বিষয়বস্তুতে চলুন

কেলাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সাদা চিনির কেলাস

কেলাস কঠিন পদার্থের একটি বিশেষ রূপ। যে সকল কঠিন পদার্থের কণাগুলি কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে সজ্জিত থাকে, তাদেরকে দানাদার পদার্থ বলা হয় (crystalline)। এই জাতীয় পদার্থের অণুগুলি একটি সুনির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক রূপ লাভ করে। সুনির্দিষ্ট ও সুষম জ্যামিতিক গঠন বিশিষ্ট সূক্ষ্ম প্রান্ত যুক্ত সমতল পৃষ্ঠ দেশ দ্বারা সীমাবদ্ধ কঠিন বস্তুই কেলাস।[] এই জাতীয় পদার্থকে সাধারণভাবে কেলাসাকার পদার্থ বলা হয়। পদার্থের বিশেষ ধরনের আণুবীক্ষণিক বিন্যাসকে বলা হয় কেলাস গঠনবিন্যাস।

ছোটো ছোটো কেলাসকণাগুলি একত্রিত হয়ে কখনো কখনো একই আকারের বড় কেলাস তৈরি করে। কেলাস বিভিন্ন রঙের হতে পারে। বিষয়টি নির্ভর করে এর উপাদানের উপর।

পানির উপস্থিতির ভিত্তিতে কেলাসের প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]

কেলাসে পানি আছে কি নাই, তার উপর নির্ভর করে কেলাসকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

অনার্দ্র কেলাস

[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের মূল উপাদানের সাথে কোনো পানির অণু থাকে না৷

সোদক কেলাস

[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাস তৈরির ক্ষেত্রে কেলাসের মূল উপাদানের সাথে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক পানির অণু থাকে। এই পানিকে কেলাস-পানি বলা হয়।যেমনঃ CuSO4.5H2O (তুঁতে)-এর মধ্যে 5H2O হলো কেলাস-পানি। মূলত ওই পাণির অণু না থাকলে কেলাস তৈরিই হবে না। এমন কি দেখা যায়, এই জাতীয় কোন কেলাস থেকে পানির অণু সরিয়ে নিলে কেলাসিত রূপ নষ্ট হয়ে যায়।

কণার সজ্জা অনুসারে কেলাসের প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]

কেলাসের ভিতরের কণাগুলির সজ্জা অনুসারে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

একক কেলাসাকার

[সম্পাদনা]

এই সকল কেলাস একই জাতীয় কেলাসকণা নিয়ে গঠিত হয়।

বহু কেলাসাকার

[সম্পাদনা]

এই সকল কেলাস একাধিক ধরনের কেলাসাকার কণা মিলিত হয়ে গঠিত হয়। এদেরকে বলা হয় বহু-কেলাসাকার পদার্থ। অধিকাংশ ধাতব পদার্থ, মাটির তৈরি বিভিন্ন উপকরণে এই জাতীয় কেলাস লক্ষ্য করা যায়।

কেলাসের জালক গঠনের পদ্ধতি অনুসারে কেলাসের প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]

কেলাসের ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক বিন্যাসে কতকগুলি বিন্দু কল্পনা করা হয়। এই বিন্দুগুলির অবস্থান এবং দিকনির্দেশনা অনুসারে কেলাসের কণাগুলি অবস্থান করে। এই বিন্যাসকে বলা হয় কেলাসের জালক ব্যবস্থা (lattice systems)। এই পদ্ধতিতে ত্রিমাত্রিক বিন্যাসের বিন্দুগুলিকে যুক্ত করলে কেলাসের আকার তৈরি হয়। এইভাবে যখন কোনো একক কেলাসখণ্ড তৈরি হয়, তখন তাকে বলা হয় কেলাস কোষ (crystal cell)। এই কোষের আকার নির্ভর করে, কোষে অবস্থিত পরমাণু বা আয়নের উপর।  এই কোষের বাহুগুলি সমতল হয় বলে, কোষের বাহুগুলি একটি নির্দিষ্ট কোণে মিলিত হয়। এই কোণের পরিমাপ এবং বাহুগুলির দৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তিক করে কেলাসগুলিকে ৭টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে৷

ঘনক কেলাস জালক পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাস একটি ঘনকের আকারে সৃষ্টি করে। কেলাসের জালক বিন্যাসের বিচারে এটি সবচেয়ে সরল। এর বাহু সংখ্যা ১২ এবং তল সংখ্যা ৬টি। প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হয় এবং কোণগুলি ৯০ ডিগ্রি (সমকোণ) থাকে। এর তিনটি প্রকরণ আছে।

সাধারণ ঘনক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের জালক বিন্যাসে ৮টি পরমাণু নিয়ে একটি কেলাস কোষ গঠিত হয়। অর্থাৎ ৮টি বিন্দুতে পরমাণুগুলি থাকে। এই পরমাণুগুলি দুটো স্তরে সজ্জিত থাকে। এর উপরের স্তরে চারটি এবং নিচের স্তরে চারটি পরমাণু একই তলে থাকে। ফলে কেলাসটি একটি বাক্সের আকার ধারণ করে। এই কেলাসের ভিতরভাগ একটি ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি করে।

বস্তুকেন্দ্রিক ঘনক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় ঘনকে ৯টি পরমাণু তিনটি স্তরে সজ্জিত থাকে। এর প্রথম ও তৃতীয় স্তরে ৪টি করে পরমাণু একটি বাক্সের আকার সৃষ্টি করে। এই বাক্সের প্রতিটি কোণার পরমাণু মধ্যভাগে অপর একটি পরমাণু অবস্থান করে। মধ্যভাগের (বা দ্বিতীয় স্তর) এই পরমাণুটি প্রান্তীয় পরমাণুর কেন্দ্র হিসাবে একটি সুদৃঢ় কেন্দ্র তৈরি করে।

পার্শ্বকেন্দ্রিক ঘনক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় ঘনকে মোট ১৪টি পরমাণু থাকে। এর কেন্দ্রে কোনো পরমাণু থাকে না। কিন্তু প্রতিটি তলের কেন্দ্রে একটি করে পরমাণু থাকে। ফলে প্রতিটি তল একটি পৃথক দৃঢ়তা লাভ করে।

আয়তাকার কেলাস জালক পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের বাহু সংখ্যা ৮টি এবং তল সংখ্যা ৬টি হয়। এর ঊর্ধ্ব ও নিম্নতল বর্গাকার হলেও উলম্ব বাহু অপেক্ষাকৃত বড় বা ছোটো হয়। ফলে এটি একটি আয়তাকার বাক্সের মতো মনে হয়। এর প্রতিটি কোণ ৯০ ডিগ্রি থাকে। এর দুটি প্রকরণ আছে।

সাধারণ আয়তাকার কেলাস
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের জালক বিন্যাসে ৮টি পরমাণু নিয়ে একটি কেলাস কোষ গঠিত হয়। অর্থাৎ ৮টি বিন্দুতে পরমাণুগুলি থাকে। এই পরমাণুগুলি দুটো স্তরে সজ্জিত থাকে। এর উপরে স্তরে ৪টি এবং নিচের স্তরে চারটি পরমাণু একই তলে থাকে। কিন্তু এর ঊর্ধ্ব ও নিম্নতল অপেক্ষাকৃত লম্বা হওয়ার ফলে, কেলাসটি একটি লম্বা বাক্সের আকার ধারণ করে। এই জালকের ভিতরভাগ একটি ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি করে।

বস্তুকেন্দ্রিক ঘনক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসে ৯টি পরমাণু তিনটি স্তরে সজ্জিত থাকে। এর প্রথম ও তৃতীয় স্তরে ৪টি করে পরমাণু একটি বাক্সের আকার সৃষ্টি করে। এই বাক্সের প্রতিটি কোণার পরমাণু মধ্যভাগে অপর একটি পরমাণু অবস্থান করে। মধ্যভাগের (বা দ্বিতীয় স্তর) এই পরমাণুটি প্রান্তীয় পরমাণুর কেন্দ্র হিসাবে একটি সুদৃঢ় কেন্দ্র তৈরি করে।  কিন্তু এর ঊর্ধ্ব ও নিম্নতলে অপেক্ষাকৃত লম্বা হওয়ার ফলে, কেলাসটি একটি লম্বা বাক্সের আকার ধারণ করে।

অর্থোরম্বিক কেলাস পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর কোনো বাহুই পরস্পরের সমান নয়। এই পদ্ধতির পরমাণুর সংখ্যা এবং পরমাণুর অবস্থান অনুসারে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

সাধারণ অর্থোরম্বিক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের জালক বিন্যাসে ৮টি পরমাণু নিয়ে একটি কেলাস কোষ গঠিত হয়। এর বাহুগুলি পরস্পর অসমান হয়।

ভিত্তি-কেন্দ্রিক অর্থোরম্বিক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসের জালক বিন্যাসে ১০টি পরমাণু থাকে। এর উপরিতল ও নিম্নতলের কেন্দ্রে দুটি পরমাণু থাকে। এবং যথারীতি এই পদ্ধতির কেলাসের বাহুগুলি সমান হয় না।

বস্তুকেন্দ্রিক অর্থোরম্বিক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় ঘনকে ৯টি পরমাণু তিনটি স্তরে সজ্জিত থাকে। এর একটি তলের কেন্দ্রে ১টি পরমাণু থাকে। এবং যথারীতি এই পদ্ধতির কেলাসের বাহুগুলি সমান হয় না।

পার্শ্বকেন্দ্রিক অর্থোরম্বিক
[সম্পাদনা]

এই জাতীয় কেলাসে মোট ১৪টি পরমাণু থাকে। এর প্রতিতলের কেন্দ্রে ৬টি পরমাণু থাকে।  এবং যথারীতি এই পদ্ধতির কেলাসের বাহুগুলি সমান হয় না।

রম্বোহেড্রাল কেলাস পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের কোণগুলি ৯০ ডিগ্রির কম হয়। এদের বাহুগুলির দৈর্ঘ্য সমান হয়। ফলে কেলাসটি রম্বসের আকার ধারণ করে।  এই পদ্ধতিতে পরমাণুর সংখ্যা থাকে ৮টি।

ট্রাইক্লিনিক কেলাস পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের কোণগুলি ৯০ ডিগ্রির কম হয়। তবে বাহুগুলি সমান হয় না। এই পদ্ধতিতে পরমাণুর সংখ্যা থাকে ৮টি।

মনোক্লিনিক কেলাস পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের একটি কোণ ৯০ ডিগ্রির কম হয়। অন্য দুটি কোণ ৯০ ডিগ্রির সমান হয়। এই পদ্ধতিতে পরমাণুর সংখ্যা থাকে ৮ বা ৯টি হয়। পরমাণুর সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এই জাতীয় কেলাস দুই প্রকার হয়ে থাকে।

সাধারণ মনোক্লিনিক
[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের একটি কোণ ৯০ ডিগ্রির কম হয়। অন্য দুটি কোণ ৯০ ডিগ্রির সমান হয়। এই পদ্ধতিতে পরমাণুর সংখ্যা থাকে ৮টি হয়।

ভিত্তি-কেন্দ্রিক মনোক্লিনিক
[সম্পাদনা]

এই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের একটি কোণ ৯০ ডিগ্রির কম হয়। অন্য দুটি কোণ ৯০ ডিগ্রির সমান হয়। এই পদ্ধতিতে পরমাণুর সংখ্যা থাকে ১০টি। এর উপরের ও নিচের তলের কেন্দ্রে দুটি পরমাণু থাকে।

ষড়ভুজাকৃতি কেলাস পদ্ধতি

[সম্পাদনা]

ই পদ্ধতির কেলাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এদের কোণগুলি ৯০ ডিগ্রির কম হয়। এর মোট ১৪ পরামাণু ১৪টি বিন্দুতে স্থাপিত থাকে। ছয়টি পরমাণু নিয়ে একটি ষড়ভুজ তৈরি হয় এবং তার কেন্দ্রীয় বিন্দুতে একটি পরমাণু থাকে। এই রকম দুটি সেটের পরমাণুগুলি পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকলে, এর এক সেটের কেন্দ্রীয় পরমাণুর সাথে অপর সেটের কেন্দ্রীয় পরমাণুর সাথে যুক্ত থাকে না। এর বাহুগুলি পরস্পর সমান হয়।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]