বিষয়বস্তুতে চলুন

ওয়াইয়ু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ওয়াইয়ু
বিয়েতে সম্ভাব্য বর ও কনের নৃত্যু প্রদর্শনী
মোট জনসংখ্যা
ভেনিজুয়েলায় ৪,১৩,৪৩৭ (২০১১ আদমসুমারী)[]
কলম্বিয়ায় ৩,৮০,৪৬০ (২০১৮ আদমসুমারী)[]
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল
গুয়াহিরা উপদ্বীপ
 কলম্বিয়া এবং  ভেনেজুয়েলা
ভাষা
ওয়াইয়ু, স্পেনিশ ভাষা
ধর্ম
রোমান ক্যাথলিক[]
সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী
আরাওয়ান গোষ্ঠী

ওয়াইয়ু হলো একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা উত্তর কলম্বিয়ার সবচেয়ে উত্তরে এবং উত্তর-পশ্চিম ভেনেজুয়েলার গুজিরা উপদ্বীপে বসবাস করে। ওয়াইয়ু ভাষা আরাওয়াকান ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় তারা স্পেনীয় উপনিবেশবাদী, জমির দখলদার এবং ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল। আজও তাদের ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। আর তাদের হস্তশিল্প কলম্বিয়ার রপ্তানিতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

ভৌগলিক অবস্থান

[সম্পাদনা]
কলম্বিয়া-ভেনিজুয়েলার যে অঞ্চলে ওয়াইয়ু আদিবাসীরা বসবাস করে

ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠী গুজিরা উপদ্বীপের শুকনো জায়গাগুলোতে বসবাস করে, যা ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার সীমানা জুড়ে, ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত। এই কঠিন পরিবেশের মধ্য দিয়ে দুটি প্রধান নদী প্রবাহিত হয়েছে, কলম্বিয়ার রাঞ্চেরিয়া নদী এবং ভেনেজুয়েলার এল লিমোন নদী। এই নদীগুলোই তাদের প্রধান পানির উৎস। পাশাপাশি বৃষ্টির মৌসুমে পানি ধরে রাখার জন্য তারা কৃত্রিম জলাধারও তৈরি করেছে।

এই অঞ্চলের আবহাওয়া নিরক্ষীয় মৌসুমি প্রকৃতির। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল, যাকে তারা জুয়াপু বলে। এরপর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল, যাকে তারা জেমিয়াল বলে। এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত দ্বিতীয় বর্ষাকাল, যার নাম ইওয়া। আর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় গ্রীষ্ম।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

গুজাইরা বিদ্রোহ

[সম্পাদনা]
লা গুজাইরার মানচিত্র, ১৭৬৯

যদিও ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠী কখনো স্পেনীয়দের সম্পূর্ণ অধীনে আসেনি, তবুও উভয় পক্ষের মধ্যে অনেকবছর ধরেই যুদ্ধাবস্থা ছিল। ১৭০১ সালে তারা একটি ক্যাপুচিন মিশন (খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারেরর মিশন) ধ্বংস করে বিদ্রোহ করে, ১৭২৭ সালে দুই হাজারেরও বেশি আদিবাসী স্পেনীয়দের ওপর আক্রমণ চালায়। এছাড়া ১৭৪১, ১৭৫৭, ১৭৬১ এবং ১৭৬৮ সালেও বিদ্রোহ ঘটে। ১৭১৮ সালে গভর্নর সোটো দে হেরেরা তাদেরকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে, "বর্বর, ঘোড়া চোর, মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য, যাদের নেই ঈশ্বর, নেই আইন, নেই কোনো রাজা।" কলম্বিয়ার ভূখণ্ডে থাকা সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওয়াইয়ুরা ছিল অনন্য, কারণ তারাই একমাত্র গুলি চালানো ও ঘোড়ার ব্যবহার শিখেছিল।[]

১৭৬৯ সালে স্পেনীয়রা ২২ জন ওয়াইয়ু আদিবাসীকে ধরে নিয়ে যায়, তাদের কার্টাহেনার দুর্গ নির্মাণের কাজে লাগানোর জন্য। এর প্রতিক্রিয়ায়, ১৭৬৯ সালের ২ মে, রিও দে লা হাচার কাছে এল রিনকন নামের জায়গায়, ওয়াইয়ুরা আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে একটি গির্জা পুড়ে যায় এবং ভিতরে আশ্রয় নেওয়া দুইজন স্পেনীয়ও পুড়ে মারা যায়। তারা পুরোহিতকেও আটক করে। এরপর স্পেনীয়রা সঙ্গে সঙ্গে এল রিনকন থেকে একটি বাহিনী পাঠায় ওয়াইউদের ধরতে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হোসে আন্তোনিও দে সিয়েরা, একজন মেস্তিজো, যিনি আগেও ২২ জন গুজিরোকে ধরার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওয়াইউরা তাকে চিনে ফেলে এবং তার দলকে বাধ্য করে পুরোহিতের বাড়িতে আশ্রয় নিতে, তারপর সেই বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে সিয়েরা এবং তার সঙ্গে থাকা আটজন মারা যায়।[]

এই সাফল্যের খবর দ্রুতই গুজিরোর অন্যান্য এলাকায় পৌঁছে যায়, আর বিদ্রোহে আরও অনেক ওয়াইয়ু যোগ দেয়। মেসিয়ারের হিসেবে, বিদ্রোহের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় ২০,০০০ ওয়াইয়ু যোদ্ধা অস্ত্র হাতে ছিল। তাদের অনেকের কাছেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, যা তারা ইংরেজ ও ডাচ চোরাকারবারিদের কাছ থেকে, এমনকি স্পেনীয়দের কাছ থেকেও সংগ্রহ করেছিল। এই অস্ত্রের জোরে বিদ্রোহীরা প্রায় পুরো অঞ্চল দখল করে এবং বসতিগুলো জ্বালিয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এতে ১০০ জনের বেশি স্পেনীয় নিহত হয় এবং আরও অনেকে বন্দি হয়। বিদ্রোহীরা প্রচুর গবাদিপশুও দখল করে। যেসকল স্পেনীয়রা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, তারা রিও দে লা হাচায় আশ্রয় নেয় এবং মরাকাইবো, ভালে দে উপার, সান্তা মার্তা ও কার্টাহেনায় জরুরি বার্তা পাঠায়। কার্টাহেনা থেকে ১০০ জন সৈন্য পাঠানো হয়।

তবে বিদ্রোহীরা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ ছিল না। সিয়েরার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তার আত্মীয়স্বজন, যারা নিজেরাও ওয়াইয়ু ছিল, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। দুই পক্ষের এই আদিবাসীরা লা সোলে দাদে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়। এর সঙ্গে স্পেনীয় বাহিনীর আগমন ঘটলে বিদ্রোহ ধীরে ধীরে থেমে যায়, তবে তার আগেই গুজিরোরা নিজেদের বহু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করেছিল।[]

জোড়পূর্বক শ্রম

[সম্পাদনা]

ঔপনিবেশিক ভেনেজুয়েলার বহু গ্রাম্য অঞ্চলে ওয়াইয়ুদের ওপর নির্যাতন করা হত। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঋণ দাসত্ব ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। এমনকি ১৫৪২ সালের "নিউ ল’স" বা নতুন আইন দ্বারা স্পেনীয় উপনিবেশে আদিবাসী দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার পরও এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।[]

১৭৭১ সালে কার্টাহেনা থেকে পাঠানো একদল স্পেনীয় সৈন্য গুজিরা উপদ্বীপে আদিবাসী বিদ্রোহ দমন করতে আসে। কিন্তু তারা এসে দেখে, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর সেনাদল, অর্থাৎ ওয়াইয়ুরা, যাদের হাতে ব্রিটিশদের তৈরি বন্দুক। ব্রিটিশ ও ডাচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি, ওয়াইয়ুরা তাদের কাছে মুক্তা ও ব্রাজিল কাঠের বিনিময়ে চোরাই ত্রীতদাস কিনত। আসলে, ওয়াইউ নেতা পাবলো মাজুসারেস এবং তোরিবিও কাপোরিনচে, দুজনেরই আটজন করে আফ্রিকান দাস ছিল। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওয়াইয়ুরা স্পেনীয়দের জন্য এক প্রকার হুমকি হয়েই ছিল এবং স্বাধীনভাবেই চলত। মাঝে মাঝে উভয় পক্ষই একে অপরের লোক অপহরণ করত।

স্পেনীয় ভূখণ্ডে আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন রোধে ইতিমধ্যে যে আইন ছিল, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে স্পেনীয় কর্মকর্তারা বন্দিদের ত্রীতদাস হিসেবে ব্যবহারকে “ন্যায়সঙ্গত” বলেই দাবি করত। তাদের যুক্তি ছিল তারা যেহেতু যুুদ্ধংদেহী আচরণ করেছে তাদের এই শাস্তি পাওয়া স্বাভাবিক।[]

ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় ১৮১১ সালে, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা আসে ১৮২১ সালে, যখন সিমন বলিভার ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তবে ঋণ দাসত্বের প্রথা ভেনেজুয়েলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় অনেক পরে, ১৮৫৪ সালে। তখন প্রেসিডেন্ট হোসে গ্রেগরিও মোনাগাস (১৮৫১–১৮৫৫) জমির মালিকদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, বয়স বাড়তে থাকা তাদের মূল্যহীন শ্রমিকদের (অর্থাৎ ক্রীতদাসদের) মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে তারা ক্ষতিপূরণ পাবেন।[]

১৮৮০ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত, ভেনেজুয়েলার সরকার মূলত বড় শহরগুলোর দিকেই নজর দিয়েছিল। ফলে স্থানীয় এলাকাগুলো অবাধে আদিবাসী শ্রমিকদের শোষণ চালিয়ে যাচ্ছিল। ওয়াইয়ুদের মুখে-মুখে প্রচলিত গল্পে শোনা যায়, কৌশলে ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক শ্রমে লাগানোর ঘটনা তখন ছিল স্বাভাবিক। অনেক ওয়াইয়ু তখন দিনমজুরের মতো কাজও খুঁজছিল। তাদের বিনা ভাড়ায় অন্য বসতিতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো, কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা বুঝতো, সেটি আসলে বিনা মজুরির কাজের ফাঁদ।

কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা সরাসরি ওয়াইয়ু গ্রামে হামলার নির্দেশ দিতেন, আর মানুষদের ধরে নিয়ে যেতেন। জমির মালিকেরা যখন মনে করলেন, শুধু ওয়াইয়ু বন্দিদের ওপর নির্ভর করলে হবে না, তখন কিউবার মতো দেশ থেকে আফ্রিকান বংশোদ্ভুত শ্রমিক আনা শুরু হলো। কারণ তাদের আরও শ্রমিক দরকার ছিল, কিন্তু ওয়াইয়ুরা পর্যাপ্ত ছিল না।

তখনও হেসিয়েন্ডা ব্যবস্থা চলমান ছিল, আর ভেনেজুয়েলার বেশিরভাগ জমিই ছিল কৃষিজমি। ফলে যারা ধরা পড়ত, তাদের প্রায় সবাইকে পাঠানো হতো কৃষিকাজে, যেখানে তারা রোদে পুড়তো, বৃষ্টিতে ভিজতো, কেউই জানতো না তারা কবে মুক্তি পাবে।[]

এই বন্দী ওয়াইয়ুদের প্রতিরোধের ধরন একেক এলাকায় একেক রকম ছিল, কোন অঞ্চলে জমির মালিকরা শ্রমিকদের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ চালাচ্ছেন, তার ওপরই নির্ভর করত সেই প্রতিরোধের ধরণ। এই প্রতিরোধের জন্ম হয়েছিল এক অভিন্ন স্বপ্ন থেকে। যা ছিল ওয়াইয়ু এবং আফ্রো-ভেনেজুয়েলান শ্রমিকদের মুক্তির স্বপ্ন। প্রতিরোধের ধরণ ছিল কখনও পালিয়ে যাওয়া, কখনো স্থানীয় সরকারের কাছে আবেদন করা, আবার কখনো বিদেশি দেশের সহায়তা চাওয়া, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল কলম্বিয়া।[] কিন্তু পালানো সহজ ছিল না। অনেক ওয়াইয়ু চারপাশের জায়গা চিনত না। ফলে পথ হারিয়ে ফেলত, আর তখন হয় রোগে বা ক্ষুধায় মারা যেত, না হয় আবার ধরা পড়ত নিজেরই মালিকের হাতে। ধরা পরার পর এক সাথে আবেদন করলে, মালিকরা তাদের মাফও করে দিত। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই দেখা যেত, কেবল একজন-দুজন ওয়াইয়ু মুক্তি পেয়েছে, বাকিরা আফ্রো-ভেনেজুয়েলান ও অন্য ওয়াইয়ুরা বন্দীই থেকে যেত। সময়ের সাথে সাথে এই শোষণ ধীরে ধীরে কমে গিয়েছিল, বিশেষ করে শাসক হুয়ান ভিসেন্তে গোমেসের (১৯০৮–১৯৩৫) মৃত্যুর পর। তবুও, সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পেতে, তাদের অনেক পথ পারি দিতে হয়েছে, অনেক দীর্ঘ রাত পার করতে হয়েছে।[]

১৯৩৬ সালে, হুয়ান ভিসেন্তে গোমেসের (১৯০৮–১৯৩৫) উত্তরসূরি জেনারেল এলেয়াজার লোপেস কনত্রেরাস (১৯৩৫–১৯৪১) গ্রামগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাঠান, যেন আফ্রো-ভেনেজুয়েলান ও ওয়াইয়ু, দু’ধরনের মানুষকেই ঋণ দাসত্বের ফাঁদ থেকে রক্ষা করা যায়। যদিও ভেনেজুয়েলায় আদিবাসীদের জোরপূর্বক শ্রমের প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হতে লেগে গিয়েছিল আরও প্রায় দেড় দশক, ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত। তবুও ১৯৩৬ সালের পর থেকে গুজিরোদের জোরপূর্বক কাজে লাগানোর প্রবণতা চোখে পড়ার মতো কমে আসে।[]

খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া

[সম্পাদনা]
ঘোড়ার ওপর বসে থাকা দুজন ওয়াইয়ু, ১৯২৮

ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মপ্রচার বা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষাদানের প্রচেষ্টা শুরু হয় ১৮৮৭ সালে, যখন ফাদার হোসে মারিয়া দে ভালদেভিয়েখাসের নেতৃত্বে ক্যাপুচিন ধর্মযাজকরা ফিরে আসেন। ১৯০৫ সালে, পোপ পায়াস দশম “ওয়াইয়ু জনগণকে সভ্য করার” উদ্দেশ্যে লা গুজিরা ভিকারিয়েট প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফাদার আতানাসিও ভিসেন্তে সোলের ই রোয়োকে প্রথম ভিকার হিসেবে নিয়োগ দেন।[]

তারা এরপর ওয়াইয়ু শিশুদের জন্য অনাথ আশ্রম গড়ে তুলতে শুরু করেন। প্রথমটি ছিল লা সিয়েরিতা অনাথ আশ্রম, যা ১৯০৩ সালে সিয়েরা নেভাদা দে সান্তা মার্তা পাহাড়ে নির্মিত হয়। এর পর ১৯১০ সালে কালানকালা নদীর তীরে সান আন্তোনিও অনাথ আশ্রম এবং ১৯১৩ সালে সেরানিয়া দে মাকুইরা পাহাড়ে নাজারেথ অনাথ আশ্রম গড়ে ওঠে। এসব অনাথ আশ্রমের প্রভাব ছিল গারাচাল, এল পাখারো, কারাজুয়া, গারাগুয়াও, মুরুমানা, গার্রা পাতামানা এবং কারাইপিয়া এলাকার রাঞ্চেরিয়াগুলোর ওপর, আর নাজারেথ অনাথ আশ্রমের প্রভাব ছিল তারোয়া, মাগুয়াইপা, গুয়াসেইপা এবং আলপানাপাউসে’র রাঞ্চেরিয়াগুলোতে।

ধর্মযজকরা নিয়মিত বসতিগুলোতে যেতেন এবং ওয়াইয়ুদের মেস বা প্রার্থনায় অংশ নিতে আহ্বান করতেন। অনাথ আশ্রমে থাকা ওয়াইয়ু শিশুদের ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিতে শিক্ষা দেওয়া হতো। এরপর থেকে ওয়াইয়ু জনগণ ও কলম্বিয়ান সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমে আসে। এমনকি ১৯৪২ সালে উরিবিয়া শহর প্রথমবারের মতো বড়দিন এবং নববর্ষ উদযাপন করে।

জনসংখ্যা

[সম্পাদনা]
কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলায় ওয়াইয়ুরা সবচেয়ে বড় আদিবাসী গোষ্ঠী

১৯৯৭ সালের কলম্বিয়ার এক আদমশুমারি অনুযায়ী, ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৪৪,০০৩ জন, যা কলম্বিয়ার মোট আমেরিন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ এবং লা গুজিরা বিভাগের মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ। তারা মোট ৪,১৭১ বর্গমাইল (১০,৮০০ বর্গকিলোমিটার) এলাকা জুড়ে বসবাস করে, প্রায় দশটি বড় বসতিতে, যার মধ্যে আটটি লা গুজিরার দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি বসতির নাম কারাইপিয়া।

ভেনেজুয়েলায়, ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, ওয়াইয়ু জনগণের সংখ্যা প্রায় ২,৯৩,৭৭৭ জন, যার মধ্যে প্রায় ৬০,০০০ জন মারাকাইবো শহরে বাস করে। সংখ্যার দিক থেকে এটি ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যা দেশটির আমেরিন্ডিয়ান জনসংখ্যার ৫৭.৫ শতাংশ।

তবে এই বিশাল এলাকা জুড়ে ওয়াইউদের বসতি সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। তাদের জনসংখ্যা মূলত জমাট বেঁধে আছে নাজারেথ ও জালা’আলা’র আশপাশে, ওয়োপু’মুইন ও উরিবিয়ার সমতলভূমিতে, আর মাইকাও ও মানাউরে শহরে,যেখানে উপদ্বীপের মধ্যে জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। এই ছন্নছাড়া বসতিগুলো সরাসরি ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত, গ্রিষ্মে অনেক ওয়াইয়ু ভেনেজুয়েলায় চলে যায়, বিশেষ করে মারাকাইবো শহর ও তার আশপাশে কাজের খোঁজে; আর বর্ষা শুরু হলে তারা আবার কলম্বিয়ার ঘরে ফিরে আসে।

ওয়াইউ জনগণ নিজেদের শুধু “ওয়াইয়ু” বলেই পরিচয় দেয়। তারা “ইন্ডিয়ান” শব্দটি স্বীকার করে না; বরং নিজেদের “মানুষ” বলতেই পছন্দ করে। “কুসিনা” বা “ইন্ডিয়ান” শব্দটি তারা ব্যবহার করে অন্য আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য, আর “আলিহুনা” (যার অর্থ “যে ক্ষতি করে”) শব্দটি তারা ব্যবহার করে বাইরের মানুষ বা ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের বোঝাতে।

ওয়াইয়ুদের বিভিন্ন গোত্র

[সম্পাদনা]

ওয়াইয়ুদের মাঝে বিভিন্ন গোত্র লক্ষ্য করা যায়। নিচে কিছু তালিকা দেওয়া হল[]

গোত্রের নাম বসতির অঞ্চল অর্থ
আপুসানা ইইরাকাহাউলে

জাসাউওউ
কানাকানতুই
মাতুয়োলুউ
সিপানোউ
উশুওউ
য়াচুলেপু
উলুউ
ওয়াতকাসাইনরুউ
পলুমোলুউ
শুলিইউ-কানেজেরুউ

টক বা তেতো
সমুদ্রসৈকত
অন্তর্বর্তী / মাঝামাঝি
বিস্মৃত
সি’ইয়া ভূমি
প্যানের ভূমি
নিঃশ্বাস থেকে দূরে
গোলাকার বস্তু
ওলুনকা ঘরের ভেতরের অংশ
মাটিতে রাখা কুঠার
লুকানোর জায়গা
এপিয়েইয়ু লুমৌলেইন
পুুরৌলেপু
ঝোপঝাড়
যেখানে ঘুমঘুম ভাব অনুভূত হয়
লিপুয়ানা উও'উপানালুউ
পুুরৌলেপু
চোখের কাছে
পাখিদের জন্য
জায়ালিয়ু কালিমিরুউ
আরালিয়েতুউ
উরাইচেইন
মেকিজানাও
প্রাণীর দাঁত
পাল একত্রিত করা বা তাড়ানো
ছোট “কুরারিরে”
মাথাবিহীন চোখ
জুসায়ু পোলুজালিই
মারালুউ
কুঠার থেকে সাবধান
জমির উপরে
পাওসায়ু পাতসুয়ারুই
পালুওউ
ভীত
সমুদ্রে পৌঁছানো
সাপুয়ানা তুইকিই
ওয়ালেরু
আগুন
তোমার ভিতরে
তিজুয়ানা উচালিই
ওউলেমেরুউ
খেলা
অনেক
উলিয়ানা আলাইনমাপু
চাওাইসু
আনুয়াপা’আ
পুসিচিপা’আ
কাইজাওউউ
সেকুওলুউ
উচাইসপা’আ
পুলাশুউলিয়া
সৌলাওউ
সবাই একত্রিত হও
একটির উপর আরেকটি
যখন এটা নৌকায় পরিণত হয়
যখন এটা বাদুড়ে পরিণত হয়
আমাদের চোখের দাঁত
এখানে আসা
ওখানে যাওয়া
আমার তোমার চেয়ে বেশি ক্ষমতা আছে
যেটি করাত চালায়
উলিয়ু ইশোউ কার্ডিনালের
উরালিয়ু আলাসু
পালুুটোউ
পাশ দিয়ে যাওয়া
আমার চোখ লাঠির তৈরি
উলেওয়ানা ইরুওউ জলপাই রঙের মুখ
ওয়ালেপুশানা ইশাজিওউ
আলাপুওলুউ
পোড়া চোখ
মিথ্যে চোখ
ওয়ালাপুয়ানা আতুায়রুকু লালন-পালন

ওয়াইউ জনগণের ভাষার নাম ওয়াইয়ুনাইকি। এটি অ্যারাওয়াক ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যা ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত।[১০] লা গুআহিরা অঞ্চলে এই ভাষার কিছু সামান্য উপভাষাগত পার্থক্য আছে। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে উচ্চারণ ও কিছু শব্দে, অল্প অল্প ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা স্প্যানিশ ভালোভাবেই বলতে পারে, কিন্তু তারা জানে নিজেদের প্রাচীন ভাষা সংরক্ষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াইয়ু জনগণ এবং অন্যান্য কলম্বিয়ানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও দ্বিভাষিক শিক্ষা প্রচারের জন্য সেন্ট্রো ইথনো-এডুকেটিভো কামুসুচিও নামক একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রথমবারের মতো চিত্রসহ ওয়াইয়ুনাইকি-স্প্যানিশ এবং স্প্যানিশ-ওয়াইয়ুনাইকি অভিধান তৈরি করা।[১১]

ধর্ম ও সমাজ

[সম্পাদনা]

ওয়াইয়ু ধর্মের প্রধান দেবতা হলেন মালেইওয়া। যিনি ঈশ্বর, সব কিছুর স্রষ্টা, ওয়াইয়ু জনগণের স্রষ্টা এবং ওয়াইয়ু সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। পুলোউইহুয়া হলেন আধ্যাত্মিক সত্তা, আধা-দেবতার মতো, যারা দম্পতি এবং প্রজনন ও জীবনের সাথে যুক্ত। পুলোউই (নারী রূপ) বাতাস ও শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। হুয়ার পুরুষ রূপ, যিনি এক যাযাবর শিকারি এবং এক শক্তিশালী হত্যাকারী হিসেবে বিবেচিত। ওয়ানুলু অসুস্থতা ও মৃত্যুর অশুভ আত্মার প্রতীক।[১২]

শিশুরা বাড়িতেই জন্ম নেয়, সাধারণত শাশুড়ি বা কাছের কোনো নারী আত্মীয় সহায়তা করেন। শিশুর সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নারীরা আগে সন্তানকে খাওয়ান এবং যখন সন্তানের বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয় তখন কঠোর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন।

ছেলেদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু মেয়েদের জন্য প্রায় ১২ বছর বয়সে বা মাসিক শুরু হলেই কিছু বিশেষ আচার পালন করা হয়। এই সময় তাদের ২ মাস থেকে শুরু করে ২ বছর পর্যন্ত নির্জন থাকতে হয়। মেয়েদের মাথার চুল কামাতে হয় এবং বড় দোলনা বা চিনচোরো-তে বিশ্রাম নিতে হয়। এই সময়ে ওয়াইউ মেয়েদের স্ত্রী হিসেবে প্রস্তুত হতে শেখানো হয়, এর বড় একটি অংশ রান্না ও ওয়াইয়ু ব্যাগ বুননের কৌশল শেখা। তাদের একটি বিশেষ নিরামিষ খাদ্য জাগুয়াপি খাওয়ানো হয় এবং ঘন ঘন গোসল করানো হয়।

নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এটি পুরোপুরি মাতৃতান্ত্রিক নয়। ওয়াইয়ু জনগণ চায় তাদের নারীরা জ্ঞানী ও পরিণত হোক। প্রায় সব প্রচলিত বিয়ে হয় পারিবারিকভাবে ঠিক করা, এবং কনের মায়ের ভাই ও মামাদের পণ দেওয়া হয়। ১১ বছর বয়সী কন্যাদেরও বাগদান দেওয়া হয়, কারণ এই সময় তারা সন্তান ধারণের সক্ষমতা পেতে শুরু করে। উদ্দেশ্য হলো বিয়ের আগে যেন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ না ঘটে, যা সমাজে, বিশেষ করে মেয়ের পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার জন্য লজ্জার কারণ হিসেবে দেখা হয়। ওয়াইয়ুদের পুরুষদের একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে।

