কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া
| কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া | |
|---|---|
| বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস | |
| মহাজগত: | ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) |
| পর্ব: | Actinomycetota |
| শ্রেণি: | Actinomycetia |
| বর্গ: | Mycobacteriales |
| পরিবার: | Corynebacteriaceae |
| গণ: | Corynebacterium (ক্রুস ১৮৮৬) লেহমান ও নিউম্যান ১৮৯৬ (অনুমোদিত তালিকা ১৯৮০)[১] |
| প্রজাতি: | C. diphtheriae |
| দ্বিপদী নাম | |
| Corynebacterium diphtheriae (ক্রুস ১৮৮৬) লেহমান ও নিউম্যান ১৮৯৬ (অনুমোদিত তালিকা ১৯৮০)[২] | |
কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া (ইংরেজি: Corynebacterium diphtheriae)[ক] একটি গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া প্যাথোজেন যা ডিপথেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে।[৩] একে ক্লেবস-লফলার ব্যাসিলাস নামেও ডাকা হয়, কারণ ১৮৮৪ সালে জার্মান ব্যাকটেরিয়াবিদ অ্যাডুইন ক্লেবস (১৮৩৪-১৯১৩) ও ফ্রিডরিশ লফলার (১৮৫২-১৯১৫) এটি আবিষ্কার করেছিলেন।[৪] এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত নিরীহ থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়াফাজ দ্বারা সংক্রমিত হলে এটি একটি বিষ উৎপন্ন করে।[৫] এই বিষই ডিপথেরিয়া রোগের কারণ।[৬] ডিপথেরিয়া রোগে ব্যাকটেরিয়া দেহের শ্লৈষ্মিক স্তরে আটকে গিয়ে অনুপ্রবেশ করে, প্রধানত শ্বাসতন্ত্রকে প্রভাবিত করে এবং এক্সোটক্সিন নিঃসরণ ঘটায়।[৭] এই বিষ ত্বকের ক্ষতস্থানে স্থানীয় প্রভাব ফেলে, আর গুরুতর সংক্রমণে অন্যান্য অঙ্গ-তন্ত্রে বিপাকীয় ও প্রোটিনবিয়োজনজনিত প্রভাব সৃষ্টি করে।[৭] শিশুমৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত এই রোগটি ১৯১০-এর দশকে ডিপথেরিয়া টিকার ব্যাপক প্রয়োগের ফলে প্রায় সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়েছে।[৮]
ডিটিএপি টিকার উন্নয়নের ফলে ডিপথেরিয়া এখন আর তেমন সংক্রমিত হয় না। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যার বেশিরভাগ টিকাবিহীন, সেখানে এখনও ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।[৯]
শ্রেণিবিন্যাস
[সম্পাদনা]এর চারটি উপপ্রজাতি স্বীকৃত: সি. ডি. মাইটিস, সি. ডি. ইন্টারমিডিয়াস, সি. ডি. গ্রেভিস এবং সি. ডি. বেলফান্টি। উপপ্রজাতিগুলো কলোনির মোরফোলজি ও জৈব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে সামান্য ভিন্ন, যেমন নির্দিষ্ট পুষ্টি বিপাকের ক্ষমতা। সব কটিই বিষাক্ত (তাই ডিপথেরিয়া সৃষ্টি করে) বা অ-বিষাক্ত হতে পারে।
স্ট্রেইন সাবটাইপিং-এর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতির তুলনা করে উপপ্রজাতিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।[১০] এই পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের উৎস সনাক্ত করতেও সাহায্য করে। তবে সি. ডিপথেরিয়া-এর সাবটাইপিং-এর ক্ষেত্রে স্ট্রেইন শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য সম্পদের অভাবের কারণে দরকারী বা সঠিক শ্রেণিবিন্যাস সীমিত।[১১]
বিষ
