করুণাময়ী রাণী রাসমণি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
করুণাময়ী রানী রাসমণি
করুণাময়ী রাণী রাসমণি.png
ধারবাহিকটির স্ক্রীনশট
ধরননাটক, সামাজিক
নির্মাতাসুব্রত রায়, সম্রাট ঘোষ
পরিচালকরাজেন্দ্র প্রসাদ দাস
অভিনয়েদিতিপ্রিয়া রায়
মূল দেশ ভারত
মূল ভাষাবাংলা
নির্মাণ
ব্যাপ্তিকালপ্রায় ২২ মিনিট
নির্মাণ কোম্পানিজি বাংলা
মুক্তি
মূল নেটওয়ার্কজি বাংলা
প্রথম প্রকাশ২৪ জুলাই, ২০১৭
বহিঃসংযোগ
ওয়েবসাইট

করুণাময়ী রানী রাসমণি একটি ভারতীয় জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক। এটি জুলাই, ২০১৭ হতে জি‌ বাংলাতে সম্প্রচারিত হচ্ছে ‌।[১][২][৩]

ধারাবাহিকের প্রধান সংগীত :

তুমি মহাশক্তি , মহেশ্বরী; বিজয়লক্ষ্মী যুগে যুগে।

আলোকরূপিণী , পরমাপ্রকৃতি , বন্দি তোমায় বহু রূপে।।

অমৃতরূপা মা তুমি ,

গঙ্গা যেমন করুণাধারায় ,

দয়াময়ী , স্নেহময়ী ,

আতুরজনের তুমি আশ্রয়।

তোমার তুলনা তুমি ,

করুণাময়ী রাণী রাসমণি।

তুমি লক্ষ্মী , প্রিয়ংবদা।

ধর্মকামার্থসাধিনী।

স্নিগ্ধশুদ্ধা , প্রেমময়ী ,

কমলেকামিনী রাধারাণী।

তোমার তুলনা তুমি ,

করুণাময়ী রাণী রাসমণি।

নিত্যরাসে স্থিতি তোমার ,

ডুব দিয়েছো কালী বলে।

তোমার তুলনা তুমি ,

যত মত , তত পথে ....

বন্দি চৈতন্য স্বরূপিণী ,

করুণাময়ী রাণী রাসমণি।।

ধারাবাহিকের গল্প -

হালিশহরের রাণী : আনুমানিক ১২০০ বঙ্গাব্দের ( ইংরেজি ১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দে ) ১২ ই আশ্বিন (ইংরেজি ২৯ শে সেপ্টেম্বর ) বুধবার সকালে গঙ্গা - তীরবর্তী নদীয়ার হালিশহর গ্রামে মাহিষ্য বংশে জন্ম হয় রাসমণির । পিতা - হরেকৃষ্ণ দাস ( লোকমুখে হারু ঘরামি) , মাতা - রামপ্রিয়া দেবী । অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে প্রচুর অভাব - অনটনের মধ্যে জন্ম হয় রাসমণির । দারিদ্র্যকে অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন বলেই পরবর্তীকালে তিনি তাদের প্রতি এতটা করুণাময়ী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন । রাসমণির দুই দাদাও ছিল সংসারে , আর ছিল বাল্যবিধবা পিসি ক্ষেমঙ্করী । কথিত আছে , রাসমণির জন্মের পূর্বে তাঁর মা এক দৈব স্বপ্ন দেখেন । তিনি অষ্টসখীর সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকার লীলা দর্শন করেন স্বপ্নে । নাচতে নাচতে হঠাৎ এক সখী রামপ্রিয়া দেবীর কোলে এসে পড়েন ‌। তারপরেই জন্ম হয় রাসমণির । তাই তাঁর পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তাঁদের ঘরে স্বয়ং অষ্টসখীর এক সখী এসেছেন । তাই তৎকালীন সময় অনুযায়ী রাসমণির বিবাহের বয়স পেরিয়ে গেলেও তারা রাসমণির বিয়ে দেননি । তাঁদের বিশ্বাস ছিল , তাদের লক্ষ্মী স্বরূপিনী মেয়ের জন্য নারায়ণ তুল্য স্বামী আছে , যথাসময়ে সেই বিবাহ হবে । শূদ্রের এহেন অহংকার অবশ্য সমাজের উঁচুতলার মানুষরা মেনে নিতে পারেননি । তাই একঘর করা হয় হারু ঘরামি ও তার পরিবারকে ।

আদ্যপান্ত বৈষ্ণব পরিবার ও সমাজে রাসমণির জন্ম হয় । প্রতিদিন সন্ধ্যায় হালিশহরের একমাত্র হারু ঘরামির বাড়িতেই কথাগান অনুষ্ঠিত হতো । রামায়ণ , মহাভারত , উপনিষদ , পুরাণাদি প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা হতো । দূরদূরান্ত থেকে লোকে মশাল নিয়ে শুনতে আসত । ছোট্ট রাসমণি দেখত , সেই অপূর্ব দৃশ্য । অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে লোকে আসছে জ্ঞানের পথে । আবার তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । এই ঘটনা রাসমণির মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে । অনেক ছোটোবেলা থেকেই কপালে রসকলি আঁকত রাসমণি । রাসমণি দেখত , বৈষ্ণব - শাক্ত , গৃহী - সন্ন্যাসী , নারী - পুরুষ , ব্রাহ্মণ - ক্ষত্রিয় - বৈশ্য - শূদ্র নির্বিশেষে সবাই একসাথে দল বেঁধে আসত , একসঙ্গে বসত । কোনো ভেদাভেদ ছিল না । এই ঘটনাও রাসমণির মনে গেঁথে গিয়েছিল ; তাই কালী সাধক রামপ্রসাদের গ্রামে জন্ম হলেও রাসমণির অসুবিধা হয়নি বৈষ্ণব ধর্মকে আপন করে নিতে । তার কাছে সবাই সমান ছিল , হিন্দু - মুসলমান - অস্পৃশ্য সবাই ।

ছোটবেলা থেকেই রাসমণিকে শেখানো হয়েছিল , জীবসেবাই নারায়ণসেবা । সেকথা রাসমণি মাথায় রেখেছেন আজীবন । প্রয়োজনে নিজে অভুক্ত থেকে অতিথি কিংবা দরিদ্রের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে রাসমণি , সেই কোন ছোটবেলা থেকে । গ্রামের লোকে আদর করে তাই তাকে ডাকত রাণী রাসমণি বলে । শেষ পর্যন্ত তা-ই সত্যি হলো ।

কথিত আছে , খুব ছোটো বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময়ে বালিকা রাসমণি ডুমুরের ফুল দেখতে পেয়েছিল , কিন্তু তার বন্ধুরা না দেখতে না পাওয়ায় কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি । কিন্তু রামপ্রিয়া দেবী বিশ্বাস করেন । কারণ তিনি যে স্বপ্নে দেখেছিলেন তাঁর মেয়েকে । সাধারণত ডুমুরের ফুল দেখা মানে রাজযোগ থাকা । বাস্তবিক , তাই ঘটেছিল , রাসমণি রাজরাণী হয়েছিল ।

মাত্র সাত বছর বয়সে, এক অজানা জ্বরে মা'কে হারান রাসমণি । রাসমণি তখন আরো শান্ত , আরো স্থিতধী , অচঞ্চলা হলেন , সেই বয়সে যা অস্বাভাবিক । পিসিমা ক্ষেমঙ্করীই মাতৃস্নেহে পালন করেন রাসমণিকে ।

এভাবে শৈশব থেকেই সমবয়সীদের তুলনায় অনেকটা আলাদা হয়ে যান রাসমণি ।

রাজ - রাণী : সেসময়ে কলকাতার জানবাজার রাজবাড়িতে চলছে অন্য পালাবদলের কাহিনী। জানবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা হলেন প্রীতিরাম দাস , ১৭৫৩ সালে অত্যন্ত দরিদ্র ঘরে তাঁর জন্ম । চোদ্দো বছর বয়সে তিনি পিতা-মাতা কে হারান । তখন দুই ভাই - রামধনু ও কালীপ্রসাদকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে কলকাতার মান্নাবাড়িতে আশ্রয় নিলেন প্রীতিরাম । সে বাড়ির কর্ত্রীময়ী গৃহিণী যে তাঁর দূরসম্পর্কের পিসিমা বিন্দুবালা দেবী! তাঁর পিসেমশাই অক্রূরচন্দ্র মান্নার তত্ত্বাবধানে সেখানে কাজ চলা গোছের ইংরেজি শিখলেন প্রীতিরাম । তারপর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে রসদ সরবরাহের কাজে নেমে পড়লেন । উদ্যোগী পুরুষের উদ্যোগে মা লক্ষ্মী সন্তুষ্ট হলেন ‌‌। এক ইংরেজ সৈনিকের সুনজরে পড়ে পেলেন সুবিশাল জমিদারি । মান্নাবাড়ির কর্তা যুগলকিশোর মান্নার মেয়ে যোগমায়া দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হলো । যৌতুক হিসেবে পেলেন জানবাজারের ১৬ বিঘা জমি । সেখানেই প্রীতিরামের প্রাসাদ গড়ে উঠল ‌‌। পরপর দুটি পুত্র লাভ করলেন - ১৭৭৯ তে হরচন্দ্র আর ১৭৮৩ তে রাজচন্দ্র । পুত্রদের পর দুটি কন্যাও লাভ করেছিলেন প্রীতিরাম ও যোগমায়া দেবী। তাঁদের নাম দয়াময়ী ও বিশ্বময়ী ।

১৮০০ সালে মকিমপুর পরগণা কিনে নিয়ে সেখান থেকে বাঁশ , কাঠ , মাছ চালান দিতে শুরু করলেন বেলেঘাটার আড়তে । সেকালে অনেক বাঁশকে একসঙ্গে বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে আনা হতো , চলতি ভাষায় যাকে বলে ' বাঁশের মাড় ' । প্রীতিরাম বংশগত উপাধি পেলেন - "মাড়" ।

পুত্রদের যুগোপযোগী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার পর তাঁদের বিয়ে দিলেন । হরচন্দ্রের সাথে বিয়ে দিলেন হুগলি জেলার জানু দাসের সুশীলা কন্যা আনন্দময়ী দেবীর । রাজচন্দ্রের দু'দুবার বিয়ে দিলেও বিয়ের বছরেই মারা যান সেই দুই স্ত্রী ।

