কুরআনে সহিংসতা
কুরআনের কিছু আয়াতে শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে, আবার কিছু আয়াতে সংযম ও মীমাংসার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু কিছু আয়াত অন্য কিছু আয়াতকে নাসখ করে, এবং কিছু আয়াতকে সাধারণ নির্দেশ হিসেবে ধরা হয়, আর কিছু নির্দিষ্ট শত্রুর উদ্দেশে বলা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়—এই কারণে কোন আয়াত কীভাবে বুঝতে হবে এবং সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে, এ বিষয়টি ইসলামী যুদ্ধ-ভাবনার কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলে গবেষক চার্লস ম্যাথিউসসহ অন্যরা মন্তব্য করেছেন।[১]
অনেক গবেষক ব্যাখ্যা করেছেন যে, কুরআনের সহিংসতা-সম্পর্কিত বাক্যাংশগুলো মূলত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে;[২][৩] তবে কিছু বাইরের উৎস থেকে অর্থায়িত সহিংস গোষ্ঠী (যেমন: আইএসআইএস), যাদের ইসলাম ত্যাগকারী বা কাফির হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তারা এই আয়াতগুলোর নিজস্ব স্বার্থে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে সহিংসতা বৈধ মনে হয়।[৪] তারা কুরআনের যুদ্ধ ও সহিংসতা-সংক্রান্ত শিক্ষাকে নিজেদের মত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছে, যা মূল ধারার ইসলামি ব্যাখ্যা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে স্পষ্টভাবে বলা যায়, কুরআন অকারণে সহিংসতা সমর্থন করে না।[৫][৬]
নাসখ
[সম্পাদনা]চার্লস ম্যাথিউস লিখেছেন যে, কুরআনে থাকা "তলোয়ার সংক্রান্ত আয়াত" এবং "শান্তি সংক্রান্ত আয়াত" নিয়ে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ম্যাথিউসের মতে, এই আয়াতগুলোর মধ্যে কোনটিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত এবং একে অপরের সাথে কীভাবে মিলিয়ে বোঝা যাবে—এই প্রশ্নটি ইসলামে যুদ্ধ-সম্পর্কিত চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।[১]
হিজরতের পূর্বে মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় নিপীড়কদের বিরুদ্ধে অহিংসভাবে সংগ্রাম করেছিলেন।[৭] হিজরতের পর থেকে কুরআনিক ওহিগুলোতে আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতে শুরু করে।[৮]
অলিভার লেমানের মতে, অনেক ইসলামি ফকিহ নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে “তলোয়ারের আয়াতগুলোকেই” প্রাধান্য দিয়েছেন।[৯] উদাহরণস্বরূপ, ডায়ান মর্গানের ভাষ্যমতে, ইবন কাসির (১৩০১–১৩৭২) মত দেন যে, তলোয়ার আয়াত সকল শান্তি চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে যা মুহাম্মদ (সা.) মুশরিকদের সঙ্গে সম্পাদন করেছিলেন।[১০]
আধুনিকতাবাদীরা অবশ্য “তলোয়ার আয়াতের” নাসখের ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তা করলে কুরআনের বহু শান্তি ও মীমাংসামূলক আয়াত নাসখ হয়ে যাবে।[১১][১২]
শান্তি ও সমঝোতা
[সম্পাদনা]মুসলিম ও অমুসলিম—উভয় ধরনের বহু গবেষক ও লেখক মনে করেন, কুরআনের মূল বার্তা সহিংসতা, জবরদস্তি, নিষ্ঠুরতা ও অসহিষ্ণুতার বিপরীত; বরং এতে ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও আত্মরক্ষার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফাওজি আবদেলমালেক উল্লেখ করেছেন, “অনেক মুসলিম পণ্ডিত ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, সহিংসতার ধর্ম হিসেবে নয়। তাদের মতে, জিহাদ এবং ইসলামে যুদ্ধ সংক্রান্ত কুরআনিক আয়াতগুলো অমুসলিমদের কাছে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা হয়।”[১৩]
নিসিম রেজওয়ান মত দেন, “সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা কুরআনের প্রকৃত আত্মার পরিপন্থী। এসব বৈশিষ্ট্য নবী মুহাম্মদের (সা.) জীবনে যেমন ছিল না, তেমনি প্রকৃত ধার্মিক মুসলমানদের জীবনেও তা অনুপস্থিত।”[১৪]
ফয়সল আবদুল রউফ বলেন, “কুরআন দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশ্বাসে জোর-জবরদস্তিকে নিষিদ্ধ করেছে, কারণ এটি মানবাধিকারের একটি মৌলিক দিক—বিশ্বাসের স্বাধীনতা—লঙ্ঘন করে। ইসলামী আইনে ভিন্নমত বা ভিন্ন বিশ্বাস সহিংসতা বা যুদ্ধের যথার্থ কারণ হতে পারে না। কুরআনের ২:২৫৬ আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘ধর্মে জবরদস্তি নেই’; আর ১০৯:১–৬-এ বলা হয়েছে, ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য।’”[১৫]
