কিমেরিয়া (মহাদেশ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আজ থেকে প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে, পার্মিয়ান যুগের মানচিত্র। কিমেরিয়া তখনও পুরাতন টেথিসের দক্ষিণ উপকুলে গন্ডোয়ানার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।
আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে, পার্মিয়ান ও ট্রায়াসিক যুগের সন্ধিক্ষণের মানচিত্র। কিমেরিয়া গন্ডোয়ানা ছেড়ে তার উত্তরমুখী চলন শুরু করেছে। তার দক্ষিণে নব্য টেথিস সাগরের উদ্ভব।
আজ থেকে প্রায় ১৫ - ১০ কোটি বছর আগে। কিমেরিয়া এসে মিলে গেছে লরেশিয়ার সাথে। দক্ষিণে গন্ডোয়ানারও ভাঙন শুরু হয়েছে; ভারতীয় পাত ও মাদাগাস্করের উত্তরমুখী চলন পরিলক্ষণীয়।

কিমেরিয়া হল একটি অধুনালুপ্ত প্রাচীন মহাদেশ, বা আরও বলা ভালো, মহাদেশীয় টুকরো (Terrane)। আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে পার্মিয়ানট্রায়াসিক যুগের সন্ধিক্ষণে সুপ্রাচীন একক মহাদেশ প্যানজিয়ার দক্ষিণ অংশ পরবর্তী সময়ের গন্ডোয়ানা অতিমহাদেশের উত্তর উপকূল থেকে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ফালির মতো একটি অপেক্ষাকৃত সরু ভূভাগ ভূত্বকীয় পাত (টেকটনিক প্লেট) চলাচলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশ উত্তরে সরে আসতে শুরু করে। পুরাতন টেথিস সাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এই ভূভাগ দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে ক্রমশ উত্তরে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত তৎকালীন একক মহাদেশ প্যানজিয়ার উত্তর অংশ, পরবর্তীকালের অতিমহাদেশ লরেশিয়ার দিকে সরে আসতে থাকলে পুরাতন টেথিস ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসতে শুরু করে ও কিমেরিয়ার দক্ষিণে আরেকটি নতূন মহাসাগরের উদ্ভব ঘটে।[১] এই নতুন মহাসাগরটি টেথিস সাগর বা নব্য টেথিস নামে পরিচিত। প্রায় ৬ কোটি বছর পর আজ থেকে প্রায় ২০.৮ কোটি বছর আগে ট্রায়াসিক যুগের শেষের দিকে কিমেরিয়া এসে উত্তরে লরেশিয়ার সাথে মিলে গেলে পুরাতন টেথিস সাগর সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত হয় ও নব্য টেথিস তার জায়গা অধিকার করে।[২] আজকের বলকান অঞ্চলের অংশবিশেষ, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, তিব্বত, মালয় উপদ্বীপ, প্রভৃতি অঞ্চল এই প্রাচীন মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল।[৩]

তত্ত্বের উদ্ভব ও ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রীয় পুরাজীববিদ্‌ মেলখিওর নয়মাইর (Melchior Neumayr) মেসোজোয়িক যুগের সামুদ্রিক পলিস্তর ও তাদের বিন্যাস পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রথম ৎসেন্ট্রালেস মিটলমেয়ার (Zentrales Mittelmeer) বা কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরের ধারণার পত্তন করেন ও বলেন এই সাগর যদিও খুব চওড়া ছিল না, কিন্তু জুরাসিক যুগে সম্ভবত তা পূর্বপশ্চিমে আজকের হিমালয় পর্বতমালা থেকে সুদূর পশ্চিম গোলার্ধের ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।[৪] তাঁকে অনুসরণ করেই ১৮৯৩ সালে এডুয়ার্ড সুয়েস তাঁর চার খণ্ডে প্রকাশিত Das Antlitz der Erde (পৃথিবীর মুখ) গ্রন্থে দেখান যে লরেশিয়া ও দক্ষিণদিকে আজকের একাধিক মহাদেশ একত্রিত হয়ে যে গন্ডোয়ানা অতিমহাদেশ গঠন করেছিল - তাদের মধ্যে একটি স্থলবেষ্টিত সাগরের অস্তিত্ব ছিল। এর একদা অস্তিত্বের সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে তিনি এই গ্রন্থে আফ্রিকা ও আল্পস পর্বতে প্রাপ্ত বিভিন্ন জীবাশ্মের তালিকা পেশ করেন।[৫][৬]

অপরদিকে বিখ্যাত জার্মান ভূতত্ত্ববিদ ও ভাসমান ভূভাগ ও তাকে ভিত্তি করে পরবর্তীকালে ভূত্বকীয় পাত তত্ত্বের জনক আলফ্রেড ভেগেনার তাঁর বিখ্যাত ডি এনটস্টেয়ুং ড্যের কন্টিনেন্টে উন্ড ওৎসেয়ানে (জার্মান - Die Entstehung der Kontinente und Ozeane) গ্রন্থে একটি সুপ্রাচীন একক মহাদেশের কথা বলেন; ঐ গ্রন্থের ১৯২০ সালে প্রকাশিত সংস্করণে যার নাম দেন তিনি উরকন্টিনেন্ট (Urkontinent) বা প্যানজিয়া[৭] এইসময় তিনি সেই একক মহাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কোনও প্রাচীন নিরক্ষীয় মহাসাগরের কথা স্বীকার করেননি। কিন্তু বইটির ১৯২৯ সালের সংস্করণে তিনি এই মহাদেশের ভাঙন ও কতগুলি সঙ্কীর্ণ মহাসাগরের অস্তিত্বের কথা বলেন ও উল্লেখ করেন যে সেগুলি ছিল অপেক্ষাকৃত নবীন।[৮] ১৯৫৮ সালে অস্ট্রেলীয় ভূতত্ত্ববিদ স্যামুয়েল ওয়ারেন কেরি একটি ত্রিভূজাকৃতি প্রাচীন নিরক্ষীয় মহাসাগরের (টেথিস) তত্ত্ব প্রস্তাব করেন যার চওড়া খোলা মুখটি ছিল পূর্বদিকে।[৯] বর্তমানে এই তত্ত্বটিরই আরও সংশোধিত একটি রূপ সাধারণভাবে স্বীকৃত, যার বক্তব্য অনুসারে এই অঞ্চলে একটি নয়, দু'টি মহাসাগর ছিল। এই দুই মহাসাগরের মধ্যে এক বা একাধিক মহাদেশীয় টুকরো বিভাজিকা হিসেবে অবস্থান করত। এদেরই একটি প্রধান টুকরো হল কিমেরিয়া। এর উত্তরমুখী চলনের ফলেই পুরনো মহাসাগরটি সংকুচিত হতে হতে ক্রমে অবলুপ্ত হয় ও তার জায়গা নেয় অপেক্ষাকৃত নতুন আরেকটি মহাসাগর।

বর্তমান স্বীকৃত তত্ত্ব[সম্পাদনা]

বর্তমান স্বীকৃত তত্ত্ব অনুযায়ী কিমেরিয়া আদতে একটি টুকরো মহাদেশীয় পাত, যা একসময় দক্ষিণের অতিমহাদেশ গন্ডোয়ানার সাথে যুক্ত ছিল ও পরবর্তীকালে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তরে ও পূর্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এর বিভিন্ন অংশ ইউরেশিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট। এর সম্বন্ধে যেটুকু জানা যায়, তা নীচে বর্ণিত হল -

৫০ - ৪০ কোটি বছর আগে[সম্পাদনা]

প্রাক ক্যাম্ব্রীয় অধিযুগের (আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্মকাল থেকে ৫৪ কোটি বছর আগে প্রথম খোলকবিশিষ্ট বহুকোষী প্রাণীদের আবির্ভাব পর্যন্ত সময়কাল) শেষের দিক থেকে প্যালিওজোয়িক যুগের (৫৪ কোটি - ২৫.৩ কোটি বছর আগে) বেশির ভাগ সময়কালই কিমেরিয়া ভারতীয় পাত ও সেই সঙ্গে গন্ডোয়ানার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। পুরাতন টেথিস সাগর দ্বারা তা লরেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সম্ভবত এইসময়ই প্যান আফ্রিকান অরোজেনি বা পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়ার কোনও এক বিলম্বিত পর্যায়ে মহাদেশীয় পাতগুলির মধ্যে সংঘর্ষ ও একটি পাতের তলায় আরেকটির ঢুকে যাওয়ার (subduction) মতো প্রক্রিয়াগুলির ফলে গন্ডোয়ানার উত্তরপূর্ব উপকূল তথা ভারতীয় পাতের উত্তর অংশ রীতিমতো প্রভাবিত হয়; কিমেরীয় পাতেও তার প্রভাব দেখা যায়। একাধিক মহাদেশীয় টুকরোর মধ্যে সংঘর্ষ ছিল এর অন্যতম কারণ।[১০] অর্ডোভিশিয়ান যুগের (৪৮.৫৪ ± ০.১৯ থেকে ৪৪.৩৪ ± ০.১৫ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) বিভিন্ন মহাদেশীয় শিলাস্তরের মিশ্রণ ও তার তলায় প্রাপ্ত ক্যাম্বীয় যুগের (৫৪.১ ± ০.১ থেকে ৪৮.৫৪ ± ০.১৯ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) শিলীভূত সামুদ্রিক পলিস্তর পরীক্ষা করে ভূতাত্ত্বিকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাছাড়া এই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নানা গ্রানাইট শিলাস্তরের ইন্ট্রুশন (Intrusion), যাদের বয়স প্রায় ৫০ কোটি বছর, তাও এই ভূতাত্ত্বিক ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে।

৩০ - ২৫ কোটি বছর আগে[সম্পাদনা]

কার্বনিফেরাস যুগে (৩৫.৮৯ কোটি থেকে ২৯.৮ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) ভারতীয় পাতের সাথে কিমেরীয় পাতের একটি চ্যূতির সৃষ্টি হয় ও কিমেরীয় পাত ক্রমশ ভারতীয় পাত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। পার্মিয়ান যুগে (২৯.২৯ কোটি থেকে ২৫.২২ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) এই চ্যূতি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে একটি নতুন মহাসাগরের উদ্ভব ঘটতে শুরু করে। এই মহাসাগরই নব্য টেথিস বা টেথিস সাগর নামে পরিচিত। এরপর ক্রমশ কিমেরিয়া উত্তরে লরেশিয়ার দিকে সরে আসতে থাকে। ফলে তার উত্তরে পুরাতন টেথিস সংকুচিত ও দক্ষিণে নব্য টেথিস প্রসারিত হয়ে উঠতে শুরু করে। আজকের তুরস্ক, ইরান, তিব্বত, ইন্দোচীন, প্রভৃতি এই কিমেরীয় ভূভাগের অংশ ছিল।

২০ - ১০ কোটি বছর আগে[সম্পাদনা]

আজ থেকে প্রায় ১৯ থেকে ২০ কোটি বছর আগে কিমেরীয় পাত ক্রমশ উত্তরে এগিয়ে আসার ফলে লরেশীয় মহাদেশীয় পাতের সাথে তার সংঘাত শুরু হয়। ফলে উত্তরে আজকের কাজাখস্তান, উত্তর ও দক্ষিণ চীনের সাথে ক্রমে তা মিলিত হতে শুরু করলে দু'টি উল্লেখযোগ্য ভূতাত্ত্বিক ঘটনা ঘটে। প্রথমত পুরাতন টেথিস সাগরের ধীরে ধীরে অবলুপ্তি ঘটে, দ্বিতীয়ত কিমেরীয় পাতের উত্তর প্রান্ত বরাবর অনেকগুলি সুউচ্চ ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণীর সৃষ্টি হয়। এই পর্বতশ্রেণীগুলি বর্তমানে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের বলকান, কার্পেথীয়ককেসাস অঞ্চল, তুরস্ক ও ইরানের উত্তর ভাগ এবং মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত। এগুলি একসময় আজকের হিমালয়ের মতোই সুউচ্চ ছিল। এই অঞ্চল জুড়ে অনেক মৃত ও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব আজও সেই ভূতাত্ত্বিক পাতসমূহের সংঘর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। আজ থেকে ২০ - ১৫ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ জুরাসিক যুগের প্রায় বেশিরভাগ সময় জুড়েই এইসব ভূতাত্ত্বিক ঘটনাগুলি সম্পন্ন হয়।

আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগে ভারতীয় পাতটি বছরে প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার বেগে উত্তরে এগিয়ে আসতে শুরু করে। এমনকী আজও ভারতীয় পাতের এই উত্তরমুখী গতি চালু রয়েছে। প্রায় ২৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বছরে ৫ সেন্টিমিটার হারে এখনও তা উত্তরে (একটু পুব দিকে, সরাসরি উত্তরের সাথে ৩৩° কোণ করে) কাজাখস্তান, সাইবেরিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলে মহাদেশীয় পাতগুলির মধ্যে এখনও সংঘর্ষ চলছে ও একটি পাতের তলায় আরেকটি প্রবেশ (subduction) করে চলেছে। ফলে এই অঞ্চলে অরোজেনি বা পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়া এখনও সজীব।

সাম্প্রতিক গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ[সম্পাদনা]

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সুইস ভূতাত্ত্বিক ইয়োভান স্ট্যোকলিন মধ্যপ্রাচ্যে যে বিশদ ক্ষেত্রসমীক্ষা চালান, তাতে তিনি দেখতে পান যে ইরানের উত্তরাংশে অবস্থিত আলবুর্‌জ পর্বতমালার উত্তরপ্রান্ত দু'টি মহাদেশীয় পাতের সংযোগস্থলের (suture) উপরে অবস্থিত। তিনি এই অঞ্চলকে প্যালিওজোয়িক মহাযুগে গন্ডোয়ানার উত্তর উপকূল ও পুরাতন টেথিসের অবশেষ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, প্যালিওজোয়িক মহাযুগে ইরান আরব তথা গন্ডোয়ানারই উত্তর অংশ হিসেবে বিরাজ করত, যা উত্তরে একটি সাগর দ্বারা আরও উত্তরের ভূভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। আজকের কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ অংশের গভীর খাত ও আশেপাশের পর্বতাঞ্চলকে তিনি এই পুরনো বুজে যাওয়া সাগরেরই অবশেষ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি সেই সঙ্গে দক্ষিণপশ্চিম ইরানের জগ্রোস পর্বতমালা বরাবর ইরানীয় পাতআরবীয় পাতের সংযোগস্থলে আরেকটি অতি পুরাতন চ্যুতির অস্তিত্বও খুঁজে পান, যা সম্ভবত প্যালিওজোয়িক মহাযুগের শেষের দিক বা মেসোজোয়িক মহাযুগের (২৫.২২ কোটি - ৬.৬ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) প্রথমদিকে এই দুই পাতকে আলাদা করে দিয়েছিল। এরউপর ভিত্তি করে তিনি অনুমান করেন যে নিশ্চয়ই এই দক্ষিণের চ্যুতিটি বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে দক্ষিণে আরেকটি সাগরের (নব্য টেথিস) উদ্ভব হয়েছিল। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে এই নতুন সাগরটির উদ্ভবের সাথে সাথে আজকের ইরান গন্ডোয়ানার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মেসোজোয়িক মহাযুগের শেষের দিকে নিশ্চয়ই একটি ক্ষুদ্র মহাদেশে পরিণত হয়েছিল। তিনি একে ইরানীয় ক্ষুদ্রমহাদেশ নামে অভিহিত করেন। কিন্তু এই দক্ষিণের এই নব্য সাগরটি প্যালিওসিন উপযুগে (৬.৬ কোটি - ৫.৬ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) হিমালয় ও আল্পস পর্বতমালার গঠনপ্রক্রিয়ার সময় আবার বুজে যায়। অর্থাৎ, এই অঞ্চলের দক্ষিণে আরও একটি মহাদেশীয় পাত সংযোগস্থল নিশ্চিতভাবে অবস্থান করছে, যা ইরানীয় পাতের সাথে তার দক্ষিণের মহাদেশীয় পাতের পুনরায় একত্রিত হওয়াকে সূচিত করে।[১১] দক্ষিণের এই মহাদেশীয় পাত সংযোগস্থল সম্পর্কিত স্ট্যোকলিনের এই অনুমান পরবর্তী গবেষণায় বহুলাংশেই প্রমাণিত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদজগতের বিবর্তনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, কার্বনিফেরাস যুগ (৩৫.৮৯ কোটি থেকে ২৯.৮ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) পর্যন্ত তার সাথে গন্ডোয়ানার ঐ জাতীয় উদ্ভিদের বিবর্তনের অত্যন্ত মিল, কিন্তু ট্রায়াসিক যুগ (২৫.২২ কোটি - ২০.১৫ কোটি বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) থেকে ইউরেশীয় উদ্ভিদের বিবর্তনের সাথে তার মিল বেশি। অর্থাৎ এই দুই সময়ের মধ্যবর্তীযুগে ইরান গন্ডোয়ানা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এসে নিশ্চয়ই পৃথকভাবে অবস্থান করেছিল ও অবশেষে ইউরেশিয়ার সাথে মিলিত হয়েছিল।[১২] (মূল নিবন্ধ - ইরানীয় ক্ষুদ্রমহাদেশ)

