কুইক কম্পোস্ট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মাটির প্রাণ হলো জৈবপদার্থ। দীর্ঘদিন ধরেই এ দেশে ফসল চাষে নানা ধরনের জৈবসার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গর্তে পচানো জৈবসার, গাদা করে পচানো জৈবসার ইত্যাদি পদ্ধতিতে এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে জৈবসার তৈরি ও ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচলিত এসব পদ্ধতির একটা বড় অসুবিধা হলো আবর্জনা বা গোবর পচতে দু-তিন মাস সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে জৈবসার ব্যবহার করে জমিতে তা ব্যবহার করা অসুবিধাজনক। এমনকি তৈরির স্খানে এসব সার দীর্ঘদিন পড়ে থাকতে থাকতে অনেক সময় তার পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যায়, চুইয়ে নষ্ট হয়, উড়ে যায়।

তাই সম্প্রতি দ্রুত বিভিন্ন জীবজ পদার্থ পচিয়ে জৈবসারে রূপান্তরিত করার একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। বিভিন্ন জীবজ পদার্থ বা আবর্জনার সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে পচিয়ে জৈবসার তৈরি করা হয় বলে এ সারের নাম দেয়া হয়েছে ‘কুইক কম্পোস্ট’। স্বল্প সময়ে অর্থাৎ ১৫ দিনেই এ সার তৈরি ও ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায়। তা ছাড়া এই সার অন্যান্য জৈবসারের চেয়ে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন।

বর্তমানে এসব সুবিধার কারণে পল্লী অঞ্চলে এ ধরনের জৈবসার তৈরিতে চাষিদের যথেষ্ট আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সম্প্রসারণ কর্মীরা এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছেন। তৈরির উপকরণ সহজলভ্য হলে কুইক কম্পোস্টের প্রসার বাড়তে পারে বলে তার ধারণা।

উপাদান[সম্পাদনা]

কুইক কম্পোস্ট তৈরি করতে লাগে খৈল, কাঠের গুঁড়া বা চালের কুঁড়া ও অর্ধপচা (ডিকম্পোজড) গোবর বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা। এসব উপাদানের মিশ্রণ অনুপাত হবে ১:২:৪।

তৈরির পদ্ধতি[সম্পাদনা]

খৈল ভালোভাবে গুঁড়া করে চালের কুঁড়া বা কাঠের গুঁড়া ও আধাপচা মুরগির বিষ্ঠা বা গোবরের সাথে উত্তমভাবে মেশাতে হবে। মিশ্রণে পরিমাণমতো পানি যোগ করে কাই বানাতে হবে, যাতে ওই মিশ্রণ দিয়ে কম্পোস্ট বল তৈরি করলে ভেঙে যাবে না; কিন্তু ১ মিটার ওপর থেকে ছেড়ে দিলে ভেঙে যাবে। মিশ্রিত পদার্থগুলো গাদা করে এমনভাবে রেখে দিতে হবে যাতে ভেতরে জলীয় বাষ্প আটকে পচনক্রিয়া সহজ হয়। গাদার পরিমাণ ৩০০-৪০০ কেজির মধ্যে হওয়া ভালো। গাদার সব উপাদান একবারে না মিশিয়ে তিন-চারবারে মেশালে ভালো হয়।

শীতকালে গাদার ওপরে ও চার দিকে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। আর বর্ষাকালে বৃষ্টির জন্য পলিথিন ব্যবহার করতে হবে এবং বৃষ্টি থেমে গেলে পলিথিন সরিয়ে ফেলতে হবে। গাদা তৈরির ২৪ ঘন্টা পর থেকে গাদার তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং ৪৮-৭২ ঘন্টার মধ্যে ৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছায়। অর্থাৎ গাদায় তখন আঙুল ঢুকালে অসহনীয় তাপমাত্রা অনুভূত হবে (৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এর ফলে সৃষ্ট তাপে মিশ্রিত পদার্থ পরে নষ্ট হতে পারে। তাই গাদা ভেঙে ওলটপালট করে ১ ঘন্টা সময়ের জন্য মিশ্রণকে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে এবং পুনরায় আগের মতো গাদা করে রাখতে হবে।

এভাবে ৪৮-৭২ ঘন্টা পরপর গাদা ভেঙে ওলটপালট করতে থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে ওই দ্রুত মিশ্র জৈবসার জমিতে প্রয়োগের উপযোগী হবে। সার তৈরি হলে তা ঝুরঝুরে শুকনো এবং কালো বাদামি রঙ হবে।

প্রয়োগ মাত্রা[সম্পাদনা]

জমির উর্µরতা ও ফসলভেদে প্রতি শতাংশে প্রায় ৬-১০ কেজি কুইক কম্পোস্ট সার ব্যবহার করতে হয়। ফসলের জমি তৈরির সময় প্রতি শতাংশে ৬ কেজি এবং কুশি পর্যায়ে সেচের আগে ২ কেজি করে উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সবজি ফসলের ক্ষেত্রে জমি তৈরির সময় প্রতি শতাংশে ৬ কেজি এবং ৪ কেজি সার রিং বা নালা করে সবজি বেডে প্রয়োগ করতে হয়। সার প্রয়োগের পর সেচ দিতে হয়।

পুষ্টিমান[সম্পাদনা]

কুইক কম্পোস্ট সারে নাইট্রোজেন ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ফসফরাস ০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও পটাশিয়াম ০ শতাংশ ৭৫ শতাংশ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও কিছু গৌণ খাদ্য উপাদান থাকে।

ব্যবহারের উপকারিতা[সম্পাদনা]

কুইক কম্পোস্ট সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পায়, অণুজীবের ক্রিয়া বাড়তে থাকে, ফসলের প্রয়োজনীয় সব খাদ্যোপাদান সহজলভ্য হয়। ফলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় এবং গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়।