নিঃসন্তান পত্নী আনন্দময়ীকে রেখে মারা যান হরচন্দ্রও , মাত্র ২১ বছর বয়সে। মাড়বংশে উত্তরাধিকার জনিত সমস্যার সূত্রপাত ঘটে । কিন্তু রাজচন্দ্র বিবাহ সম্পর্কে হয়ে যান বীতশ্রদ্ধ । তিনি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন । রাজচন্দ্র ছিলেন সুপুরুষ , সুঠাম তাঁর দেহ , ব্যায়াম করা পেটানো পেশীবহুল আকর্ষণীয় শরীর ; আক্ষরিক অর্থেই রাজপুত্র যাকে বলে । বিদ্যায় যেমন তাঁর অনুরাগ ছিল , সঙ্গীতে তিনি ছিলেন সেরকমই পারদর্শী । তিনি সেতার , সরোদ ও বীণা - তিনটেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাজাতে পারতেন । এর সঙ্গেই লাঠিখেলাতেও তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন । তাঁর হাতে লাঠি থাকলে বড়ো বড়ো লেঠেলরাও তাঁকে হারাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যেত । রাজা রামমোহন রায় ও ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে ও সমাজের কল্যাণ করতে আরম্ভ করেন তিনি । তাঁর গানের গলা এতটাই সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল যে স্বয়ং রাজা রামমোহন রায় তাঁকে ব্রাহ্মসমাজে নিয়ে যেতেন গান শোনাতে ।

একদিন ত্রিবেণীর ঘাটে স্নান করতে যাওয়ার সময়ে তিনি কোণার ঘাটে এক অপরূপা বালিকাকে স্নান করতে দেখেন । বালিকার সারল্য , শান্তময়ী রূপ ও ভক্তি তাঁকে আকৃষ্ট করে । বাড়ি ফিরে বৌদি আনন্দময়ীকে জানান এই ভালো লাগার কথা । বৌমার থেকে জানতে পেরে প্রীতিরাম খোঁজখবর চালান । ঘটক জানায় মেয়েটি পালটি ঘরের মেয়ে । নাম - রাসমণি । পিতা - হারু ঘরামি । কী অলৌকিক , তাই না ?

এভাবেই কলকাতার সঙ্গে হালিশহর , জ্ঞানের সঙ্গে বুদ্ধি , নারায়ণের সঙ্গে লক্ষ্মীর , রাজচন্দ্রের সঙ্গে রাসমণির যোগাযোগ স্থাপিত হলো । বিবাহ প্রস্তাব গেল হারু ঘরামির বাড়িতে ।

মহাপরিণয় : দরিদ্র হারু ঘরামির ঘরে যত সহজে বিবাহপ্রস্তাব গিয়েছিলো , রাজচন্দ্র ও রাসমণির বিবাহ অত সহজে হয়নি। বরং এ কথার পর কন্যাপক্ষ ও পাত্রপক্ষ - উভয় দিকেই বহু বাধা পড়েছিল এবং প্রচুর নিষেধাজ্ঞা এসেছিলো এই বিবাহ সম্পন্ন করার ব্যাপারে। গঙ্গার ঘটে স্নানরতা রাসমণিকে এক পরপুরুষ দেখেছে - এ জিনিস হালিশহরের ব্রাহ্মণ তথা সমাজের মাথার মেনে নিতে পারলেন না। তাঁরা সরল রাসমণির চরিত্রে কালিমা লেপন  করতেও পিছপা হলেন না। হারু ঘরামির বাড়িতে জল - অচল হলো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো , যতদিন না রাসমণি সমাজপতিদের কথানুযায়ী প্রায়শ্চিত্ত করছে , ততদিন এলাকার কোনো বাজারে তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে না। পিসিমা ক্ষেমঙ্করীও এই বিবাহে মত দিলেন না ; কারণ যে পুরুষ স্নানের ঘাটে স্নানরতা মেয়েকে দেখে , তাঁর চরিত্র সম্পর্কে তিনি যথেষ্টই সন্দিহান ।  রাসমণিদের এই দুরবস্থার সময়ে একদিন দেবদূতের মতো হারু ঘরামীর বাড়িতে এলেন কলকাতা শহরের সেরা ধনী - বাবু প্রীতিরাম মাড় , প্রচুর উপহার আর উপঢৌকন নিয়ে।

অন্যদিকে জানবাজারের রাজবাড়ী ও মান্নাবাড়িও এতো দরিদ্র বংশ ও ঘরের মেয়েকে বধূ করে আনতে চায়নি। তার ওপর মেয়েটির ঘর যে সমাজে একঘরে - একথাও তাঁরা ঘটক মারফৎ জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু রাসমণির কুষ্ঠী বিচার করে দেখা গেলো , মেয়েটি অত্যন্ত সুলক্ষণা ও পয়মন্ত , তার পুত্রসন্তান যোগ ও রয়েছে এবং সর্বোপরি সে দীর্ঘায়ু হবে।  তার ওপর রাজচন্দ্র ও রাসমণি যে পূর্ণ রাজযোটক - একথাও শহরের বড়ো বড়ো জ্যোতিষী ও পন্ডিতেরা মেনে নিলেন। মেয়েটি এতই ভাগ্যবতী যে , যে শশুরবাড়িতে তার পদার্পন হবে , সেখানে মা লক্ষ্মীর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিশ্চিত। এর পরে আর কোনো বাধা থাকে না , যেখানে স্বয়ং রাজচন্দ্রের তাকে মনে ধরেছে এবং কুষ্ঠীও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। তবু সমস্ত সন্দেহের নিরসন ঘটাতে প্রীতিরাম নিজেই হালিশহরে গেলেন , উপহারের জাহাজ নিয়ে।

রাসমণিকে প্রীতিরাম দেখতে পান গঙ্গার ঘাটে , সে তখন ক্ষুধার্ত বহুরূপীদের নিজে হাতে করে খাওয়াচ্ছে । মলিনবসনা গৌরকান্তি সেই মেয়েটির মধ্যে প্রীতিরাম স্বয়ং মা লক্ষ্মী ও মা অন্নপূর্ণাকে লক্ষ্য করলেন । একজন পণ্ডিতকেও সাথে করে নিয়ে গেছিলেন প্রীতিরাম । সেখানে আবার রাসমণির ভাগ্য পরীক্ষা হলো । মেয়েটিকে প্রীতিরামের এত ভালো লাগলো যে বিয়ে একেবারে পাকা করে ফেললেন । নিজের পাইক বাহিনী পাঠিয়ে হারু ঘরামির পরিবারকে সুরক্ষা প্রদান করলেন , শুভক্ষণে মেয়েকে আশীর্বাদও করে গেলেন । হরেকৃষ্ণ দাসও একদিন গিয়ে তাঁর ভাবী জামাইকে আশীর্বাদ করে এলেন । জামাইয়ের বিনয় , চরিত্র , নম্রতা , শ্রদ্ধা ও শিক্ষায় তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন ।‌‌ ক্ষেমঙ্করী দেবীও আর আপত্তি করলেন না । হারু ঘরামির এহেন ভাগ্যলাভে প্রতিবেশীরা কেউই সন্তুষ্ট হলেন না ‌‌। বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার ফলপ্রসূ হলো না দেখে প্রধান পুরোহিত মশাই তখন শেষ অস্ত্র ত্যাগ করলেন , বললেন , শাস্ত্রমতে তৃতীয় পক্ষ ক্ষীণজীবী ও স্বল্পায়ু । এবার কন্যাপক্ষের মতো পাত্রপক্ষের মাথাতেও হাত পড়লো । অবশেষে এরও বিধান দিলেন মান্নাবাড়ির কুলগুরু । তাঁরই নির্দেশে রাজচন্দ্রের তৃতীয় বিবাহ হল একটি গাছের সঙ্গে । ব্যস , আর কোনও বাধা রইল না । স্থির হলো , জানবাজারের বাড়িতে বিয়ে হবে । গোটা হালিশহর নিমন্ত্রণ রইল । তারপরও এই বিয়ে ভাঙতে হালিশহরের পুরোহিত মশাই এক যজ্ঞ আরম্ভ করলেন তন্ত্রমতে , সেখানে নরবলির ব্যবস্থাও করলেন । বালিকা রাসমণির প্রাণ কেঁদে উঠলো এক অসহায় শিশুর জন্য । সমস্ত ভয় বিসর্জন দিয়ে শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে থাকল রাসমণি তাকে বাঁচাতে । পুরোহিত তাকেই আঘাত করতে উদ্যত হলে হঠাৎ তিনি রাসমণির মধ্যে তাঁর উপাস্য দেবী করালবদনী কালীকে দেখতে পেলেন । রাসমণির স্বরূপ বুঝতে পারলেন তিনি । স্বীকার করলেন সব অপরাধ । প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন হারু ঘরামির পরিবারকে । তাঁদের ওপর থেকে সমস্ত বাধা নিষেধ তুলে নিলেন ।

গোটা কলকাতা শহর ভেঙে পড়ল এই বিয়েতে । নহবৎ , নিধুবাবুর টপ্পা , কথাগান , বিশাল দানসাগর , অফুরান কাঙালীভোজন , উপহার , উপঢৌকনের স্তূপ - কোন কিছুই বাকি রইল না । বিয়েতে এসেছিলেন স্বয়ং রাজা রামমোহন রায় এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর । ১৮০৪ সালের শুভদিনে শুভক্ষণে শুভলগ্নে রাজচন্দ্র ও রাসমণির চার হাত এক হলো । সবাই আনন্দে মেতে উঠলেও সেদিন সারাদিন নিজেকে ঘরবন্দি , অনাহারে রেখে গুমরে গুমরে কেঁদে গেলেন রাজচন্দ্রের আনন্দের সাথী , পরম প্রিয়া আনন্দময়ী দেবী ।

