কুফু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

কাফাহ বা কুফু (আরবি: الكفاءة‎‎; আল-কাফ'আ৷ অর্থঃ দক্ষতা বা যোগ্যতা) হল ইসলামে বিয়ের ব্যাপারে ইসলামী আইনশাস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যার আরবি ভাষায় আক্ষরিক অর্থ, দক্ষতা বা সমতা, সমান, সাদৃশ্য, সমকক্ষ, সমতুল্য ইত্যাদি।[১][২] বিয়ের ক্ষেত্রে বর-কনের রুচি, চাহিদা, বংশ, যোগ্যতা সব কিছু সমান সমান বা কাছাকাছি হওয়াকে ইসলামী পরিভাষায় কুফু বলে।[৩] অতএব, একে একটি সম্ভাব্য স্বামী এবং তার সম্ভাব্য স্ত্রীর মধ্যে সামঞ্জস্য বা সমতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা মেনে চলতে হবে।[২] এই সামঞ্জস্য ধর্ম, সামাজিক মর্যাদা, নৈতিকতা, ধার্মিকতা, সম্পদ, বংশ বা রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত একাধিক কারণের উপর নির্ভরশীল। সাধারণত ধর্মীয় নৈতিকতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও আলেমগণ কনের তুলনায় বরের সার্বিক অবস্থানকে কাছাকাছি কিন্তু তুলনামুলক উত্তম হওয়া সুবিধাজনক বলে পরামর্শ দেন, এবং বরের অবস্থান যেন কনের অবস্থান থেকে নীচু না হয় সে ব্যাপারে লক্ষ রাখতে বলেন।

আইনি বিধিবিধান[সম্পাদনা]

ইসলামী পণ্ডিতরা (উলামা) কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে কুফুর মতবাদ সম্পর্কে ভিন্ন মতামত ও যুক্তি রাখেন। চারটি সুন্নি মাধবের দ্বারা যা ধারাবাহিকভাবে সম্মত হয় তা হল ধর্মের সামঞ্জস্যতা। মুসলিম নারীরা শুধুমাত্র মুসলিম পুরুষদের বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মুসলিম পুরুষদেরও ইহুদি বা খ্রিস্টান মহিলাদের সাথে বিবাহ করার অনুমতি আছে। শিয়া ইসলামে বংশের ভিত্তিতে কাফার কোন ধারণা নেই।

হানাফী অবস্থান[সম্পাদনা]

ঐতিহ্যবাহী হানাফী মাযহাবের মতে, কুফু বিবাহের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলার মধ্যে একটি বিশেষ আনুপাতিকতার প্রতিনিধিত্ব করে।

পাকিস্তানি মুফতি ও দায়ী তারিক মাসুদ বলেন, "ফুকাহায়ে কেরাম ছয় জিনিসের মাঝে কুফু ঠিক রাখার কথা বলেছেন। এ ছয় জিনিসের মাঝে কুফু ঠিক থাকা আবশ্যক। এ ছয় জিনিস পুরুষের জন্য নয়। পুরুষ নিজের চেয়ে নিচু জায়গায় বিয়ে করলেও শরীয়াতে তাকে অনুমতি দেয়। পুরুষ নিচু থেকে নিচুতে শাদি করতে পারবেন। কিন্তু মেয়ে পারবে না। বরং মেয়ের বেলায় কুফু তার সমপর্যায়ের হবে বা উঁচু হবে। তাহলে বিয়ে সফল হবে। অন্যথা সফল হবে না।

ছয়টি জিনিস নিম্মরুপ :

ক) বংশ: নারীর চেয়ে নিচু বংশের কারো সাথে কুফু হবে না। বরং সমপর্যায়ের বা উঁচু হতে হবে।

খ) পেশা: পেশায় নারীর চেয়ে নিচু হলে চলবে না। উঁচু বা সমপর্যায়ের লাগবে।

গ) দৌলত: এ দৌলত দ্বারা টাকা পয়সা কিংবা ব্যাংক ব্যালেন্স উদ্দেশ্য নয়। টাকা পয়সাতো আসে যায়। কখনো আছে। কখনো নাই। দেখা যায় আজ গরীব। কাল ধনী। তাই শরীয়ত কখনো টাকা পয়সাকে দৌলতমন্দ বলেনি। বরং কারো যদি দু’হাত ও দু’পা থাকে তাহলে শরিয়ত তাকে ধনী হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। কেননা সে সম্পদ উপার্জন করতে পারবে, (অর্থাৎ উৎপাদনশীল হবে)। এখানে দৌলত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এতটুকু পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া যতটুকু হলে মেয়ের মহরের টাকা দিতে পারে।

ঘ) ইসলাম: মুসলমান কন্যাকে মুসলমানের কাছেই বিয়ে দিতে হবে। কোনো ঈসায়ীর কাছে দিলে হবে না। তবে কোনো পুরুষের জন্য ঈসায়ীকে বিয়ে করা জায়েজ।

ঙ) দীনদারী: দীনদারী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মেয়ে দীনদার। আর ছেলে কোন ধরণের কবীরা গুনাহে লিপ্ত। তাহলে সেও এই মেয়ের উপযুক্ত নয়। দীনদার নারীকে ফাসেকের কাছে বিয়ে দিলে বাবাকে কেয়ামাতের দিন জবাবদিহি করতে হবে।

চ) আলেমা: কোনো সত্যিকারের আলেমা মেয়ের কুফু গায়রে আলেম হতে পারবে না। সব মহিলা মাদরাসার ছাত্রীরা ভালো আলেমা হয় না এটা সবার আগে মনে রাখতে হবে। তবে ভালো মজবুত যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমা মেয়ের বিয়ে গাইরে আলেমের কাছে দিতে পারবে না। তবে আলেম ছেলে আলেমা ও গায়রে আলেমা সবাইকে বিয়ে করতে পারবে।"

মাসুদের মতে, "এই ছয়টি বিষয় বিয়ের সময় পিতার দেখা জরুরি। কিন্তু আজকাল সমাজে কুফু মিলানো অনেক কঠিন। যদি বাবা এসব দেখা শুরু করে তাহলে সবদিক দিয়ে মিলানো মুশকিল। তাই ফুকাহায়ে কেরাম এর একটি সুরত বের করেছেন। সেটা হলো, ‘কোনো কুফুওয়ালা ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রী বানিয়ে দেয়া। কেননা কোনো গাইরে কুফুর কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়ার চেয়ে কুফুওয়ালা ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রী বানানো উত্তম। এর মাঝে দাম্পত্যজীবন সুখী হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। গাইরে কুফুওয়ালার কাছে দাম্পত্যজীবন সফল হওয়ার সুযোগ অনেক কম। এর মাঝে সারাজীবন দুঃখিনী মহিলা কষ্ট পেতে থাকে। একটা সময় এসে বিয়ে ভেঙ্গে যায়। অশান্তি দেখা দেয়। তাই পরিবারে শান্তির জন্য কুফু দেখে বিয়ে দেয়া জরুরি।"[৪]

মালেকী অবস্থান[সম্পাদনা]

ঐতিহ্যবাহী মালেকী অবস্থান বলে যে, স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের জন্য ধর্মের মধ্যে কুফু হল সমানুপাতিক।

শাফি অবস্থান[সম্পাদনা]

শাফেয়ী চিন্তাধারার মতে, কুফু বংশ, ধর্মীয়তা, পেশা, এবং ত্রুটিমুক্ত হওয়া যা বিবাহ চুক্তি (নিকাহ) বাতিল করার অনুমতি দেয়। কাকে বিয়ে করতে হবে তার সুপারিশ হিসেবে এটা ভুল বোঝা যাবে না। বরং, এটি একটি আইনী নিষেধাজ্ঞা হিসাবে গ্রহণ করা উচিত যাতে একজন নারীর বিবাহের ক্ষেত্রে তার স্বার্থ রক্ষা করা যায়। যদি কোন মহিলা এই বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে আপাতদৃষ্টিতে বেমানান কাউকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে তা করতে তার কোন দোষ নেই। তদনুসারে, একজন আরব মহিলার কোনো অনারব পুরুষকে বিয়ে করা উচিত নয়; একইভাবে, একজন পুণ্যবান মহিলার দুর্নীতিগ্রস্ত পুরুষকে বিয়ে করা উচিত নয়, (যদিও স্বামী তার অন্যায় ত্যাগ করা যথেষ্ট)। উচ্চতর পেশার কারও কন্যাকে নীচ পেশার পুরুষকে বিয়ে করা উচিত নয়। উভয় পক্ষের সম্পদ বিবেচনার বিষয় নয়, কারণ এটি নিছক সাময়িক এবং "যারা আত্মসম্মান এবং বুদ্ধিমত্তার অধিকারী তারা এতে গর্ব করে না।"

হাম্বলী অবস্থান[সম্পাদনা]

হাম্বলী চিন্তাধারার পণ্ডিতরা বলেন যে, কুফু পাঁচটি বিষয়, যেমন, ধর্ম, বংশ, স্বাধীনতা, চাকরি এবং সম্পদের উপর ভিত্তি করে মিল এবং আনুপাতিকতার প্রতিনিধিত্ব করে।

উদ্দেশ্য[সম্পাদনা]

কাফফার মূল লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী বিবাহ করা। যুক্তি হল যে সাধারণ ধারণা, সমতুল্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি পরিবার একটি শান্তিপূর্ণ এবং সুখী বিবাহ করবে। যাইহোক, যদি এই ধরনের যুক্তি গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটি প্রশ্ন উত্থাপন করে যে কেন এই নিষেধাজ্ঞাগুলি শুধুমাত্র একজন সম্ভাব্য স্ত্রীর জন্য প্রযোজ্য, স্বামীর উপর নয়। আইনী বিধিবিধানের সাথে আরও সংগত একটি উদ্দেশ্য হ'ল সম্ভাব্য স্ত্রীর স্বার্থ রক্ষা করা নিশ্চিত করে যে সে তার বিবাহিত বন্ধনে অসম্মানিত নয়।

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. Cobb, Paul (২০১২-০৬-২২)। The Lineaments of Islam: Studies in Honor of Fred McGraw Donner (ইংরেজি ভাষায়)। BRILL। পৃষ্ঠা ১৪৯। আইএসবিএন 978-90-04-23194-8 
  2. Mobini-Kesheh, Natalie (১৯৯৯)। The Hadrami Awakening: Community and Identity in the Netherlands East Indies, 1900-1942 (ইংরেজি ভাষায়)। SEAP Publications। পৃষ্ঠা ৯৫। আইএসবিএন 978-0-87727-727-9 
  3. রহমান, হাফিজুর (৬ মার্চ ২০২০)। "বিয়ের ক্ষেত্রে 'কুফু'র গুরুত্ব"নয়া দিগন্ত। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২১ 
  4. "গাইরে কুফুর সঙ্গে কন্যার বিয়ে দেওয়া বাবার জন্য অনেক বড় ভুল: মুফতি তারিক মাসুদ"ourislam24.com। সংগ্রহের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২১ 

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]