ওয়াসিল আহমদ
ওয়াসিল আহমদ واصل احمد | |
|---|---|
| জন্ম | আনু. ২০০৫ |
| মৃত্যু | (বয়স ১১) |
| পেশা | পুলিশ সদস্য |
| নিয়োগকারী | আফগান সরকার |
| পরিচিতির কারণ | শিশু-যোদ্ধা |
ওয়াসিল আহমদ ( আনু. ২০০৫ – ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ খ্রি.) ছিলেন একজন আফগান শিশু সৈনিক, যিনি এগারো বছর বয়সে একটি আফগান পুলিশ ইউনিটের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং পরবর্তীতে তালেবানদের হাতে নিহত হওয়ার জন্য সর্বাধিক পরিচিত।[১] তার চাচা সামাদ তাকে একে-৪৭, পিকে মেশিনগান, রকেট ও মর্টার ব্যবহারের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ফোন ও ভিএইচএফ রেডিও ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। [১] ২০১৫ সালে সামাদ আহত হওয়ার পর তিনি নিজের চাচা সামাদের পুলিশ ইউনিটের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দুইজন মুখোশধারী বন্দুকধারীর গুলিতে তিনি নিহত হন। আক্রমণকারী দুই মুখোশধারী তালেবান সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। [২]
শৈশব ও লালন-পালন
[সম্পাদনা]ওয়াসিল আহমদ আফগানিস্তানের ওরুজগন প্রদেশে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তৎকালীন উরুজগান অঞ্চল দীর্ঘ দিন ধরে 'বিপজ্জনক ও সংঘাতের কেন্দ্র' হিসেবে পরিচিত ছিল। তালেবান আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা মোল্লা মুহাম্মদ ওমর ওরুজগনেই জন্মগ্রহণ করেন। তাই এখানে অধিকাংশ মানুষই তালেবানের সমর্থক ছিল। এরপর ২০০১ সালে আফগানিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইও ওরুজগন থেকেই তালেবানের বিরুদ্ধে প্রথম পশতু বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন।[৩] তাই ঐতিহাসিকভাবে ওরুজগন প্রদেশ জটিল রাজনৈতিক উত্তেজনা, গোত্রীয় লড়াই এবং সামরিক সংঘর্ষের একটি মূল কেন্দ্র ছিল। ওয়াসিলের পিতা তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে ওয়াসিল নিজেই সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই মূলত তাকে এই যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি জানান যে, এ ঘটনা তার মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।[৪][৫]
ওয়াসিল আহমেদের চাচা ওরুজগন প্রদেশের উরুজগান জেলার স্থানীয় আফগান পুলিশের কমান্ডার ছিলেন। জানা যায়, ওয়াসিলের চাচা সামাদ পূর্বে তালেবানদের একজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালে তালেবান যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পূর্বের তুলনায় আক্রমণ জোরদার হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে তিনি দল পরিবর্তন করে আফগান সরকারের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ হয়ে তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন।[৬] ২০১৫ সালের গ্রীষ্মের সময় তালেবান যোদ্ধারা খাস ওরুজগান অঞ্চলকে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এই অবরোধের সময় ওয়াসিলের চাচা সামাদ গুরুতরভাবে আহত হন। সামাদের আঘাত পাওয়ার পরে ওয়াসিল আহমদ নিজের চাচার চাকরিতে নিযুক্ত হন এবং তার ইউনিটের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। তখন তিনি অল্পবয়সী একজন কিশোর ছিলেন এবং তখন তার বয়স মাত্র ১১ বা ১২ বছর ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।[৭]
অবরোধ
[সম্পাদনা]
সংঘাতময় ওরুজগন প্রদেশের মধ্যে দান সাঙ্গো এলাকায় সংঘটিত এই অবরোধটি অত্যন্ত বিপদসংকুল ছিল। অবরোধের সবচেয়ে উত্তপ্ত পর্যায়ে ওয়াসিলের অধীনে মাত্র ৭৫ জনের মতো সরকারপন্থী যোদ্ধা ছিল। বিপরীতে দাবি করা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে বাইরে শত শত সশস্ত্র তালেবান যোদ্ধা নিয়ে গঠিত এক বিরাট বাহিনী অবস্থান করছে।[৫] এভাবে মোট ৭১ দিন ধরে অবরোধ চলতে থাকে।[৪] এর মধ্যে ৪৩ দিন ধরে ওয়াসিল নিজেই একজন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে ইউনিট পরিচালনা করেন।[৪] তিনি দাবি করেন যে, তিনি মর্টার, রকেট লঞ্চার থেকে নিয়ে মেশিনগান পর্যন্ত সব রকমের ভারী অস্ত্র পরিচালনা করতেন এবং তিনি প্রায়শ ইউনিট কম্পাউন্ডের ছাদে উঠে অস্ত্র চালাতেন।[৫]
ওয়াসিল শুধু যুদ্ধের মাঠেই নয়; বরং যুদ্ধের তিনি পাশাপাশি বাহিনীর সাথে কেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থার দায়িত্বও পালন করতেন। তার ইউনিটের সাথে আফগান বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু তিনিই ছিলেন।[৫]
অবশেষে ২০১৫ সালের আগস্টে আফগান বিশেষ বাহিনী অবরোধ ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। এরপর ওয়াসিল ও বেঁচে থাকা ৩৫ জন যোদ্ধাকে আফগান ও ন্যাটো একটি যৌথ হেলিকপ্টার অভিযানে উদ্ধার করে এবং উন্নত চিকিৎসার লক্ষ্যে তাদের তারিন কোট শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।[৮] ওয়াসিলের চাচা সামাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তখন সরকারি কর্তৃপক্ষ সামাদ ও তার ভাতিজা ওয়াসিল উভয়কেই বীর হিসেবে সম্মানিত করে।[৪]
হত্যা