রাজচন্দ্রের বড়ো বৌঠান : রাজচন্দ্র দাসের বড়ো বৌঠান আনন্দময়ী দেবী কিশোরী  বয়সে জানবাজারে আসেন হরচন্দ্রের হাত ধরে , রাজবধূ হয়ে। নম্রস্বভাবা , বিনয়ী , কর্মকুশলী আনন্দময়ী খুব সহজেই বাড়ির সবার আপন হয়ে উঠলেন। প্রায় সমবয়সী ঠাকুরপো রাজচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর প্রীতির সম্পর্ক , বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।  যতদিন গড়াতে লাগলো এই সম্পর্কের বাঁধন আরো দৃঢ় হতে আরম্ভ করে। কিন্তু আনন্দময়ীর কপালে এতো সুখ সইলো না। হরচন্দ্র বিয়ের এক বছরের মাথাতেই মারা গেলেন। যা হয় , নিঃসন্তান আনন্দময়ীকেই সবাই দোষী সাব্যস্ত করলো স্বামীর মৃত্যুর জন্য। সবাই নয় , যুগলকিশোর মান্নার স্ত্রী তথা প্রীতিরাম দাসের শ্বশ্রুমাতা এবগ প্রীতিরামের কনিষ্ঠা ভ্রাতৃবধূ সুকুমারী দেবীই তাঁকে কুকথায় জর্জরিত করতেন , আর সবাই যথেষ্ট আধুনিক ছিলেন , মেনেও নিয়েছিলেন ভাগ্যকে। যে বৌদি - ঠাকুরপোর বন্ধুত্বকে সবাই প্রশ্রয়ের চোখে দেখতো , সেটাই এবার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো।  বিশেষত , মান্নাগিন্নী আর সুকুমারী দেবীর তীক্ষ্ণ রসনার ধারে আনন্দময়ীর জীবন বিষবৎ হয়ে উঠলো। সঙ্গে শুরু  হলো দাসীদের গুঞ্জন। একপ্রকার বাধ্য হয়েই তড়িঘড়ি প্রীতরাম ছোটোছেলের বিয়ে দিলেন , লোকেদের মুখ চুপ করাতে। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম , পরপর দুই স্ত্রীই মারা গেলেন। লোকে এবারেও দোষী ঠাহর করলো আনন্দময়ীর বিষদৃষ্টিকেই। যোগমায়া দেবী সবসময় নিজের পুত্রবধূকে আগলাবার চেষ্টা করতেন , কিন্তু প্রবল প্রভাবপ্রতিপত্তিশালীনী মা আর মুখরা জায়ের কাছে সরলস্বভাবা যোগমায়া দেবী বিশেষ সুবিধা করতে পারতেন না। কিন্তু এতো কিছু হওয়ার পরেও রাজচন্দ্র আর আনন্দময়ীর সম্পর্কে এতটুকু চিড় ধরেনি। ওদের দুজনেরমধ্যে ছিল এক নির্মল ও পবিত্র সম্পর্ক , দুনিয়ার কোনো মাপকাঠিই তাকে মাপতে পারতো না। বরং যেটা হলো , এতো কথা শুনতে শুনতে কোথায় যেন আনন্দময়ীরও তার ঠাকুরপোর ওপরে একটা অধিকারবোধ চলে এলো। তাই তো , ঠাকুরপোর বিয়েতে অমানুষিক পরিশ্রম করলেও সেই বিয়ে সম্পর্কে এক দ্বন্দ্ব তাকে সেদিন কুরে কুরে খেলো।  তাই সে ঘরের মধ্যে বন্দি থেকে কেঁদে গেলো। ফলে যা হওয়ার তাই হলো , সবাই ধরে নিলো আনন্দময়ী ঠাকুরপোর এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি , তাই কাঁদছে। আসলে , কাউকে যদি কেউ সর্বক্ষণ বলে , তুমি খারাপ , তোমার নজরেই আজ এই সংসার পুড়ছে , তোমার নজর ডাইনির নজর - একটা না একটাদিন সে নিজেই এই কথাটা বিশ্বাস করতে আরম্ভ করবে , করবেই। আনন্দময়ীরও তাই হয়েছিল এবং এই ঘটনা রাসমণি - রাজচন্দ্রের দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলেছিলো। রাসমণি ছিলেন শ্রী রাধাকৃষ্ণের অষ্টসখী/ মা ভবতারিণীর অষ্টসখী।  তিনি যেখানেই যেতেন সেটাই মহামিলন ক্ষেত্রে হয়ে উঠত, মানুষের মন বদলে দিতে পারবারিক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল রাসমণির । তাইতো শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার পর তার জা কে পুরো পাল্টে দিয়েছিলেন । যে জা তাদের বিয়ের দৃশ্য দেখে চোখের জল ফেলছিলেন , সেই রাসমণির আপন দিদি হয়ে উঠল ,যে নতুন বউকে প্রথমে পছন্দ করছিলেন না আনন্দময়ী , সেই নতুন বৌ তার নিজের বোন হয়ে উঠল । রাসমণি নিজের অপার ভালোবাসা , সেবা , শ্রদ্ধা , একনিষ্ঠতা , সারল্য , ভরপুর বিশ্বাস আর আস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন আনন্দময়ীকে। এসব অবশ্য একদিনে হয়নি ।

রাজপরিবারের রাজবধূ : দুই দাদা , বিধবা পিসি আর বাবার ছোট্ট সংসারে বড়ো হওয়া রাসমণি এসে পড়ল এক বৃহৎ রাজপরিবারে । সেখানে তার স্বামী , তিন শ্বশুর মশাই , তিন শাশুড়ি মা , বড়ো জা , দুই ননদিনী আর দুই ঘর জামাই , ছোটো দেবর , যুগলকিশোর মান্না , তাঁর গিন্নি , বিধবা বিন্দুবালা দেবী, শত শত দাসীদের নিয়ে এক বি - রা - ট পরিবার । শাশুড়ি মা মাতৃস্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন রাসমণিকে । পরিবারের সবাই ভীষণ ভালোবাসত এই ছোট্ট বালিকাটিকে । খালি সন্তুষ্ট হলেন না সুকুমারী দেবী , কারণ তিনি একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে রাজচন্দ্রের কোনো বংশধর আসবে না এবং এই বিশাল সম্পত্তির মালিক হবে তাঁর পুত্র অভয়চন্দ্র ও তার পরিবার । কিন্তু সুলক্ষণা , পুত্র যোগ থাকা বুদ্ধিমতী রাসমণি তাঁর সেই আশা ভঙ্গ করে দিল । তাই অভয়চন্দ্র আর সুকুমারী দেবী - দুজনের কাছেই রাসমণি চক্ষুশূল হয়ে উঠল ।

মাড়দের গৃহদেবতা ছিলেন জনার্দন , আর রাসমণিদের রঘুবীর ; রাসমণি প্রথম দিন থেকেই মন প্রাণ এক করে জনার্দনের সেবা করত । সবাই অবাক হয়েছিলো ; কিন্তু তাঁরা তো আর জানতেন না যে রাসমণি ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছে যে ঈশ্বর এক ও অবিনশ্বর। আর এই শিক্ষা রাণীমা স্মরণে রেখেছিলেন। তবে রাসমণির এতো ভক্তি , এতো ঈশ্বরপ্রেম , এতো সারল্য তাঁর স্বামীর দিদিমার পছন্দ হতো না। তাকে যে সবাই প্রশ্রয় দিচ্ছে , সেটাও তার মনমতো হতো না।বৌভাতের দিন সকালবেলা জানবাজারের বাড়িতে হঠাৎই উপস্থিত হন এক দরবেশ বৈষ্ণব। সুঠাম তাঁর দেহ , বিরাট চেহারা আর সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন এক উজ্জ্বল জ্যোতি বেরোচ্ছে। দেখলেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে ইচ্ছা করে। প্রীতিরাম তাঁকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা করেন। কিন্তু তিনি প্রীতিরামের ঠাকুরঘরে যাওয়ার এবং পরিবারের লক্ষ্মীকে সেখানে ডেকে দেওয়ার আদেশ করেন। প্রীতিরামের অপেক্ষায় না থেকে তিনি অদ্ভুতভাবে অন্দরমহলে ঢুকে ঠিক ঠাকুরঘরের পথ খুঁজে নিয়ে সেখানে গিয়ে ধ্যানে বসেন।

প্রীতিরাম পড়লেন ফাঁপরে। বাড়িতে সদ্য বিয়ে হয়ে আসা বধূকে তিনি কি করে এক অপরিচিত পুরুষের সামনে নিয়ে যাবেন ? মুশকিল আসান করে দিলেন বিন্দুবালা দেবী। তিনি বললেন , রাসমণি এখনো বালিকা। আর কোনো সন্ন্যাসীর সামনে যাওয়ায় কোনো বাধা নেই।  রাসমণির সোজা তিনি যাবেন নাহয়।

তাই হলো , ব্যক্তিত্বশালীনী এই মহিলার কথা অমান্য করবে এমন সাধ্য মান্না বা মাড় কারুর নেই। যুগল-গিন্নি অসন্তুষ্ট হলেও কিছু বললেন না।

যাই হোক , ধ্যান ভাঙার পর সেই সন্ন্যাসী রাসমণিকে কন্যা সম্বোধন করে তাঁর হতে তুলে দেন এক শালগ্রাম শিলা। বলেন , এই শিলার মধ্যে স্বয়ং রঘুবীর বাস করেন। রঘুবীর স্বয়ং তাকে নির্দেশ দিয়েছেন জানবাজারের লক্ষ্মীর কাছে তাঁকে নিয়ে যেতে। রাসমণি যেন নিজের স্বামীজ্ঞানে , নিজের সন্তানজ্ঞানে রঘুবীরের সেবা করে। তারপর যেমন হঠাৎ করে এসেছিলেন , অন্তর্হিত হলেন সেই অদ্ভুতভাবে। সেইদিন থেকে মাড়দের গৃহদেবতা জনার্দনের সম আসনে পূজিত হতে থাকলেন রঘুবীর।

এতো শিক্ষিত পরিবার হওয়া সত্বেও মাড় ও মান্না এই দুই পরিবারই প্রচণ্ড গোঁড়া ছিল। রাসমণি এসে একে একে সেই কুপ্রথাগুলি ভাঙতে শুরু করলো। পাশে পেলো তার আলোকপ্রাপ্ত স্বামী রাজচন্দ্রকে। স্ত্রীর স্বামীর পাদোদক খাওয়া , বিধবাদের যেকোনো শুভ অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকা - এসবই আসতে আসতে ভাঙলো রাজচন্দ্র আর রাসমণি। একদিনে তা সম্ভব হয়নি।  রাসমণির সারল্য ও দৃঢ়তা , রাজচন্দ্রের তীক্ষ্ণ যুক্তির কাছে মাথা নোয়ালো কুসংস্কার। রাসমণির ভালোবাসার কাছে হেরে গেলো মাড়বাড়ির সুবিখ্যাত দুর্গাপুজোর বলিপ্রথা। তর্কের মাধ্যমে যা হওয়া অসম্ভব হয় , স্নেহের দ্বারা , ভালোবাসার দ্বারা যে সেটাই সম্ভব ও সর্বজনগ্রাহী হয়ে উঠতে পারে , সেটাই প্রমাণ করে দেখালো রাসমণি।

জমিদারবাড়ির ছেলে ও জামাই হওয়ার দরুণ রাসমণির দেবর অভয়চন্দ্র ও ছোটো নন্দাইয়ের বেশ কিছু চরিত্রের ত্রুটি ছিল। রক্ষিতাগমন , বিলাসবৈভবে গা ভাসানো , মদ্যপান , জুয়াখেলা - এসবের অভাব ছিল না এদের চরিত্রে। উপযুক্ত  শাসনের অভাবে সেই ব্যাপারগুলো মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছিল। ছোট নন্দাই এক রমণীকে গোপনে বিবাহ করেছিলেন এবং মাড় বাড়ির ঘরজামাই হওয়া সত্বেও তাদের সবকিছু লুকিয়ে গিয়েছিলেন ও তাদের প্রতারিতও করেছিলেন । নিজের প্রকৃত স্ত্রীকে অর্থাৎ বিশ্বময়ীকে ভয়  দেখিয়ে শ্বশুরমশাইয়ের থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করতেন তিনি। গোপনে তার একটি সংসারও ছিল এবং বিশ্বময়ীকে তিনি কখনোই যোগ্য সম্মান ও ভালোবাসা দেননি। ভালোবাসা না পেয়ে বিশ্বময়ী  হয়ে উঠেছিল রুক্ষ ও মুখরা।  তার দাদা যে ওই গ্রাম্য মেয়েটাকে এতো ভালোবাসে - এ সে কখনোই সহ্য করতে পারতো না। রাসমণিকে কারণে অকারণে ছোট করা , কথা শোনানো - এসব তো লেগেই ছিল। হঠাৎ মহালয়ার দিন রাসমণি গঙ্গার ঘাটে স্নান করতে গিয়ে সদ্যোজাত শিশু কোলে এক অল্পবয়সী মেয়েকে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখে , তার কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে জানা যায় , তার স্বামী জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়ে তাকে এক মাড়োয়ারি বাবুর কাছে বেচে দিয়েছে।

তার স্বামীর পরিচয় জানলে রাসমণি নিশ্চিত হন যে এটি তার ছোটো নন্দাইয়েরই কীর্তি। অভাগা মেয়েটির প্রতি সহানুভূতিতে তাঁর মন করুণায় আর্দ্র হয়ে আসে। তিনি মেয়েটিকে নিজের গ্রামবাসী সখীর পরিচয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন। কিন্তু তার পরিচয় বেশিদিন চাপা রাখা গেলো না। রাজবাড়িতে রাসমণির নামে ছিছিক্কার উঠলো , তার স্বামী ছাড়া আর কেউ তাকে বিশ্বাস করলো না , বিশ্বময়ী ও ছোটো নন্দাই তো তুমুল ঝামেলার সৃষ্টি করলেন।  তখন রাসমণির  স্বপক্ষে প্রমাণের জন্য রাজচন্দ্র খবর পাঠালো সেই মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ীকে। ব্যবসায়ী এসে সব ঘটনা কবুল করলো। তখন শ্বশুরবাড়ির সম্মান রক্ষার্থে সপুত্রক মেয়েটিকে নিজের জন্মগ্রামে , হালিশহরে রেখে আসেন রাসমণি । এই ঘটনার পর থেকে ছোট জামাইয়ের ক্রিয়াকর্মের ওপর কঠোরভাবে নজরদারি রাখা আরম্ভ হলো। এতে ছোট নন্দাই রাসমণি ও রাজচন্দ্রের ওপর ভীষণভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলো। তন্ত্রমন্ত্রের সাহায্যে সে নানাভাবে এই যুগলের ক্ষতি করার চেষ্টা করলো।

সাময়িকভাবে সে এই কাজে সফলও হলো।  ত্যাগ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিশ্বময়ীকেও সে দাদার অমঙ্গল করতে বাধ্য করেছিল। বিশ্বময়ী,  আনন্দময়ী এবং রাজচন্দ্রকে জড়িয়ে নানারকম কথা ছড়াতে লাগলো। কিন্তু রাসমণির ভালোবাসা ও ভক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলো অমঙ্গলের কালো ছায়া। রাসমণি সবই জানতে পেরেছিলো , কিন্তু কোনো অভিযোগ জানায়নি কাউকেও , নিজের দিদি আনন্দময়ী ছাড়া। তারপর রাসমণির পরামর্শেই প্রীতিরাম এক মহাল পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়ে এবং তার কোষাগার ব্যবহার সীমাবদ্ধ করে দিয়ে ছোট জামাই ও বিশ্বময়ীকে পাঠিয়ে দেন এক দূরবর্তী মহালে।  এতে কারোর মনেই কোনো অসন্তোষ থাকে না , আবার তার ক্ষতির থেকেও রাজপরিবারকে বাঁচানো সম্ভব হলো। যাওয়ার আগে অবশ্য বিশ্বময়ীর সঙ্গে রাসমণির ভাব হয়ে গেছিলো কারণ সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল এবং অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে বারংবার ক্ষমা চেয়েছিলো নিজের দাদা আর দুই বৌদিদির কাছে। সংসারে ফিরে এলো শান্তি।

এবার অশান্তি বাঁধল অভয়চন্দ্রকে নিয়ে । অভয়চন্দ্র অনেক বেশি হিংস্র , লোভী , অর্থলোলুপ , ধূর্ত , দুঃসাহসী আর চরিত্রহীন । একবার আনন্দময়ীকে সে কুপ্রস্তাবও দিয়েছিল । ভীতা , লজ্জিতা , অসহায়া আনন্দময়ীর সম্মান রক্ষা করতে এগিয়ে এলো রাসমণি স্বয়ং । ঠাকুরপোকে ঠাস করে সপাটে একটা চড় মেরে তাকে উচিৎ শিক্ষা দেয় রাসমণি । এ নিয়ে মাড়বাড়িতে বিস্তর জলঘোলা হলো । রাসমণির প্রস্তাবে অভয়চন্দ্রের বালিকা বধূ সরযূবালাকে তড়িঘড়ি বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসা হলো । সরযূ ছিল খুব শান্তশিষ্ট , খুব ভালো আর সরল একটি মেয়ে । তিন জা - এর চরিত্র প্রায় এক । তিনজনের মধ্যে এই সুসম্পর্ক আজীবন বজায় ছিল । কারো মনে পরস্পরের প্রতি কোনো ঈর্ষা , দ্বেষ ছিল না । এরপর একদিন রাণীর হালিশহরে যাওয়ার দিন সব ঘটনা ওলটপালট হয়ে গেল ।

রাণী পালকি করে অনেকদিন পর বাপের বাড়ি যাচ্ছে , সঙ্গে প্রচুর দাস দাসী , লেঠেলবাহিনী , উপঢৌকন আর পালকির ঠিক পাশেই অশ্বারোহী রাজচন্দ্র । অনেকদিন পরেই যাচ্ছে , কারণ মাঝখানে হরেকৃষ্ণর সঙ্গে রাসমণির কিছু মনোমালিন্য হয়েছিল । হরেকৃষ্ণর এবং তার পুত্রদের চোখ বেয়াই বাড়ির এই বিপুল সম্পত্তি দেখে ধাঁধিয়ে গিয়েছিল । ছেলেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য গোপনে তিনি চিঠিতে রাসমণিকে অনুরোধও করেছিলেন । কিন্তু সে প্রস্তাব রাসমণি সরাসরি নাকচ করে দেয় । জানায় , এতে তার পিতৃগৃহের সম্মানহানি অবশ্যম্ভাবী । তারা দরিদ্র হতে পারে , কিন্তু সব মান-মর্যাদা খুইয়ে বেয়াইবাড়ির থেকে সাহায্য নেওয়া উচিত নয় । আত্মসম্মানবোধ সবচেয়ে মূল্যবান , একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর পাওয়া যায় না । ভাগ্যে লক্ষ্মীলাভ লেখা থাকলে আপন কর্মের  দ্বারাই তাকে করায়ত্ত করা সম্ভব ।  যেমনটি করেছেন তাঁর শ্বশুরমশাই ; কপর্দকশূন্য থেকে আজ তিনি কলকাতার এক নম্বর ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তি । রাসমণি এতদিন ধরে রাজপ্রাসাদে বাস করে সম্পত্তির লোভ কী জিনিস বুঝে গেছে । তাই সে পত্রে তার বাবা এবং ভাইকে জানবাজারে আসতেই নিষেধ করে দেন । যাই হোক, হরেকৃষ্ণ এতে খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন । তিনি মেয়েকে চিঠি লেখা থামিয়ে দেন । তার মান ভাঙাতেই রাসমণির পিত্রালয়ে আগমন । কিন্তু অর্থের মোহ তখনো ত্যাগ করতে পারেননি হরেকৃষ্ণ ও তাঁর দুই পুত্র। ফলে , রাসমণিকে ব্যর্থমনোরথ হয়েই ফিরতে হলো।

ফেরার পথে এক জায়গায় প্রবল গোলযোগ , ঢাক- কাঁসর - শাঁখ - ঢোল প্রভৃতি বহুবিধ বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনে পালকি থামল । সেইসঙ্গে একটি মেয়ের বুকফাটা আর্তনাদ। প্রবল বাদ্যযন্ত্রের শব্দ , ব্রাহ্মণদের " জয় সতীমায়ের জয় " বলে হুঙ্কার - কোনোকিছুই সেই আর্তনাদকে ঢাকতে পারছে না।  কিছুক্ষনের মধ্যেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেলো। রাসমণিরই সমবয়সী এক ব্রাহ্মণকন্যা সদ্য বিধবা হয়েছে আর তাকে সতী বানাবার জঘন্য পাশবিক প্রক্রিয়ায় মেতে আছে তার পরিবারবর্গ ও পুরোহিতগণ। গঙ্গার তীরবর্তী রাস্তা - সেখানেই সতীদাহ হবে। চিতায় এক বৃদ্ধের দেহ শায়িত আছে আর একটি বিস্রস্তবসনা মেয়েকে কয়েকজন প্রৌঢ়া ধরেবেঁধে সেই চিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটিকে দেখলেই বোঝা যায় সে অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় রয়েছে। তবু তাকে চিতার দিকে নিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে সবাই। এর মধ্যেও কয়েকজন নির্মমভাবে তার গায়ের গয়না টেনে খুলে নিচ্ছে। রাসমণি সতীদাহের ঘটনা জানলেও এরকম দৃশ্য কখনো দেখেনি। সে এই নির্মমতা , পাশবিকতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে পালকির মধ্যে বসেছিল।

রাজচন্দ্রও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন । সতীদাহের কথা জানলেও এরকম চোখের সামনে থেকে তিনিও দেখেননি । এরপর যা ঘটতে শুরু করল , তাতে রাসমণি আর পালকিতে বসে থাকতে পারল না । ইতিমধ্যে মেয়েটিকে দড়ি দিয়ে সেই মৃতদেহের সঙ্গে চিতার ওপরে বাঁধা হল। তারপর ব্রাহ্মণরা আবার সতীমায়ের নামে জয়ধ্বনি দিয়েই জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে দিল সেই চিতার দিকে । মেয়েটির আর্তনাদ যত বাড়তে লাগলো,  পাল্লা দিয়ে তত বাড়তে লাগলো ঢাক ঢোল মৃদঙ্গের আওয়াজ । আতঙ্কে শিউরে উঠে রাসমণি জড়িয়ে ধরল রাজচন্দ্রকে । তখনই সে নদীর তীরে একটি কালীমন্দির দেখতে পেল । ছুটে গিয়ে সেই মন্দিরে ধর্না দিল সে । আকুল স্বরে মায়ের কাছে সে জোর করে সতী করা মেয়েটির প্রাণভিক্ষা চাইল ।

