বিষয়বস্তুতে চলুন

কৃষি সমবায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

কৃষি সমবায় বা কৃষকদের সমবায় হল একটি উৎপাদক সমবায়, যেখানে কৃষকরা নির্দিষ্ট কার্যক্রমে তাদের সম্পদ একত্রিত করে।

কৃষি সমবায়কে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়: ১) কৃষি পরিষেবা সমবায়, যা স্বতন্ত্রভাবে কৃষিকাজ করা সদস্যদের বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করে, এবং ২) কৃষি উৎপাদন সমবায়, যেখানে উৎপাদনের সম্পদ (জমি, যন্ত্রপাতি) একত্রিত করা হয় এবং সদস্যরা যৌথভাবে চাষাবাদ করে।

বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন সমবায় তুলনামূলকভাবে বিরল। এর মধ্যে সমবায় খামারগুলি অন্তর্ভুক্ত, যা সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রচলিত ছিল; ইসরায়েলের কিবুতজ, সম্মিলিতভাবে পরিচালিত কমিউনিটি শেয়ার্ড অ্যাগ্রিকালচার, কোস্টারিকা, ফ্রান্স এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশে Longo Maï সমবায়, কিউবার CPAs, এবং নিকারাগুয়ার উৎপাদন সমবায়।

ইংরেজিতে "কৃষি সমবায়" বলতে সাধারণত কৃষি পরিষেবা সমবায় বোঝানো হয়, যা বিশ্বব্যাপী সংখ্যাগরিষ্ঠ। কৃষি পরিষেবা সমবায় প্রধানত দুটি ধরনের হয়: সরবরাহ সমবায় এবং বিপণন সমবায়। সরবরাহ সমবায় কৃষকদের বীজ, সার, জ্বালানি, এবং যন্ত্রপাতি পরিষেবার মতো কৃষি উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ করে। বিপণন সমবায় কৃষকদের উৎপাদিত ফসল ও পশুপালনের পণ্য পরিবহন, প্যাকেজিং, মূল্য নির্ধারণ, বিতরণ, বিক্রয় ও প্রচার কাজে সহায়তা করে। কৃষকরা ঋণ সমবায় এর মাধ্যমেও মূলধন ও বিনিয়োগের অর্থায়নের জন্য নির্ভর করে।

উল্লেখযোগ্য কৃষি সমবায়গুলোর মধ্যে রয়েছে ডেইরি ফার্মার্স অফ আমেরিকা, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম দুগ্ধ সংস্থা; ভারতের বৃহত্তম খাদ্য বিপণন সংস্থা Amul; এবং জাপানের জেন-নোহ, যা রাসায়নিক সার বিক্রির ৭০% নিয়ন্ত্রণ করে।

লক্ষ্য

[সম্পাদনা]

সমবায় কাঠামো বিনিয়োগকারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের (IOF) থেকে আলাদা।

জাপানের সাপোরো শহরে হোকুরেন ফেডারেশন অফ অ্যাগ্রিকালচারাল কোঅপারেটিভস-এর সদর দফতর

কৃষি সমবায় গঠনের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল কৃষকদের উৎপাদন ও সম্পদ একত্রিত করার সুযোগ প্রদান করা। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকদের জন্য স্বতন্ত্রভাবে কোনো পণ্য তৈরি করা বা কোনো পরিষেবা গ্রহণ করা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। সমবায় কৃষকদের একটি সংস্থায় একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেয়, যার ফলে তারা এককভাবে কাজ করার চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারে। এটি অর্থনৈতিক মাপগত সুবিধা এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক শক্তির ধারণার সাথে সম্পর্কিত।

কিন্তু, বড় সমবায়ই সর্বদা সেরা তা নয়। কিছু সমবায়ের সদস্য সংখ্যা ২০-এর কম, আবার কিছু সমবায়ের সদস্য সংখ্যা ১০,০০০-এরও বেশি হতে পারে।

একজন ক্ষুদ্র কৃষক কলম্বিয়ার একটি কৃষি সমবায়ে তার কফি জমা দিচ্ছেন। সমবায় ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে, বিশেষ করে কফি ও কোকোর মতো পণ্যের ক্ষেত্রে, যেখানে বড় ব্যবসায়ীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

যদিও অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো সমবায় গঠনের একটি প্রধান কারণ, এটি একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। সমবায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল কৃষকরা এর পরিচালনার উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, ফলে মুনাফা একমাত্র সদস্যদের মধ্যেই বণ্টন হয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে নয়।

কৃষি উৎপাদন গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলের প্রধান কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস হওয়ায় কৃষি সমবায় খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমবায় ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রাকৃতিক ও শিক্ষামূলক সম্পদ, কৃষি উপকরণ এবং বাজারের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষকদের আয়ের ওপর প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন বা ঋণের তুলনায় উৎপাদক সংগঠনের সদস্য হওয়া বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

হেইস কো-অপ এলিভেটর, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইনটেরিয়র প্লেইনস অঞ্চলের শত শত কৃষি বিপণন সমবায়ের একটি।

কৃষিতে সাধারণত তিন ধরনের সমবায় দেখা যায়:

  • যন্ত্রপাতির সমবায়: অনেক ছোট কৃষিজমির মালিকদের জন্য ব্যয়বহুল কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব নয়, কারণ এটি শুধু মৌসুমি সময়ে ব্যবহৃত হয়। তাই স্থানীয় কৃষকরা মিলে একটি যন্ত্রপাতির সমবায় গঠন করে, যা সবাই ব্যবহার করতে পারে।
  • উৎপাদন ও বিপণন সমবায়: একটি খামারের পক্ষে একা তার উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা বা পরিবহন করা কঠিন হতে পারে। সমবায় একত্রে উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারে বিতরণ করতে সাহায্য করে।
  • ঋণ সমবায়: কৃষকদের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে, কারণ ক্ষুদ্র ঋণে ব্যাংকগুলো উচ্চ লেনদেন খরচ ধার্য করে বা পর্যাপ্ত জামানত না থাকলে ঋণ দিতে চায় না। কৃষকরা মিলে একটি তহবিল গঠন করে, যা সদস্যদের ঋণ প্রদান করতে পারে। এছাড়াও, বড় সমবায় ব্যাংক থেকে তুলনামূলক ভালো শর্তে ঋণ সংগ্রহ করতে পারে।

উৎপত্তি ও ইতিহাস

[সম্পাদনা]

প্রথম কৃষি সমবায়গুলি ইউরোপে ১৭শ শতকে তৈরি হয়।

১৮ ও ১৯শ শতকে, ওসমানীয় শাসনের অধীনে কিছু গ্রীক অঞ্চলে সমবায় গঠন করা হয়, যা স্থানীয় পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রথম নাগরিক সমবায় ছিল রচডেল সোসাইটি, যা ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেলে গঠিত হয়। যদিও এটি টেক্সটাইল শ্রমিকদের একটি সংগঠন ছিল, এটি কৃষকদের জন্য জমি ভাড়া নেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল।

১৯শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপে প্রথম কৃষি সমবায় তৈরি হয়, যা পরে উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সরবরাহ সমবায়

[সম্পাদনা]

কৃষি সরবরাহ সমবায় কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন বীজ, সার, কীটনাশক, জ্বালানি এবং যন্ত্রপাতির ক্রয়, সংরক্ষণ ও বিতরণ করে।

উদাহরণ

[সম্পাদনা]

যুক্তরাষ্ট্র

[সম্পাদনা]

নেদারল্যান্ডস

[সম্পাদনা]

বিপণন সমবায়

[সম্পাদনা]

কৃষি বিপণন সমবায় হল কৃষকদের মালিকানাধীন সমবায় ব্যবসা, যা কৃষিপণ্যের (উভয় শস্য ও পশুপালন) রূপান্তর, প্যাকেজিং, বিতরণ ও বিপণনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

নিউজিল্যান্ড

[সম্পাদনা]

নিউজিল্যান্ডে কৃষি সমবায়ের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা ১৯শ শতকের শেষের দিকে শুরু হয়। প্রথম কৃষি সমবায় ছিল ওটাগো উপদ্বীপের ছোট "ওটাগো পেনিনসুলা কো-অপারেটিভ চিজ ফ্যাক্টরি কো. লি.", যা ১৮৭১ সালে ওটাগো উপদ্বীপের হাইক্লিফে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নিউজিল্যান্ড সরকার সমবায়গুলোর প্রচারে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছিল এবং দূরবর্তী অঞ্চলে ছোট সমবায়গুলো কার্যকর ছিল, ফলে এই খাত দ্রুত বিকশিত হয়। ১৯০৫ সালের মধ্যে, দুগ্ধ শিল্পের প্রধান সংগঠনের কাঠামো হয়ে ওঠে সমবায় ব্যবস্থা।

১৯২০-৩০-এর দশকে, প্রায় ৫০০টি দুগ্ধ সমবায় কোম্পানি ছিল, যেখানে বেসরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির সংখ্যা ৭০-এরও কম ছিল। তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, উন্নত পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি ও জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে সমবায়গুলোর একীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে, দুটি প্রধান সমবায় গঠন করা হয়: ওয়াইকাটো ভিত্তিক নিউজিল্যান্ড ডেইরি গ্রুপ এবং টারানাকি ভিত্তিক কিউই কো-অপারেটিভ ডেইরিজ। ২০০১ সালে, এই দুটি সমবায় এবং নিউজিল্যান্ড ডেইরি বোর্ড একীভূত হয়ে ফন্টেরা গঠন করে।

এই বিশাল একীভূতকরণ নিউজিল্যান্ড সরকারের সমর্থনে সম্পন্ন হয়, যা দুগ্ধ শিল্পের উন্মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার অংশ ছিল, যেখানে অন্যান্য কোম্পানিগুলো সরাসরি দুগ্ধপণ্য রপ্তানি করার অনুমতি পায়। তবে দুটি ছোট সমবায়, মরিন্সভিল-ভিত্তিক তাতুয়া ডেইরি কোম্পানি এবং দক্ষিণ দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ওয়েস্টল্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্টস, ফন্টেরার সাথে যুক্ত না হয়ে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

নিউজিল্যান্ডের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষি সমবায়গুলোর মধ্যে মাংস ও সার শিল্পের সমবায়গুলো অন্তর্ভুক্ত। মাংস শিল্পের সমবায় একীভূত হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, তবে সদস্যদের পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

কানাডা

[সম্পাদনা]

কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি বিপণন সমবায় ছিল উইট পুল। এই কৃষকদের মালিকানাধীন সমবায় প্রতিষ্ঠান পশ্চিম কানাডাজুড়ে শস্য কেনা ও পরিবহনের কাজ করত। এগুলো আগের বেসরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন শস্য ক্রেতাদের প্রতিস্থাপন করে এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। ১৯৯০-এর দশকে, বেশিরভাগ উইট পুল বেসরকারি হয়ে যায় এবং কয়েকটি একীভূত হয়। বর্তমানে, এগুলো ভাইটেরা কর্পোরেশনের অংশ।

প্রাক্তন উইট পুলগুলোর মধ্যে রয়েছে:

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কানাডিয়ান কৃষি বিপণন সমবায়:

ইকুয়েডর

[সম্পাদনা]

ইকুয়েডরের আমাজন অঞ্চল বিশ্বখ্যাত কোকো বীজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। নাপো অঞ্চলে, ৮৫০টি কিচওয়া পরিবার একত্রিত হয়ে মার্কিন জীববিজ্ঞানী জুডি লগব্যাকের সহায়তায় একটি কৃষি বিপণন সমবায়, কালারি অ্যাসোসিয়েশন, গঠন করেছে। এই সমবায় কৃষকদের অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি করেছে এবং তাদের কিচওয়া সংস্কৃতি ও আমাজন রেইনফরেস্ট সংরক্ষণে সহায়তা করেছে।

ভারতের মহারাষ্ট্রে একটি সমবায় চিনি কলে আখ ওজন করা হচ্ছে

ভারতে স্থানীয়, আঞ্চলিক, রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত সমবায় নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা কৃষি বিপণনে সহায়তা করে। প্রধানত খাদ্যশস্য, পাট, তুলা, চিনি, দুধ ও বাদামের বিপণন এদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

আমূল এর আনন্দ প্যাটার্ন-ভিত্তিক দুগ্ধ খামারি ভারতের বৃহত্তম স্বনির্ভর শিল্প এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। এই সমবায় পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নের ফলে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

চিনি উৎপাদনের জন্য আখ মূলত স্থানীয় কৃষকদের মালিকানাধীন সমবায় চিনি কলগুলিতে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। বিশেষত মহারাষ্ট্রে, এই চিনি কলগুলি স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ইসরায়েল

[সম্পাদনা]

নেদারল্যান্ডস

[সম্পাদনা]

ইউক্রেন

[সম্পাদনা]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

[সম্পাদনা]

মেক্সিকো

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

সূত্র

[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]