কাশ্মীরিয়াত

কাশ্মীরিয়াত হল ভারত-শাসিত কাশ্মীরের কাশ্মীর উপত্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় সমন্বয়ের শতাব্দী প্রাচীন আদিবাসী ঐতিহ্য।[৩] ষোড়শ শতাব্দীতে উত্থিত এই অঞ্চলটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি, দেশপ্রেম এবং তাদের পার্বত্য মাতৃভূমি কাশ্মীরের প্রতি গর্বের দ্বারা চিহ্নিত।[৪]
কাশ্মীর উপত্যকার যৌথ হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতি, উৎসব, ভাষা, রন্ধনপ্রণালী এবং পোশাকের উদাহরণ প্রকাশ করে এই কাশ্মীরিয়াত।[৫] কাশ্মীরিয়াতের চেতনায়, উভয় ধর্মের অনুগামীরাই হিন্দু এবং ইসলামের উৎসব উদযাপন করে।[৫] কাশ্মীরি সুলতান জয়ন-উল-আবিদিন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে উৎসাহিত ক'রে কাশ্মীরিয়াতের প্রচার করেছিলেন। কাশ্মীরি রহস্যবাদ অনুযায়ী লাল দেদের (যাকে লাল্লেশ্বরীও বলা হয়) দেহটি ফুলের ঢিপিতে পরিণত হয়েছিল এবং হিন্দু ও মুসলমান উভয়ে মিলে তাকে সমাহিত করেছিল। এই গল্প কাশ্মীরিয়াতের একটি প্রতীক হিসাবে কাজ করে যা এটিকে আজও জীবিত রেখেছে।[৫]
সাম্প্রতিক ২০০৭ সালে নয়াদিল্লিতে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ দ্বারা পরিচালিত জরিপে, শ্রীনগরের ৮৪ শতাংশ মানুষ কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ফিরে আসা দেখতে চায়। কাশ্মীর উপত্যকা সহ তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে জনমতের ২০০১ সালের এমওআরআই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা ধর্ম বা জাতিগত ভিত্তিতে রাজ্যকে বিভক্ত করার বিরোধিতা করেছেন। যাইহোক, পণ্ডিত ক্রিস্টোফার স্নেডেন বলেছেন যে কাশ্মীরিয়াতের ধারণাকে 'আদর্শ বা বীরত্বপূর্ণ আচরণ' হিসাবে দেখানো বা 'রোমান্টিসাইজড' করা হয়েছে এবং কাশ্মীরিয়াত কাশ্মীরি পণ্ডিত ও কাশ্মীরি মুসলমানদের মধ্যে বিদ্বেষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিরোধ করতে পারেনি। [৬]
উৎপত্তি
[সম্পাদনা]কাশ্মীরের বিতর্কিত অঞ্চলটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্য রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইসলাম মধ্যযুগীয় সময়ে প্রবেশ করেছিল এবং শিখ ধর্মও ১৮ ও ১৯ শতকে শিখ সাম্রাজ্যের শাসনাধীন অঞ্চলগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের পুরাণ ও ইতিহাসে কাশ্মীরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। এই অঞ্চলে অনেক কিংবদন্তি হিন্দু ও বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হজরতবাল মাজারে একটি সংরক্ষিত স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে যা ইসলামের নবী মুহাম্মদের চুল বলে বিশ্বাস করা হয়। ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য গুরু নানক কাশ্মীর যাত্রায় যান। কাশ্মীরিরা বিশ্বাস করে যে কাশ্মীরিয়াতের ধারণা সুলতান জয়ন-উল-আবিদিনের শাসনকালে শুরু হয়, যিনি কাশ্মীরের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সমান সুরক্ষা, গুরুত্ব এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন।[৭] কাশ্মীরি রহস্যবাদী লাল দেদের গল্প, যাঁর দেহ ফুলের ঢিপিতে পরিণত হয়েছিল বলে কথিত আছে এবং যেটি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের দ্বারা সমাহিত হয়েছিল, সেটি কাশ্মীরিয়াতের চেতনার একটি প্রাচীন প্রতীক।[৫]
দর্শন