অনতিলম্বে আকাশ কালো করে মুষলধারে বৃষ্টি নামলো । সেই বৃষ্টির এমন তেজ , তার সঙ্গে এমন মুহুর্মুহু বজ্রপাত ও তুমুল ঝড় , ব্রাহ্মণরা , বাদকরা ও মেয়েটির পরিবারের লোকেরা সব প্রাণভয়ে পালিয়ে গেল । আর আশ্চর্যভাবে নিভে গেল সেই চিতার আগুন । মেয়েটির প্রাণ রক্ষা করলেন স্বয়ং জগদীশ্বরী ।

বৃষ্টি ধরার সঙ্গে সঙ্গেই রাসমণি ছুটে গিয়ে খুলে দিল মেয়েটির বাঁধন । সে অক্ষত , তবু ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে আছে । তখনও নেশার ঘোর তার কাটেনি । রাসমণি রাজচন্দ্রকে অনুরোধ করল মেয়েটিকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে । রাজচন্দ্র কিন্তু সম্মতি দিল না । কারণ এতে তাদের পরিবার একঘরে হবে , লোকে তাদের ধর্মত্যাগী বলবে এবং সর্বোপরি পরিবারের কেউ এটা মেনে নেবে না । তখন রাসমণি যুক্তি দিল , প্রাণ থাকলে তবেই ধর্ম থাকে । তাই প্রাণের মূল্য ধর্মের চেয়ে অনেক বেশি । তাঁর স্বামী শিক্ষিত , রাজা রামমোহন রায়ের সুহৃদ , তিনি যদি এই অসহায় মেয়েদের পাশে এসে না দাঁড়ান , তবে কে দাঁড়াবে ? ঈশ্বর এই মেয়েটিকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন , এরপর তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তাদের। রাজচন্দ্র অভিভূত হলেন স্ত্রীর এই মানসিক দৃঢ়তা দেখে । তিনি সম্মত হলেন । মেয়েটিকে গোপণে রাসমণির পালকিতে করেই নিয়ে আসা হল কলকাতায় ।

তখন কলকাতায় মধ্যরাত্রি । রাসমণি আর রাজচন্দ্র আলোচনা করে মেয়েটিকে নিয়ে এসেছেন মান্নাবাড়িতে, মেয়েটির সুরক্ষার জন্য । দাসীকে দিয়ে খবর পাঠানো হল তাদের ফুল ঠাকুরমা বিন্দুবালা দেবীকে । সব শুনে বিন্দুবালা দেবীর তো মাথায় হাত । তিনি প্রথমেই খুব বকাবকি করলেন রাজচন্দ্র আর রাসমণিকে। যে মেয়ের সতী হওয়াতে বাধা পড়েছে , তাকে আশ্রয় দিলে তো গোটা সমাজ বিপরীতে চলে যাবে , জনতার বিপুল রোষ আছড়ে পড়বে জানবাজার আর মান্নাবাড়ির ওপরে । অনেক বাদানুবাদ হওয়ার পর হঠাৎ মেয়েটি পালকি থেকে বেরিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বিন্দুবালা দেবীর পায়ে আছড়ে পড়ে আশ্রয় চাইল । সে বারবার করে বলল যে সে বেঁচে থাকতে চায় , সে সতী হতে চায় না , সে স্বর্গে যেতেও চায় না । তখন বিন্দুবালা দেবীর সকল দ্বন্দ্ব কেটে গেল । তিনি মেয়েটিকে আশ্রয় দিলেন এবং রাজচন্দ্র - রাসমণিকে সে রাতটা মান্নাবাড়িতেই থেকে যেতে বললেন ।

রাসমণি মেয়েটিকে নিয়ে ঘরে এলো । মেয়েটির ওপর দিয়ে এত বড়ো ধকল গেছে , তার ওপর অতিরিক্ত নেশা । প্রচণ্ড ক্লান্ত সে । এতটাই ক্লান্ত , যে নিজের হাতে করে জল গড়িয়ে খাওয়ার ক্ষমতাও নেই । অথচ তৃষ্ণায় সে ছটফট করছে । রাসমণি পড়ল ফাঁপরে । মেয়েটা পিপাসায় ছটফট করছে , আর এত রাতে সে অন্য বামুনবৌ পায় কোথায় ? সে কী শূদ্রাণী হয়ে ব্রাহ্মণীর মুখে জল দেবে ? অল্পক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল রাণী । প্রাণ থাকতে এভাবে সে কাউকে মরতে যেতে দেবে নাকি ? সে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের হাতে জল গড়িয়ে নিয়ে খাইয়ে দিল মেয়েটিকে । মেয়েটি " মা , মা গো " বলে ঢলে পড়ল । অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল সে ।

রাজচন্দ্র আর বিন্দুবালা দেবী যা ভয় করেছিলেন , তা-ই হলো । রাত পোহাবার আগেই ব্রাহ্মণরা হানা দিলেন জানবাজারে । খবর পেয়ে মান্নারা সপরিবারে সেখানে ছুটলেন । রাসমণি গোপণে নিজের পালকিতে তুলে নিল সেই মেয়েটিকে ।

বাড়ির পিছন দিয়ে সুরক্ষিতভাবে জানবাজারে ঢুকে সব শুনে তো সবার চক্ষুস্থির। ওদিকে মাড়রা তো বুঝতেই পারছেনা , এ হুলুস্থুলের কারণ কি? যত সময় এগোচ্ছে , দলে দলে লোক এসে বিক্ষোভ জানাচ্ছে  জানবাজারের বাড়ির সামনে। উপায়ান্তর না দেখে রাসমণি সমস্ত কথা বলতেই বাধ্য হলো। শুনে সবাই রেগে গেলেন। প্রীতিরাম তো বৌমাকে কিছু বলতে পারবেন না , তিনি রাজচন্দ্রকেই তার কান্ডজ্ঞানহীনতার জন্য দুষতে লাগলেন। যোগমায়া দেবীও খুব অসন্তুষ্ট হলেন রাণীর ওপরে। বিন্দুবালা দেবীও রেহাই পেলেন না।  ইতিমধ্যে পুলিশ এসেও উপস্থিত হয়েছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে জানবাজারের সম্পর্ক তো খুবই ভালো। তাই , পুলিশ এসে ভিড় কিছুক্ষনের মধ্যেই ফাঁকা করে দিলো আর প্রীতিরামকে সতর্ক করে দিলো , কারণ এর জল অনেকদূর গড়াবে। জানা গেলো , লোকগুলো বিধবা মেয়েটির শ্বশুরবাড়ির লোক। যুগলগিন্নি তো রায় দিয়েই দিলেন , এখুনি মেয়েটিকে তার বাড়ির লোকের হাতে তুলে দিতে , কিন্তু বিন্দুবালা দেবীর নিষেধে তা গ্রাহ্য হলো না।

সবাই ভাবলো সমস্যা হয়তো এবার মিটেছে , কিন্তু আরো বড়ো আকারে সমস্যা এলো। ব্রাহ্মণসমাজের শিরোমণি , যাঁর কোথায় গোটা সমাজ চলে , সেই অঘোরনাথ শাস্ত্রী গোটা ব্রাহ্মণকুল , বিশাল লেঠেল বাহিনী আর বহুসংখ্যক লোককে নিয়ে সোজা ঢুকে এলেন প্রাসাদের মধ্যে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন , হয় মেয়েটিকে তাঁদের হাতে তুলে দিয়ে সপরিবারে দাসেরা প্রায়শ্চিত্ত করুক , নচেৎ এ বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। প্রীতিরামের কোনো অনুনয় - বিনয়ে তিনি পাত্তাই দিলেন না। পিতাকে ক্রমাগত অসম্মানিত হতে দেখে বারংবার সবার নিষেধ সত্ত্বেও বেরিয়ে এলেন স্বয়ং রাজচন্দ্র। কিন্তু ফল হলো উল্টো। আগুনে যেন ঘি পড়লো। হুঙ্কার দিয়ে উঠলো গোটা ব্রাহ্মণসমাজ। এই ধর্মত্যাগী কুলাঙ্গার ম্লেচ্ছকে তারা কোনোভাবেই রেহাই দেবে না। উদ্যত লাঠি নেমে এলো রাজচন্দ্রে ওপর।

ঠিক সেই সময়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মহাশয়।  ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি বরাবর সতীদাহের বিরোধিতা করে এসেছেন রাজা রামমোহন রায়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তাঁর তীক্ষ্ণ যুক্তিজাল , ক্ষুরধার রসনা আর অপরিসীম বিদ্যাচর্চাকে রীতিমতো ভয় পায় গোটা ব্রাহ্মণসমাজ।

তিনি নিজে কঠোর হাতে নিবারণ করলেন সেই উদ্যত লাঠিকে । বললেন , পিছন থেকে কেন ? ক্ষমতা থাকলে সে যেন সামনে এসে রাজচন্দ্রের সঙ্গে লাঠির লড়াই করে । তারপর অঘোরনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাদানুবাদ আরম্ভ হল ।উক্তি - প্রত্যুক্তির মাধ্যমে আস্তে আস্তে পরিবেশ আবার উত্তপ্ত হতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার যুক্তি দিলেন , সতী হওয়া যেকোনো নারীর স্বেচ্ছাধীন । সে নিজে না চাইলে তাকে সতী করা যাবে না , একথা শাস্ত্রেও মানে। তখন সদ্যবিধবা মেয়েটিকে ডাকা হলো। চিকের আড়ালে এসে দাঁড়ালো ভয়ভীতা সেই মেয়েটি। সে সদ্যই বিধবার বেশ ধারণ করেছে। কিন্তু ভয়েতে সে থরহরিকম্প। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার অত্যন্ত মিষ্টিস্বরে তার মতামত জানতে চাইলেন। কিন্তু তবুও মেয়েটি একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না ভয়ে । সভায় চাপা গুঞ্জন শুরু হলো । তখন ধীরে ধীরে রাসমণি মেয়েটির পাশে গিয়ে তার পিঠে হাত রাখল এবং তাকে অভয় দিল । মেয়েটি এবার সাহস পেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো । খানিক সামলে নিয়ে সে স্পষ্টভাবে জানাল , সে বাঁচতে চায় , সে সতী হতে চায় না । গোটা সভা নিস্তব্ধ । মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার তখন উচ্চৈঃস্বরে রাজচন্দ্র আর রাসমণির সাহসের প্রশংসা করে তাদের সাধুবাদ জানালেন । অঘোরনাথ শাস্ত্রী চুপচাপ বেরিয়ে তো গেলেন , কিন্তু যাওয়ার আগে স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেলেন যে এই মেয়ে সতী হবেই , কেউ আটকাতে পারবে না ।

হলও তাই । এত চেষ্টা করেও মেয়েটিকে বাঁচানো গেল না । যুগলগিন্নির প্রবল আপত্তিতে মেয়েটিকে বাড়িতে রাখা গেল না । তখন তাকে , রাজা রামমোহন রায়ের পরামর্শ মতো তাঁরই তৈরি করা একটি আশ্রমে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল । সেখানে বিভিন্ন বিধবা মেয়েরা একসঙ্গে থাকে এবং হস্তশিল্প বা অন্যান্য কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে । তাদের সুরক্ষা প্রদান করেন স্বয়ং রাজা রামমোহন রায় ; তাঁর পাইকবাহিনী নিয়ে । সেখানে যাওয়ার পথেই রাজচন্দ্রকে পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে অঘোরনাথ শাস্ত্রীর দল । রাজচন্দ্র যথাসম্ভব গোপন রেখেই যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন , কিন্তু অভয়চন্দ্র এই সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিল অঘোরনাথ শাস্ত্রীর কাছে । রাজচন্দ্রকে পেছন থেকে লাঠির বাড়ি মেরে গুরুতরভাবে আহত করা হয় । তাঁর লেঠেলবাহিনীও এঁটে উঠতে পারল না এই অতর্কিত আক্রমণের সঙ্গে । তারপর অঘোরনাথ শাস্ত্রীর নির্দেশেই পালকিতে থাকা সেই মেয়েটিকে সেখানেই আবার দড়ি দিয়ে বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হলো । আকাশ বাতাস মথিত হয়ে উঠল তার আর্তনাদে । তার হাহাকারে শিউরে উঠল পাশের জনবসতির লোকেরাও ।

সাফল্য না পেলেও রাজচন্দ্র - রাসমণির জীবনে এই ঘটনার গুরুত্ব অপরিসীম । কারণ -

১) এই ঘটনার মাধ্যমে রাজচন্দ্র আর রাসমণি - দুজনেরই জনহিতকর কাজে হাতকড়ি হল ।

২) ব্রাহ্মণদের সঙ্গে মাড়বাড়ির চিরস্থায়ী শত্রুতা আরম্ভ হল

৩) রাজা রামমোহন রায়ের পাশে সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে শুধু আলোকপ্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত যুবকরাই নয় , এক কিশোরীও এসে দাঁড়াল , যা গোটা সমাজকে স্তম্ভিত করেছিল ।  

কিন্তু এতকিছুর পরেও অভয়ের চরিত্র সংশোধন হলো না । গোপনে সে আবার আনন্দময়ীকে কুপ্রস্তাব দিলো । দাসীদের মাধ্যমে সে খবরও চাপা রইলো না । তখন মাড় বাড়ি আর মান্নাবাড়ী একত্রে সিদ্ধান্ত নিল আনন্দময়ীকে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেওয়ার । কিন্তু এই একতরফা বিচার উদারমনস্ক রাজচন্দ্র কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না । তার বৌঠানের সত্যি কোনো দোষ ছিল না , সমস্ত দোষ অভয়ের ; অথচ বাড়ির ছেলে বলে তার কোনো শাস্তিই হল না ? এই ঘটনার তুমুল বিরোধিতা করে রাজচন্দ্র তার স্ত্রী রাসমণি এবং বৌঠান আনন্দময়ীকে নিয়ে তাদের ইজারার মকিমপুর তালুকে চলে গেলেন । মায়ের চোখের জল , বাবা মশাইয়ের আদেশ , দাসীদের গুঞ্জন - কোনোকিছুই তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারল না ‌‌।  

লক্ষ্মীমন্ত রাসমণি : মাড়পরিবারে রাসমণির আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই গৃহলক্ষ্মী সন্তুষ্ট হলেন । মাড়েদের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠলো । ব্রিটিশদের অত্যন্ত সুনজরে পড়ে গেল মাড়েদের ব্যবসা । আরো চারিদিক থেকে নতুন নতুন কাজের বরাত আসতে আরম্ভ করল । আমদানি - রপ্তানি উভয়দিকেই প্রীতিরাম এত মুনাফা আগে দেখেননি ।শুধু তাই নয় , পরপর দুই স্ত্রীর মৃত্যু রাজচন্দ্রকে সংসারের প্রতি উদাসীন করে তুলেছিল , রাসমণি আসার পর সেই ঔদাসীন্যও কেটে গেল । রাজচন্দ্র সাগ্রহে ব্যবসার হাল ধরলেন । প্রীতিরাম তো খুশি হয়ে রাসমণির কোষাগারের ব্যবহারকে অসীম করে দিলেন । অর্থাৎ , রাসমণি যখন চাইবে , যে পরিমাণ চাইবে তত পরিমাণ অর্থ কোষাগার থেকে নিতে পারবে । তার সঙ্গে রাসমণির মোটা মাসোহারার ব্যবস্থা করা হলো । এতে অনেকেরই চোখ টাটাল , কিন্তু প্রীতিরাম সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না । রাসমণি অবশ্য নিজের জন্য কিছুই খরচ করত না । প্রতিদিন গঙ্গায় স্নানের পর তিনি গঙ্গা থেকে জানবাজার পর্যন্ত সমস্ত গরীব দুঃখীদের অর্থ ও বস্ত্র বিতরণ করতেন । সবাই দুহাত ভরে তাকে আশীর্বাদ করেন । স্ত্রীর অনুরোধে গঙ্গায় একটি সুন্দর শান বাঁধানো ঘাট বানিয়ে দিলেন রাজচন্দ্র , ভাঙাচোরা, শ্যাওলা পড়া ঘাটের জায়গায় । সেই ঘাটের নাম হল বাবু রাজচন্দ্র দাসের নামে - বাবুঘাট । সেই ঘাট আজও কলকাতার ঐতিহ্য । স্ত্রীর সুবিধার্থে রাজচন্দ্র জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি কিনে নিলেন । সুন্দর ভাবে সংস্কার করলেন সেই রাস্তার ।

রাসমণি মাঝেমধ্যেই কালীঘাটের মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন । স্বয়ং সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা রাসমণিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কালীঘাটের মন্দিরে আসার জন্য , তার পবিত্রতা ও অপার করুণার জন্য। সেখানেও তিনি কাঙালীভোজন করাতেন , গরীবদের অর্থ বিতরণ করতেন , তাদের সমস্যা শুনে সে সমস্যার সমাধান করতেন । কালীঘাটের মন্দিরে তিনি মোটা টাকা অনুদান দিয়ে মন্দিরের সংস্কারও করেছিলেন । কিন্তু বৈষ্ণব পরিবারের মেয়ে , সর্বোপরি বৈষ্ণব পরিবারের বধূ - সে শাক্ত দেবীর থানে কেন এত ঘনঘন যাবে ? এই প্রশ্ন তুলেছিলেন তার বাড়ির সদস্যরাও । কিন্তু রাসমণি তো নদীয়ার হালিশহরের মেয়ে ; নদীয়া যেমন শ্রীচৈতন্যের জন্মভূমি , হালিশহর তেমনি তো বিখ্যাত কালী সাধক রামপ্রসাদের জন্মস্থান । সেখানে তাঁর বাসগৃহে ধুমধাম করে কালীপুজো হতো । রাসমণিরা অংশগ্রহণ করত । রাসমণি ছোট্টবেলা থেকেই যেমন সহজভাবে ঈশ্বরের মধ্যে বিভেদ ঘুচিয়ে ফেলেছিল , তেমনি সহজভাবেই জনার্দনের সেবক মাড়েরাও একথা মেনে নিতে বাধ্য হল । তাছাড়া রাসমণি তো জনার্দনের সেবায় কোনো ত্রুটি রাখছে না । তাই রাসমণির কালীঘাটে যাওয়া বহাল হল । রাজচন্দ্রের দিদিমা প্রচুর আপত্তি করলেন । কিন্তু স্বয়ঃ মাড়দের গুরুদেব , যিনি রাসমণিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন , তিনিই যখন রাসমণিকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন , তখন আর কোনো বাধা রইলো না । কালীঘাটের পাশেই একটি বাড়ি কিনে নিলেন রাজচন্দ্র , স্ত্রীর যাতে কোনো অসুবিধা না হয় । দিকে দিকে করুণাময়ী, দয়াময়ী নামে রাসমণির নাম ছড়িয়ে পড়ল ।

তখনকার দিনে মাড়েরা দৈনিক ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা আয় করতেন । রাজচন্দ্রের তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির কাছে হার মানলো অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা । রাজচন্দ্র তসরের চাদর , মৃগনাভি , আফিম , নীল প্রভৃতি ইংল্যাণ্ডে রপ্তানি করতেন এবং অর্জন করতেন প্রচুর মুনাফা । এই নীল ব্যবসা ছিল মাড়দের অন্যতম প্রধান ব্যবসা । এই নীল চাষকে কেন্দ্র করেই রাজচন্দ্র - রাসমণির জীবন অন্যদিকে বাঁক নিলো ।

মকিমপুর তালুকের মনোহর পরিবেশের মধ্যে মাড়দের সুবৃহৎ , অতীব সুন্দর মহল । সেখানেই রাজচন্দ্র - রাসমণি - আনন্দময়ী গিয়ে উঠলেন । এই মকিমপুর তালুক বিখ্যাত ছিল নীলচাষের জন্য ।

যাই হোক , এই মকিমপুর তালুকে আগমন ছিল রাসমণির জীবনের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । কেন ? তার উত্তর খানিক বাদেই পাওয়া যাবে !