[সম্পাদনা]সি. ডিপথেরিয়া ডিপথেরিয়া বিষ উৎপন্ন করে, যা এলংগেশন ফ্যাক্টর ইএফ-২ নিষ্ক্রিয় করে পোষক কোষের প্রোটিনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে ফ্যারিঞ্জাইটিস ও গলায় 'সিউডোমেমব্রেন' সৃষ্টি হয়। শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়াফাজ দ্বারা সংক্রমিত স্ট্রেইনগুলোই বিষাক্ত হয়।[১২][১৩]
ডিপথেরিয়া বিষ জিনটি ব্যাকটেরিওফাজের মাধ্যমে বিষাক্ত স্ট্রেইনগুলোর ক্রোমোজোমে সংহত হয়।[১৪]
ডিপথেরিয়া বিষ নিয়ন্ত্রক প্রধানত লৌহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি লক্ষ্য ডিএনএ বাঁধাই সক্রিয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় সহকারক হিসাবে কাজ করে। মাধ্যমের লৌহের স্বল্প ঘনত্বে বিষ উৎপাদিত হয়। উচ্চ লৌহ ঘনত্বে লৌহ অণু বিটা ব্যাকটেরিওফাজের অ্যাপোরিপ্রেসর-এর সাথে যুক্ত হয়, যা টক্স জিন বহন করে। লৌহের সাথে যুক্ত হলে অ্যাপোরিপ্রেসর বিষ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।[১৫] এলেক'স টেস্ট দ্বারা জীবাণুটির ডিপথেরিয়া বিষ উৎপাদনের ক্ষমতা যাচাই করা হয়।[১৬]
সনাক্তকরণ
[সম্পাদনা]সি. ডিপথেরিয়া সনাক্ত করতে গ্রাম স্টেইন প্রয়োগ করা হয়, যা গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া, অত্যন্ত বহুরূপী অণুজীব দেখায়, প্রায়শই চীনা অক্ষরের মতো আকৃতির। অ্যালবার্ট'স স্টেইন ও পন্ডার'স স্টেইন-এর মতো দাগ মেরু অঞ্চলে গঠিত মেটাক্রোম্যাটিক কণিকা প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়। এগুলো বাবেস-আর্নস্ট কণিকা নামে পরিচিত, আবিষ্কারক পল আর্নস্ট ও ভিক্টর বাবেস-এর নামানুসারে। লফলারের মিডিয়াম-এর মতো সমৃদ্ধকরণ মাধ্যম সি. ডিপথেরিয়া-কে অগ্রাধিকারভিত্তিকে বাড়তে দেয়। এরপর টেলুরাইট অ্যাগার ব্যবহার করে সমস্ত কোরিনেব্যাকটেরিয়া টেলুরাইটকে ধাতব টেলুরিয়ামে রূপান্তর করতে পারে। এই রূপান্তর অধিকাংশ কোরিনেব্যাকটেরিয়াম প্রজাতির ক্ষেত্রে বাদামী কলোনি দ্বারা বা সি. ডিপথেরিয়া কলোনির চারপাশে কালো বলয় দ্বারা নির্দেশিত হয়। অণুজীবটি ক্যাটালেজ উৎপন্ন করে কিন্তু ইউরিয়েজ নয়, যা এটিকে কোরিনেব্যাকটেরিয়াম আলসারান্স থেকে পৃথক করে। সি. ডিপথেরিয়া পাইরাজিনামাইডেজ উৎপন্ন করে না, যা কোরিনেব্যাকটেরিয়াম স্ট্রিয়াটাম ও কোরিনেব্যাকটেরিয়াম জেইকিয়াম থেকে ভিন্ন।[১৭]
রোগসৃষ্টিকারী ক্ষমতা
[সম্পাদনা]
কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া ডিপথেরিয়া রোগের কারণ। ব্যাকটেরিওফাজ ব্যাকটেরিয়ার কোষে একটি জিন প্রবর্তন করে স্ট্রেইনকে বিষাক্ত করে তোলে। এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত নয় এমন স্ট্রেইনগুলো নিরীহ।[৬] সি. ডিপথেরিয়া একটি দণ্ডাকার, গ্রাম-ধনাত্মক, স্পোরবিহীন ও অচলনশীল ব্যাকটেরিয়া।[১৮] এটি প্রধানত মানুষকেই সংক্রমিত করে। ধারণা করা হয়, মানুষ এই রোগজীবাণুর প্রাকৃতিক আধার। তবে অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে প্রাণীদের মধ্যে সি. ডিপথেরিয়া পাওয়া গেছে, শুধুমাত্র দুটি কুকুর ও দুটি ঘোড়ার ক্ষেত্রে সংক্রমণ বিষাক্ত ছিল।[১৯]
এই রোগ প্রধানত ক্রান্তীয় অঞ্চল ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায়। অনাক্রম্যতাহীন ব্যক্তি, অপর্যাপ্ত টিকাপ্রাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও টিকাবিহীন শিশুদের সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকে। শ্বাসযন্ত্রের ফোঁটার মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমিত হয়। কম সাধারণভাবে খোলা ঘা বা দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করেও ছড়াতে পারে। রোগের সাধারণ পর্যায়ে শরীরের সর্বাধিক প্রভাবিত অংশ উপরের শ্বাসতন্ত্র। নাসাগ্রসনিরন্ধ্রীয় অঞ্চলে ঘন ধূসর আস্তরণ জমে শ্বাস-প্রশ্বাস ও গিলতে কষ্ট হয়। লক্ষণ লোপ পাওয়ার পরেও রোগটি কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে সংক্রামক থাকে, কখনও এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।[২০]
সি. ডিপথেরিয়া-র প্রধান প্রবেশপথ নাক, টনসিল ও গলা। আক্রান্ত ব্যক্তির গলা ব্যথা, দুর্বলতা, জ্বর ও গ্রন্থি ফোলা অনুভব করতে পারেন। শ্বাসকষ্টের মতো মারাত্মক লক্ষণও দেখা দিতে পারে।[২১] চিকিৎসা না করালে ডিপথেরিয়া বিষ রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে কিডনি, স্নায়ু ও হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি করতে পারে। অত্যন্ত বিরল জটিলতার মধ্যে রয়েছে শ্বাসরোধ ও আংশিক পক্ষাঘাত। ডিটিএপি টিকা এই রোগ প্রতিরোধে কার্যকর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি শিক্ষা ও কিছু পেশায় অংশগ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলক (ব্যতিক্রম প্রযোজ্য)।[৭]
সি. ডিপথেরিয়া সংক্রমণের প্রথম ধাপে বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়া শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে বসতি স্থাপন করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত উপরের শ্বাসনালীর শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে ঘটে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রধানত টনসিল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। সংক্রমণের কিছু অস্বাভাবিক স্থানের মধ্যে রয়েছে হৃৎপিণ্ড, স্বরযন্ত্র, শ্বাসনালী, শ্বাসনালিকা এবং মুখগহ্বরের সামনের অংশ যেমন গালের ভেতরের আবরণ, ঠোঁট, জিহ্বা, কঠিন ও কোমল তালু।[২২] শ্বাসতন্ত্রের নির্দিষ্ট স্থানে বসতি স্থাপনে ব্যাকটেরিয়ার একাধিক রোগসৃষ্টিকারী উপাদান কাজ করে, যার অনেকাংশ এখনও সম্পূর্ণ বোঝা যায়নি। ইন ভিট্রো গবেষণায় ডিআইপি০৭৩৩ নামক বহুকার্যকরী প্রোটিনের ভূমিকা দেখা গেছে, যা ব্যাকটেরিয়ার পোষক কোষে আটকানো ও ফাইব্রোজেন-বাঁধাইয়ের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। মিউট্যান্ট স্ট্রেইনে আটকানো ও আবরণী অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বহিঃকোষীয় ম্যাট্রিক্সের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে লুকিয়ে থাকতে ব্যাকটেরিয়াকে সাহায্য করে।[২৩]
ডিপথেরিয়ার ক্ষত প্রায়শই ফাইব্রিন, ব্যাকটেরিয়ার কোষ ও প্রদাহজনক কোষ দিয়ে গঠিত সিউডোমেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ডিপথেরিয়া বিষ প্রোটিনবিয়োজনের মাধ্যমে দুটি খণ্ডে বিভক্ত হয়: এন-টার্মিনাল খণ্ড এ (উত্প্রেরক অংশ) এবং খণ্ড বি (ঝিল্লিপ্রবেশী ও গ্রাহক-বাঁধাই অংশ)। খণ্ড এ ইএফ-২-এর এনএডি+ -নির্ভর এডিপি-রাইবোজাইলেশন ত্বরান্বিত করে, ফলে ইউক্যারিওটিক কোষে প্রোটিন সংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত হয়। খণ্ড বি কোষ পৃষ্ঠের গ্রাহকের সাথে যুক্ত হয়ে খণ্ড এ-কে কোষের ভেতরে প্রবেশে সাহায্য করে।[২২]
একবার ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট স্থানে জমা হলে সেখানে সংখ্যাবৃদ্ধি করে প্রদাহজনক সিউডোমেমব্রেন তৈরি করে। গলবিলের ডিপথেরিয়ায় সাধারণত টনসিল ও আনুষঙ্গিক কাঠামো, অগ্রলম্বিকা, কোমল তালু ও নাসাগ্রসনিরন্ধ্রীয় অঞ্চলে সিউডোমেমব্রেন ছড়ায়। উপরের শ্বাসতন্ত্রের ডিপথেরিয়ায় গ্রসনিরন্ধ্র, স্বরযন্ত্র, শ্বাসনালী ও শ্বাসনালিকায় এটি বৃদ্ধি পায়। সিউডোমেমব্রেন প্রথমে সাদা থাকে, পরে মৃত আবরণী কোষের কারণে মলিন ধূসর ও শক্ত হয়ে ওঠে।[২২]
শ্বাসনালী বা শ্বাসনালিকায় সিউডোমেমব্রেন গঠন বায়ুপ্রবাহের দক্ষতা কমায়। সময়ের সাথে বায়ুপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ফুসফুসীয় থলিতে গ্যাসের বিনিময় হ্রাস পায় এবং রক্তসংবহনতন্ত্রে অক্সিজেনের আংশিক চাপ কমে যায়, যার ফলে সায়ানোসিস ও শ্বাসরোধ হতে পারে।[২২]
সংক্রমণ
[সম্পাদনা]শ্বাসযন্ত্রের ফোঁটার মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমিত হয় (যেমন কাশি বা হাঁচি)। কম সাধারণভাবে খোলা ঘা বা দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করেও ছড়াতে পারে।[১১]
টিকা
[সম্পাদনা]ডিটিএপি টিকা এই রোগ প্রতিরোধে কার্যকর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি শিক্ষা ও কিছু পেশায় অংশগ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলক (ব্যতিক্রম প্রযোজ্য)।
কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া-র বিরুদ্ধে সুরক্ষাদানকারী টক্সয়েড টিকার উদ্ভাবন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে। ১৮০০-এর দশকের শুরুতে টিকা প্রথম তৈরি হলেও ১৯১০-এর দশকের আগে এটি ব্যাপকভাবে সহজলভ্য হয়নি। জাতীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরীক্ষা জরিপ (এনএইচএএনইএস) অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিকার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে "১২ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের ৮০ শতাংশ ডিপথেরিয়ার বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা" অর্জন করেছে।[২৪]
রোগনির্ণয়
[সম্পাদনা]শ্বাসতন্ত্রীয় সি. ডিপথেরিয়া রোগনির্ণয় ক্লিনিকাল উপস্থাপনার ভিত্তিতে করা হয়, অন্যদিকে অ-শ্বাসতন্ত্রীয় ডিপথেরিয়া ক্লিনিকালি সন্দেহ করা না গেলে পরীক্ষাগার পরীক্ষার উপর বেশি নির্ভর করতে হয়। কালচারিং সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি যা ডিপথেরিয়া বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত বা নাকচ করে। সম্ভাব্য সংক্রমিত স্থান, ক্ষত ও ঘা থেকে সোয়াব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।[২৫]
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
[সম্পাদনা]মানবদেহে কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া-র বিষাক্ত স্ট্রেইন প্রবেশ করলে এটি গলায় ক্ষতিকর বিষ নিঃসরণ করে। অ্যান্টিটক্সিন আরও ক্ষতি প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অ্যান্টিবায়োটিকও দেয়া হয়। ডিপথেরিয়ার জন্য সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে রয়েছে পেনিসিলিন বা এরিথ্রোমাইসিন। ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার পর কমপক্ষে ৪৮ ঘন্টা পৃথক থাকতে হয়। ব্যক্তিটি আর সংক্রামক নয় তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া নির্মূল হয়েছে কিনা যাচাই করা হয়। এরপর রোগের আরও সংক্রমণ রোধে টিকা দেওয়া হয়।[২৬]
ডিপথেরিয়া টিকার ব্যাপক ব্যবহার সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে এবং রোগের প্রাথমিক প্রতিরোধ সম্ভব করেছে। অধিকাংশ মানুষ ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার ও পারটুসিসের বিরুদ্ধে সুরক্ষাদানকারী ৩-ইন-১ টিকা পায়, যা সাধারণত ডিটিএপি বা টিডিএপি নামে পরিচিত। ডিটিএপি টিকা শিশুদের জন্য, আর টিডিএপি কিশোর-কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।[৯]
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুর অভিভাবকদের ডিটিএপি টিকার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা সাধারণত পাঁচটি ডোজের সিরিজ। এই টিকাগুলো বাহু বা উরুতে ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং শিশুর বয়স ২ মাস, ৪ মাস, ৬ মাস, ১৫-১৮ মাস ও ৪-৬ বছর হলে প্রয়োগ করা হয়।[৯]
ডিপথেরিয়া টিকার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে "হালকা জ্বর, খিটখিটে ভাব, তন্দ্রা বা ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা"। বিরল ক্ষেত্রে ডিটিএপি টিকা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।[৯]
জিনতত্ত্ব
[সম্পাদনা]সি. ডিপথেরিয়া-র জিনোম ২.৫ মেগা বেস পেয়ারের একটি বৃত্তাকার ক্রোমোজোম নিয়ে গঠিত, যাতে কোনও প্লাজমিড নেই।[২৭] এর জিনোমে উৎপত্তিস্থলের কাছে জি+সি টার্মিনাসের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেশি।
কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া জিনোমে কোন প্লাজমিড নেই। ক্রোমোজোমের উচ্চ জি+সি উপাদান এর উচ্চ জিনগত বৈচিত্র্যে অবদান রাখে। গুয়ানিন ও সাইটোসিনের উচ্চ উপাদান ব্যাকটেরিয়ার সমগ্র জিনোম জুড়ে সমান নয়। ~৭৪০ কিলোবেস অঞ্চলে প্রতিলিপির টার্মিনাস জি+সি উপাদান হ্রাস করে। অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ায় টার্মিনাসের কাছে জি+সি উপাদান কমতে দেখা গেলেও সি. ডিপথেরিয়া-র জিনোমে এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে স্পষ্ট। ক্রোমোজোমীয় প্রতিলিপি এই ঘটনার একটি কারণ।[২১]
টীকা
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Parte AC। "Corynebacterium"। LPSN।
- ↑ Parte AC। "Corynebacterium"। LPSN।
- ↑ Hoskisson PA (জুন ২০১৮)। "Microbe Profile: Corynebacterium diphtheriae – an old foe always ready to seize opportunity"। Microbiology। ১৬৪ (6): ৮৬৫–৮৬৭। ডিওআই:10.1099/mic.0.000627। পিএমসি 6097034। পিএমআইডি 29465341।
- ↑ Barksdale L (ডিসেম্বর ১৯৭০)। "Corynebacterium diphtheriae and its relatives"। Bacteriological Reviews। ৩৪ (4): ৩৭৮–৪২২। ডিওআই:10.1128/br.34.4.378-422.1970। পিএমসি 378364। পিএমআইডি 4322195।
- ↑ Ott L, Möller J, Burkovski A (মার্চ ২০২২)। "Interactions between the Re-Emerging Pathogen Corynebacterium diphtheriae and Host Cells"। International Journal of Molecular Sciences। ২৩ (6): ৩২৯৮। ডিওআই:10.3390/ijms23063298। পিএমসি 8952647। পিএমআইডি 35328715।
- 1 2 Muthuirulandi Sethuvel DP, Subramanian N, Pragasam AK, Inbanathan FY, Gupta P, Johnson J, এবং অন্যান্য (২০১৯)। "Insights to the diphtheria toxin encoding prophages amongst clinical isolates of Corynebacterium diphtheriae from India"। Indian Journal of Medical Microbiology। ৩৭ (3): ৪২৩–৪২৫। ডিওআই:10.4103/ijmm.IJMM_19_469। পিএমআইডি 32003344।
- 1 2 3 Hadfield TL, McEvoy P, Polotsky Y, Tzinserling VA, Yakovlev AA (ফেব্রুয়ারি ২০০০)। "The pathology of diphtheria"। The Journal of Infectious Diseases। ১৮১ (Suppl 1): S১১৬ – S১২০। ডিওআই:10.1086/315551। পিএমআইডি 10657202।
- ↑ Clarke KE, MacNeil A, Hadler S, Scott C, Tiwari TS, Cherian T (অক্টোবর ২০১৯)। "Global Epidemiology of Diphtheria, 2000-20171"। Emerging Infectious Diseases। ২৫ (10): ১৮৩৪–১৮৪২। ডিওআই:10.3201/eid2510.190271। পিএমসি 6759252। পিএমআইডি 31538559।
- 1 2 3 4 "Diphtheria – Symptoms and causes"। Mayo Clinic (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২২।
- ↑ Shariat N, Dudley EG (জানুয়ারি ২০১৪)। "CRISPRs: molecular signatures used for pathogen subtyping"। Applied and Environmental Microbiology। ৮০ (2): ৪৩০–৪৩৯। বিবকোড:2014ApEnM..80..430S। ডিওআই:10.1128/AEM.02790-13। পিএমসি 3911090। পিএমআইডি 24162568।
- 1 2 Sangal V, Hoskisson PA (সেপ্টেম্বর ২০১৬)। "Evolution, epidemiology and diversity of Corynebacterium diphtheriae: New perspectives on an old foe" (পিডিএফ)। Infection, Genetics and Evolution। ৪৩: ৩৬৪–৭০। বিবকোড:2016InfGE..43..364S। ডিওআই:10.1016/j.meegid.2016.06.024। পিএমআইডি 27291708। ১৩ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুলাই ২০২৫।
- ↑ Freeman VJ (জুন ১৯৫১)। "Studies on the virulence of bacteriophage-infected strains of Corynebacterium diphtheriae"। Journal of Bacteriology। ৬১ (6): ৬৭৫–৬৮৮। ডিওআই:10.1128/JB.61.6.675-688.1951। পিএমসি 386063। পিএমআইডি 14850426।
- ↑ Freeman VJ, Morse IU (মার্চ ১৯৫২)। "Further observations on the change to virulence of bacteriophage-infected a virulent strains of Corynebacterium diphtheria"। Journal of Bacteriology। ৬৩ (3): ৪০৭–৪১৪। ডিওআই:10.1128/JB.63.3.407-414.1952। পিএমসি 169283। পিএমআইডি 14927573।
- ↑ Mokrousov I (জানুয়ারি ২০০৯)। "Corynebacterium diphtheriae: genome diversity, population structure and genotyping perspectives"। Infection, Genetics and Evolution। ৯ (1): ১–১৫। বিবকোড:2009InfGE...9....1M। ডিওআই:10.1016/j.meegid.2008.09.011। পিএমআইডি 19007916।
- ↑ Nester EW, Anderson DG, Roberts CE, Pearsall NN, Nester MT (২০০৪)। Microbiology: A Human Perspective (Fourth সংস্করণ)। Boston: McGraw-Hill Education। আইএসবিএন ৯৭৮-০-০৭-২৯১৯২৪-০।
- ↑ Breton D (ডিসেম্বর ১৯৯৪)। "[Non-toxic Corynebacterium diphtheriae septicemia with endocarditis in an earlier healthy adult. First case and review of the literature]"। Presse Médicale (French ভাষায়)। ২৩ (40): ১৮৫৯–১৮৬১। পিএমআইডি 7899317।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক) - ↑ "UK Standards for Microbiology Investigations – Identification of Corynebacterium species" (পিডিএফ)। ১২ ডিসেম্বর ২০২৩।
