কুরআনের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

কুরআনের ইতিহাস বলতে ইসলামের নবী মুহাম্মদ এর উপর ধারাবাহিকভাবে মৌখিক নাযিল ও তা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করাকে বোঝানো হয়। এটি কয়েক যুগ যাবত ব্যাপ্ত ছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ।

মুসলমানদের বিশ্বাস ও ইসলামী গবেষকগণের তথ্য মতে, কুরআর নাযিল ৬১০ খ্রীস্টাব্দে শুরু হয়, যখন ফেরেশতা জিব্রাঈল (Arabic: جبريل, Jibrīl or جبرائيل, Jibrāʾīl) মক্কা নগরীর হেরা পর্বতে, সর্ব প্রথম কুরআনের সূরা আলাক্ব এর প্রথম পাঁচটি আয়াত নবী মুহাম্মাদকে পাঠ করান। আর এই ধারাবাহীকতা ৬৩২ খ্রীস্টব্দে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়।[১] আমরা আজ যে কুরআন গ্রন্থাকারে দেখতে পাই, সেটি সংকল করেছেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা হয়রত উসমান (৬৪৪ থেকে ৬৫৬)। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তার খিলাফতের (ইসলামিক সরকারের) দায়িত্ব পালন করেন। যার জন্য তাকে আজও জামিউল কুরআন বা কুরআন সংরক্ষণকারি বলা হয়। আর পুরো বিশ্বে তার লিপিবদ্ধ করা কুরআন প্রচলিত রয়েছে। অধ্যাপক ফ্রান্সিস এডওয়ার্ড পিটার্স এর তথ্যমতে, কুরআন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে, পক্ষপাত এড়াতে অত্যন্ত রক্ষণশীলতা ও সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।[২]

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিতদের মতে বুৎপত্তি[সম্পাদনা]

কুব্বাত আল সাখরা । এই স্থাপনাটি , সবচেয়ে প্রাচীন ইসলামী স্থাপত্যের উদাহারণ , যা ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়েছিল।
কুব্বাত আল সাখরা । এই স্থাপনাটি , সবচেয়ে প্রাচীন ইসলামী স্থাপত্যের উদাহারণ , যা ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়েছিল।

কুরআনের বুৎপত্তি দীর্ঘ সময় যাবত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে রয়েছে ।[৩] অধিকাংশ পণ্ডিতই ঐতিহ্যগতভাবে যা বর্ণীত হয়েছে তা গ্রহণ করেছেন । তারা গ্রহীতা হিসেবে মুহাম্মাদের ভূমিকা ও সংকলক হিসেবে প্রথম দিকের খলিফাদের ভুমিকার পার্থক্যকে গ্রহণ করেছেন ।[৩] এছাড়াও ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি পরিমার্জন এমনকি মূলগত পুনঃমূল্যায়ন করার জন্যও বহুসংখ্যক প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। [৩]

কুরআনের প্রাচীনত্ব নির্ধারণে কুব্বাত-আস-সাখরা ও এর খোদাইকৃত লিপি একটি অগ্রহউদ্দীপক স্থাপনা। [৪] পণ্ডিতেরা এইসব খোদাইকৃত লিপির অস্তিত্ব সম্বন্ধে কয়েক শতাব্দী যাবত অবহিত । এগুলো বারংবার তাদের অনুবাদের বিষয়বস্তু হিসেবে ছিল , তবে এখনোও সেই উপাদানটির উপর খুব কমই নজর দেয়া হয়েছে যেটা থেকে এইসব খোদাইকৃত লিপি , অনুলিপি করা হয়েছে।

অষ্টভুজাকৃতি কুব্বাত আল সাখরার সম্মুখদিকে রয়েছে কালেমা ও কিছু আয়াত, যা ঈশ্বরের প্রশংসা ও তার ক্ষমতার ঘোষণা দিচ্ছে । এরপর মুহাম্মদের নাম এসেছে এবং

তার প্রশংসা বর্ণীত হয়েছে , যা ৬৯৪ সালের দিকে যথেষ্টই প্রচলিত ছিল (শাহাদা)। এরপর বর্ণীত হয়েছে যে, খ্রিষ্ট ছিলেন একজন সম্মানিত নবী এবং মরণশীল ; যা খৃষ্টান বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণভাবে মেলেনি । এরপর দাবী করা হয়েছে যে, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর নিজেই যথেস্ট ।

সবশেষে একটি আদেশ দেয়া হয়েছে যেখানে তার আনুগত্যের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমাণ্যকারিদেরকে কঠিন শাস্তির সাবধানবানী দেয়া হয়েছে।

বাইবেলের সাথে সাদৃশ্য[সম্পাদনা]

অবিশ্বাসী পণ্ডিতগন,ইহুদী ও হিব্রু ধর্মগ্রন্থ এবং কুরআনের অনেক সাদৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন যে ; মুহাম্মাদ সেটাই শিক্ষা দিয়েছেন যেটাকে তিনি সার্বজনীন ইতিহাস বলে মনে করতেন। তারা আরও মনে করেন যে , আরবে তার ভ্রমণকালে যেসব ইহুদী এবং খ্রিস্টানের সাথে তার সাক্ষাত হয়েছিল তাদের থেকেই এসব শিক্ষালাভ করেছিলেন।

বুৎপত্তি ও সংকলন[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদ
উপরে উল্লেখিত বিষয়ের উপর ধারাবাহিকের একটি অংশ
Muhammad