[সম্পাদনা]অবরোধ শেষ হওয়ার পর ওয়াসিল স্থানীয় বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন[৯] এবং পাশাপাশি বাড়িতে তিনি ব্যক্তিগত শিক্ষকের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যান।[১০] তখন তার ইংরেজি ভাষাজ্ঞান কিছুটা উন্নত হয়; যদিও সামগ্রিকভাবে তাকে ভালো ছাত্র বলা যেত না। এই বিষয়ে তার একজন প্রতিবেশী পরে মন্তব্য করেছিলেন যে, সম্ভবত এর কারণ ছিল, তাকে পুলিশ কর্মকর্তারা অতিমাত্রায় উৎসাহ দিত এবং তার বীরত্বের জন্য তাকে বিভিন্ন পদক প্রদান করা হয়েছিল। তাই সে পড়াশোনার চেয়ে অস্ত্র নিয়ে খেলতে ও শখের বসে পুলিশ গাড়ি চালাতে বেশি আগ্রহী ছিল।[৯] এমনকি নিরাপত্তার জন্যে তাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় পিস্তল বহন করারও অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।[২] ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সোমবার সকালে যখন তিনি স্থানীয় বাজারের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল,[১১][১২] তখন দু'জন মুখোশ পরিহিত বন্দুকধারী মোটরবাইকে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।[১১] মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তারা তার মাথায় দু’বার গুলি করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে 'লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড' হিসেবে বর্ণনা করা হয়।[২]
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কান্দাহার শহরর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়; কিন্তু সেখানে কিছুক্ষণ পরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[১০] পরবর্তীতে তাকে স্থানীয় শাহিদানো কবরস্থানে দাফন করা হয়।[৯]
বিতর্ক
[সম্পাদনা]ওয়াসিল আহমদের মৃত্যুর কিছুদিন পর তার প্রকৃত অবস্থান বা ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অবরুদ্ধ বাহিনীর ভেতরে তিনি ঠিক কোন ভূমিকায় ছিলেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।[৪] তার চাচা সামাদ দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, আহমদ কোন আনুষ্ঠানিক বা সরকারি যোদ্ধা ছিলেন না; বরং তিনি শুধুমাত্র নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।[১৩] অবরোধের কিছুদিন পর তার চাচা সামাদ নিজেও সুস্থ হয়ে উঠছিলেন এবং ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে 'স্বাধীন আফগানিস্তান মানবাধিকার কমিশনের' একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, যেহেতু আহমদকে বন্দুক ও সরকারি পুলিশের পোশাক সরবরাহ করা হয়েছিল, তাই একজন শিশু-সেন্য হিসবে বিবেচিত হবেন এবং এটি স্পষ্টতই শিশু-সৈন্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। [৪]
কমিশনের রিপোর্টে আরো বলা হয় যে, পুলিশ ওয়াসিলকে নায়ক হিসেবে প্রচার করে নিজেরাই তার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।[১৩] তারা তাকে প্লাস্টিকের ফুলের মালা পরিয়ে সম্মান জানায়; এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে কর্মকর্তারা তার সাহসিকতা ও বীরত্বের প্রশংসা করেন। অপরদিকে, আফগান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে এ কথা অস্বীকার করে যে, সরকারি বাহিনী শিশু-সেনা ব্যবহার করে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা "চাইল্ড সোলজার্স ইন্টারন্যাশনাল" দাবি করে যে, সংঘর্ষে উভয় পক্ষই শিশু-সৈন্যদের ব্যবহার করেছে।[৩]
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 Popalzai, Masoud (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "11-year-old Afghan boy, hailed as hero for fighting Taliban, killed by militants"। CNN। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুন ২০২৩।
- 1 2 3 "Siege 'Hero,' 12, Gunned Down by Taliban"। এনবিসি নিউজ। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- 1 2 "Assassinated: The little boy who became a hero of Afghanistan's resistance against Taliban"। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- 1 2 3 4 5 6 Popalzai, Masoud (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "11-year-old Afghan boy, hailed as hero for fighting Taliban, killed by militants"। CNN। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুন ২০২৩।
- 1 2 3 4 "Siege 'Hero,' 12, Gunned Down by Taliban"। এনবিসি নিউজ। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- ↑ "Afghan boy who was declared a hero for fighting the Taliban gunned down on his way to school"। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- ↑ Chan, Melissa। "Taliban Kills 10-Year-Old Soldier Hailed as War Hero"। ১২ জুলাই ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Taliban Gun Down 10-Year-Old Militia Hero in Afghanistan"। The New York Times। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- 1 2 3 "Taliban Gun Down 10-Year-Old Militia Hero in Afghanistan"। The New York Times। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- 1 2 Popalzai, Masoud (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "11-year-old Afghan boy, hailed as hero for fighting Taliban, killed by militants"। CNN। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুন ২০২৩।
- 1 2 "Assassinated: The little boy who became a hero of Afghanistan's resistance against Taliban"। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- ↑ "10-year-old 'hero' who fought against Taliban assassinated on his way to school"। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
- 1 2 Graham-Harrison, Emma (৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "Wasil Ahmad: the 10-year-old 'hero' murdered by the Taliban"। The Guardian।