- ↑ "Diphtheria Infection | Home | CDC"। www.cdc.gov (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১০ এপ্রিল ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৭ নভেম্বর ২০১৭।
- ↑ Tyler R, Rincon L, Weigand MR, Xiaoli L, Acosta AM, Kurien D, এবং অন্যান্য (আগস্ট ২০২২)। "Toxigenic Corynebacterium diphtheriae Infection in Cat, Texas, USA"। Emerging Infectious Diseases। ২৮ (8): ১৬৮৬–১৬৮৮। ডিওআই:10.3201/eid2808.220018। পিএমসি 9328917। পিএমআইডি 35876749।
- ↑ "Diphtheria"। MedlinePlus। U.S. National Library of Medicine। সংগ্রহের তারিখ ২৭ নভেম্বর ২০১৭।
- 1 2 Cerdeño-Tárraga, A. M.; Efstratiou, A.; Dover, L. G.; Holden, M. T. G.; Pallen, M.; Bentley, S. D.; Besra, G. S.; Churcher, C.; James, K. D.; De Zoysa, A.; Chillingworth, T.; Cronin, A.; Dowd, L.; Feltwell, T.; Hamlin, N. (১৫ নভেম্বর ২০০৩)। "The complete genome sequence and analysis of Corynebacterium diphtheriae NCTC13129"। Nucleic Acids Research। ৩১ (22): ৬৫১৬–৬৫২৩। ডিওআই:10.1093/nar/gkg874। আইএসএসএন 0305-1048। পিএমসি 275568। পিএমআইডি 14602910।
- 1 2 3 4 Sharma NC, Efstratiou A, Mokrousov I, Mutreja A, Das B, Ramamurthy T (ডিসেম্বর ২০১৯)। "Diphtheria"। Nature Reviews. Disease Primers। ৫ (1): ৮১। ডিওআই:10.1038/s41572-019-0131-y। পিএমআইডি 31804499। এস২সিআইডি 208737335।
- ↑ Antunes CA, Sanches dos Santos L, Hacker E, Köhler S, Bösl K, Ott L, এবং অন্যান্য (মার্চ ২০১৫)। "Characterization of DIP0733, a multi-functional virulence factor of Corynebacterium diphtheriae"। Microbiology। ১৬১ (Pt 3): ৬৩৯–৬৪৭। ডিওআই:10.1099/mic.0.000020। পিএমআইডি 25635272।
- ↑ Stratton K, Ford A, Rusch E, Clayton EW, এবং অন্যান্য (Committee to Review Adverse Effects of Medicine) (২৫ আগস্ট ২০১১)। Diphtheria Toxoid–, Tetanus Toxoid–, and Acellular Pertussis–Containing Vaccines (ইংরেজি ভাষায়)। National Academies Press (US)।
- ↑ "Diagnosis, Treatment, and Complications | CDC"। www.cdc.gov (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ১৮ নভেম্বর ২০২২।
- ↑ "Diphtheria: Causes, Symptoms, Treatment & Prevention"। Cleveland Clinic। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২২।
- ↑ Cerdeño-Tárraga AM, Efstratiou A, Dover LG, Holden MT, Pallen M, Bentley SD, এবং অন্যান্য (নভেম্বর ২০০৩)। "The complete genome sequence and analysis of Corynebacterium diphtheriae NCTC13129"। Nucleic Acids Research। ৩১ (22): ৬৫১৬–৬৫২৩। ডিওআই:10.1093/nar/gkg874। পিএমসি 275568। পিএমআইডি 14602910।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- CoryneRegNet—কোরিনব্যাকটেরিয়াল ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর ও নিয়ামক নেটওয়ার্কের ডাটাবেস
- Corynebacterium diphtheriae genome
- BacDive – ব্যাকটেরিয়াল ডাইভারসিটি মেটাডাটাবেজে কোরিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া-র আদি স্ট্রেইন ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে