বিষয়বস্তুতে চলুন

কার্পে দিয়েম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

কার্পে দিয়েম (Carpe diem) একটি লাতিন প্রবাদ, যার প্রচলিত বাংলা অর্থ "আজকের দিনটিকে কাজে লাগাও" বা "মুহূর্তটিকে ধরে রাখো"। বাগধারাটি রোমান কবি হোরেস-এর ওডস (খ্রিষ্টপূর্ব ২৩) কাব্যগ্রন্থের প্রথম খণ্ড থেকে নেওয়া।

একটি সূর্যঘড়ি, যাতে carpe diem খোদাই করা আছে

অর্থ ও ব্যুৎপত্তি

[সম্পাদনা]

Carpe শব্দটি লাতিন ক্রিয়াপদ carpō-এর দ্বিতীয় পুরুষ একবচন বর্তমান কালের অনুজ্ঞা রূপ, যার আক্ষরিক অর্থ "ছেঁড়া" বা "তোলা"; হোরেস এটি "উপভোগ করা" বা "কাজে লাগানো" অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। অন্যদিকে diem শব্দটি dies (দিন) শব্দের কর্মকারক রূপ। এই হিসেবে বাগধারাটির অধিকতর আক্ষরিক অনুবাদ দাঁড়ায় "দিনটি পেকে গেলে তা তুলে নাও", যার অন্তর্নিহিত অর্থ মুহূর্তটিকে উপভোগ করা।

সেন্ট জোসেফ ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মারিয়া এস. মারসিলিও-র মতে, carpe diem মূলত একটি উদ্যানতাত্ত্বিক রূপক, যা পাকা ফল বা ফুল তোলার সঙ্গে তুলনীয়; কবিতার প্রেক্ষাপটে দেখলে এটি প্রকৃতির সংবেদনশীল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মুহূর্তকে উপভোগ করার ইঙ্গিত দেয়।[]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

হোরেসের ওডস ১.১১ কবিতায় এই পঙ্‌ক্তি পাওয়া যায়, যেখানে কবি তার বন্ধু লেউকোনোয়িকে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বর্তমান মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে বলছেন। কবিতাটির শেষ পঙ্‌ক্তি: "carpe diem, quam minimum credula postero" — অর্থাৎ, "আজকের দিনকে কাজে লাগাও, আগামীকালের ওপর যতটা সম্ভব কম বিশ্বাস রেখে।"[]

প্রাচীন সাহিত্যে

[সম্পাদনা]

এই ধারণার সম্ভবত প্রথম লিখিত প্রকাশ পাওয়া যায় মেসোপটেমীয় পুরাণে, যেখানে সিদুরি গিলগামেশ-কে শোক ত্যাগ করে জীবনকে আলিঙ্গন করার পরামর্শ দেন। কিছু গবেষকের মতে, এটি মূলত গিলগামেশকে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণে ফিরে আসার আহ্বান হিসেবেই দেখা উচিত, নিছক আনন্দ-উপভোগের আহ্বান হিসেবে নয়।[]

তাৎপর্য

[সম্পাদনা]

হোরেসের কবিতায় এই বাগধারা মূলত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার প্রতি ইঙ্গিত করে; ভবিষ্যৎকে আকস্মিকতার হাতে ছেড়ে না দিয়ে, বরং আজকের দিনেই নিজের ভবিষ্যৎকে উন্নততর করার প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়েছে। এই বাণী সাধারণত হোরেসের এপিকিউরীয় দার্শনিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে ব্যাখ্যা করা হয়।[]

সম্পর্কিত বাগধারা

[সম্পাদনা]
Gather Ye Rosebuds While Ye May, জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস-এর আঁকা চিত্র

"Collige, virgo, rosas" ("কন্যা, গোলাপ কুড়িয়ে নাও") পঙ্‌ক্তিটি পাওয়া যায় De rosis nascentibus কবিতায়, যা ভার্জিল বা আউসোনিয়াসের রচনা বলে মনে করা হয়। এতে তরুণদের প্রতি সময় থাকতে জীবন উপভোগের আহ্বান জানানো হয়েছে, যা রবার্ট হেরিক-এর ১৬৪৮ সালের কবিতা "To the Virgins, to Make Much of Time"-এর "Gather ye rosebuds while ye may" পঙ্‌ক্তির সঙ্গে তুলনীয়।