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে , কুরআন মুহাম্মদের উপর নাজিল হয়েছিল । তার চল্লিশ বছর বয়সে , ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে রমজান মাসের এক রাতে এটি শুরু হয়েছিল । ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে আয়াতটি এবঙ্গি মানবজাতীর নিকট আল্লহর বানী পৌঁছে দেয়া ও লিপিবদ্ধ করার দায়ীত্বটি পেয়েছিলেন ।মুসলমান পণ্ডিতেরা বিশ্বাস করেন যে মুহাম্মদ একজন নিরক্ষর ব্যক্তি ছিলেন যেমনটা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে ।

""যারা সেই নিরক্ষর রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবে লিখিত পায়,...." কুরআন ৭:১৫৭ [১]

ইমাম বুখারী (র) এর হাদীস উম্মুল মুমিনুন হয়রত আয়িশা (রা) হতে বর্ণিত আছে, প্রথম কুরআন নাযিল হয় যখন ফেরিশতা জিব্রাঈল নবী হয়রত মুহাম্মদ (স) এর নিকট সাক্ষাত করেন এবং পাঠ করতে বলেন। নবী মুহাম্মদ বলেন, মা আনা বিক্বারিউ। যার অর্থ বেশ কতটি হতে পারে। যেমন, 'আমি পড়তে পারি না' বা আমি কী পাঠ/আবৃত্তি করব? অথবা 'আমি তো পড়তে/অধ্যায়ন করতে জানি না। তিন বার এমন প্রশ্ন-উত্তর হল দু'জনের মাঝে। এর পর চতুর্থ বার জিব্রাঈল নবী মুহাম্মদকে, সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তার বুকের অার ছেড়ে দিলেন। এরপর আবার বললেন, পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে! পাঠ করুন আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্য শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না"[৫]:39–41 আর এরপর মুহাম্মদ (স) এর নিকট ধারাবাহিক ভাবে দীর্ঘ ২৩ বছর সময়ে তার জীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী পবিত্র আল কুরআন অবতীর্ণ হয়। যা ৬৩২ খ্রীস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়।[৫]:45

মুসলিমগণ বিশ্বাস করে যে, জিব্রাঈল আল্লাহ প্রদপ্ত কুরআনের সকল, কথা কোন প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন না করে, নবি মুহাম্মদ এর নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। আল-কুরআন এই কথায় জোড় দেয় মুহাম্মদ (স) শুধুমাত্র পবিত্র কথাগুলোই গ্রহণ করেন। আর এর কোন ব্যতিক্রম ঘটে নি।(১০:১৫)। আর এই কথাও বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ নিজে নিজের পরিচয় করান নি, যে টা তিনি করতে পরতেন, বরং তিনি প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। আর নবি নিজের থেকে কিছুই বলেন না, তিনি সেটাই বলেন, যা তাকে বলা হয় ওহির মাধ্যমে।।[৬] নবি মুহাম্মদের জন্য আয়াত গুলো খুবই বাস্তব ছিল, এর একটা প্রক্ষাপটও ছিল, তবে নবি (সা) শুধুমাত্র অক্ষরিক অর্থই জানতেন, এর অন্তর নিহিত অর্থ জানতেন না। [৬]

যখন তাকে কুরআন অবতীর্ণের অভিজ্ঞতা জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তিনি বর্ণনা করেন,

"কখন কখন এটি ঘণ্টার ধ্বনির মত হয়, আবার অন্তরে ঢেলে দেয়া হয়, আমি তখন বুঝতে পারি। কিছু কিছু সময় আমার নিকট মানুষের রুপ ধারন করে ফেরেশতা জিব্রাঈল আসেন। আর আমাকে পাঠ করতে বলেন। আমি তখন তা উপলদ্ধি করতে পরি"[৫]:43

তিনি এই অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন যে, একটা সময় খুব যন্ত্রণা হয়। উদাহরণ, আমি শুনছি, "অন্য কেউ বুুঝতে পারছে না, অথচ আমার অন্তরে গেথে যাচ্ছে।"[৫]:43 আর এভাবেই মুহাম্মদ (স) পবিত্র কোনআনের ওহী গ্রহণ করেন ও তাঁর সাথীদের সাহাবিদের সাথে পাঠ করেন। আর তিনি এটা কণ্ঠস্ত বা হিফজ্ করেন ও লিখে রাখেন। প্রত্যেক রমজান মাসে নবী (সা) জিব্রাঈকে সমগ্র কুরআন পাঠ করে শুনাতেন, আবার জিব্রাঈল নবীকে কুরঅান টাঠ করে শুনাতেন। প্রথমিক যুগে কুরআন গাছের ছালে, পথরে, খেজুর বাকলে সংরক্ষণ করা হত। কোরআন মাজিদ লেখার পাশাপাশি সাহাবিগণ মুখস্ত করে তার সংরক্ষণ করতেন। নবী (স) নিজে কুরআন মুখস্ত করতেন। আর মুহাম্মদ (স) তাঁর সকল সাথীকে কুরআনের তালিম দিতেন। পুরো কুরআন মাজিদ হিফজ করার প্রচলন মুসলিমদের মাঝে এখনও বিদ্যমান রয়েছে। ইসলামের শুরু থেকেই লক্ষ লক্ষ মানুষ কুরআনের হাফেজ হয়ে আসছে। এমন কি, সপ্তম শতাব্দীর আরবের প্রেক্ষাপটে এটা তেমন কোন কৃতিত্ব ছিল না, যখন আরব বিশ্বে, কবিতা আবৃত্তি করা, কবিতা মুখস্ত করা ছিল গৌরবের বিষয়। তখন তারা দক্ষতার সাথে মুখস্ত বিদ্যাতে ঝুকে পরে ছিলেন। অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতাগুলোতে কবিতা ছিল সবচেয়ে আকর্ষনিয় বিয়ষ।[৭]