মকিমপুর তালুকে নিরিবিলি পরিবেশে রাজচন্দ্র নিজে নিজের স্ত্রী আর বৌঠানের শিক্ষার ভার নিলেন । রাসমণি তখনো বালিকা ; আজন্মলালিত ধারণার বশবর্তী হয়ে সে মোটেই ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়নি । তখন আনন্দময়ী তাকে বললেন যে , তিনি কোনোকালে লেখাপড়া করেননি , তাও তাঁকে বৈধব্যদশা ভোগ করতে হচ্ছে ; যা কপালে আছে তা তো কেউ খণ্ডাতে পারবে না , বরঞ্চ বিধবা হওয়ার পর যাতে কেউ বিধবাদের ঠকাতে না পারে - সে জন্যই লেখাপড়া শেখার দরকার । কথাটা রাসমণির মনে গেঁথে গিয়েছিল । মকিমপুর রাজবাড়ী হয়ে উঠল সরস্বতীর আরাধনাস্থল । রাজচন্দ্র যত্ন করে , ধৈর্য্য ধরে আনন্দময়ী আর রাসমণিকে বাংলা , ইংরেজি ও সংস্কৃতের শিক্ষা দিলেন । হাতে ধরে শেখালেন ব্যবসার খুঁটিনাটি । ব্যবসা সংক্রান্ত দলিল-দস্তাবেজ , যা মকিমপুরে ছিল , সব বিস্তৃতভাবে আলোচনা করতেন রাজচন্দ্র আনন্দময়ী আর রাসমণির সাথে । দিনের বেলায় রাজচন্দ্র তালুক পরিদর্শনে বেরোতেন , বৌরা ঘরের কাজ গুছিয়ে নিত আর রাতে বসত লেখাপড়ার আসর । একদিন সেখানকার নীলকুঠির সাহেব সপরিবারে রাজচন্দ্রকে আমন্ত্রণ জানালেন নিজের ভবনে ।

পথে যাওয়ার সময়ে রাজচন্দ্রের কাছে কয়েকজন নীলচাষী এসে মহেশ দাস নামে একজন নীলচাষীর হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা শোনালো । তারা এটাও বলল যে , বাবু এখানকার জমিদার । তিনি যেন নীলকুঠির সাহেবের সঙ্গে মহেশের বিষয়ে একটু কথা বলেন । রাজচন্দ্র একটু বিস্মিত হলেন । কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও জানতে পারলেন না । তাঁর মনে হল , সমস্ত নীলচাষীরাই এমন কিছু জানে , কিন্তু খুব ভয়েতে তারা কিচ্ছুটি বলছে না । বুদ্ধিমতী রাসমণি তখন রাজচন্দ্রকে সাহেবের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতে বলল আর জানাল সে যাবে নীলচাষীদের গ্রামে , মহেশ দাসের স্ত্রী দুর্গার সাথে কথা বলতে ।

দুর্গা তো প্রথমে কোনো কথাই বলতে চায় না ; রাসমণি দেখল সে কিন্তু অন্যদের মতো ভয় পাচ্ছে না । সে প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ আর ঘৃণাবশে কথা বলছে না । তার স্বামীকে পাওয়া না যাওয়াতে সে উতলা হয়ে আছে , কিন্তু তার কোনো অনুতাপ বোধ বা ভয় নেই । রাসমণি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অতি সহজেই দুর্গাকে আপন করে নিল । দুর্গা অবশেষে সব কথা জানাল , কিন্তু সব শুনে চমকে উঠল রাসমণি।

দুর্গা জানাল , নীলকুঠির সাহেব এই পরগণায় সামান্য কিছু জমির ইজারা নিয়ে এসেছিল নীলচাষের জন্য । কিন্তু আশেপাশের সমস্ত জমি দখল করার জন্য সে বাড়ি বাড়ি দাদন পাঠাতে লাগল । বলা বাহুল্য , অধিকাংশ কৃষকই এই প্রস্তাবে রাজি হল না ; কারণ একবার নীলচাষ করলে সেই জমিতে দ্বিতীয় কোনো ফসল উৎপাদন করা যাবে না । আর কৃষক হয়ে জমিকে বন্ধ্যা তারা হতে দিতে পারবে না । এই জমিই তো তাদের সারাজীবনের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করে। নীলচাষ তো একবছরের ; তারপর ধান না ফললে তারা তো না খেয়ে মরবে । এরপর সাহেব অন্য পথ ধরল । সে রাতের অন্ধকারে লেঠেল পাঠিয়ে ধানের গোলায় আগুন লাগিয়ে দিতে লাগল । সবাই বুঝতে পারল , কার কাজ ; কিন্তু কিছু করার নেই । কারণ জমিদার এখানে আসেন না আর প্রশাসন নীলকরদের অধীনে ।

রাসমণি কিশোরী বালিকা হলেও বুঝলো সমস্যা অনেক গভীরে। এক এক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সে দুর্গাকে আশ্বাস প্রদান করে ফিরে গেলো বাগান বাড়িতে। রাজচন্দ্রের সঙ্গে রাণী কথা বলল। কিন্তু রাজচন্দ্র জানালো নীলকর সাহেব দোষী - একথার সাক্ষ্য সবাই আড়ালে দেবে , আদালতে নয়। আর নীলকর সাহেবের বিরুদ্ধে একটি কথা বললে তা মোটেই ব্রিটিশরাজ ভালোভাবে নেবে না। তার ওপর , মাড়দের একটি অন্যতম প্রধান ব্যবসা হলো - নীল রপ্তানি। তাই নীলচাষের ক্ষতি হলে তাদের ব্যবসা বিপুল পরিমানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্রিটিশরা ক্ষুব্ধ হলে অন্য ব্যবসার লাইসেন্সও বাজেয়াপ্ত হতে পারে। পাশে তারা কাউকে পাবে না। উপরন্তু প্রীতিরাম প্রচণ্ড বিরক্ত হতে পারেন।

রাসমণি চুপ করে গেলেও মানতে পারলো না , রাজচন্দ্রের মনটাও খচ খচ করতে লাগলো। কিন্তু কিছু করার ছিল না কারুরই। কয়েকঘন্টার মধ্যে দুর্গাও গোপনে খবর পাঠিয়ে দিলো যে মহেশ দাস পালিয়ে এসেছে অক্ষতভাবে, কিন্তু তার আশ্রয় দরকার। রাসমণি গোপনে মহেশ আর দুর্গাকে তাদের মহলে আশ্রয় দিলো , কাকপক্ষীতেও টের পেলো না।

অভিনয়ে[সম্পাদনা]

  • দিতিপ্রিয়া রায় রাসমণি দাসী ওরফে "রাণী" ওরফে "রাণীমা" , রাজচন্দ্রের স্ত্রী হিসাবে - (প্রধান নেতৃত্ব) (মৃত) ;
  • জানবাজারের বাবু রাজ চন্দ্র দাস (মাড়) হিসাবে গাজী আবদুন নূর - রাসমণির স্বামী জানবাজারের ধনী ও আকর্ষণীয় জমিদার। (মৃত)
  • সৌরভ সাহা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব হিসাবে একজন বিংশ শতাব্দীর বাংলার ভারতীয়  সাধক। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের অবতার বলে বিশ্বাস করা হয়।
  • সারদা দেবী চরিত্রে সন্দীপ্তা সেন - উনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য সাধিকা এবং শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের স্ত্রী।
  • গৌরব চ্যাটার্জী মথুরামোহন বিশ্বাস ওরফে "মথুর" - করুণাময়ীর স্বামী এবং রাজচন্দ্র-রাসমণির কনিষ্ঠ জামাতা। তিনি রাসমণি -রাজচন্দ্রের কাছে ছেলের মতো হয়ে গেলেন (যে তাদের কখনও জৈবিকভাবে হয়নি)। করুণাময়ীর মৃত্যুর পরে তিনি জগদম্বাকে (তাঁর ছোট বোন) বিয়ে করেছিলেন।
  • অদিতি চ্যাটার্জী ভৈরবী ভ্রমনী (বা যোগেশ্বরী) - এক যোগেশ্বরী যিনি রামকৃষ্ণকে  তন্ত্র (২০২১-বর্তমান) দীক্ষা করেছিলেন
  • সোহান বন্দোপাধ্যায় প্রীতিরাম দাস (মাড়) - যোগমায়ার স্বামী, রাজচন্দ্রের বাবা এবং রাসমণির শ্বশুর। (মৃত)
  • সমতা দাস  ওরফে "মায়া" / "যুগী" - যুগল মান্নার কন্যা, প্রীতিরাম দাসের স্ত্রী, রাজচন্দ্রের মা এবং রাশমণির শাশুড়ি। (মৃত)
  • সুছন্দ্রা বন্দ্যোপাধ্যায় সুকুমারী দাসী - প্রীতরামের কনিষ্ঠ ভাই কালীপ্রসাদের স্ত্রী,  যোগমায়া দাসীর জা , রাজচন্দ্রের ছোটখুড়ীমা , অভয়ের মা। তিনি দুষ্ট এবং সম্পদের লোভী এবং চান তাঁর পৌত্র মাধব রাজচন্দ্রের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। (মৃত)
  • তানিয়া কর আনন্দময়ী দাসীর চরিত্রে - অল্প বয়সে বিধবা। রাসমণির বড় জা । (প্রস্থানিত)[৪]
  • অভয় চন্দ্র দাস হিসাবে ধ্রুবজ্যোতি সরকার / সুদীপ রাহা - কালীপ্রসাদ এবং সুকুমারীর পুত্র, রাজ চন্দ্রের ছোট খুড়তুতো ভাই, রাসমণির দেওর , মাধবের বাবা।
  • শ্যামৌপ্তি মুদলী / ঈপ্সিতা মুখার্জি সরযূবালা হিসেবে - অভয়ের প্রথম স্ত্রী, রাসমণির ছোট জা, মাধবের মা যিনি পরে তাঁর স্বামীকে তার দুষ্টতার কারণে ত্যাগ করেছিলেন
  • দিয়া চক্রবর্তী পদ্মমণি আটা (বা দাসি) ওরফে "পদ্ম" চরিত্রে - রাজচন্দ্র-রাসমণির বড় মেয়ে, রামচন্দ্রের স্ত্রী।[৫]
  • রামচন্দ্র আটা ওরফে "আটামশাই" হিসাবে চন্দ্রনীভ মুখোপাধ্যায় / সৌরভ চক্রবর্তী(রাজা) - পদ্মর স্বামী, রাজ চন্দ্র-রাসমণির বড় জামাই।
  • কুমারী চৌধুরী  হিসাবে সহেলি ঘোষ রায় /অশ্মী ঘোষ - রাজচন্দ্র-রাসমণির দ্বিতীয় কন্যা, প্যারিমোহনের স্ত্রী। (মৃত)
  • প্যারিমোহন চৌধুরী চরিত্রে পার্থিব ব্যানার্জি - কুমারীর স্বামী, রাজচন্দ্র-রাসমণির দ্বিতীয় (মধ্যম) জামাতা। (মৃত)
  • করুণাময়ী বিশ্বাস (দাসী) ওরফে "করুণা" হিসাবে ঐন্দ্রিলা সাহা - রাজচন্দ্র-রাসমণির তৃতীয় কন্যা, মথুরামোহনের প্রথম স্ত্রী যিনি তার সন্তানের (ভূপাল) জন্ম দেওয়ার পরে মারা গিয়েছিলেন । (মৃত)
  • জগদম্বা বিশ্বাস (দাসী) ওরফে "ছোটখুকি" হিসাবে সম্পূর্ণা মন্ডল / রোশনি ভট্টাচার্য - রাজচন্দ্র-রাসমণির কনিষ্ঠ কন্যা। তিনি উদার-মনের, নিবেদিত এবং প্রকৃতিগত ভাবে নির্ভীক। মথুরামোহনের দ্বিতীয় স্ত্রী।[৬]
  • মাধবচন্দ্র দাস হিসাবে প্রীতম দাস - অভয় এবং সরযূর পুত্র, রাজচন্দ্র-রাসমণির ভ্রাতুষ্পুত্র , সুকুমারীর নাতি, পদ্মর ছোট খুড়তুতো ভাই, কুমারী-করুণা-জগদম্বার বড় খুড়তুতো ভাই। তিনি তার পিতা এবং ঠাকুরমার একটানা অশুভ মতামত সত্বেও পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন।
  • পদ্মমণি দাসির জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং রানী রাসমণির নাতি মহেন্দ্রনাথ আটা হিসাবে সায়ক চক্রবর্তী। (মৃত)
  • জগদম্বা দাসীর জ্যেষ্ঠ পুত্র  এবং রানী রাসমণির নাতি দ্বারিকানাথ বিশ্বাসের ভূমিকায় নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভক্ত ছিলেন এবং অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মাণে তাঁর মা জগদম্বা দাসীকে সহায়তা করেছিলেন। পরে সুমন দে এই চরিত্রে অভিনয় করছেন[৭]
  • কুমুদিনী দাসী , দ্বারিকানাথের হবু স্ত্রীর চরিত্রে সুস্মিলি আচার্য্য
  • শুভ্রজিৎ সাহা রানী রাসমণির নাতি কুমারী দাসীর পুত্র যদুনাথ চৌধুরী চরিত্রে
  • বিশ্ববাসু বিশ্বাস , ভূপালচন্দ্র বিশ্বাস হিসেবে। তিনি করুণাময়ী ও মথুরামোহনের একমাত্র পুত্র।
  • সোমাশ্রী ভট্টাচার্য ভূপালচন্দ্রের স্ত্রী প্রসন্নময়ীর ভূমিকায়, জগদম্বা দাসীর বড় পুত্রবধূ।
  • নিস্তারিণী বিশ্বাস , মথুর বাবু ও জগদম্বা দাসীর মেয়ের চরিত্রে বিয়াস ধর।
  • যদুনাথের প্রথম স্ত্রী আশালতা হিসাবে অলকানন্দা গুহ। কুমারী দাসী এবং প্যারিমোহন চৌধুরীর পুত্রবধূ। (মৃত)
  • অনিকেত চক্রবর্তী মথুর বাবু এবং জগদম্বা দাসীর দ্বিতীয় পুত্র ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস হিসাবে।
  • পদ্মমণি দাসী ও রামচন্দ্র আটার জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ মহেন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলার চরিত্রে সৌমী চক্রবর্তী।
  • অমিতাভ দাস রাঘবেন্দ্ররূপে, তিনি মহেন্দ্রনাথের বিধবা স্ত্রী  কমলার সাথে বিবাহ করেছিলেন।
  • পদ্মমণি দাসী ও রামচন্দ্র আটার কনিষ্ঠ পুত্র হিসাবে গণেশ চন্দ্র হিসাবে প্রণয়চন্দ্র
  • গনেশ চন্দ্রের স্ত্রী অন্নদা হিসাবে প্রমিতা চক্রবর্তী
  • দয়াল, নিস্তারিণীর স্বামী চরিত্রে সুজয় সাহা
  • ধীরেনের চরিত্রে অরিত্র দত্ত, দয়ালের বড় খুড়তুতো ভাই
  • ধীরেনের বাবা হিসাবে অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়
  • ধীরেনের মা হিসাবে সাহানা সেন
  • শমীক চক্রবর্তী মেঘনাথ উপাধ্যায় হিসাবে
  • অনিন্দিতা ভট্টাচার্য / তনুশ্রী ভট্টাচার্য / সরগামী রুমপা দেবী ভবতারিনী হিসাবে।[৮]
  • গদাধরের বড় ভাই রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রাক্তন প্রধান পুরোহিত হিসাবে মনোজ ওঝা। (মৃত)
  • ছোট মা সারদা হিসাবে অয়ন্যা চট্টোপাধ্যায়[৯][১০]
  • সারদামণির মা হিসাবে ত্বরিতা চট্টোপাধ্যায়[১১]
  • প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস হিসাবে প্রান্তিক ব্যানার্জি - মথুরের বড় ভাই, মনমোহিনীর স্বামী।  এর আগে করুণার সাথে বিবাহের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার কথা ছিল। (প্রস্থানিত)
  • মনমোহিনী বিশ্বাস চরিত্রে সৌমী ঘোষ - প্রাণকৃষ্ণের স্ত্রী। (প্রস্থানিত)
  • জয়নারায়ণ বিশ্বাস হিসাবে দিগন্ত বাগচী - প্রাণকৃষ্ণ এবং মথুরামোহনের পিতা।তিনি অহংকারী এবং মথুরকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন কারণ মথুর অনুমতি ছাড়াই করুণাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ভিতারি গ্রামের জমিদার। (মৃত)
  • হরেকৃষ্ণ চরিত্রে শঙ্কর দেবনাথ - রাসমণির পিতা। (মৃত)
  • সংযুক্তা রায়চৌধুরী ক্ষেমঙ্করী দেবী, হরেকৃষ্ণের ছোট বোন, রাসমণির পিতৃশ্বসা  হিসাবে তিনি তাকে বড় করেছেন। (মৃত)
  • মা কালীর বালিকারূপ ঐশ্বর্যা রায় করেছিলেন।
  • গৌতম দে বাচস্পতি মহাশয় হিসাবে - ১৯ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার গোঁড়া ব্রাহ্মণ সমাজের প্রধান। (মৃত)
  • অঘোর শাস্ত্রী মহাশয়ের চরিত্রে বরুণ চন্দ - উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার সমসাময়িক ব্রাহ্মণ সমাজের প্রাক্তন প্রধান, মানসিকতায় গোঁড়া। (মৃত)
  • কালীমতির মা লক্ষ্মীমতি হিসাবে জাগৃতি গোস্বামী। (প্রস্থানিত)
  • তর্কালঙ্কার মহাশয়ের চরিত্রে সঞ্জীব সরকার - বাচস্পতি মহাশয়ের মৃত্যুর পরে ব্রাহ্মণ সমাজের প্রধান। তিনি গোঁড়া হিন্দু এবং ঘন ঘন বিরোধের কারণে মাড় পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। (মৃত)
  • হলধারী ঠাকুরের ভূমিকায় রঘুবীর
  • হৃদয় ঠাকুরের চরিত্রে সিদ্ধার্থ ঘোষ
  • লোপামুদ্রা সিনহা চন্দ্রমণি দেবী হিসাবে - শ্রী রামকৃষ্ণের মা
  • কাত্যায়নী দেবী হিসাবে কৃষ্ণা মিত্র - শ্রী রামকৃষ্ণের বড় বোন
  • রামেশ্বর চরিত্রে আদিত্য রায় - শ্রী রামকৃষ্ণের দ্বিতীয় বড় ভাই
  • রামেশ্বরের স্ত্রী হিসাবে কন্যাকুমারী মুখোপাধ্যায় - শ্রী রামকৃষ্ণের দ্বিতীয় বড় বৌদি
  • ডোনাল্ড সাহেবের চরিত্রে জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • চম্পাবাই চরিত্রে অনিন্দিতা রায়চৌধুরী
  • ফাহিম মির্জা রাম মোহন রায় চরিত্রে (মৃত)
  • দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভূমিকায় রাজ ভট্টাচার্য
  • রাধাকান্ত দেবের ভূমিকায় সৌরভ চ্যাটার্জী
  • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চরিত্রে সৌরভ দাস
  • সাবর্ণ রায়চৌধুরী চরিত্রে কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়
  • ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় হিসাবে ভাস্বর চ্যাটার্জী - শ্রী রামকৃষ্ণের পিতা, একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ । (মৃত)
  • ঠগী চরিত্রে সুমিত সমাদ্দার
  • হিয়া দে মা কালী চরিত্রে
  • নাপিত বউ চরিত্রে জুঁই সরকার
  • কাপালিকা চরিত্রে ঋতা দত্ত চক্রবর্তী
  • কুসুমের চরিত্রে শীর্ষা গুহঠাকুরতা - যুবতী বিধবা। তার বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক ('বদ্দিমশাই') যিনি এক বিশাল দুর্ভিক্ষের সময় জগদম্বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। মাধব কুসুমকে ভালোবাসতো ও তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো তাকে সামাজিক সম্মান দিতে।
  • বিখ্যাত টপ্পা গায়ক নিধু বাবু চরিত্রে অরিন্দম গাঙ্গুলী।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "King-size lives of small-screen stars - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৩-০১ 
  2. "Rani Rashmoni beats popular shows on TV; rules the TRP chart - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৩-০১ 
  3. "'Rani Rashmoni' actress Tania Kar gets married - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৩-০১ 
  4. "'Rani Rashmoni' actress Tania Kar gets married - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 
  5. "Entertainment news in Bengali, Latest Tollywood and Bollywood news, Movie News, বিনোদনের খবর, সিনেমা পর্যালোচনা - HT Bangla"Hindustantimes Bangla। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 
  6. বিলকিস, মৌসুমী। "'রাসমণি'-তে জগদম্বার চরিত্র কেমন সামলাচ্ছেন রোশনি?"www.anandabazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-০৪ 
  7. "Mom is double excited about my role in 'Rani Rashmoni': Suman Dey - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-০৩ 
  8. "'ভবতারিণী' চরিত্র থেকে বিদায় নিচ্ছেন অন্তঃসত্ত্বা তনুশ্রী, কে পেলেন সুযোগ?"News18 Bengali। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 
  9. "রানী রাসমণি সিরিয়ালের ছোট্ট মা সারদাকে দেখেছেন নিশ্চই! রইল অভিনেত্রীর আসল পরিচয়"Bong Trend - Bangla Entertainment News and Viral News (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 
  10. Bangla, TV9 (২০২১-০১-১৮)। "শুটিং না থাকলে আমি গদাধরের সঙ্গে ক্রিকেট খেলি: অয়ন্যা"TV9 Bangla। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 
  11. "বিয়ের ৬ মাসের মাথায় 'কড়ি খেলা'-খ্যাত ত্বরিতার ঘরে নতুন সদস্য! শুভেচ্ছা টলিউডের"Hindustantimes Bangla। ২০২১-০৭-২০। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-১৪ 

৪)https://www.prothomalo.com/entertainment/tv/%E0%A6%86%E0%A6%9C-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A7%80-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%A3%E0%A6%BF

৫)https://bangla.hindustantimes.com/entertainment/buzz-karunamoyee-rani-rashmoni-uttar-porbo-to-begin-from-monday-sandipta-roy-to-play-the-role-of-maa-sarada-opposite-sourav-saha-31625320314963.html

৬)https://bangla.aajtak.in/cinema-and-tv-serial-news/television/story/sandipta-sen-play-role-sarada-devi-korunamoyee-rani-rashmoni-uttar-porbo-sourav-saha-sri-ramkrishna-285281-2021-07-03