১৯৮০'র দশকে তুর্কি ভূতত্ত্ববিদ সেলাল সেনগ্যোর যে গবেষণা চালান, তার ফলে স্ট্যোকলিন বর্ণিত ইরানীয় ক্ষুদ্রমহাদেশের সীমা পশ্চিমে ও পূর্বে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমে তুরস্ক থেকে পূর্বে তিব্বত হয়ে সুদূর ইন্দোচীন পর্যন্ত এর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে তিনি অনুমান করেন।[১৩][১৪] ১৯০১ সালে এডুয়ার্ড সুয়েস মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণীগুলিকে বোঝাতে যে শব্দবন্ধ কিমেরিশেস গেবর্গে (Kimmerisches Gebirge) ব্যবহার করেছিলেন[১৫], তাকেও তিনিই পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন ও তাঁর বর্ণিত ফালির মতো সরু কিন্তু লম্বা মহাদেশীয় টুকরোটিকে কিমেরিয়া নামে অভিহিত করেন।[১২][১৬] সেনগ্যোর দেখান যে বর্তমানে পশ্চিমে আল্পস থেকে পূর্বে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত যে একের পর এক পর্বতশ্রেণী একরকম একটানা শৃঙ্খলের মতো অবস্থান করছে, বাস্তবে তা দু'টি পৃথক পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়ার (অরোজেনি) ফল। এই দু'টি পৃথক পর্বতগঠন প্রক্রিয়া কালের হিসেবেও সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু তারা একের উপর আরেকটি যেন চেপে বসেছে (superimposed)। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে এই সব পর্বতে একাধিক যুগের বিভিন্ন শিলাস্তর যেন কিছুটা জালের মতো মিশে রয়েছে। তার মধ্যে পুরনোগুলিকে তিনি কিমেরীয় পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়ার ফল বলে অভিহিত করেন ও পরবর্তীগুলিকে আল্পীয় পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই দুই পর্বতগঠন প্রক্রিয়াকে তিনি দু'টি পৃথক মহাসাগর বুজে যাওয়ার সময়কালের বলে বর্ণনা করেন। তার মধ্যে উত্তরেরটি ছিল পুরাতনতর; এটি বুজে আসার ফলে যে কিমেরীয় পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হয়, তা ছিল বস্তুত এক বৃহত্তর প্রক্রিয়া। অপরদিকে দক্ষিণের অপেক্ষাকৃত নবীনতর আল্পীয় প্রক্রিয়াটির মূলেও ছিল ভূত্বকীয় পাতের চলনের ফলে দক্ষিণে আরও একটি মহাসাগরের বুজে আসা। এই দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ ফালির মতো মহাদেশীয় ভূভাগটিই ছিল কিমেরিয়া, যা এই দুই মহাসাগরকে পুরাতন টেথিস বুজে যাওয়ার সময় পর্যন্ত পৃথক করে রেখেছিল।[১৬]

বর্তমান গুরুত্ব[সম্পাদনা]

যেহেতু কিমেরিয়াকে দু' দুটি অরোজেনি বা পর্বত উৎক্ষেপন প্রক্রিয়া, সাবডাকশন বা একটি মহাদেশীয় পাতের অন্য আরেকটির তলায় প্রবেশ, প্রভৃতি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, এই অংশের শিলাস্তরে বহু ওলোটপালোট ঘটে গেছে। প্রাচীন কিমেরিয়াভুক্ত অঞ্চলগুলি তাই বর্তমানে নানা খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যেমন একমাত্র বলিভিয়ার আলতিপ্লানো অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সমস্ত অ্যান্টিমনি খনিই এই কিমেরিয়ায় অবস্থিত। এর মধ্যে নাম করা খনিগুলো রয়েছে মূলত তুরস্ক, ইউনানতাইল্যান্ডে। এছাড়াও পৃথিবীর ক্রোমাইট আকরিকের এক বড় অংশ তুরস্কে পাওয়া যায়। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ও তাইল্যান্ডে প্রচূর পরিমানে টিনের আকরিক পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Golonka, J. (2007). [ "Phanerozoic paleoenvironment and paleolithofacies maps: late Palezoic"]. Geologia. 33 (2): 145–209. পৃঃ - ১৮২। সংগৃহীত ১৩ অক্টোবর, ২০১৭।
  2. The Middle Triassic Epoch of the Triassic Period: 245 to 228 million years ago সংগৃহীত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
  3. Scotese C.R. & W. S. McKERROW. "Revised World maps and introduction". Geological Society, London, Memoirs. 12 (1): 1–21. doi.org/10.1144/GSL.MEM.1990.012.01.01 সংগৃহীত ১৩ অক্টোবর, ২০১৭।
  4. Kollmann, H. A. (1992). "Tethys—the Evolution of an Idea". In Kollmann, H. A.; Zapfe, H. New Aspects on Tethyan Cretaceous Fossil Assemblages. Springer-Verlag reprint ed. 1992. pp. 9–14. ISBN 978-0387865553. মূল জার্মান সংস্করণ - 27717529. সংগৃহীত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
  5. Suess, E. (1901). "Dasselbe wurde von Neumayr das 'centrale Mittelmeer' genannt und wird hier mit dem Namen Tethys bezeichnet werden. Das heutige europäische Mittelmeer ist ein Rest der Tethys." Der Antlitz der Erde 3. Wien F. Tempsky. (জার্মান) সংগৃহীত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
  6. Suess, E. (1893). "Are ocean depths permanent?". Natural Science: A Monthly Review of Scientific Progress. 2. London. pp. 180– 187. p. 183: "This ocean we designate by the name "Tethys," after the sister and consort of Oceanus. The latest successor of the Tethyan Sea is the present Mediterranean."
  7. Wegener, Alfred (1922). Die Entstehung der Kontinente und Ozeane (জার্মান). ISBN 3-443-01056-3.
  8. Wegener, Alfred (1929). Die Entstehung der Kontinente und Ozeane (জার্মান) (4th ed.). Braunschweig: Friedrich Vieweg & Sohn Akt. Ges. ISBN 3-443-01056-3.
  9. Carey, S. W. (1958). The tectonic approach to continental drift. Continental Drift – A Symposium. Geology Dept., Univ. of Tasmania.
  10. Ulf Linnemann, Richard d’Lemos, Kerstin Drost, Teresa Jeffries, Axel Gerdes, Rolf L. Romer, Scott D. Samson, Rob A. Strachan: Cadomian tectonics. S. 103–154 in: Tom McCann (Hrsg.): The Geology of Central Europe. Volume 1: Precambrian and Palaeozoic. The Geological Society, London 2008, ISBN 978-1-86239-245-8, S. 103
  11. Stöcklin, J. (1974). "Possible Ancient Continental Margins in Iran". In Burk, C. A.; Drake, C. L. The geology of continental margins. Springer Berlin Heidelberg. pp. 873–887. সংগৃহীত ২১ অক্টোবর, ২০১৭।
  12. Stampfli, G. M. (2000). "Tethyan oceans" (PDF). Geological society, London, special publications. 173 (1): 1–23. সংগৃহীত ২১ অক্টোবর, ২০১৭।
  13. Şengör, A. M. C. (1984). "The Cimmeride orogenic system and the tectonics of Eurasia". Geological Society of America Special Papers. 195: 1–74. ISBN 9780813721958. doi:10.1130/SPE195-p1
  14. Şengör, A. M. C. (1987). "Tectonics of the Tethysides: orogenic collage development in a collisional setting". Annual Reviews of Earth and Planetary Science. 15: 213–244.
  15. Suess, E. (1901). "Der Antlitz der Erde". 3 (2). Wien F. Tempsky. (জার্মান) পৃঃ - ২৩। সংগৃহীত ২৩ অক্টোবর, ২০১৭।
  16. Şengör, A. M. C.; Altıner, D.; Cin, A.; Ustaömer, T.; Hsü, K. J. (1988). "Origin and assembly of the Tethyside orogenic collage at the expense of Gondwana Land" (PDF). Geological Society, London, Special Publications. 37 (1): 119–181. doi:10.1144/gsl.sp.1988.037.01.09.

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]