মধ্যযুগীয় লাতিন ছাত্রসংগীত "Gaudeamus igitur" (তবে আনন্দ করি চলো), যা প্রায়ই "De Brevitate Vitae" (জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে) নামে পরিচিত, ১২৮৭ সালের দিকে রচিত বলে ধারণা করা হয় এবং এতেও মৃত্যুর অনিবার্যতা মাথায় রেখে জীবনের আনন্দ উপভোগের কথা বলা হয়েছে।

এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত অথচ ভিন্ন একটি বাগধারা হলো memento mori ("স্মরণ রাখো যে তুমি মরণশীল"), যা কার্পে দিয়েমের কিছু অর্থগত সাদৃশ্য বহন করে। হোরেসের কাছে, নিজের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতনতাই মুহূর্তের গুরুত্ব উপলব্ধি করার মূল চাবিকাঠি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে memento mori বাগধারাটি অনুশোচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে, যেমনটি বহু ভ্যানিটাস চিত্রকর্মে দেখা যায়। বর্তমানে অনেকেই এই দুই বাগধারাকে প্রায় বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করেন — carpe diem জীবন উপভোগের আহ্বান জানায়, আর memento mori তার প্রলোভন প্রতিরোধের কথা বলে। তবে হোরেসের মূল ব্যবহারে memento mori-র এই অর্থ ছিল না।

সাম্প্রতিক উল্লেখ

[সম্পাদনা]

আধুনিক ইংরেজিতে "YOLO" (You Only Live Once, অর্থাৎ "জীবন একটাই") অভিব্যক্তিটি একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করে।[]

১৯৮৯ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র Dead Poets Society-তে রবিন উইলিয়ামস অভিনীত শিক্ষক জন কিটিং বিখ্যাত সংলাপ বলেন: "Carpe diem. Seize the day, boys. Make your lives extraordinary." পরবর্তীতে এই সংলাপটি আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট-এর সেরা ১০০ চলচ্চিত্র সংলাপের তালিকায় ৯৫তম স্থান পায়।[]

সামাজিক দার্শনিক রোমান ক্রাজনারিক তার Carpe Diem Regained (২০১৭) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, ভোগবাদী সংস্কৃতির ঘড়ি-বাঁধা কর্মদিবস ও সপ্তাহান্তের পরিকল্পনার বিপরীতে, carpe diem ধারণাটি বরং তাৎক্ষণিকভাবে জীবনকে কাজে লাগানোর একটি বিকল্প পথ দেখায়।[]

স্লোভেনিয়ার হয়ে ইউরোভিশন সং কনটেস্ট ২০২৩-এ জোকার আউট ব্যান্ডের পরিবেশিত গান "Carpe Diem" প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Luu, Chi (৭ আগস্ট ২০১৯)। "How "Carpe Diem" Got Lost in Translation"JSTOR Daily (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)।
  2. Conington, John (১৮৮২)। "Odes 1.11"। Perseus Digital Library।
  3. Ackerman, Susan (২০০৫)। When Heroes Love: The Ambiguity of Eros in the Stories of Gilgamesh and David। Columbia University Press। পৃ. ১৩০–১৩১। আইএসবিএন ৯৭৮-০২৩১১৩২৬০২
  4. Harrison, Stephen (২০১২)। The Cambridge Companion to Horace। Cambridge University Press। পৃ. ১৫৪, ১৬৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৮৩০০২-৭
  5. "Carpe Diem! How the philosophy of 'seize the day' was hijacked"iNews। ১৮ এপ্রিল ২০১৭।
  6. "AFI's 100 Years...100 Movie Quotes"। American Film Institute। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |সংগৃহীত-তারিখ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  7. Macdonald, Fiona। "What it really means to 'Seize the day'"bbc.com
  8. "Slovenia: Joker Out to premiere 'Carpe Diem' on Saturday night!"eurovision.tv। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩।