কাঁটা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
"কাঁটা"
লেখকশহীদুল জহির
দেশবাংলাদেশ
ভাষাবাংলা
বর্গছোটগল্প
প্রকাশিত হয়ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯)
প্রকাশনার ধরনসংকলন
প্রকাশকশিল্পতরু প্রকাশনী
মাধ্যমছাপা (শক্তমলাট)
প্রকাশনার তারিখ১৯৯৯
পূর্ববর্তী রচনা"এই সময়"
পরবর্তী রচনা"আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস"

"কাঁটা" বাঙালি লেখক শহীদুল জহির রচিত ছোটগল্প। ১৯৯৫ সালে রচিত গল্পটি ১৯৯৯ সালে ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প শিরোনামে জহিরের দ্বিতীয় গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়। ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িকতাকেন্দ্রীক এই গল্পে জহির সময়ের কাঠামো উত্তীর্ণ এক কাহিনীর বয়ান দিয়েছেন। গল্পের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে ১৯৬৪ সাল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৮৯-৯০ সালের পটভূমিতে। গল্পে বারবার একই চরিত্র এবং একটি কুয়ার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়, যে কুয়ায় বার বার এক দস্পতির মৃত্যু ঘটে।

২০১০ সালে এই গল্প অবল্মনে একই শিরোনামে টেলিভিশন চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন অনিমেষ আইচ। এছাড়াও একই শিরোনামে পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন টোকন ঠাকুর।

পটভূমি[সম্পাদনা]

এই গল্পের নাম প্রথমে "কাঁটা" রাখা হয়। পরে তা বদলে "মনোজগতের কাঁটা" এবং অবশেষে "কাঁটা" নামে স্থির করা হয়। একাধিকবার নাম পরিবর্তনের সাপেক্ষে জহিরের যুক্তি ছিল, প্রতীকী 'কাঁটা'য় হিন্দু-মুসলিমদের চেতনাজগতে পরস্পরের প্রতি যে বৈরিতা, সাম্প্রদায়িকতা, সংশয় এবং আস্থাহীনতা বহুকাল ধরে পরিপুষ্ট হয়েছে সেটি উপড়ে ফেলা অসম্ভব।[১] পরোক্ষভাবে 'কাঁটা' সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক।

চরিত্রসমূহ[সম্পাদনা]

  • সুবোধচন্দ্র -
  • স্বপ্না রানী - সুবোধচন্দ্রের স্ত্রী
  • আব্দুল আজিজ ব্যাপারি
  • পরানচন্দ্র - সুবোধচন্দ্রের ছোট ভাই
  • মওলানা আবুবকর

কাহিনীসংক্ষেপ[সম্পাদনা]

পুরান ঢাকার ভূতের গলির আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসে সুবোধচন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না। তাদের দেখে ভূতের গলির লোকেদের মনে সংশয় জাগে যে, সুবোধচন্দ্র ও স্বপ্না যেন পুনরায় আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়ির উঠোনের কুয়ায় পড়ে না যায়। এভাবে সময়ের কাঠামো ভেঙে কাহিনী এগুতে থাকে। কারণ অতীতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে ভাড়াটে ছিল সুবোধচন্দ্র ও স্বপ্না রানি। যুদ্ধকালে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়, তখন ভূতের গলির তাদের আশ্বস্ত করে বলে, 'আমরা আছি না, আমরা মইরা গেছি নিহি'। বাঁচার জন্য সুবোধ দম্পতি তাদের ধর্মীয় চিহ্ন মুছে মুসলমান সাজে। তবে ধরা পড়ার চরম মুহূর্তে সুবোধচন্দ্র ও তার স্বপ্না আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়ির উঠোনের কুয়ার ভেতর পড়ে যায় বা তাদের ফেলে দেয়া হয়। যুদ্ধ শেষে সাতক্ষীরা থেকে সুবোধচন্দ্রের ছোট ভাই পরানচন্দ্র ঢাকায় এসে ভাই ও বৌদির মৃত্যুর খবর জানতে পারে এবং কিছু স্মুতি চিহ্ন নিয়ে ফিরে যায়।[২]