[সম্পাদনা]কাশ্মীরের অস্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হল এর হিমালয় দ্বারা বেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থান, কঠোর শীতকালীন জলবায়ু এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্নতা। এই অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদেশী আক্রমণও দেখা গেছে। কাশ্মীরিয়াত ধর্মীয় পার্থক্য নির্বিশেষে সংহতি, প্রাণোচ্ছলতা এবং দেশপ্রেমের একটি অভিব্যক্তি বলে মনে করা হয়।[৭] এটি সম্প্রীতির নীতি এবং মানুষের এবং তাদের ঐতিহ্যের বেঁচে থাকার সংকল্পকে মূর্ত করে বলে মনে করা হয়। অনেক কাশ্মীরির কাছে কাশ্মীরিয়াত ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের দাবি করে। এটি কাশ্মীর শৈবধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং সুফিবাদ দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং দৃঢ় বিশ্বাস বহন করে যে প্রতিটি ধর্ম একই ঐশ্বরিক লক্ষ্যে নিয়ে যাবে।[৭]
কাশ্মীরও মুঘল সম্রাট আকবরের দীন-ই-ইলাহীর সমন্বিত দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যা হিন্দু ও মুসলিম আদর্শ ও মূল্যবোধের সংমিশ্রণের উপর জোর দিয়েছিল। কাশ্মীরি ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে কাশ্মীরিয়াতের কাজগুলি দৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং একে জীবনের একটি উপায় হিসাবে জোর দেওয়া হয়েছে।[৮] যাইহোক, কাশ্মীরিয়াতের প্রভাব ও গুরুত্ব শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা প্রকৃত ঐতিহাসিক কাশ্মীর। গিলগিট, বাল্টিস্তান, জম্মু এবং লাদাখের দূরবর্তী অঞ্চলগুলি এই দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়নি, কারণ এই অঞ্চলগুলি সংস্কৃতি, ভাষা বা জাতিগত দিক থেকে কাশ্মীরি নয়।[৯]
উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
[সম্পাদনা]ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরে মুসলিম, হিন্দু এবং শিখরা বার্ষিক সুফি উরস উৎসব একসাথে উদযাপন করে।[৫]
কাশ্মীরি মুসলিম গালিচা তাঁতিরা কার্পেট নকশা করেছেন যেগুলিতে হিন্দু দেবতা দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[১০]
প্রতি বছর ১৬ই জুলাই, জ্বালামুখী মেলা খ্রেউ শহরে অনুষ্ঠিত হয়, যেটির আয়োজন করে জ্বালা জি মন্দির। কাশ্মীরি হিন্দু এবং কাশ্মীরি মুসলমানরা এতে অংশ নেয়।[১]
ঈদ উদযাপনের সময়, হিন্দুরা তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের শুভেচ্ছা জানায়, এটি একটি সাধারণ বিষয়, প্রাণ কৌল এই চর্চাকে বলেছেন "সম্পূর্ণ কাশ্মীরীয়তার সংস্কৃতি"-র একটি উদাহরণ।[২]
আধুনিক চ্যালেঞ্জ
[সম্পাদনা]কাশ্মীর সংঘাতের সূচনায় যখন এই অঞ্চলটি পাকিস্তান ও ভারত উভয়েই দাবি করেছিল এবং ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এই অঞ্চলটি বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় কাশ্মীরিয়াত সংস্কৃতি এবং নীতিগুলি ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল। কাশ্মীরের সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক বিতর্কে, কেউ কেউ কাশ্মীরীয়তকে জাতীয়তাবাদ এবং পাকিস্তান ও ভারত উভয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভিব্যক্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে জঙ্গিবাদের সূত্রপাতের ফলে কাশ্মীর থেকে প্রায় সমস্ত হিন্দু চলে এসেছে এবং হিন্দু ও শিখদের অবশিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা হয়েছে, যা কাশ্মীরিয়াতের বুননকে আরও ক্ষয় করেছে।[৭] ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ব্যাপক বিরোধের মধ্যেই রাজ্যে সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার মাধ্যমে মুসলিম ও হিন্দুদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দ্বারা কাশ্মীরিয়াতকে পুনরুজ্জীবিত করার সচেতন প্রচেষ্টা করা হয়েছে।[১১] জম্মু ও কাশ্মীর জুড়ে এবং প্রবাসী কাশ্মীরি সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সাহিত্যের মাধ্যমে কাশ্মীরিয়াতকে উন্নীত করার প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে।[১২]