গবেষক চার্লস ম্যাথিউসের মতে, কুরআনের শান্তিবিষয়ক আয়াতগুলো এমন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে যেখানে, “যদি কেউ শান্তি চায়, তবে—তারা মুসলমান না হলেও—তাদের শান্তিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।” তিনি ২:১৯০ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, “আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।”[১]
চিবা ও শোয়েনবাম মত প্রকাশ করেছেন যে, ইসলাম এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় না, যারা শুধুমাত্র বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণে দ্বিমত পোষণ করে। বরং ইসলাম এমন ব্যক্তিদের প্রতি সদয় আচরণ করার নির্দেশ দেয়।[১৬][১৭][১৮][১৯]
ইয়োহানান ফ্রিডম্যান মত দেন যে, কুরআন ধর্মীয় জবরদস্তির উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে সমর্থন করে না। তবে যুদ্ধকে ‘ধর্মীয়’ বলা হয়েছে এই অর্থে যে, মুসলমানদের শত্রুদের “আল্লাহর শত্রু” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (৮:৫৭–৬২ তে)।[২০][২১]
সলোমন এ. নিগোসিয়ান লিখেছেন, “আক্রমণ প্রতিরোধ অথবা ইসলামি আদর্শ রক্ষার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে।” তাঁর মতে, কুরআন মুসলমানদের প্রতি এমন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করার আহ্বান জানায়—তা তারা মুসলমান হোক কিংবা অমুসলিম। নিগোসিয়ান আরও বলেন, কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ইসলাম রক্ষার্থে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ একটি কর্তব্য, যা যেকোনো মূল্যে পালনীয়। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাদের নিরাপত্তা দান করেন, যারা আক্রমণ প্রতিহত করতে যুদ্ধ করে।”[২২]
চন্দ্র মুজাফফার মত দেন, “অবিচার, নিপীড়ন ও আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বিষয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়, কোন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বা সহিংসতা বৈধ হতে পারে। অর্থাৎ, সহিংসতার বৈধতা নির্ধারণে কুরআনের নির্দেশনাই হলো মাপকাঠি।”[২৩]
ইসলামি বিবরণ অনুযায়ী হাবিল ও কাবিলের কাহিনিতে, হাবিল তার হত্যাপ্রবণ ভাই কাবিলকে বলেন, “যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে তোমার হাত বাড়াও, তবু আমি তোমাকে হত্যা করতে আমার হাত বাড়াব না, কেননা আমি আল্লাহকে ভয় করি।”[২৪] কিছু গবেষক, যেমন জাওদাত সাঈদ,[২৫] এই ঘটনাকে অহিংসার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।[২৬]
আহমদিয়া মতবাদের একাধিক পণ্ডিত, যেমন মাওলানা মুহাম্মদ আলী, মাওলানা সাদরউদ্দিন, বশারত আহমদ এবং ব্রিটিশ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গটলিব উইলহেল্ম লেইটনার মত দেন যে, কুরআনের আয়াতগুলো প্রাসঙ্গিকভাবে পাঠ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়—কুরআন আগ্রাসনের সূচনা নিষিদ্ধ করে এবং কেবল আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেয়।[২৭][২৮][২৯][৩০][৩১]
আরবিন্দ কুমার লেখেন:
কুরআন সহিংসতার জবাবে প্রতিরোধমূলক সহিংসতাকে অনুমোদন করে। ইসলাম-পূর্ব আরব গোত্রগুলোর ইতিহাস এবং তাদের মধ্যে চলা হিংসাত্মক সংঘর্ষের দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়, সে সময়কার পরিবেশে 'নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের' দর্শন কার্যকর হতো না।[৩২]
খালেদ আবু আল-ফাদল উল্লেখ করেন, “কুরআনে এমন একটি আয়াতও নেই যা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ, অপ্রশমিত ও নিঃশর্ত বাধ্যবাধকতার আহ্বান জানায়।”[৩৩]
জন এল. এসপোসিটো এবং দালিয়া মোঘাহেদের মতে, কুরআন শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অনুমতি প্রদান করে, তবে পাশাপাশি শান্তি স্থাপনের জন্য দৃঢ় নির্দেশও প্রদান করে।[৩৪][৩৫]
সংঘর্ষ-সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
[সম্পাদনা]কুরআন ২:১৯১ আয়াতটি দুইটি মূল বিষয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, এই আয়াতে “নিপীড়নের” (ফিতনা) ক্ষেত্রে অন্যদের হত্যা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। [টীকা ১]
দ্বিতীয়ত, এই আয়াতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না “ধর্ম কেবল আল্লাহর জন্য হয়” এবং “ফিতনা” আর না থাকে। “ফিতনা” শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে, তবে সাধারণত এটিকে “পরীক্ষা” বা “বিপর্যয়” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।[৩৭] এই প্রসঙ্গে কুরআন ২:১৯১–১৯৩-এর পরিপূর্ণ আয়াতসমূহ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।[৩৮]
কুরআন বিশারদদের মতে, উক্ত আয়াতের পাঠ্যপ্রসঙ্গ মূলত প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ সম্পর্কিত, যা সংঘটিত হয়েছিল হুদাইবিয়ার চুক্তি ভঙ্গের পর। চুক্তিটি তখন ভেঙে যায়, যখন কুরাইশ-সমর্থিত বানু বকর গোত্র মুসলমানদের মিত্র বানু খুযা'আ গোত্রের ওপর হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায়, নবী মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশদের একটি পত্র পাঠান, যাতে বলা হয় তারা যেন বা তো বানু বকর গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে অথবা ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। কিন্তু কুরাইশরা উভয় প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে এবং এতে চুক্তি ভঙ্গ হয়। গবেষকদের মতে, সংশ্লিষ্ট কুরআনিক আয়াতগুলো শুধুমাত্র তাদের উদ্দেশ্যে যাদের দ্বারা চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে।[৩৯]
এর পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে:
আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো তাদের সঙ্গে, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
এই আয়াতকে ভিত্তি করে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, কুরআনে কেবল আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।[৪১]
গবেষক মিশেলিন আর. ইশে মত দেন, “কুরআন আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে বৈধতা দেয়, বিশেষ করে ইসলামি সম্প্রদায়ের ওপর বাইরের বা অভ্যন্তরীণ আক্রমণ কিংবা চুক্তিভঙ্গের মাধ্যমে সংঘটিত আগ্রাসনের ক্ষেত্রে।”[৪২][৪৩]
মুফতি মুকররম আহমদ-এর মতে, কুরআন মানুষকে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করে।[৪৪][৪৫] তিনি আরও বলেন, কুরআন মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করে।[৪৬][৪৭]
তলোয়ারের আয়াতসমূহ
[সম্পাদনা]কুরআনে দুটি মূল আয়াত (৯:৫ এবং ৯:২৯) সাধারণভাবে “তলোয়ারের আয়াত” নামে পরিচিত, যদিও “তলোয়ার” শব্দটি কুরআনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।[৪৮] বিশেষ করে ৯:৫ নম্বর আয়াতটিকে “তলোয়ারের আয়াত” বা “আয়াত আল-সাইফ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
কিন্তু যখন হারাম মাসসমূহ শেষ হয়ে যাবে, তখন মুশরিকদের হত্যা করো যেখানেই তাদের পাও, তাদের ধরো, অবরুদ্ধ করো এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সব কৌশলে অপেক্ষা করো। তবে তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
গবেষক রিউভেন ফায়ারস্টোন ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইবন কাসির “তলোয়ারের আয়াতসমূহ”কে চার ধরনের লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেন: ৯:৫ মূর্তিপূজকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়; ৯:২৯ আহলুল কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলে, যতক্ষণ না তারা জিজিয়া প্রদান করে; ৯:৭৩ এমন লোকদের বিরুদ্ধে, যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান হলেও নবী ও মুসলিম সমাজের বিরোধিতা করে; এবং ৪৯:৯ মুসলমানদের মধ্যকার অন্যায়কারী পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়।[৪৯]
গবেষক প্যাট্রিসিয়া ক্রোন উল্লেখ করেছেন যে, বহুল আলোচিত এই “তলোয়ারের আয়াত” মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যারা চুক্তিভঙ্গ ও আগ্রাসনের সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি বলেন, এই আয়াত সেই মুশরিকদের ব্যতিক্রম করে যারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল। এখানে এটাও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যদি তারা বিরত হয়, তবে যুদ্ধ থামিয়ে দিতে হবে।[৫০]