এরপর কোন একসময় ঢাকা শহরের কোন এলাকায় দাঙ্গা হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এবং সুবোধচন্দ্র ও স্বপ্না রানী একই কুয়ায় পড়ে যায়। এই মৃত্যুর কারণ নির্দিষ্ট করে বলা না হলেও, ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ওই দাঙ্গা একটা কারণ হতে পারে। যদিও লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে যে, সুবোধচন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না কুয়ার পাড়ে বসে পূর্ণিমা দেখবার সময় কুয়োর পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব লক্ষ্য করে এবং সেই প্রতিবিম্ব ছুঁতে গিয়ে কুয়ার মধ্যে পড়ে মারা যায়। এরপর নারায়ণগঞ্জ থেকে সুবোধচন্দ্রের ছোট ভাই পরানচন্দ্র এসে দাদা-বৌদির লাশ নিয়ে যায়।[২] দ্বিতীয় ঘটনার সাত বছর পর 'নিঃসন্তান রংবাজ জেনারেলের শাসনকালের শেষদিকে মহাবন্যার পরের কোনো এক সময়' সুবোধচন্দ্র দম্পতিকে আবার ভূতের গলির আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে পাওয়া যায়। সে সময় একদিন ভূতের গলির লোকেরা অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় ক্ষিপ্র হয়। এই ঘটনায় সুবোধচন্দ্র ভীত হয় এবং ভূতের গলির লোকেরা পুনরায় তাকে অভয় দেবার চেষ্টা করে। যদিও পরে জানা যায়, মসজিদ ভাঙার ঘটনায় সুবোধচন্দ্র মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে স্ত্রীকে নিয়ে খেয়েছে। তবে 'এই মিষ্টি খাওয়ার ঘটনা কে দেখে কিংবা এই ঘটনার কথা কার কাছ থেকে জানা যায় তা মহল্লার লোকেরা বলতে পারে না।' ভূতের গলির লোকেরা ক্ষিপ্ত হয় এবং সুবোধচন্দ্রের বাড়িতে হাজির হয়। তারা ফিরে যাবার পর সুবোধচন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্নার লাশ কুয়ার ভেতরে পাওয়া যায়। এবার পুলিশ এসে তাদের লাশ নিয়ে যায়।[২]

এরপর ভূতের গলির লোকেদের ঘুরেফিরে বার বার সকল স্বপ্না রানীর হাতে তৈরি নিমকপারা ও চায়ের কথা মনে পড়ে। এবং বার বার সকল সুবোধচন্দ্রকে অভয় দেয়া এবং তা রাখতে ব্যর্থ হবার কথাও মনে পড়ে। এ সকল বিষয়ে ক্রমাগত তারা বিষন্নতা বোধ করে এবং তারা কুয়াটি বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করে এবং হয়তো বন্ধ করতে সক্ষম হয়; যদিও সে নিশ্চয়তা গল্পে পাওয়া যায় না।[২]

সমালোচনা[সম্পাদনা]

এক আলোচনায় লেখক মাজুল হাসান, গল্পে কুয়া বন্ধ করার বিষয়ে এলাকাবাসীর প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি গল্পটিকে দুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, প্রথমত সবকিছু জানার পরও ভুতের গলির লোকেরা সুবোধচন্দ্র দস্পতিকে বাচাতে পারে না। কারণ কুয়োটা ছিল বাড়ির মধ্যে। অর্থাৎ মুখে অভয়ের বাণী শোনালেও সাম্প্রদায়িকতার বীজ থাকে মনের ভেতর। দ্বিতীয়ত এই কুয়া আছে বলেই বারবার মারা পড়ে সুবোধ-স্বপ্না। এই কুয়া মূলত প্রতীকী সাম্প্রদায়িকতার কূপ।[৩]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

এই গল্প অবল্মনে ২০১০ সালে একই শিরোনামে টেলিভিশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন অনিমেষ আইচ, যেটি দেশ টিভিতে প্রচারিত হয়।[৪] যেখানে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, মোশাররফ করিম, দীপান্বিতা হালদার, মামুনুর রশীদ, শহীদুজ্জামান সেলিম প্রমুখ।[৫] একই শিরোনামে বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন টোকন ঠাকুর।[৬] মুক্তিপ্রতিক্ষিত এই চলচ্চিত্রের মূল ভূমিকায় রয়েছেন অনিমেষ আইচ ও তৃপ্তি রানী।[৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. হাবিব, তাশরিক-ই- (৯ ডিসেম্বর ২০১৬)। "শহীদুল জহিরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা"ঢাকা: কালের কণ্ঠ। ২৭ মে ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  2. ওয়াহিদ, সবুজ (১৮ মে ২০১৩)। "শহীদুল জহির-এর ছোট গল্প "কাঁটা"-- সাম্প্রদায়িকতার কুয়ো ও অপরাধ বোধের কাঁটা"প্রিয়.কম। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  3. হাসান, মাজুল (১ সেপ্টেম্বর ২০১২)। "শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুআবহ ও কয়েনেজসমূহ"arts.bdnews24.comঢাকা: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২১ 
  4. "Victory Day specials on TV channels"দ্য ডেইলি স্টার (বাংলাদেশ)। ১৬ ডিসেম্বর ২০১০। ৭ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০২১ 
  5. মাহমুদ, রাসেল (২০১৮-০৯-২৭)। "কী অবস্থায় কোটি টাকার 'কাঁটা'"প্রথম আলো। ২০২০-০১-২৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০১-২৮ 
  6. হায়দার, এহসান (১৯ ডিসেম্বর ২০১৯)। "মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র 'কাটা' প্রসঙ্গে টোকন ঠাকুর"। shampratikdeshkal। ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]