বিষয়বস্তুতে চলুন

ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনয়ে

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে
ডাচ পণ্ডিত সনুক হারখ্রোনিয়ে
ডাচ পণ্ডিত সনুক হারখ্রোনিয়ে
জন্ম(১৮৫৭-০২-০৮)৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৭
ওস্টারহাউট, নেদারল্যান্ডস
মৃত্যু২৬ জুন ১৯৩৬(1936-06-26) (বয়স ৭৯)
লেইডেন, নেদারল্যান্ডস
পেশাঅধ্যাপক, লেখক, গুপ্তচর, উপনিবেশিক উপদেষ্টা
জাতীয়তাডাচ

ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (ওলন্দাজ উচ্চারণ: [ˈkrɪstijaːn ˈsnuk ɦʏrˈɣrɔɲə]; ৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৭   ২৬ জুন ১৯৩৬) ছিলেন একজন ডাচ পণ্ডিত, যিনি প্রাচ্য সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনি ডাচ উপনিবেশিক সরকার-এর নেটিভ বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিষয়ে উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন।

তিনি ১৮৫৭ সালে ওস্টারহাউট-এ জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭৪ সালে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়-এ ধর্মতত্ত্ব (থিওলজি) নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৮৮০ সালে লেইডেন থেকে তিনি 'Het Mekkaansche Feest'[] ("মক্কার উৎসব") শীর্ষক প্রবন্ধের জন্য ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৮৮১ সালে তিনি লেইডেন স্কুল ফর কলোনিয়াল সিভিল সার্ভেন্টস-এ অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

আরবি ভাষায় দক্ষ সনুক ১৮৮৪ সালে জেদ্দার ওসমানীয় গভর্নরের সহায়তায় মক্কার আলেমদের এক প্রতিনিধিদলের কাছে পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ১৮৮৫ সালে তিনি মুসলিমদের পবিত্র শহর মক্কায় হজ পালনের অনুমতি পান। তিনি প্রাচ্য সংস্কৃতির ওপর গবেষণাকারী প্রথম পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে একজন যিনি মক্কায় প্রবেশ করতে সক্ষম হন।

তিনি ছিলেন এক অগ্রগামী পর্যটক। মক্কার মতো শহরে একজন পশ্চিমা হিসেবে তিনি বিরল ছিলেন। কিন্তু তিনি সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যান যে, অনেকেই মনে করত তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।[] পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন যে তিনি মুসলমান সেজে ছিলেন। এটি তিনি ১৮৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তার কলেজের বন্ধু কার্ল বেজল্ড-কে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন। চিঠিটি এখন হেইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার-এ সংরক্ষিত আছে।[][] ১৮৮৮ সালে তিনি রয়াল নেদারল্যান্ডস একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর সদস্য নির্বাচিত হন।[]

১৮৮৯ সালে তিনি লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মালয় ভাষার অধ্যাপক হন এবং ডাচ সরকারের উপনিবেশিক বিষয়ক দপ্তরে আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি আচেহ-এর অবস্থা, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ-এ ইসলামের ভূমিকা, উপনিবেশিক প্রশাসন ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে ১,৪০০-এরও বেশি প্রবন্ধ লিখেছেন।

জে. বি. ফন হেউৎস-এর উপদেষ্টা হিসেবে তিনি আচেহ যুদ্ধ (১৮৭৩–১৯১৪)-এর শেষ পর্বে (১৮৯৮–১৯০৫) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞানের সাহায্যে তিনি এমন কৌশল তৈরি করেন, যা আচেহবাসীদের প্রতিরোধ দমনে এবং ডাচ উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের সহায়তা করে। প্রায় ৪০ বছরের যুদ্ধ শেষে আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ অধিবাসী নিহত এবং প্রায় দশ লাখ মানুষ আহত হয়।

আচেহ যুদ্ধে তার সাফল্যের ফলে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে উপনিবেশিক প্রশাসনিক নীতি গঠনে তার প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু তিনি মনে করতেন তার পরামর্শ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই ১৯০৬ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসে ফিরে আসেন এবং সেখানে সফল এক একাডেমিক জীবন চালিয়ে যান।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

১৮০০ সালে যখন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমানে: ইন্দোনেশিয়া) উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ স্থানীয় জনগণের প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম ছিল ইসলাম। তবে এই ইসলামের সাথে পুরনো ধর্মীয় বিশ্বাসের উপাদানগুলো মিশে গিয়ে এক ধরনের শক্তিশালী ধর্মীয় সিনক্রেটিক বা মিশ্র সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। মক্কা থেকে ফেরা আরব ব্যবসায়ী ও স্থানীয় হাজিরা ইসলামের আরও কঠোর বা অরথডক্স ব্যাখ্যা প্রচার করতে শুরু করেন। এর ফলে ইসলামের কঠোর 'সানত্রী' ধারা গড়ে ওঠে। আর যারা ইসলাম শুধু নামেমাত্র পালন করত, তাদের বলা হতো "আবানগান"।[]

ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের একটি মসজিদ, ১৯০০

অধিকাংশ খ্রিস্টান গির্জা উপনিবেশিক সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করত। প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক মিশনারিরা সরকারের কৌশল যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে মেনে চললেও, তাদের কাজের ওপর কিছুটা স্বাধীনতা ছিল। ডাচ উপনিবেশবাদ কখনও ধর্মীয় উগ্রতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়নি। তবে ১৯শ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়, যা প্রায়ই ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম এবং বিভিন্ন খ্রিস্টান গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত সৃষ্টি করত।[]

সরকার ও ইসলামের সম্পর্ক ছিল কিছুটা জটিল। ডাচ উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা রাখার নীতি অনুসরণ করত এবং ধর্মীয় বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকতে চাইত। কিন্তু শাসনব্যবস্থায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইসলাম প্রাথমিক পর্যায় থেকেই উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যগুলো মিলে একসঙ্গে বিভিন্ন সময় দাঙ্গা ও যুদ্ধের রূপ নেয়, যেমন পাদ্রি যুদ্ধ (১৮২১–১৮৩৭) এবং আচেহ যুদ্ধ (১৮৭৩–১৯১৪)।[]

ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে জীবন

[সম্পাদনা]
আচেহ থেকে হজে যাওয়া তীর্থযাত্রী। ছবি তুলেছেন সনুক হারখ্রোনিয়ে, ডাচ কনস্যুলেটে জেদ্দা, ১৮৮৪

১৮৭১ সাল থেকে উপনিবেশিক গভর্নর-জেনারেল 'স্থানীয় বিষয়ক উপদেষ্টা'-র ওপর নির্ভর করতেন এই ধরনের উত্তেজনা মোকাবিলায়। আরবি ও ইসলামের উপর দক্ষতার কারণে প্রফেসর ড. সনুক হারখ্রোনিয়ে ১৮৮৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। তার মূল পরামর্শ ছিল ধর্মীয় বিষয়ে যতটা সম্ভব কম হস্তক্ষেপ করা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শুধু রাজনৈতিক ইসলামের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা উচিত ছিল। তার পরামর্শ বহু বছর উপনিবেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। তবে ১৯১২ সালে সারেকাত ইসলাম গঠনের মাধ্যমে প্রথম ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দল তৈরি হয়।[]

ডাচ উপনিবেশিক নীতিতে সংস্কার আনার লক্ষ্য নিয়ে সনুক ১৮৮৯ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে যান। প্রথমে তিনি বুইতেনজর্গ-এ ইসলামি শিক্ষা নিয়ে গবেষক হিসেবে ও ১৮৯০ সালে বাটাভিয়া-তে আরবি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রথমে তাকে আচেহ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ইউরোপের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্তাব পেলেও তিনি দেশে ফেরেননি। ১৮৯০ সালে তিনি চিয়ামিস, পশ্চিম জাভার এক স্থানীয় অভিজাত পরিবারের কন্যাকে বিয়ে করেন। নেদারল্যান্ডসে এটি বিতর্ক তৈরি করলে সনুক একে "বৈজ্ঞানিক সুযোগ" হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যাতে ইসলামি বিয়ের রীতিনীতির বিশ্লেষণ করা যায়। এই বিয়ে থেকে তার চারটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

১৮৯১ থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যে সনুক, যিনি তখন আচেহ ভাষা, মালয় ভাষাজাভানিজ ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, অবশেষে আচেহ যান। তখন দীর্ঘ আচেহ যুদ্ধ ওই অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি "হাজি আবদুল গফফার" নাম ধারণ করে স্থানীয় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আস্থা ও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার আচেহের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট-এ তিনি আচেহবাসীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সামরিক অভিযান না চালানোর পরামর্শ দেন। বরং তিনি সুসংগঠিত গুপ্তচরবৃত্তি ও অভিজাত শ্রেণির সমর্থন আদায়ের উপর জোর দেন। তবে কিছু উগ্রপন্থী আলেমের ক্ষেত্রে শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা তিনি স্বীকার করেছিলেন।[]

১৮৯৮ সালে সনুক জে. বি. ফন হেউৎস-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হন আচেহকে "শান্ত" করার অভিযানে। তার পরামর্শ ডাচদের জন্য দীর্ঘ আচেহ যুদ্ধের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়। তবে হেউৎস তার নৈতিক ও উদার প্রশাসনের আদর্শ কার্যকর করতে রাজি না হওয়ায় তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। ১৯০৩ সালে সনুক আরেক স্থানীয় নারীকে বিয়ে করেন এবং ১৯০৫ সালে তাদের এক পুত্র সন্তান জন্মায়। উপনিবেশিক নীতিতে হতাশ হয়ে তিনি পরের বছর নেদারল্যান্ডসে ফিরে যান এবং এক সফল একাডেমিক জীবন শুরু করেন।[]

সনুক বাটাভিয়ার আরব গ্র্যান্ড মুফতি হাবিব উসমান বিন ইয়াহইয়ার বন্ধু ছিলেন। হাবিব উসমান ডাচদের আচেহ যুদ্ধের পক্ষে ফতোয়া প্রদান করেছিলেন।

মক্কায় অবস্থান (১৮৮৪–১৮৮৫)

[সম্পাদনা]
সনুক হারখ্রোনিয়ে মক্কায় (১৮৮৫)