ওহীর প্রকৃতিক ও কাব্যিক বিষয় নিয়ে, জনগণ প্রশ্ন তুলেছিল। মুহাম্মদ (স) আধ্যাতিক উৎস থেকে বিবেচনা করে তাদেরকে বুঝিয়েছিলেন। তবে তাদের এক কবিতা গভীর ভাবে এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত ছিল। আর তাই মুহাম্মদ যখন প্রথম মক্কায় ইসলাম প্রচার ও কুরআন আবৃত্তি করছিলেন তখন একজন কবি(২১.৫) বা কবিতা (৩৭.৩৬) এর বিরোধীতা করে।[৮]

কুরআন যেহেতু অন্য কোন গ্রন্থের মত এক সাথে অবতীর্ণ হয় নি, তাই এর প্রতিটি পরিচ্ছেদ, অধ্যায় সুসংবদ্ধ ছিল না। তাই এর সংরক্ষণ করা সময়ের দাবী হয়ে দাড়ায়। কুরআন সংকলন কখন শেষ হয় এটা নিয়ে মুসলিম অমুসলিম পণ্ডিতগণের মাঝে কিছু মতবিরোধ দেখা যায়। কিছু সংখ্যক বিশ্বাস করে যে নবী মুহাম্মদ তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই কুুরআর সংকলন করেন। আবার কিছু সংখ্যক বিশ্বাস করে, হয়রত অালি অথবা হয়রত আবু বকর (রা) কুরআন সংকলন করেন।[৯]

মুহাম্মদ[সম্পাদনা]

নবী মুহাম্মদ এর সময় কুরআনের আয়াত, সূরা পরিবর্তনের সম্ভাবনা ছিল। আর তাই তিঁনি সেই সময় কুরআন মুখস্ত করা ও অধ্যয়ন করার পদ্ধতি সাহাবিদের শিক্ষা দিতেন। যদিও সাহাবিগণ কুরআন লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নবি তাদের অনুমোদন দেন নি। করণ কুরআনের হুকুম বাতিল হতে পারত। তাই তাঁর সময় কুরআন সংকলনের প্রচলন ছিল না। ইচ্ছা করলে যে কেউ সংকলন করতে পারতেন, কেননা মক্কা সেই সময়ে বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক নগরী ছিল, তাদের অধিকাংশ জনগণ লেখতে পারত। কিছু পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে, নবী (স) জায়েদ ইবনে সাবিতউবাই ইবনে কাব (রা) সহ ৪৮ সদস্যের একটি দল গঠন করেন যারা কুরআনের আয়াত সংকলন করেন। আর এটাই ছিল নবী মুহাম্মদের জীবদ্দশায় পবিত্র কোরআনের গ্রন্থাকারে প্রকাশের অস্তিত্ব। তবে এখানে পবিত্র কুরআনের পূর্ণঙ্গ লিপি ছিল না[৫]:83

অধিকাংশ শিয়াসুন্নি আলেমগণের মতে, সম্পূর্ণ কোরআন নবী মুহাম্মাদের মৃত্যুর পূর্বেই সংকলিত হয়েছিল। ইবনে আব্বাস বলেন, "যেটা কুরআনের চুড়ান্ত লিপি সেটি সংরক্ষিত ছিল। কেননা নবি (সা) কুরআন তেলায়াত করতেন, আর জিব্রাঈল (আ) শুনতেন, আর জিব্র্রাঈল তেলায়াত করলে নবি শুনতেন" এটা হত প্রতি রমজান মাসে। আর তার মৃত্যুর পূর্বেই সম্পূর্ণ কুরআন নাযিল শেষ হয়েছিল।"[১০] একে অপরকে শুনানোর কথায় এই কথায় প্রকাশ পেত যে, সম্পূর্ণ অবতীর্ণ শেষ হয়েছে। যেটা প্রমাণ করছে এটাই কুরআনের চুড়ান্ত লিপি। এর মাধ্যমে কুরআনের সকল বিধি-বিধান অবতীর্ণের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি তার প্রমাণ মিলেছে। আবার কিছু সংখ্যক আলেমের মতে, কুরআন নবী জীবিত অবস্থায় অবতীর্ণ ও গ্রন্থকারে সাজানো হয়েছে আর তার কোন পরিবর্তন হয়নি। আর কুরআনের ঐতিহ্যগত আইন দ্বারা প্রকাশ পায়, মুহাম্মদ (স) ই-কুরআনের চুড়ান্ত সংস্করণ করেন। যেটা তিনি জিব্রাঈল এর কাছ থেকে ধারাবাহীক ভাবে শুনে শুনে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।[১১]

