ক্ষুধিত পাষাণ
| "ক্ষুধিত পাষাণ" | |
|---|---|
| লেখক | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| দেশ | ব্রিটিশ ভারত |
| ভাষা | বাংলা |
| বর্গ | ছোটোগল্প |
| প্রকাশিত হয় | ১৮৯৫ |
| মাধ্যম | মুদ্রিত |
"ক্ষুধিত পাষাণ" হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি বাংলা ছোটোগল্প। ১৮৯৫ সালে সাধনা পত্রিকায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ আহমেদাবাদের শাহীবাগে সবরমতী নদীর নিকটে অবস্থিত মোতি শাহী মহলে অবস্থানকালে এই গল্পটি লেখার অনুপ্রেরণা লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময় এখানে বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।[১] গল্পের মধ্যে গল্প বলার ভঙ্গিতে লেখা এই ছোটোগল্পটিতে গল্পকথক এক রহস্যময় ট্যাক্স কালেক্টারের মুখে কর্মসূত্রে তাঁর একটি মফস্সল শহরে আড়াইশো বছরের পুরনো এক প্রাসাদে রাত্রিবাসের রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
কাহিনী-সারাংশ
[সম্পাদনা]গল্পকথক ও তাঁর এক থিওসফিস্ট আত্মীয় পূজার ছুটিতে দেশভ্রমণ সেরে কলকাতায় ফিরছিলেন। রেলগাড়িতে তাঁদের সঙ্গে এক আলাপ হয় এক রহস্যময় সবজান্তা ভদ্রলোকের। একটি জংশনে নেমে দ্বিতীয় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করার সময় সেই রহস্যময় ভদ্রলোক একটি গল্প ফেঁদে বসলেন। এখান থেকেই গল্পের মধ্যে গল্প বলার ভঙ্গিতে মূল কাহিনীর সূচনা:
ভদ্রলোক তাঁর অতীত জীবনের একটি গল্প শোনান। এক সময়ে তিনি শুস্তা নদীর কাছে বরীচে তুলোর মাশুল আদায়ের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি উঠেছিলেন আড়াইশো বছরের পুরনো দ্বিতীয় শা-মামুদের ভোগবিলাসের জন্য নির্মিত একটি শ্বেতপাথরের প্রাসাদে। স্থানীয়েরা তাঁকে সেখানে রাত্রিবাস করতে বারণ করেছিল। কিন্তু তিনি শোনেননি। ক্রমশ “বাড়িটার এক অপূর্ব নেশা” তাঁকে “আক্রমণ করিয়া ধরিতে লাগিল”। রহস্যময় পদধ্বনি শুনতে পেলেন, অদ্ভুত সব ছায়ামূর্তি দেখলেন, টের পেলেন অতীত জীবনের উপস্থিতি। তিনি অনুভব করলেন, প্রাসাদটি ধীরে ধীরে যেন তাঁকে গ্রাস করছে। রাতের পর রাত নানারকম দৃশ্য তাঁর দৃষ্টিগোচর হল: নারীকণ্ঠের কলহাস্য, ফোয়ারার উচ্ছ্বাস, সংগীতের সুর, বাতাসে ভেসে আসা সুগন্ধ এবং নারীর ক্রন্দনধ্বনি ও আর্তরব। ঘোর কাটত পাগল মেহের আলির “তফাত যাও, তফাত যাও, সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়” চিৎকারে। ক্রমে স্বপ্ন ও সত্যের সীমারেখাটি অস্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল তাঁর চোখে। তিনি পালাতে চাইলেন, কিন্তু অনুভব করলেন যে কিছু একটা আছে যা তাঁকে পালাতে দিচ্ছে না। পুরনো কর্মচারী করিম খাঁকে জিজ্ঞাসা করায়, সে জানালো যে প্রাসাদটি অভিশপ্ত। "একসময় ঐ প্রাসাদে অনেক অতৃপ্ত বাসনা, অনেক উন্মত্ত সম্ভোগের শিখা আলোড়িত হইত- সেই-সকল চিত্তদাহে, সেই-সকল নিষ্ফল কামনার অভিশাপে এই প্রাসাদের প্রত্যেক প্রস্তরখণ্ড ক্ষুধার্ত তৃষার্ত হইয়া আছে; সজীব মানুষ পাইলে তাহাকে লালায়িত পিশাচীর মতো খাইয়া ফেলিতে চায়। যাহারা ত্রিরাত্রি ঐ প্রাসাদে বাস করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে কেবল মেহের আলি পাগল হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে, এ পর্যন্ত আর কেহ তাহার গ্রাস এড়াইতে পারে নাই।"ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁর নিস্তারের উপায় কী। করিম খাঁ তখন এক ইরানী ক্রীতদাসীর গল্প বলতে শুরু করলেন।
ঠিক সেই সময় ট্রেন এসে পড়ল। ভদ্রলোক গল্পটি সেখানেই থামিয়ে উঠে পড়লেন একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরায়। গল্পকথক ও তাঁর সঙ্গীর গল্পটির শেষ শোনা হল না।
পর্যালোচনা
[সম্পাদনা]ড. ফজলুল হক সৈকত লিখেছেন যে, এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনাশৈলীর মধ্যে দিয়ে লৌকিকতা-অলৌকিকতা, রহস্যময়তা ও ঈশ্বরবিশ্বাসের সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন।[২] ভীষ্মদেব চৌধুরীর মতে, এটি "প্রাকৃত-অতিক্রমী কোনো শিল্পকৃতি নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর এক সৃজনক্ষম কবিতার বর্ণযোজনার অভিপ্রয়াস, এক পুনর্গঠিত ইতিহাসের নন্দনশোভা।"[৩]
চলচ্চিত্রায়ন
[সম্পাদনা]এই গল্প অবলম্বনে দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে:
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ দত্ত, রমা; সিলি, ক্লিনটন (২০০৯)। Celebrating Tagore : a collection of essays। অ্যালায়েড পাবলিশার্স। পৃ. ৩। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৮৪২৪৪২৪৩। ওসিএলসি 623263320।
- ↑ সৈকত, ফজলুল হক (২ মার্চ ২০১৩)। "রবীন্দ্রনাথের 'ক্ষুধিত পাষাণ': অলৌকিকতা ও ঐশ্বরিক বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব"। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। সংগ্রহের তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ চৌধুরী, ভীষ্মদেব (৪ মে ২০২৩)। "ক্ষুধিত পাষাণ: ঐতিহ্যিক কাঠামোয় ইতিহাসের পুনর্গঠন"। দৈনিক সমকাল। সংগ্রহের তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২৪।
- 1 2 মারিয়া, শান্তা (৮ মে ২০১৪)। "অভিনয়ে রবিঠাকুর"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২৪।