সনুক হারখ্রোনিয়ের গ্রন্থ মক্কা ইন দ্য ল্যাটার পার্ট অব দ্য ১৯থ সেঞ্চুরি-এর ভূমিকায়,[] নিম্নলিখিত বিবরণ পাওয়া যায়:

"১৮৮৪–১৮৮৫ সালে তিনি [অর্থাৎ সনুক হারখ্রোনিয়ে] এক বছর আরবিয়ায় থাকার সুযোগ পান। এর অর্ধেক সময় তিনি মক্কায় কাটান, যেখানে তিনি ইসলামি শিক্ষার ছাত্র হিসেবে জীবন যাপন করেন। বাকি অর্ধেক সময় কাটান জেদ্দায়। তাঁর অভিজ্ঞতার ফলাফল হিসেবে তিনি জার্মান ভাষায় দুই খণ্ডের 'মক্কা' শীর্ষক বই লিখেন, যা ১৮৮৮–১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হজের আচারাদি সরাসরি দেখার চেয়ে মক্কার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মক্কায় আসা মুসলমানদের জীবন সম্পর্কে ঘনিষ্ঠভাবে জানা ছিল।"

১৯২৯ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে,[১০] আর্থার জেফেরি আরও বিশদে বলেন:

"মক্কা ও হজ সম্পর্কিত আমাদের মানক বৈজ্ঞানিক কাজটি আমরা ঋণী পরবর্তী খ্রিস্টান তীর্থযাত্রী প্রফেসর সি. সনুক হারখ্রোনিয়ের কাছে। তিনি ডাচ প্রাচ্যবিদ ছিলেন এবং লেইডেনে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে বসবাস করতেন। ১৮৮০ সালে হজের উৎপত্তি ও প্রকৃতি নিয়ে তাঁর রচনা লেখা হয়েছিল এবং ১৮৮৫ সালে ডাচ কনস্যুলেটে জেদ্দায় পাঁচ মাস থাকার পর তিনি মক্কায় যান। সেখানে ছয় মাস কোরআনের ছাত্র হিসেবে বসবাস করেন এবং তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থের উপাদান সংগ্রহ করেন। যেখানে বার্কহার্ড মূলত শহরের ভূগোল এবং হজের আচারাদি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, সেখানে সনুক মক্কার সমাজজীবন নিয়ে গভীর গবেষণা করেন এবং তাঁর কাজ এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে পরবর্তী লেখকদের জন্য শুধু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করার কাজ বাকি থাকে।"

"হারখ্রোনিয়ে মক্কার সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মেলামেশা করতে পারতেন এবং তাঁর বিদ্বানসুলভ প্রস্তুতি মক্কার সমাজজীবনকে আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। অন্য কোনো লেখক এত স্পষ্টভাবে এমন এক সমাজের চিত্র এঁকেছেন বলে জানা যায়নি, যা নানা জাতির সংমিশ্রণে গঠিত এবং যাদের কুসংস্কার ও পূর্বধারণার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। শহরের প্রচলিত অনৈতিকতার চিত্র তিনি এমনভাবে এঁকেছেন যা বার্কহার্ডের তুলনায়ও কালো এবং তিনি এমন একজন সাক্ষী যাকে ইসলামবিরোধী পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে দোষারোপ করা যায় না।"

সনুক হারখ্রোনিয়ে তোলা মক্কার আলোকচিত্র, ১৮৮৫

সনুক হারখ্রোনিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ভান করে মক্কায় সময় কাটিয়েছিলেন — এই কারণে কেউ কেউ তাঁকে "বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারক" বলেছেন। যেমন, পাকিস্তানের প্রয়াত ডানপন্থী বেসামরিক কর্মকর্তা ও ১৯৬২ সালে নেদারল্যান্ডসে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত কুদরত উল্লাহ শাহাব তাঁর আত্মজীবনীতে[১১] ইঙ্গিত দেন:

"ডাচ প্রাচ্যবিদদের একটি দল স্পষ্ট উদাহরণ, যারা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ছদ্মবেশে ভ্রান্ত বক্তব্য ও চিন্তা ছড়িয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের চেহারা বিকৃত করেছে। তারা পাশ্চাত্যদের মনে ইসলামের প্রতি পক্ষপাত তৈরি করেছে এবং কিছু আত্মবিস্মৃত মুসলমানদের কাছে কর্তৃত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর অন্যতম হলেন সি. সনুক হারখ্রোনিয়ে। তিনি লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য অধ্যয়নের অধ্যাপক ছিলেন। ১৮৮৪ সালে তিনি ছয় মাস জেদ্দায় ছিলেন এবং এরপর ছদ্ম ইসলামি নাম নিয়ে ছয় মাস মক্কায় ছিলেন। হারামে অমুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ, তবুও তিনি মুসলমানের ছদ্মবেশে সেখানে থাকতেন এবং মক্কার মুসলমানদের জীবন নিয়ে জার্মান ভাষায় দুই খণ্ডের 'মক্কা' গ্রন্থ লিখেছিলেন। তিনি এর আগে 'হেট মক্কানশে ফেস্ট' নামে হজ নিয়ে ডাচ ভাষায় বই লিখেছিলেন। ইসলামি আচার ও মুসলমানদের অবস্থা অনুসন্ধান করতে গিয়ে যারা প্রতারণা ও মুনাফিকির ছদ্মবেশ নেন, তাদের সদিচ্ছা বা ন্যায্যতা খুঁজে পাওয়া বৃথা। এ ধরনের লেখালেখি ডাচদের মনে মুসলমানদের সম্পর্কে বহু বিবাহপ্রথায় লিপ্ত, শৃঙ্খলাহীন, বর্বর এবং অদক্ষ শাসক হিসেবে মানসচিত্র গড়ে তুলেছে।"

এল.আই. গ্রাফ-এর মতে,[১২] মক্কায় প্রবেশের আর কোনো উপায় সনুকের ছিল না:

"নিশ্চয়ই সনুক হারখ্রোনিয়ের মক্কায় প্রবেশের অন্য কোনো পথ ছিল না, মুসলমানদের কাছে নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করা ছাড়া।"

অর্থাৎ "সনুক হারখ্রোনিয়ের মক্কায় প্রবেশের একমাত্র উপায় ছিল মুসলমান হওয়া।"

ডেভিড স্যামুয়েল মারগলিওথ, উনিশ শতকে অমুসলিমদের হজ পর্যবেক্ষণের বিপদ স্মরণ করিয়ে বলেন:[১৩]

"মনে করা হয়, হজ পালন দেখার পর নিরাপদে ফিরে আসা ইউরোপীয়দের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বেশিরভাগই এর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। যারা সফল হয়েছে, তারা প্রায় সবাই চতুরতা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।"

এ বিষয়ে আর্থার জেফেরিও বলেন:[১৪]

"মক্কা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, প্রায় কোনো হজ মৌসুমই যায় না যে কোনো এক জনকে গোপনে খ্রিস্টান সন্দেহে হত্যা করা না হয়।"

সনুক হারখ্রোনিয়ের মক্কার পবিত্র স্থানটিতে প্রবেশ করতে ইসলামি সংস্কৃতি আত্মসাৎ করে ঔপনিবেশিক স্বার্থে ব্যবহারের বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়, যখন তিনি নিজেই বলেন, "প্রাচ্যবিদ ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি যতই সহানুভূতিশীল হোক না কেন, মক্কার মতো দূরবর্তী স্থানে, যেখানে মন এত সীমাবদ্ধ, তার আশ্বাসগুলো সন্দেহের চোখে দেখা হবে।"[১৫] আরব নাম "আবদুল-গাফফার" গ্রহণ করেও হারখ্রোনিয়ে আরবদের মানসিকতা সীমাবদ্ধ মনে করার সাহস দেখান।[১৫]

গুপ্তচরবৃত্তি

[সম্পাদনা]

১৮৮৪ সালের ২৮ আগস্ট জেদ্দায় এসে পৌঁছান ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে। মাত্র সাতাশ বছর বয়সের এই ডাচ পণ্ডিত, প্রাচ্যবিদ ও গুপ্তচরের মূল উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় প্রবেশ করা এবং ডাচ উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তার সরকারের কাছে পাঠানো। বিশেষত আচেহজাভা অঞ্চল থেকে আসা হজযাত্রীদের কার্যকলাপ ও মক্কার আলেম সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। ডাচ সরকার আশঙ্কা করত, এই হজযাত্রীরা মক্কার আলেমদের প্রভাবে দেশে ফিরে গিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে পারে।[১৬]

হারখ্রোনিয়ে লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্বে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৮৮০ সালে ‘মক্কা উদযাপন’ শীর্ষক থিসিসের জন্য ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ডাচ কলোনিয়াল সিভিল সার্ভিস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-এ শিক্ষকতা শুরু করেন। মক্কায় প্রবেশের জন্য মুসলমান হওয়ার ভান করা তার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে আব্দুল গফ্ফার রাখেন এবং ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করেন, যাতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের আস্থা অর্জন করা যায়। উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনাধীন হেজাজ অঞ্চলে তিনি গভর্নর ওসমান পаша এবং স্থানীয় বিচারক ও আলেমদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন।[১৬]

১৮৮৫ সালের ২১ জানুয়ারি হারখ্রোনিয়ে মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পান। পরবর্তী সাত মাস তিনি মক্কায় অবস্থান করেন এবং স্থানীয় মুসলিম সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি মক্কার আলেম, মুফতি, শেখ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যান, প্রার্থনায় অংশ নেন এবং আচেহ, জাভা ও অন্যান্য অঞ্চলের হজযাত্রীদের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার সঙ্গে ছিল প্রায় ৪০ কেজি ওজনের একটি ক্যামেরা, যার সাহায্যে তিনি কাবা, মসজিদ এলাকা এবং মক্কার বিভিন্ন স্থানের ছবি তোলেন। পাশাপাশি কুরআন তেলাওয়াতের শব্দ রেকর্ড করেন, যা ইতিহাসের প্রথম কুরআন তেলাওয়াতের রেকর্ডিং হিসেবে বিবেচিত হয়।