এছাড়াও দেখুন
[সম্পাদনা]- যৌগিক জাতীয়তাবাদ
- পাঞ্জাবিয়াত, পার্শ্ববর্তী পাঞ্জাব অঞ্চলে বহু-ধর্মীয় ঐক্যের অনুরূপ ঐতিহ্য
- গঙ্গা-যমুনি তেহজীব
- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য
- ফুল ওয়ালোঁ কি সৈর
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 Sajnani, Manohar (২০০১)। Encyclopaedia of Tourism Resources in India (ইংরেজি ভাষায়)। Gyan Publishing House। পৃ. ১৬৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৮৩৫-০১৭-২।
- 1 2 Koul, Pran (৬ জানুয়ারি ২০১৪)। The Silence Speaks (ইংরেজি ভাষায়)। Partridge Publishing। পৃ. ৫৫। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৮২৮-১৫৯৪-৮।
- ↑ Tak, Toru (২০ এপ্রিল ২০১৩)। "The Term Kashmiriyat"। Economic & Political Weekly।
The term Kashmiriyat has come to signify a centuries-old indigenous secularism of Kashmir.
- ↑ Hans Classroom (১৯ মার্চ ২০১৮)। "Kashmiriyat"। The Hans India। সংগ্রহের তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।
- 1 2 3 4 5 Murphy, Eamon (২০১৩)। The Making of Terrorism in Pakistan: Historical and Social Roots of Extremism (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃ. ৫৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৫৬৫২৬-৪।
- ↑ Snedden, Christopher (২০১৫)। Understanding Kashmir and Kashmiris। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮১৮৪৯০৪৬২২০।
- 1 2 3 4 Nayak, Meena Arora (২২ সেপ্টেম্বর ২০০৬)। "Kashmiriyat: An embracing spirit languishes like the dying chinar tree"। World View Magazine। ১৮ নভেম্বর ২০০৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Razdan, P. N. (২২ সেপ্টেম্বর ২০০৬)। "Kashmiriat and literature"। ২৯ মার্চ ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৬।
- ↑ "CENTRE FOR LAND WARFARE STUDIES" (পিডিএফ)। ১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১ এপ্রিল ২০২৫।
- ↑ Chari, Pushpa (২৮ জুলাই ২০১৮)। "Ganga-Jamuni tehzeeb: Syncretic ethos in weaves and crafts"। The Hindu (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০২০।
- ↑ "Spirit of Kashmiriat"। Deccan Herald। ২১ জুলাই ২০০৫। ১২ মার্চ ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৬।
- ↑ "Kashmiriyat https://www.thehansindia.com/posts/index/Hans-Classroom/2018-03-19/Kashmiriyat/367516"। সংগ্রহের তারিখ ১ এপ্রিল ২০২৫।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:-এ বহিঃসংযোগ (সাহায্য)|শিরোনাম=
আরও পড়া
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- কাশ্মীরিয়েত
- কাশ্মীরি সাহিত্য ও কাশ্মীরিয়াত ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৯ মার্চ ২০১২ তারিখে
- নন্দীমার্গ ও কাশ্মীরিয়াত ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে
- কাশ্মীরিয়াতের আত্মা