অন্যদিকে, অলিভার লেমান উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন ৬০:৮ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে, “সদিচ্ছা সম্পন্ন ও শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির অমুসলিমদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে যুদ্ধ করা বৈধ নয়।”[৯]
শান্তির আয়াতসমূহ
[সম্পাদনা]খালেদ আবু আল-ফাদল বেশ কিছু কুরআনিক আয়াতের উল্লেখ করেছেন, যেগুলো সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের পক্ষে ব্যাখ্যা করা যায়—যা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত। কুরআন ৪৯:১৩, ১১:১১৮–১১৯, ৫:৪৮-এ মানবজাতির মাঝে বৈচিত্র্য থাকার প্রত্যাশা ও গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে; এবং তা ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’র অংশ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।[৫১]
হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে অধিক তাকওয়াবান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু জানেন।
আর যদি তোমার প্রতিপালক চাইতেন, তবে অবশ্যই মানবজাতিকে একক উম্মত করতেন। কিন্তু তারা সবসময় মতবিরোধ করতেই থাকবে, ...তবে সে ব্যতীত, যাকে তোমার প্রতিপালক দয়া করেন; এবং এজন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন...
আর আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রদান করে এবং তার উপর একটি নিরীক্ষক হিসেবে। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার আলোকে তুমি তাদের মধ্যে বিচার করো এবং সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি একটি বিধান ও একটি পথ নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে একটি উম্মত বানাতে পারতেন, কিন্তু তিনি যা তোমাদেরকে দিয়েছেন, তার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্যই তোমাদের ভিন্ন বানিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো। আল্লাহর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন, তখন তিনি তোমাদের পারস্পরিক বিরোধের ব্যাপারে অবহিত করবেন।
যারা ঈমান এনেছে, ইহুদি, সাবিই ও খ্রিস্টান—তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে—তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
আবু আল-ফাদল আরও উল্লেখ করেন যে, কুরআনে এমন আয়াতও আছে যা “শান্তির পক্ষে একটি স্পষ্ট আহ্বান” প্রদান করে এবং মুসলমানদের নির্দেশ দেয়, যেন তারা শান্তি চাইলে অবিশ্বাসীদের ফিরিয়ে না দেয়।
আর যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকো এবং আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই তিনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।
টীকা
[সম্পাদনা]- ↑ মুহসিন খান অনুবাদ করেছেন:
তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। [এই আয়াতটি জিহাদ সম্পর্কে প্রথম অবতীর্ণ হয়, তবে এটি আরেকটি আয়াতের দ্বারা পরিপূরক হয়েছে।] আর যেখানে তাদের পাও, সেখানে তাদের হত্যা করো এবং যেখান থেকে তারা তোমাদের বিতাড়িত করেছে, সেখান থেকে তোমরাও তাদের বিতাড়িত করো। নিপীড়ন (ফিতনা) হত্যা অপেক্ষাও নিকৃষ্ট। কিন্তু মসজিদুল হারামে (মক্কার পবিত্র স্থানে) যুদ্ধ করো না, যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু যদি তারা আক্রমণ করে, তবে তোমরাও তাদের হত্যা করো। কাফিরদের শাস্তি এটাই। তোমরা যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং আল্লাহর জন্য একমাত্র ইবাদত প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তারা যদি বিরত হয়, তবে জুলুমকারীদের ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে আগ্রাসন করো না।
— 190
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 Mathewes, Charles T. (২০১০)। Understanding Religious Ethics। John Wiley and Sons। পৃ. ১৯৭। আইএসবিএন ৯৭৮১৪০৫১৩৩৫১৭।
- ↑ Abdala, Mohamad (২৭ মে ২০১৩)। "Critical opinion of Islam ignores the fundamental truths"। smh.com.au। The Sydney Morning Herald।
- ↑ Sohail H. Hashmi, David Miller, Boundaries and Justice: diverse ethical perspectives, Princeton University Press, p. 197
- ↑ Wood, Graeme (মার্চ ২০১৫)। "What ISIS Really Wants"। The Atlantic (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০১৭।
- ↑ "What the Quran Really Says About Violence"। Belief Net। সংগ্রহের তারিখ ৫ মার্চ ২০১৭।
- ↑ Lumbard, Joseph E. B. (২৩ মার্চ ২০১৬)। "Understanding the Relationship Between the Quran and Extremism"। Huffington Post (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০১৭।
- ↑ Boulding, Elise. "Cultures of Peace: The Hidden Side of History", p. 57
- ↑ Howard, Lawrence. "Terrorism: Roots, Impact, Responses", p. 48
- 1 2 Leaman, Oliver (২০০৬), Jewish thought: an introduction, Taylor & Francis, পৃ. ৬৯, আইএসবিএন ৯৭৮০২০৩০৮৮৬৮৫
- ↑ Morgan, Diane (২০১০)। Essential Islam: a comprehensive guide to belief and practice। ABC-CLIO। পৃ. ৮৯। আইএসবিএন ৯৭৮০৩১৩৩৬০২৫১।
- ↑ Nielsen, Jørgen S.; Christoffersen, Lisbet (২০১০)। Shariʻa as discourse: legal traditions and the encounter with Europe। Ashgate Publishing, Ltd.। পৃ. ৩৯। আইএসবিএন ৯৭৮১৪০৯৪৯৭০২৮।
- ↑ Bennett, Clinton (২০০৫)। Muslims and modernity: an introduction to the issues and debates। Continuum International Publishing Group। পৃ. ২২০। আইএসবিএন ৯৭৮০৮২৬৪৫৪৮১২।
- ↑ Abdelmalek, Fawzy T. (২০০৮)। The Turning Point: Islam & Jesus Salvation। AuthorHouse। পৃ. ২১০। আইএসবিএন ৯৭৮১৪৬৮৫৩৪২৯০।
- ↑ Rejwan, Nissim (২০০৪)। The many faces of Islam: Perspectives on a resurgent civilization। HarperCollins। পৃ. ১৫১। আইএসবিএন ৯৭৮০৮১৩০৩০৯৭৫।
- ↑ Rauf, Feisal Abdul (১১ মে ২০০৪)। What's right with Islam: a new vision for Muslims and the West। Harper Collins। পৃ. ১২৯। আইএসবিএন ৯৭৮০০৬০৫৮২৭২২।
- ↑ "CRCC: Center for Muslim-Jewish Engagement: Resources: Religious Texts"। ৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসেম্বর ২০১০।
- ↑ "CRCC: Center For Muslim-Jewish Engagement: Resources: Religious Texts"। www.usc.edu। ২৯ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:৮ (60:8 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২১ আগস্ট ২০১১ তারিখে)
- ↑ Schoenbaum, Thomas J.; Chiba, Shin (২০০৮)। Peace Movements and Pacifism After September 11। Edward Elgar Publishing। পৃ. ১১৫–১৬। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৭২০-৬৬৭-১।
- ↑ Friedmann, Yohanan (২০০৩)। Tolerance and coercion in Islam: interfaith relations in the Muslim tradition। Cambridge, UK: Cambridge University Press। পৃ. ৯৪–৯৫। আইএসবিএন ০-৫২১-৮২৭০৩-৫।
- ↑ "8:57–62"। ২২ আগস্ট ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ ডিসেম্বর ২০১০।
- ↑ Nigosian, Solomon A. (২৯ জানুয়ারি ২০০৪)। Islam: Its History, Teaching, and Practices। Indiana University Press। আইএসবিএন ০-২৫৩-১১০৭৪-২।
- ↑ Muzaffar, Chandra (২০০২)। Rights, religion and reform: enhancing human dignity through spiritual and moral transformation। Taylor & Francis। পৃ. ৩৪৫। আইএসবিএন ৯৭৮০৭০০৭১৬৪৮৭।
- ↑ আল-মায়িদাহ ৫:২৮
- ↑ Said, Jawdat. "The Doctrine of the First Son of Adam", 1964
- ↑ McGaffey, Rahula. "Making Peace: Non-violence and peacebuilding in Palestine ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৫ অক্টোবর ২০২০ তারিখে"
- ↑ Ali, Maulana Muhammad; The Religion of Islam (6th Edition), Ch V "Jihad" p. 414 "When shall war cease". Published by The Lahore Ahmadiyya Movement ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে
- ↑ Sadr-u-Din, Maulvi. "Quran and War", p. 8. Published by The Muslim Book Society, Lahore, Pakistan. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০ মে ২০২০ তারিখে
- ↑ Article on Jihad ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৫ মার্চ ২০১৬ তারিখে by Dr G. W. Leitner (founder of The Oriental Institute, UK) published in Asiatic Quarterly Review, 1886. ("Jihad, even when explained as a righteous effort of waging war in self-defense against the grossest outrage on one's religion, is strictly limited..")
- ↑ The Quranic Commandments Regarding War/Jihad ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে An English rendering of an Urdu article appearing in Basharat-e-Ahmadiyya Vol. I, pp. 228–32, by Dr Basharat Ahmad; published by the Lahore Ahmadiyya Movement for the Propagation of Islam
- ↑ Ali, Maulana Muhammad. The Religion of Islam (6th Edition), Ch V "Jihad". pp. 411–13. Published by The Lahore Ahmadiyya Movement. link ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে
- ↑ Kumar, Arvind (১৯৯৮)। Encyclopaedia of Human Rights, Violence and Non-violence: Non-violence and societal control। Anmol Publications PVT. LTD.। পৃ. ১৮৭। আইএসবিএন ৯৭৮৮১২৬১০১৫১১।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ El Fadl, Khaled M. Abou (২০০৭)। The Great Theft: Wrestling Islam from the Extremists। HarperCollins। পৃ. ২৪০। আইএসবিএন ৯৭৮০০৬১৭৪৪৭৫৪।
- ↑ কুরআন ৮:৬১ যদি শত্রুপক্ষ শান্তির দিকে আগ্রহ দেখায়, তবে তুমিও শান্তির পথে এগিয়ে যাও এবং আল্লাহর উপর ভরসা করো।
- ↑ Esposito, John L.; Mogahed, Dalia (২০০৭)। Who speaks for Islam?: what a billion Muslims really think। Gallup Press।
- ↑ "The Order to fight until there is no more Fitnah"। Abdur Rahman। ২৮ নভেম্বর ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মার্চ ২০১২।
- ↑ ইবন কাসির ব্যাখ্যা করেন যে, এখানে “ফিতনা” অর্থ “শিরক”। "Tafsir Ibn Kathir"। Quick Quran Tafsir। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মার্চ ২০১২।
- ↑ "CRCC: Center For Muslim-Jewish Engagement: Resources: Religious Texts"। ৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসেম্বর ২০১০।
- ↑ Abu Tariq Hijazi (৯ নভেম্বর ২০১২)। "Hudaibiyah: A turning point in the history Islam"। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৭।
- ↑ কুরআন ২:১৯০
- ↑ সূরা আল-বাকারা ২:১৯০–১৯২ http://alpha.quran.com/2/190-192?startPlay=undefined ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩০ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে
- ↑ কুরআন ৯:১২-১৫, ৪২:৩৯
- ↑ Ishay, Micheline (২ জুন ২০০৮)। The history of human rights। Berkeley: University of California। পৃ. ৪৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-২৫৬৪১-৫।
- ↑ কুরআন ৯:৩৬-৪১
- ↑ কুরআন ৪:৭৪
- ↑ কুরআন ৮:৬০
- ↑ Mufti M. Mukarram Ahmed (২০০৫)। Encyclopaedia of Islam। New Delhi: Anmol Publications Pvt. Ltd। পৃ. ৩৮৬–৮৯। আইএসবিএন ৮১-২৬১-২৩৩৯-৭।
- ↑ Wessels, Antonie (২০০৬), Muslims in the West: can they be integrated, Peeters Publishers, পৃ. ৯৯, আইএসবিএন ৯৭৮৯০৪২৯১৬৮৪৫
- ↑ Firestone, Reuven (১৯৯৯)। Jihād: the origin of holy war in Islam। Oxford University Press US। পৃ. ৬৩। আইএসবিএন ৯৭৮০১৯৫৩৫২১৯১।
- ↑ Patricia Crone, Encyclopedia of the Quran, War article, p. 456
- 1 2 3 4 5 Abou El Fadl, Khaled; Lague, Ian (২০০২)। The Place of Tolerance in Islam (ইংরেজি ভাষায়)। Beacon Press। পৃ. ১৫–১৭। আইএসবিএন ৯৭৮০৮০৭০০২২৯২।
- ↑ কুরআন ৪৯:১৩
- ↑ কুরআন ১১:১১৮-১১৯
- ↑ কুরআন ৫:৪৮
- ↑ কুরআন ৫:৬৯
- ↑ কুরআন ৮:৬১
- ↑ Abou El Fadl, Khaled; Lague, Ian (২০০২)। The Place of Tolerance in Islam (ইংরেজি ভাষায়)। Beacon Press। পৃ. ২০। আইএসবিএন ৯৭৮০৮০৭০০২২৯২।