তার তোলা দুর্লভ সেপিয়া ফটোগ্রাফ, রেকর্ডিং এবং নথিপত্র মক্কা ত্যাগের আগে নিরাপদে লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন, যা আজও সংরক্ষিত আছে। তার এই সংগ্রহ মক্কার সমাজজীবন, স্থাপনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।[১৬]

হারখ্রোনিয়ে মক্কা থেকে ফিরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ সরকারের উপনিবেশিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ইসলামি শিক্ষা সীমিত করা, মসজিদ ও আলেম সমাজের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং ইসলামি আন্দোলন দমন সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আচেহ যুদ্ধের (১৮৭৩–১৯১৪) সময় তার নীতি ও কৌশলগুলো বিদ্রোহ দমনে কার্যকর হয়েছিল।

হারখ্রোনিয়ের কর্মকাণ্ড ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়। কেউ কেউ তাকে দক্ষ গুপ্তচর ও ঔপনিবেশিক নীতি প্রণেতা মনে করেন, আবার কেউ কেউ তাকে একাধারে প্রাচ্যবিদ, পণ্ডিত ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া এক অনুসন্ধানী হিসেবে বিবেচনা করেন। মক্কায় অবস্থানকালে ইসলাম গ্রহণের ভান নিয়ে আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মক্কার সমাজ ও হজযাত্রা সম্পর্কে প্রথম সুসংগঠিত ও প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপনকারী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।[১৬]

দারুল ইসলাম বনাম দারুল হারব

[সম্পাদনা]

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-এ যেখানে ভারতের মুসলমানরা বড় ভূমিকা রেখেছিল, সেখানে ব্রিটিশ সরকার তাদের এক প্রশাসক উইলিয়াম উইলসন হান্টার-কে নিয়োগ করে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে যে ভারতীয় মুসলমানরা কি "রানীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে ধর্মীয়ভাবে বাধ্য?" হান্টার তার প্রতিবেদন সম্পন্ন করেন, যা পরে দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস নামে প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এতে হান্টার বাস্তববাদী মত দেন যে ধর্মীয় যুক্তি বা ফতোয়া যেমন রানীর সরকারের বিপক্ষে ব্যবহার করা যায়, তেমনি তার পক্ষে ব্যবহার করাও সম্ভব।

তিনি লেখেন:[১৭] "উত্তর হিন্দুস্থানের ইসলামী আইনবিদরা নীরবে ধরে নেন যে ভারত শত্রুর দেশ [দারুল হারব], এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্ত টানেন যে ধর্মীয় বিদ্রোহের প্রয়োজন নেই। কলকাতার আলেমরা ভারতকে ইসলামের দেশ [দারুল ইসলাম] ঘোষণা করেন এবং বলেন ধর্মীয় বিদ্রোহ অবৈধ। এই ফলাফল ধনীদের কাছে যেমন সন্তোষজনক, কারণ তারা সীমান্তের উগ্রবাদী শিবিরে যোগ দেওয়ার বিপদ থেকে বাঁচে, তেমনি আমাদের কাছেও আনন্দের, কারণ এটি প্রমাণ করে যে আইন ও ধর্মীয় বাণী যেমন বিদ্রোহের পক্ষে, তেমনি আনুগত্যের পক্ষে ব্যবহার করা যায়।"

তবে সনুক হারখ্রোনিয়ে হান্টারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁর মতে, দারুল ইসলাম বনাম দারুল হারব বিষয়ে ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ অধ্যয়ন হান্টারের এই বাস্তববাদকে সমর্থন করে না। তিনি লেখেন:[১৮]

"তাত্ত্বিকভাবে, এমন কিছু দেশও 'দারুল ইসলাম'-এর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়, যা এক সময় মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল, যদিও বর্তমানে অমুসলিমদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। যেমন ব্রিটিশ এবং ডাচ উপনিবেশের সেই অঞ্চলগুলো যেখানে মুসলমানরা বসবাস করছে, সেগুলো ইসলামের এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এটি ভুল যে ডাব্লিউ. হান্টার এবং অন্যান্য ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এতে আনন্দ পেয়েছিলেন, ভাবলেন এই নীতি ভারতীয় মুসলমানদের বিদ্রোহকে অবৈধ করে তোলে। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা!

যদি এই নীতি ওই উপনিবেশগুলোকে দারুল হারব বা যুদ্ধের এলাকা হিসেবে গণ্য করত, যেমন ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে, তাহলে আইনি নিয়ম, যা অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নয়, মুসলমানদের কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতার অনুমতি নিয়েই যুদ্ধের কাজে অংশগ্রহণের অনুমতি দিত।

দারুল ইসলামের ভেতরে অমুসলিম শাসন এক অস্বাভাবিকতা, যা তখনই সহ্য করা যায়, যখন প্রতিক্রিয়া দেখানোর শক্তি নেই। যে দেশ দারুল ইসলামের সীমার বাইরে থাকে তা সম্পূর্ণরূপে দারুল হারব বা যুদ্ধের এলাকা, অর্থাৎ সুযোগ পেলেই জোরপূর্বক ইসলামের এলাকা হিসেবে রূপান্তর করার জন্য নির্ধারিত। প্রকৃত মূর্তিপূজকদের কাছে আত্মসমর্পণ কেবল আল্লাহ ও তাঁর নবীর প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমেই সম্ভব। যেসব ধর্ম ইসলাম স্বীকৃত করেছে, তারা মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনকর্তার কর্তৃত্ব মেনে চলবে।"

"In theory, there are also countries belonging to the 'Dar al-Islam' [ইসলামের ঘর] which are administered today by non-Muslims, yet which were historically dependent on Moslem domination. That is to say the territories of the British and Dutch Indies, inhabited by Muslim believers, which are considered as territories of Islam [দারুল ইসলাম]. Men such as W. Hunter and other English political personalities, abounding in rejoice, were in fact mistaken to imagine that this doctrine bestowed the character of illegal sedition upon the insurrection of Muslims against the English in British India. A vain illusion!

