কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের লিপিবদ্ধকরণের জন্য নিজস্ব স্বরলিপি পদ্ধতি রচনা করেন। প্রাচ্য সঙ্গীতের স্টাফ নোটেশন স্বরলিপিতে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন, যার পরিচয় তার রচিত গীতসূত্রসার গ্রন্থে পাওয়া যায়।

বাল্যকাল[সম্পাদনা]

কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে বঁড়িশা বেহালায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ছিলেন উমাসুন্দরী দেবী। বঁড়িশা বেহালার জমীদার ছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের এবং ওই বংশের জমিদাররা কুলীন ব্রাহ্মণদের নিজেদের বংশের মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নিজেদের গ্রামে এনে বাস করতে দিত। কৃষ্ণধনের পূর্বপুরুষ, রুদ্ররাম ঠাকুরের সন্তান হওয়ায় কুলীন ছিলেন এবং সেই সুবাদেই তারা বঁড়িশা বেহালায় বাস করতেন। কৃষ্ণধনের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বিশেষ ছিল না।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

কৃষ্ণধনের প্রথম শিক্ষাক্ষেত্র ছিল হিন্দু কলেজ। পরে ওই কলেজ ছেড়ে তিনি হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৬২ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বৃত্তী নিয়ে পাস করেন।

অভিনয়[সম্পাদনা]

স্কুলে শিক্ষালাভের সময় কৃষ্ণধনের বাবা কোলকাতার হোগল কুঁড়িয়ায় (ভীম ঘোষের লেন, দর্জ্জীপাড়া) থাকতেন। ওখানে গুহবাবুদের কুস্তীর আখড়ায় কৃষ্ণধন প্রায়ই সেখানে। তিনি তারাচরণ গুহের মুখে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত নাটকের সংলাপ শুনে নাট্যশালায় গিয়ে নাটক দেখতে চান। ওই নাট্যশালার নাটকে ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী পরিচালনায় প্রাচ্য সঙ্গীতের ন্য়ায় ঐকতান বাদনও প্রচলিত হয়েছিল এবং নাট্যশালাটি সেই সময় কোলকাতাতে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল। কৃষ্ণধন বহ চেষ্টা সত্ত্বেও ওই নাট্যশালায় ঢুকে নাটক দেখবার প্রবেশপত্র না পেয়ে শেষে ওই নাট্যসম্প্রদায়তে অভিনয় করার জন্য যোগদান করে ফেলেন।

১৮৫৮ সালের মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত শর্মিষ্ঠা নাটক গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ পায়। ১৮৫৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর বেলগাছিয়া নাট্যশালায় তা মঞ্চস্থ হয় এবং কৃষ্ণধন ওই নাটকে শর্মিষ্ঠার চরিত্রে নারী বেশে অভিনয় করে সকলের প্রশংসা পান।

চাকরিজীবন[সম্পাদনা]

১৮৬৫ সালে কৃষ্ণধন গোয়ালিয়র রাজ স্কুলের শিক্ষক হিসবে যোগ দেন। ১৮৬৬ সালে তিনি চীনের ইতিহাস নামে একটি গ্রন্থ লিখে প্রকাশ করেন। কৃষ্ণধনের সুপরিচিত কর্ণেল হটন ১৮৬৮ সালে তাকে কুচবিহারের মহারাজার স্টেটে স্ট্যাম্প অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৮৭২-১৮৭৪ সালে তিনি দার্জিলিং তরাইয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেন। এরপরে তিনি চাকরি ছেড়ে কোলকাতায় একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন ও পরিচালনা করেন। কিন্তু সেখানে তিনি বিশেষ সফল হন না। তিনি ১৮৭৬ সালে কুচবিহারের মহারাজার স্টেটে এক্সাইজ অফিসার হিসাবে চাকরি শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে তিনি কুচবিহারের চাকরি থেকে অবসর নেন। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত তিনি গৌরীপুরের রাজা প্রভাসচন্দ্র বড়ুয়ার সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯০৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারীতে গৌরীপুরে কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়। তার মৃত্যুর পর গৌরীপুরের রাজা তার রচিত সেতার শিক্ষা বইটির নতুন সংস্করণ নিজ খরচে প্রকাশ করেন।

সঙ্গীতচর্চা[সম্পাদনা]

বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনয়ের সুবাদেই তিনি ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী-র কাছে সঙ্গীত শিক্ষালাভ করার সুযোগ পান। আর্থিক অসঙ্গতির জন্য তিনি পিয়ানো কিনতে না পারলেও কাগজের উপর পিয়ানোর কিবোর্ডের ছবি এঁকে তাতে আঙ্গুল চালিয়ে অভ্যাস করে পিয়ানো বাদনে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কথিত আছে যে, পাথুরিঘাটায় শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাড়িতে ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীর সঙ্গীতচর্চাকালীন একদিন কৃষ্ণধন এসে উপস্থিত হলে ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী বলে ওঠেন ‘সব বন্ধ কর। বন্ধ কর। এখনই সব আদায় করে নেবে’[১]

পরবর্তীকালে চাকরি করার সময় তার সঙ্গীত চর্চার ব্যাঘাত ঘটে। তার ইচ্ছা ছিল সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপনের। তিনি প্রাচ্য সঙ্গীত বিষয়ক বই পড়ে গানের ক্রিয়াত্মক ও শাস্ত্রীয় দুই অংশেই বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল যাতে বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে লেখা বই থেকে জ্ঞান অর্জন করে মানুষ সরল উপায়ে সঙ্গীত চর্চা করতে পারে। ওস্তাদদের কাছ থেকে সঙ্গীত শিক্ষালাভের ফলপ্রসুতা নিয়ে তিনি বেশ সন্দিহান ছিলেন। এজন্য তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোলকাতায় এসে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কিন্তু সেই বিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তার অভাবে ও আর্থিক অসুবিধার কারণে তিনি পুনরায় চাকরি করতে শুরু করেন।

কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের স্টেটে এক্সাইজ অফিসার হিসাবে কাজ করার সময় তিনি তার কাছ থেকে সঙ্গীত চর্চার সাহায্য পান। কুচবিহারের মহারাজা বিদেশী দামী ষ্টাফ নোটেশন মুদ্রণ সক্ষম যন্ত্র নিয়ে আসেন কৃষ্ণধনের গীতসূত্রসার নামে সঙ্গীতবিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করার জন্য। কুচবিহারের সেইসময়ে দেওয়ানী আহিলকার হিসেবে কর্মরত ও সঙ্গীতজ্ঞ রামচন্দ্র ঘোষ কৃষ্ণধনের কাজে বিশেষ সাহায্য করেন। তিনি কৃষ্ণধনের সেতারের সঙ্গে তবলা বাজিয়ে বিভিন্ন সেতার বাদন বা গৎ-এর তাল নির্ধারণ করতে সহায়তা করেন।

গ্রন্থরচনা[সম্পাদনা]

  • ১৮৬৭ সালে বঙ্গৈকতান। এতে ঐকতান বাদ্যের গৎ -এর স্বরলিপি ছিল।
  • ১৮৬৮ সালে Hindustainie Airs arranged for the pianoforte
  • ১৮৬৮ সালে সঙ্গীতশিক্ষা
  • ১৮৭৩ সালে সেতার শিক্ষা
  • ১৮৮৫ সালে গীতসূত্রসার

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা , ২য় বর্ষ, কার্ত্তিক, ১৩৩২, পৃ ৩০৫

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]