ে এই প্রস্তাবে রাজি হতে ইতস্তত করছিলেন। কিন্তু পুরুষদের ক্রমাগত পিড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হয়ে যান। এভাবে অন্ধকারের আশ্রয়ে তারা সেই পুরুষদের সাথে সময় অতিবাহিত করেন এবং আবেগে আপ্লুত হয়ে একে অপরের সান্নিধ্য ও কামনার আতিশয্যে নিজেদের সঁপে দেন। পরদিন সকালে তরুণীরা বাড়ি ফিরে তাদের নিজ নিজ পরিবারের মুখোমুখি হতে অত্যন্ত লজ্জা বোধ করছিলেন। তখন পুরুষরা প্রস্তাব দিলেন যে, যদি তাদের অভিভাবকেরা তাদের প্রতি কঠোর আচরণ করেন, তবে তারা সকলে মিলে একত্রে স্বর্গে আরোহণ করবেন। সেইমতো তারা পাঁচ দিন পর তেনতংইয়ান নামক একটি স্থানে পুনরায় মিলিত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। উল্লেখ্যযোগ্যভাবে, একদা এই স্থানেই লুয়াং রাজবংশের রাজা লুয়াং নিংথৌ পুনশিবা একটি বাঁকানো গাছের ডালে তার রাজকীয় ধনুর্বাণ ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। [৬]
এরপর সমস্ত ঘটনা তাদের প্রত্যাশা মতোই ঘটে। তরুনী মেয়েরা বাড়ি ফিরতেই তাদের মায়েরা তাদের সাথে খারাপ আচরন করতে শুরু করেন। বিয়ের আগে সামাজিকভাবে নিচু শ্রেণির পুরুষদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, অপরাধে তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার ও মারধর করা হয়। অপমানিত ও লজ্জিত হয়ে তারা নির্ধারিত দিনের আগেই গৃহত্যাগ করলেন। তারা লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে সরাসরি স্বর্গের দেবতা 'সালাইলেন সিদাবা'র আবাসের দিকে রওনা হলেন। পথিমধ্যে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। তরুণীদের মধ্যে একজন প্রসববেদনায় আক্রান্ত হলেন এবং মানবসন্তানের পরিবর্তে একটি 'হারিনোংনাং' (মৈতৈ ভাষায় যার অর্থ ঝিঁঝিঁ পোকা) -এর জন্ম দিলেন। তিনি সেই নবজাতকটিকে পৃথিবীতেই ফেলে রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে যাওয়ার আগে তরুণী তাকে এই আশ্বাস দিয়ে যান, যে বছরে অন্তত একবার সে তার সাথে দেখা করতে আসবেন। এরপর সেই তরুণী তার সঙ্গিনীদের অনুসরণ করে এক পাহাড়ের চূড়ায় পৌছালেন। সঙ্গিনীরা সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।যখন তারা সালাইলেনের আবাসে পৌঁছালেন, তারা বিনীতভাবে দেবতার চরণে লুটিয়ে পড়লেন এবং নিজেদের দুর্দশার কথা জানিয়ে আশ্রয়ের প্রার্থনা করলেন। সালাইলেন তাদের প্রতি করুণাবিষ্ট হলেন।এরপর শীঘ্রই তাদের সাথে সেই স্থানে উপজাতীয় পুরুষরা, তাদের প্রেমিকরা যোগ দিলেন। তবে সালাইলেন তাদের সতর্ক করে দিলেন যে, স্বর্গে কোনো মরণশীল মানুষ পার্থিব প্রেম বা ত্রয়ী বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারবেন না। তিনি তাদের বছরে একবার পৃথিবীতে যাওয়ার অনুমতি দিলেন, যাতে তারা দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারেন এবং তাদের সন্তানটির (ঝিঁঝিঁ পোকা) যত্ন নিতে পারেন। এভাবেই সেই ছয়টি তরুণ দম্পতি অনন্ত সুখের জীবন লাভ করলেন। [৭]
২য় গল্প
[সম্পাদনা]২য় গল্পে হাওসি নামৈনু নামক এক বালিকার কথা বলা হয়েছে যে গল্পের শেষে এক হারিনোংনাং বা ঝিঁঝিঁ পোকায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। [৮]
নিচের অনুচ্ছেদটিতে হাওসি নামৈনু -এর স্বার্থপর সৎ মায়ের চরম নিষ্ঠুরতা এবং তার অসহনীয় কষ্টের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:
“একদিন হাওসি নামৈনু অত্যন্ত বিনয়ীভাবে তার সৎ মা লৌশিকাম চানুকে জানায় যে, সে তার সমবয়সী বান্ধবীদের সাথে কাং (মৈতৈদের একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা) খেলার পরিকল্পনা করেছে। সে তার মাকে কথা দেয় যে, পরের দিন ভোরে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথেই দূরের খামার থেকে এক ঝুড়ি ধান নিয়ে আসবে। কিন্তু তার সেই কুটিল এবং কটুভাষী সৎ মা বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নিলেন না। তিনি নামৈনুকে জোর করলেন যেন সে তৎক্ষনাৎ কাজ শেষ করে। নিরুপায় হয়ে মেয়েটি ভারী ধানের ঝুড়ি নিয়ে তার কাজে রওনা দিল। কাজ শেষ করে নামৈনু যখন ধান নিয়ে ঘরে ফিরে এল তখন সেই সদারাগী ঝগড়াটে মহিলা নামৈনুকে কোনো বিশ্রাম না দিয়ে আবারও কাজে পাঠিয়ে দিলেন। এবার তাকে উখল-মুষল দিয়ে ধান ভেনে সরু চাল তৈরি করার হুকুম দেওয়া হল। একটানা এত খাটুনি আর সহ্য করতে না পেরে অসহায় মেয়েটি মায়ের কথার প্রতিবাদ করল। সৎ মা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে হাতের কাছে থাকা একটি বড় হাতা দিয়ে নামৈনুর মাথায় সজোরে আঘাত করলেন। সাথে সাথেই তার মাথা ফেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়তে শুরু করল”
— খংজোমনুবি নোংগারোল[৯]
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]- মেইতেই সংস্কৃতিতে প্রাণী
- মেইতেই সংস্কৃতিতে পাখি
- মেইতেই সংস্কৃতিতে পাহাড় এবং পর্বতমালা
- মেইতেই লোককাহিনীর তালিকা
- মেইতেই সংস্কৃতিতে উদ্ভিদ
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Singh, Ch Manihar (২৯ আগস্ট ১৯৯৬)। A History of Manipuri Literature (ইংরেজি ভাষায়)। Sahitya Akademi। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০০৮৬-৯।
- 1 2 Meitei, Sanjenbam Yaiphaba; Chaudhuri, Sarit K. (২৫ নভেম্বর ২০২০)। The Cultural Heritage of Manipur (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-১-০০০-২৯৬৩৭-২।Meitei, Sanjenbam Yaiphaba; Chaudhuri, Sarit K.; Arunkumar, M. C. (25 November 2020). The Cultural Heritage of Manipur. Routledge. ISBN 978-1-000-29637-2.
- 1 2 Singh, Lamabam Damodar (২০০০)। L. Kamal Singh (ইংরেজি ভাষায়)। Sahitya Akademi। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০৮৫৬-৮।
- 1 2 Paniker, K. Ayyappa (২৯ আগস্ট ১৯৯৭)। Medieval Indian Literature: Surveys and selections (ইংরেজি ভাষায়)। Sahitya Akademi। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০৩৬৫-৫।
- ↑ Glimpses of Manipuri Language, Literature, and Culture (ইংরেজি ভাষায়)। Manipuri Sahitya Parishad। ২৯ আগস্ট ১৯৭০।Glimpses of Manipuri Language, Literature, and Culture. Manipuri Sahitya Parishad. 29 August 1970.
- ↑ Singh, Ch Manihar (১৯৯৬)। A History of Manipuri Literature (ইংরেজি এবং মণিপুরী ভাষায়)। Sahitya Akademi। পৃ. ৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০০৮৬-৯।
- ↑ Singh, Ch Manihar (১৯৯৬)। A History of Manipuri Literature (ইংরেজি এবং মণিপুরী ভাষায়)। Sahitya Akademi। পৃ. ৫৫। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০০৮৬-৯।
- ↑ Singh, Moirangthem Kirti (1 July 1993). Folk Culture of Manipur. Manas Publications. ISBN 978-81-7049-063-0.
- ↑ Singh, Ch Manihar (১৯৯৬)। A History of Manipuri Literature (ইংরেজি এবং মণিপুরী ভাষায়)। Sahitya Akademi। পৃ. ৫৭। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-০০৮৬-৯।