If doctrine situated these eastern colonies in the Territory of War [দারুল হারব] under the rule of a Protectorate, as is the case with colonial India under England and colonial Indonesia under the Netherlands, the statutory rule, which is not without exceptions, would allow Muslims to engage in warlike activities only with the permission of the leader of the Muslim community.

In the territory of Islam itself, the non-Muslim rule is an anomaly which should be suffered only so long as Islam is powerless to react. Every country which lies outside the boundaries of Dar al-Islam is Territory of War [দারুল হারব] in its entirety and this means: destined to be transformed by force into the territory of Islam, as soon as circumstances permit. For true pagans, submission can only be made in the form of conversion to the faith in Allah and his Prophet. Those who confess a religion recognized by Islam shall be confined to recognizing the authority of the Muslim State as the supreme government."

জিহাদ

[সম্পাদনা]

১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে সনুক হারখ্রোনিয়ে ডে গিডস নামের খ্যাতনামা ডাচ সাময়িকীতে "হলি ওয়ার মেড ইন জার্মানি" শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয় সংস্কৃতির নৈতিক দুর্যোগের তীব্র সমালোচনা করে লেখা হয়। হারখ্রোনিয়ে ১৯১৪ সালে ওসমানীয় সরকারের ঘোষিত জিহাদের জন্য জার্মানি ও তাদের প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতদের দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জার্মান প্রাচ্যবিদরা ইসলামী সমাজকে আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করেছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ ছিল এমন এক পরিস্থিতির ফলাফল যা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তিনি বলেন, মুসলমানরা অগ্রগতির সক্ষম এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুর্কিদের মতোই "ধর্মীয় শান্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা"র পক্ষে। তিনি জিহাদকে মধ্যযুগীয় প্রথা হিসেবে দেখতেন এবং মনে করতেন ১৯০৮ সালের বিপ্লব এই মধ্যযুগীয়তার অবসান ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, "খিলাফতের প্রতীক" (এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত জিহাদ) কেবল ইউরোপীয় চাপে পুনরুজ্জীবিত হয়। এই প্রবন্ধে আক্রমণের ফলে তাঁর বন্ধু কার্ল হাইনরিখ বেকার-এর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।[১৯]

তিনি লেখেন:

ইসলামের জন্য ভাগ্যের পরিহাস যে জিহাদ বা পবিত্র যুদ্ধের এই মতবাদ, যা একসময় এর গৌরব ও খ্যাতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আধুনিক সময়ে তা ইসলামের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে... যতক্ষণ না কোনো উল্লেখযোগ্য মুসলিম আলেম মধ্যযুগের এই [ইসলামী] আইনের অবসান কল্পনা করতে সাহস করেন না, এবং মুসলমানদের বড় অংশ অতীতের অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে, ততক্ষণ আমরা ইসলাম ও অন্য ধর্মগুলোর সম্পর্কের মূল্যায়নে জিহাদকে উপেক্ষা করতে পারি না... মুসলিম শিক্ষকদের ব্যাখ্যা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা ইসলাম কতটা অগ্রগতি করেছে তা বোঝায়। শেষ পর্যন্ত ইসলামকে জিহাদের মতবাদ ত্যাগ করতে হবে এবং কেবল শেষ সময়ে এক মসিহ বা মাহদী আগমন করবেন এই ক্ষতিহীন মতবাদ মেনে চলতে হবে। তখন ইসলাম অন্য ধর্মের চেয়ে শুধু আলাদা থাকবে অন্য কেতাব ও আচার অনুষ্ঠানের কারণে। তবে সেই সময় আসার আগে ইসলামের শেষ রাজনৈতিক দুর্গ ইউরোপীয় প্রভাবাধীন হবে এবং অনুন্নত মুসলমানরা শক্তিশালী ইউরোপীয় শাসনের অধীনে আসতে বাধ্য হবে।[২০]

শেষ বছরগুলো

[সম্পাদনা]
লেইডেনে সনুক হারখ্রোনিয়ের কবর

নেদারল্যান্ডসে ফিরে তিনি লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়-এ আরবি ভাষা, আচেহ ভাষা ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক কাজ প্রকাশ করতে থাকেন এবং আরব বিশ্ব ও ইসলাম ধর্ম বিষয়ক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের কাছেও তাঁর পরামর্শ চাওয়া হতো এবং তাঁর অনেক কাজ জার্মান, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। ১৯২৫ সালে ন্যাশনাল ইজিপশিয়ান ইউনিভার্সিটি, কায়রো থেকে তাঁকে অধ্যাপনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯২৭ সালে তিনি রেক্টর ম্যাগনিফিকাস ও অধ্যাপক পদ ছেড়ে দেন, তবে ১৯৩৬ সালে লেইডেনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উপদেষ্টা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।[২১]

অধ্যাপনার সময় ও পরে তিনি একজন প্রগতিশীল উপনিবেশিক উপদেষ্টা ও সমালোচক ছিলেন। নেদারল্যান্ডস ও ইস্ট ইন্ডিজের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গঠনের জন্য তাঁর সংস্কারমূলক দৃষ্টি ছিল সহযোগিতার নীতির ওপর ভিত্তি করে। এই সহযোগিতা অর্জন ও বিদ্যমান দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসানের জন্য তিনি স্থানীয় শাসক শ্রেণিকে পশ্চিমা শিক্ষার মাধ্যমে স্বশাসনের পক্ষে ছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি আহ্বান জানান: "ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের সংবিধানে জোরালো সংস্কার" যেখানে বলা হয় "নেটিভদের নৈতিক ও বৌদ্ধিক অধমতা ধারণা থেকে সরে আসতে হবে" এবং তাদের দিতে হবে "মুক্ত ও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোত্তম স্বায়ত্তশাসন"। নেদারল্যান্ডসের রক্ষণশীল গোষ্ঠী এর জবাবে উত্রেখট-এ বিকল্প উপনিবেশিক সিভিল সার্ভেন্ট স্কুল অর্থায়ন করে।[২১]

সূত্র

[সম্পাদনা]
ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে হোম যা লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়-কে দান করা হয়েছিল।

সনুক হারখ্রোনিয়ের ইসলাম সম্পর্কিত গবেষণা ও উপনিবেশ নীতি সংক্রান্ত প্রধান তথ্য কলোনি মন্ত্রণালয়-এর আর্কাইভে রয়েছে যা ন্যাশনাল আর্কাইভস, দ্য হেগে সংরক্ষিত। এই আর্কাইভে গভর্নর-জেনারেলের সব সিদ্ধান্ত, মন্ত্রীদের রিপোর্ট এবং সরকারি আইন ও বিধি রয়েছে। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় আর্কাইভ, জাকার্তা, রয়াল নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব সাউথইস্ট এশিয়ান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টাডিজ (কেআইটিএলভি), লেইডেন এবং লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার-এও তথ্য রয়েছে।[]

সনুক হারখ্রোনিয়ের চিঠিপত্র, আলোকচিত্র এবং আর্কাইভ লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার-এ সংরক্ষিত এবং ডিজিটাল কালেকশন-এর মাধ্যমে অনলাইনে পাওয়া যায়[২২]। তাঁর কিছু আলোকচিত্র খলিলি কালেকশন অব হজ অ্যান্ড দ্য আর্টস অব পিলগ্রিমেজ-এর অংশ।[২৩][২৪]

লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড (লেইডস ইউনিভারসিটেইটস ফন্ডস [nl]), বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের জন্য নিবেদিত, অবস্থিত 'সনুক হারখ্রোনিয়েহুইস'-এ, যা সনুক তাঁর বাড়ি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন।

চিত্রশালা

[সম্পাদনা]
  • ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (১৮৮৮)। মক্কা। খণ্ড ১। হেগ: এম. নাইহফ।
  • ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (১৮৮৯)। মক্কা। খণ্ড ২। হেগ: এম. নাইহফ।
  • ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (১৯০৬)। দি আচেহনিজ। খণ্ড ২। লেইডেন: ব্রিল।
  • ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (১৯১৩)। দ্য হোলি ওয়ার "মেড ইন জার্মানি"। নিউ ইয়র্ক: জি. পি. পুটনাম'স সন্স।
  • ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে (১৯১৬)। মোহাম্মেদানিজম: লেকচারস অন ইটস অরিজিন, ইটস রিলিজিয়াস অ্যান্ড পলিটিকাল গ্রোথ, অ্যান্ড ইটস প্রেজেন্ট স্টেট। নিউ ইয়র্ক: জি. পি. পুটনাম'স সন্স।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

নোট ও উদ্ধৃতি

[সম্পাদনা]
  1. Hurgronje, C. Snouck (Christiaan Snouck) (১৮৮০)। Het Mekkaansche feest। Robarts - University of Toronto। Leiden E.J. Brill।
  2. Algadri, Hamid (১৯৯৪)। Dutch Policy Against Islam and Indonesians of Arab Descent in Indonesia। LP3ES। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৭৯৮৩৯১৩৪৭
  3. "Snouck Hurgronje, Seorang Agnostik & Munafik Tulen (bag 1)" (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৯ মে ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪
  4. Carvalho, Christina (২০১০)। Christiaan Snouck Hurgronje: biography and perception (অভিসন্দর্ভ)। Universiteit van Amsterdam। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪
  5. "C. Snouck Hurgronje (1857–1936)"। Royal Netherlands Academy of Arts and Sciences। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুলাই ২০১৫
  6. 1 2 3 4 5 Knaap, G.J. "Godsdienstpolitiek in Nederlands-Indië, in het bijzonder ten aanzien van de Islam, 1816–1942" Ongoing academic research project (ING, Institute for Dutch History, 2010) Online:
  7. Van Koningsveld, P.S. Snouck Hurgronje alias Abdoel Ghaffar: enige historisch-kritische kanttekeningen, (Leiden, 1982)
  8. Van Koningsveld, P.S. Snouck Hurgronje's "Izhaar oel-Islam": een veronachtzaamd aspect van de koloniale geschiedenis, (Leiden, 1982)
  9. ইংরেজি অনুবাদ জে.এইচ. মোনাহান, ব্রিল: লেইডেন প্রভৃতি ২০০৭ (প্রিন্ট পুনঃপ্রকাশ), পৃষ্ঠা vii
  10. দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড, খণ্ড ১৯ (১৯২৯), পৃষ্ঠা ২২১–২৩৫, এখানে: পৃষ্ঠা ২৩২–৩
  11. শাহাবনামা, লাহোর: সঙ্গ-ই-মিল পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৭৬
  12. সনুক হারখ্রোনিয়ে এন জেইন ক্রিটিসি, ডে গিডস, খণ্ড ১৪৩ (১৯৮০), পৃষ্ঠা ৮০৭–১৩, এখানে পৃষ্ঠা ৮১০
  13. এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড এথিকস, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫১৪, কলাম b
  14. দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড, খণ্ড ১৯ (১৯২৯), পৃষ্ঠা ২২১।
  15. 1 2 দেখুন: ক্রিশ্চিয়ান সনুক হারখ্রোনিয়ে, „আউস আরাবিয়েন,“ আলগেমেইনে সাইটুং, ১৬ নভেম্বর ১৮৮৫, https://digipress.digitale-sammlungen.de/view/bsb00085480_00281_u001/1
  16. 1 2 3 4 "মক্কা: এক ডাচ গুপ্তচরের গল্প"। বিবিসি বাংলা। ২০২৪।
  17. দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস, ৩য় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১২২, লন্ডন: ট্রুবনার অ্যান্ড কোম্পানি, ১৮৭৬
  18. রেভ্যু দু মন্ড মুসলমান, খণ্ড XIV সংখ্যা ৬ (জুন ১৯১১), পৃষ্ঠা ৩৯০, ৩৯২।
  19. জুর্শার, এরিক-জান। জিহাদ অ্যান্ড ইসলাম ইন ওয়ার্ল্ড ওয়ার আই। লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। পৃ. ২৯।
  20. দ্য আচেহনিজ, ইংরেজি অনুবাদ এ.ডাব্লিউ.এস. ও'সালিভান, লেইডেন: ব্রিল, ১৯০৬, খণ্ড II, পৃষ্ঠা ৩৪৭, ৩৪৮, ৩৫১।
  21. 1 2 ড্রিউস, জি.ডাব্লিউ.জে."সনুক হারখ্রোনিয়ে, ক্রিশ্চিয়ান (১৮৫৭–১৯৩৬)", ইন "বায়োগ্রাফিশ উডেনবুক ফান নেদারল্যান্ড।" গ্যাব্রিয়েলস, এ.জে.সি.এম. (প্রকাশক: আইএনজি, ইনস্টিটিউট ফর ডাচ হিস্ট্রি, দ্য হেগ, ২০০৮) অনলাইন:
  22. সনুক হারখ্রোনিয়ে পেপারস, ডিজিটাল কালেকশন (লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার)
  23. "মক্কার আলোকচিত্র"খলিলি কালেকশন। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২১
  24. "মসজিদুল হারামের আলোকচিত্র"খলিলি কালেকশন। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২১

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • ইব্রাহিম, আলফিয়ান। "আচেহ অ্যান্ড দ্য পেরাং সাবিল।" ইন্দোনেশিয়ান হেরিটেজ: আরলি মডার্ন হিস্ট্রি। খণ্ড ৩, সম্পাদনা: অ্যান্থনি রেইড, সিয়ান জে এবং টি. দুরাইরাজু। সিঙ্গাপুর: এডিশনস দিদিয়ার মিলেট, ২০০১। ১৩২–১৩৩
  • রেইড, অ্যান্থনি (২০০৫)। অ্যান ইন্দোনেশিয়ান ফ্রন্টিয়ার: আচেহনিজ অ্যান্ড আদার হিস্টরিজ অব সুমাত্রাসিঙ্গাপুর: সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। আইএসবিএন ৯৯৭১-৬৯-২৯৮-৮ {{বই উদ্ধৃতি}}: |আইএসবিন= মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  • ভিকার্স, এড্রিয়ান (২০০৫)। আ হিস্ট্রি অব মডার্ন ইন্দোনেশিয়া। নিউ ইয়র্ক: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। পৃ. ১০–১৩আইএসবিএন ০-৫২১-৫৪২৬২-৬ {{বই উদ্ধৃতি}}: |আইএসবিন= মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  • ল্য তুর দ্যু মন্ড – নুভো জার্নাল দে ভয়াজ "ভয়াজ আ লা মক্কা" রিভিউ নং ১৬৭৫ প্রকাশিত ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩ হ্যাচেট প্যারিস

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]