মুহাম্মদ (সা) বিদায় হজ্জ এর ভাষণে বলেন, আমি তোমাদের জন্য দুইটি জিনিস রেখে যাচ্ছি; এই দুইটি হল আল-কুরআন ও সুন্নতে রাসূল।[১২] কিছু আলেম মনে করেন, কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কিতাবে (মাকতাবে) যা সংগৃহিত ছিল এবং যা সাহাবিগণ লেখে রেখেছিলেন। কেননা কুরআনের সবটুকু তখন ঠিক ছিল তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিল না। কারণ তখন ওহী অব্যহত ছিল। কেবল মাত্র নবি (স) এর মুখস্থ করা আয়াতই ছিল সর্বাধিক সত্য। আল-কিতাব বলতে কু্রআনের ধারাবহিক অবতীর্ণ ও সংরক্ষিত আরবি শব্দকে বোঝায়।[১৩]

অন্য একদল আলেম (ইসলামি পণ্ডিত) মনে করেন, কুরআন হল সেটা যা মুহাম্মদ (সা) নিজে সংরক্ষ করেছেন। তারা মনে করেন, নবি মুহাম্মদ তাঁর জীবদ্দশায় যা সংরক্ষণ করেছেন বা করতে বলেছেন তাই কুরআন। যেমন, জায়েদ ইবনে সাবিত বর্ণনা করেন, "আমরা কুরআন লিপিবদ্ধ করতাম আল্লাহর রাসূলের অনুমতির পর।"[১৪]

আবার অন্য কিছু ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, একটা দীর্ঘ সময় মুহাম্মদ (সা) জীবিত ছিলেন। এটা সম্ভব ছিল কুরআনের আয়াত যে কোন সময় পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন বা রহিত হতে পারত। সুতরাং ওহী সম্পূর্ণ নাজিলের পূর্বেই সংরক্ষণ করা নির্ভুল কিতাব হত না।[১৫]

আলি ইবনে আবু তালিব[সম্পাদনা]

শিয়া অনুসারিগণ মনে করে আলী ব্যক্তিগত ভাবে কুরআনের একটি অনুলিপি তৈরী করেছিলেন। যেটি সংকলিত হয়েছিল নবী মুহাম্মদের ইন্তেকালের ছয় মাস আগে। আর তাদের মতে এটিই পবিত্র আল কুরআনের প্রথম ও পরিপূর্ণ সংকলন। তারা মনে করে নবী (স) এর আদেশে এই কুরআনের সংকলনটি সংরক্ষণ করা হয় ওহী নাযিলের পরপরেই।[১৬] আর শিয়া অবলম্বিগন মনে করে আলির পাণ্ডুলিপির সাথে আজকের কুরআনের কিছুটা পার্থক্য ছিল।[৫]:89–90 কিছু শিয়া সম্প্রদায় মনে করে আলী কুরআন একত্র করেছেন, কিন্তু তাঁর অনুলিপির বৈধতা ছিলা না বলে মনে করে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, "তিঁনি পবিত্র কুরআনের সম্পূর্ণ অংশ লিপিবদ্ধ করেছেন। যেখানে আয়াত, সূরা, পারা ইত্যাদির নির্ভুল বর্ণনা ছিল। যার মধ্যে কোন কিছুই বাদ পড়ে নি। এমনকি একটি একক অক্ষর আলিফ বা লাম পর্যন্তও না। তবে তারা এটাকে গ্রহণ করে নাই।"[১৭] তারা বিশ্বাস করে আলী কর্তৃক লিপিবদ্ধ কুরআন ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত, তবে উসমানীয় সাম্রাজ্যে আমরা আজ যে কুরআন দেখি সেটি নয়। তারা এটাও বিশ্বাস করে, কুরআনের সূরা পরিবর্তন করা হয়েছে, পঠ্যপদ্ধতিরও কিছু অংশ পরিবর্তন এনেছে, তাবদিল, থেকে উম্মা থেকে ইমমা করা হয়েছে। এটা করা হয়েছিল, ইসলামের প্রথম খলিফা এটার অধিকার গ্রহণ করার পর।[১৮] তৎকালীন শিয়া আলেম আবুল কাশেম আল-খুইল যুক্তি প্রদান করে বলেন, আলি (রা) কুরআন সংরক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, যদিও আলি কর্তৃক সংরক্ষণ কুরআনে যুক্ত ছিল না তবু তিঁনি যে এটা করেছিলেন সে কথাটা সত্য। তাঁর সংরক্ষণটি কুরআনের অংশ হয়নি। কুরআন ততটুকু যেটা আল্লাহ তায়ালা মাবন জাতির জন্য অবতীর্ণ করেছেন আর মুসলিম বিশ্বও মেনে নিয়েছে।[১৯]

আবু বকর[সম্পাদনা]

সুন্নি আলেমগণের মতে, নবী (স) এর জীবিত অবস্থায় কুরআর লেখা বা সংরক্ষণ করা সীমাবদ্ধ ছিল তার সাহাবিদের মাঝে।[২০] তবে অনুমোদন প্রাপ্তগণ ছিলেন প্রায় ৪৩ জন। তাদের মধ্যে অনেকেই কুরআনকে পুরোপুরি মুখস্ত করতে পারেননি। নবী মুহাম্মদের ইন্তেকালের পর আবু বকর অত্যান্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে অবাধ নীতি চালু করলেন। আর এই নীতি গ্রহণ করা হয় ইয়ামামার যুদ্ধের পর ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে।[২১][২২] এই যুদ্ধের সময়, ৭০ জন হাফিজে কুরআন শহিদ হয়। তখন হযরত ওমর (রা) কুরআন সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুভব করেন। আর তিঁনি আবু বকর (রা) কে পরামর্শ দেন কুরআন সংরক্ষণ করতে। প্রথমে আবু বকর (রা) বিষয়টি আমলে না নিলেও পরে এর প্রয়োজনীতা বুঝতে পারেন। আর আবু বকর কুরআন সংরক্ষণে পূর্ণ মনযোগ দেন।[২১][২৩] জায়েদ ইবনে সাবিত (রা) ছিলেন রাসূল (সা) এর প্রথমিক ওহী লেখক। তাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল পরামর্শ সভায়, যখন কুরআন সংকলনের কথা চলছিল। আর সেখানে উক্ত বৈঠকে আবু বকর, ওমর ও তার মাঝে যে কথা হয় তা তিনি ব্যক্ত করেছেন:

" আবু বকর আমারকে ডেকে পাঠান, যখন তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে কুরআনের হাফেজদের শহীদ হতে দেখেছিলেন। আমি দেখলাম সেখানে ওমরও উপস্থিত আছেন। তিনি সবে মাত্র এসেছেন। আবু বকর বললেন, "ওমরই আমাকে পরামর্শ দিয়েছে, ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেজদের শহীদ হবার পর, কুরআন সংকলন করা খুবই প্রয়োজন। কেননা হাফেজদের শহীদ হবার ফলে কুরআনের সংরক্ষণ হুমকির মুখে পড়েছে।" আর তাই তিনি মনে করছিলেন কুরআন সংকলন দরকার। তিনি এভাবেই বলে যাচ্ছিলেন। আমি ওমরকে প্রশ্ন করলাম আমরা কেমন করে শুরু করতে পারি, যেটা নবী পর্যন্ত করেননি? ওমর বললেন, "এটা ছিল একটা নিদিষ্ট সময়ের জন্য যখন কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল। তখন যেহেতু কুরআনের আয়াত পরিবর্তন হবার সম্ভবনা ছিল তাই কুরআন সংকলনের কথা উঠত না। আর তাই আমি তোমাকে কুরআন সংকলেনর কথা বলছি। যায়েদ তুমি বুদ্ধিমান ও বয়সে তরুণ। তুমি পারবে, নবী (সা) এর সময় তুমি কুরআন সংকলন করেছ। আমরা তোমার খারপ জানিনা বরং ভালোই জানি। সুতরাং তুমি কুরআন সংগ্রহ ও একত্র কর।" আল্লাহর কসম, তারা আমাকে যদি একটি পাহাড় সড়াতে বলত সেটা ভালো ছিল, তবে এটা আমার কাছে তার চেয়ে অধিক গুরুতর অনুরোধ মনে হচ্ছে।(আল বুখারি, সাহিহ,জাম'ঈ আল কুরআন, হাদিস নং,৪৯৮৬; আরো দেখুন, ইবনে আবু দাউদ, পৃ, ৬-৯)

এই কাজে তার আরো কিছু প্রতিক্রিয়ার কথা বর্ণনা করা হল:

"...আল্লাহর কসম, যদি তিনি (আবু বকর) আমাকে পাহাড় এক স্থান হতে অন্য স্থানে নিতে বলতেন, যেটা আমার জন্য খুব কষ্টের হত ঠিকই তবে কুরআন সংকল তার চেয়ে বেশি কষ্টের। আর তাই আমি কুরআন সংগ্রহণ শুরু করি সব মুখস্থ ও লেখা পান্ডুলিপি মানুুষের কাছে থেকে, খেজুরের বাকল থেকে, পাথরে লেখা থেকে।[Bukhari সহীহ বুখারী, ৬:৬০:২০১ (ইংরেজি)]

আল জারাখীর মন্তব্য,[২৪]

যায়েদ (রা) তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষণ করতেন। কুরআনের প্রতিটি আয়াত, সূরা সহ সব কিছু ঠিক রখতেন। তিনি "হুফাজগণের" সাহায্য নিতেন। আর এটা ছিল প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক পালনীয়। আর তাই কুরআন সংকলন বোর্ডের সবাই নিজেদের সব ক্রুটি মুক্ত রাখতে চেষ্টা করতেন।[২৪]

যয়েদ আরো বলেন:

"আর তাই আমি আমার কাজ শুরু করি আর কুরআন সংরক্ষণ করতে থাকি। এটা কখনো খেজুরের বাকল থেকে, কখনো পাথরের লেখা থেকে, কখনো চামড়ার লেখা বা মানুষের মুখস্ত করা কুরআন থেকে। আর আমি কুরআন সংরক্ষণ করতে কোন প্রকার ভুল ত্রুটির আশ্রয় নেইনি। (সহীহ আল-বুখারী, খন্ড. ৬, পৃ. ৪৭৮)।[২৫]

আল কুরআন সংকলন বোর্ডের দশজন জনপ্রিয় ব্যক্তি হলেন,

  1. ওমার ইবনে খাত্তাব [২৬]
  2. উসমান ইবনে আফফান[২৭]
  3. আলী ইবনে আবু তালিব[২৮]
  4. আবু মুসা আল আশ'আরী[২৯]
  5. উবাই ইবনে কাব[৩০]
  6. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ[৩১]
  7. যায়েদ ইবেন সাবিত[৩২]
  8. আবু হুরায়রা[৩৩]
  9. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস[৩৪]
  10. আবু আল-দারদা[৩৫]

আর এদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুইজন হলেন, জায়েদ ইবনে সাবিত যিনি নবী মুহাম্মদের নিযুক্ত লেখক ছিলেন। অপর জন হলেন উবাই ইবনে কাব, যিনি জায়েদের পর সবচেয়ে বেশি আবদান রেখেছিলেন।[৩৬][৩৭]

উসমান ইবনে আফফান এবং তার সম্রাজ্জ্য[সম্পাদনা]

আল কুরআনের সংকলন ও গ্রন্ধাকারে প্রকাশ পায় উসমান ইবন আফ্‌ফান এর খেলাফত কালে। তিঁনি মুসলিম জাতির জন্য আল কুরআনকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান কর্তৃৃক (সংকলন. ২৩/৬৪৪-৩৫/৬৫৫) যা ছিল নবী (সা) এর ওফাতের প্রায় বিশ বছর পর আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ সংকলন।[৩৮]

হয়রত উসমানের খেলাফতের সময় আল কুরআন সংকলনের প্রয়োজন ছিল, কেননা তখন রাজ্য অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিশেষ করে যারা অনারব ছিল তাদের জন্য কুরআন অধ্যয়ন খুব কষ্ঠকর ছিল। সে সময় জটিলতা দেখা দিয়েছিল ইরাক, সিরিয়া, মিশর, এবং ইরাকে। কেননা এই দেশ গুলোতে সবে মাত্র ইসলাম প্রবেশ করেছিল। যাদের মধ্য অধিকাংশই নতুন মুসলিম ছিল। যারা কুরআন ঠিকমত পাঠ করতে পারত না। [৩৯]

অনুলিপি যাচাই ও প্রামাণ্য পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত[সম্পাদনা]

উসমান কর্তৃক প্রামাণ্য পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের আগে , কুরআনের কিছু অনুলিপি ছিল যার কোনটিই বর্তমানে পাওয়া যায় না । এই অনুলিপিগুলো কখনোই সার্বজনীন অনুমোদন পায়নি এবং মুসলমানরা এগুলোকে ব্যাক্তিগত নকল হিসেবেই দেখত ।[৪০]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের অনুলিপি[সম্পাদনা]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের অনুলিপিটি ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিশ্বাসযোগ্য । তিনি ছিলেন প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন এবং পরবর্তীতে মুহাম্মদের ব্যাক্তিগত সেবক হয়েছিলেন। বর্ণনায় এসেছে যে , তিনি সত্তরটি সূরা সরাসরি মুহাম্মদের থেকে শিক্ষা পেয়েছিলেন। মুহাম্মদ তাকে কুরআন তেলাওয়াতকারী প্রথম শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ।

উবাই ইবনে কাবের অনুলিপি[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় প্রভাবশালী অনুলিপিটি ছিল উবাই ইবনে কাবের । তিনি ছিলেন মদিনার মুসলিমদের একজন এবং মুহাম্মদের ব্যাক্তিগত লেখক ।এমনটা বিশ্বাস করা হয় যে , মুহাম্মদের জীবদ্দশায় তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের চেয়েও বড় কুরআন বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

প্রথম দিকের অনুলিপি থেকে শেষ বিশুদ্ধ পাণ্ডুলিপি[সম্পাদনা]

উসমান কর্তৃক অন্যান্য অনুলিপিগুলী নষ্ট করার পরও , বিভিন্ন স্থানে পড়ার পদ্ধতি ও উচ্চারণে পার্থক্য করা হচ্ছিল ।

হস্তলিখিত পুঁথির যুগে , কুরআনই ছিল সবচেয়ে বেশী অনুলিপি করা আরবি পাঠ্য । এটা বিশ্বাস করা হত যে , কুরআনের অনুলিপি করা লেখক ও এর মালিক উভয়ই ঈশ্বরের আশীর্বাদপ্রাপ্ত ।[৪১]

উমাইয়া শাসনামলে (৪৪/৬৬১-১৩২/৭৫০) - হেজাজ লিপি[সম্পাদনা]

কুরআনের যেসব হস্তলিখিত অনুলিপি পাওয়া গেছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন গুলোকে একত্রে বলা হয় হেজাজ লিপি ; যেগুলোর অধিকাংশই উমাইয়া শাসনামলে লেখা হয়েছিল।[৪১]

এই হস্তলিখিত অনুলিপিকরন পদ্ধতির অধিকাংশের উন্নয়ন ঘটে পঞ্চম উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিকের শাসনামলে (৬৫/৬৮৫-৮৬/৭০৫)

আব্বাসীয় শাসনামলে (১৩২/৭৫০-৬৪০/১২৫৮)[সম্পাদনা]

আদী আব্বসীয় শৈলী[সম্পাদনা]

প্রথম দিককার আব্বাসীয় অনুলিপিগুলো অনেকগুলো খণ্ডে নকল করা হয়েছিল , যেমনটা উমাইয়া শাসনামলে করা হয়নি । সেখানে বড় আকৃতির লিপি এবং প্রতি পাতাতে কম সঙ্খক লাইন লেখা হয়েছিল । লিপি এবং কাঠামো উভয়টিই তৈরি করা হয়েছিল জ্যামেতিক এবং আনুপাতিক পদ্ধতি ব্যাবহার করে ।

নতুন আব্বাসীয় শৈলী[সম্পাদনা]

কুরআনের নকল করার জন্য নতুন আব্বাসীয় শৈলীর ব্যাবহার শুরু হয় ৯ম শতাব্দীর শেষ থেকে ১২ শতাব্দী পর্যন্ত।এতে উল্লম্ব বিন্যাস পদ্ধতিতে অনুলিপি নকল করা হয়েছিল যা আদী আব্বসীয় শৈলীর থেকে বাতিক্রম।[৪১] এই সময়ে আল খলিল ইবন আহমেদ আল-ফরহেদি (মৃত্যু ৭৮৬) আবু আল আসওয়াদের পদ্ধতি প্রতিস্থাপন করে তাসকীল পদ্ধতি প্রণয়ন করেন। ১১ শতকের পর থেকে তার প্রণীত পদ্ধতি সর্বজনীনভাবে গৃহীত ও ব্যাবহৃত হচ্ছে । এতে ছয়টি বৈশিষ্ট সূচক চিহ্ন ব্যাবহার করা হয়েছেঃ ফাতহাহ্ (আ), যাম্মাহ্ (উ) , কাছরাহ্ (ই) , সুকূন (স্বরধ্বনি-মুক্ত) , শাদ্দাহ্ (দ্বৈত ব্যাঞ্জনধ্বনি), মদ (স্বর দীর্ঘায়ন; আলিফ এর উপর প্রয়োগ করা হয়)।[৪২]

সম্পূর্ণতা[সম্পাদনা]

ইসলামী উৎস[সম্পাদনা]

ইসলামী উৎস হতে জানা যায় যে খলীফা উসমান কর্তৃক প্রামাণ্য পাণ্ডুলিপি তৈরির পর পূর্বের অনুলিপিগুলো বাতিল এবং নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল ।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীঃ সুন্নী এবং শিয়া[সম্পাদনা]

মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে , বর্তমানে আমরা যে কুরআনকে দেখি তা আসলে একটি এবং একমাত্র মৌলিক গ্রন্থ যা নাযিলের পর থেকে একটুও বিকৃত হয়নি । এর মৌলিকতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে যার দাবী এই আয়াতটিতেও করা হয়েছে । "নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।" (কুরআনঃ ১৫ঃ ৯)

আল -খই এর বর্ণনা মতে উসমান যে সময়ে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত হন সে সময়ে ইসলাম এত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল যে তিনি বা তার চেয়ে ক্ষমতাশালী কারও পক্ষেও এটা অসম্ভব ছিল ; সামান্যতম অংশ পরিবর্তন করা । সে সময়ে কুরআনের মূল্য ও গুরুত্তবোধই একে রদবদল হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। ইসলাম পূর্ব যুগে আরবরা পদ্য মুখস্তকরনকে অনেক গুরুত্ত দিত । এই পদ্ধতি তাদের সংস্কৃতিরই অংশ ছিল এবং তারা এতে অত্যান্ত দক্ষ ছিল । এটা কল্পনা করা কঠিন যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের গ্রন্থকে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তারা অনুরুপ গুরুত্ব দেয়নি , বিশেষকরে যখন তারাই এটা বিশ্বাস করত যে মুখস্তকরনের ফলস্বরূপ তারা মৃত্যুর পরেও পুরুস্কৃত হবে। উসমান অনুলিপি করার সময় রদবদল করতে পারত , কিন্তুুু মুখস্ত করা মুসলমানগনের হৃদয় থেকে কুরআনের সামান্যতম অংশও মুছে ফেলা তার পক্ষেও সম্ভব হত না। [৪৩]

হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি[সম্পাদনা]

বিংশ শতাব্দীতে সানার অনুলিপি আবিষ্কৃত হয় । এটি ৬৩২-৬৭১ খ্রিষ্টাব্দের বলে নির্ধারণ করা গেছে । এর আয়াত এবং ক্রমবিন্যাস হুবহু বর্তমানের প্রমিত কুরআনের অনুরুপ।[৪৪]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Donner, Fred (২০১০)। Muhammad and the Believers: at the Origins of Islam। London, England: Harvard University Press। পৃ: 153–154। আইএসবিএন 978-0-674-05097-6 
  2. F. E. Peters, The Quest of the Historical Muhammad, International Journal of Middle East Studies, Vol. 23, No. 3 (Aug.,1991), p. 297
  3. Andrew Rippin (২০০৯)। "Qur'an"Oxford Bibliographies। Oxford: Oxford University Press। (সদস্যতা প্রয়োজনীয় (help))। "How the Qurʾan came into being and why it looks the way it does has proven to be a continual focus of attention for scholarship. Most accounts accept the basic framework of the Muslim memory, with the role of Muhammad as the recipient of revelation and the role subsequent caliphs in bringing the text together clearly separated. Some scholarship has wanted to challenge the originality and source of the text itself, tracing it to other religious communities (especially Christian: Lüling 2003; Luxenberg 2007). Others have tried to refine the Muslim accounts of revelation and collection." 
  4. Estelle Whelan, Forgotten Witness: Evidence For The Early Codification Of The Qur'an, 1988, Journal Of The American Oriental Society, 1998, Volume 118, pp. 1-14.
  5. Esack, Farid (২০০৫)। The Qur'an: A User's Guide। Oxford England: Oneworld Publications। আইএসবিএন 978-1851683543 
  6. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Revelation"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 540–543। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  7. Al Faruqi, Lois Ibsen (১৯৮৭)। "The Cantillation of the Qur'an"। Asian Music 19 (1): 3–4। ডিওআই:10.2307/833761 
  8. Leaman, Oliver (২০০৬)। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 540–543। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  9. khaled (১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। "The Truth of Islam" 
  10. Rippin, Andrew (২০০৯)। The Blackwell Companion to the Qur'an। Chichester, West Sussex: Blackwell Publishing। পৃ: ১৬৫। আইএসবিএন 978-1-4051-8820-3 
  11. Rippin, Andrew (২০০৯)। The Blackwell Companion to the Qur'an। Chichester, West Sussex: Blackwell Publishing। পৃ: 165–166। আইএসবিএন 978-1-4051-8820-3 
  12. Ibn al-Hajjaj, Muslim। "Sahih Muslim, Book 31, #5920" 
  13. Al-Khu'i, Al-Sayyid (১৯৯৮)। The Prolegomena to the Qur'an। New York: Oxford University Press। পৃ: ১৭২। আইএসবিএন 0-19-511675-5 
  14. Al-Khu'i, Al-Sayyid (১৯৯৮)। The Prolegomena to the Qur'an। New York: Oxford University Press। পৃ: ১৭৩। আইএসবিএন 0-19-511675-5 
  15. Modarressi, Hossein (১৯৯৩)। "Early Debates on the Integrity of the Qur'an: A Brief Survey"। Studia Islamica 77: ৮। ডিওআই:10.2307/1595789 
  16. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Ali"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 30–31। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  17. Al-Khu'i, Al-Sayyid (১৯৯৮)। The Prolegomena to the Qur'an। New York: Oxford University Press। পৃ: ১৫৩। আইএসবিএন 0-19-511675-5 
  18. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Ali"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York: Routledge। পৃ: 30–31। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  19. Al-Khu'i, Al-Sayyid (১৯৯৮)। The Prolegomena to the Qur'an। New York: Oxford University Press। পৃ: 154–155। আইএসবিএন 0-19-511675-5 
  20. "The Biography of Abu Bakr As-Siddeeq"। Archive.org। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  21. "Hadith - Book of Judgments (Ahkaam) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১২-০৪-২৬। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  22. Usmani, Mohammad Taqi (২০০০)। Abdur Rehman, Rafiq, সম্পাদক। An approach to the Quranic sciences। Birmingham: Darul Ish'at। পৃ: 191–6। 
  23. Hasan, Sayyid Siddiq; Nadwi, Abul Hasan Ali (২০০০)। The collection of the Qur'an। Karachi: Qur'anic Arabic Foundation। পৃ: 34–5। 
  24. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; Al-A.27zami1 নামের সূত্রের জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  25. "The Biography of Abu Bakr As-Siddeeq"। Archive.org। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  26. "Hadith - Chapters on Virtues - Jami` at-Tirmidhi - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  27. "Hadith - Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the Prophet (pbuh)) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  28. "Hadith - Book of Prayer (Kitab Al-Salat): Detailed Injunctions about Witr - Sunan Abi Dawud - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১৩-০৪-০৯। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  29. "Hadith - The Book of Virtue, Enjoining Good Manners, and Joining of the Ties of Kinship - Sahih Muslim - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১২-০৪-২৬। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  30. "Hadith - Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the Prophet (pbuh)) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  31. "Hadith - Book of Dialects and Readings of the Qur'an (Kitab Al-Huruf Wa Al-Qira'at) - Sunan Abi Dawud - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১২-১০-২১। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  32. "Hadith - The Book of Fighting [The Prohibition of Bloodshed] - Sunan an-Nasa'i - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১৪-০১-৩১। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  33. "Hadith - The Book of Mosques and Places of Prayer - Sahih Muslim - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। ২০১২-০৪-২৬। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  34. "Hadith - Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the Prophet (pbuh)) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  35. "Hadith - Chapters on Tafsir - Jami` at-Tirmidhi - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  36. "Hadith - Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the Prophet (pbuh)) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  37. "Hadith - Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the Prophet (pbuh)) - Sahih al-Bukhari - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"। Sunnah.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৭-২৪ 
  38. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Canon"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 136–139। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  39. Al-Tabari (১৯৮৯)। Ihsan Abbas; C. E. Bosworth; Jacob Lassner; Franz Rosenthal; Ehsan Yar-Shater, সম্পাদকবৃন্দ। The History of al-Tabari: The Conquest of Iraq, Southwestern Persia, and Egypt। Gautier H. A. Juynboll (trans.)। Albany, NY: State University of New York Press। পৃ: 2–6। আইএসবিএন 0-88706-876-6 
  40. Esack, Farid (২০০৫)। The Qur'an: A User's Guide। Oxford England: Oneworld Publications। আইএসবিএন 978-1851683543 
  41. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Manuscript and the Qur'an"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 384–389। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  42. Leaman, Oliver (২০০৬)। "Calligraphy and the Qur'an"। The Qur'an: an Encyclopedia। New York, NY: Routledge। পৃ: 130–131। আইএসবিএন 0-415-32639-7 
  43. Al-Khu'i, Al-Sayyid (১৯৯৮)। The Prolegomena the Qur'an। New York: Oxford University Press। পৃ: ১৭২। আইএসবিএন 0-19-511675-5 
  44. Behnam Sadeghi & Mohsen Goudarzi, "Sana'a and the Origins of the Qu'ran", Der Islam, 87 (2012), 26.