ওয়াইয়ুদের বিশ্বাস, জীবনচক্র মৃত্যুর পরও শেষ হয় না। হাড়ের সঙ্গে যার সম্পর্ক বজায় থাকে। তাই তারা সমাধিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে।। মৃত ব্যক্তিকে প্রথমে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রসহ কবর দেওয়া হয়; পাঁচ বছর পর সেই হাড় তুলে এনে পাত্র বা চিনচোরোতে (হ্যামক) রাখা হয়, তারপর তা আবার গোত্রের কবরস্থানে পুনরায় সমাধিস্থ করা হয়।

জীবন-যাপন

[সম্পাদনা]
একটি রাঞ্চেরিয়া (ওয়াইয়ুদের বসতি)

একটি ওয়াইয়ু বসতি সাধারণত পাঁচ-ছয়টি ঘর নিয়ে গঠিত হয়, যেগুলোকে বলা হয় কাসেরিওস বা রাঞ্চেরিয়াস। প্রতিটি রাঞ্চেরিয়ার নাম রাখা হয় কোনো গাছ, প্রাণী বা ভৌগোলিক স্থানের নামে। যেসব অঞ্চলে অনেকগুলো রাঞ্চেরিয়া থাকে, সেগুলোর নামকরণ হয় মায়ের পরিবারের উপাধি অনুসারে। অর্থাৎ ওয়াইউ সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। রাঞ্চেরিয়ায় বসবাসকারীরা সাধারণত একে অপরের থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্নভাবে থাকে, যাতে তাদের ছাগলের পাল মিশে না যায়।

সাধারণ বাড়ি ছোট আকারের, যাকে বলা হয় পিচি বা মিচি। ঘর সাধারণত দুটি কক্ষে বিভক্ত থাকে, যেখানে দোলনা বা হামক ঝুলিয়ে ঘুমানো হয় এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখা হয়। যেমন অ্যাক্রিলিক ফাইবারের ব্যাগ বা মোচিলা এবং পানি রাখার জন্য সিরামিকের পাত্র

ওয়াইয়ু সংস্কৃতি বিখ্যাত তাদের তৈরি ওয়াইয়ু ব্যাগ বা মোচিলার জন্য। মোচিলার অনেক ধরন আছে। এর মধ্যে সুসু হলো একটি কাঁধে নেওয়ার ব্যাগ, যার প্রস্থ প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার ও উচ্চতা প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার, যা ব্যক্তিগত বা কাজের জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। এসব কাপড়ের নকশা, প্রকৃতি ও চারপাশের জিনিস থেকে অনুপ্রাণিত। কানাসু হলো ওয়াইয়ুদের পুরনো নকশা ও ডিজাইনের একটি সংগ্রহ।

বাসস্থানগুলো হয় আয়তাকার বা আধা-বৃত্তাকার। প্রধান বাড়ির কাছে থাকে লুমা বা এনরামাদা, যা একটি খোলা জায়গা। এটি ড্রয়িং রুমের মতো হলেও প্রায় পুরোটা খোলা থাকে। ছয়টি খুঁটির ওপর সমতল ছাদ দিয়ে তৈরি এই জায়গাটি, প্রতিদিনের কাজকর্ম, অতিথি আপ্যায়ন ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা দুপুরের বিশ্রামের জন্য এখানে হামক ঝুলিয়ে রাখেন।

ঐতিহ্যগতভাবে, বাড়ির দেয়াল তৈরি হয় ইয়োতোহোরো দিয়ে।[১৩] যা কাদা, খড় ও শুকনো বাঁশের মিশ্রণ। তবে এখন কিছু ওয়াইয়ু আধুনিক নির্মাণ পদ্ধতিতে সিমেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করছে। ছাদের কাঠ ও ইয়োতোহোরো তৈরির জন্য সবচেয়ে পছন্দের গাছ হলো ড্যাগার ক্যাকটাস (Stenocereus griseus), যাকে ওয়াইউরা ইওসু বলে। ‘ইয়োতোহোরো’ শব্দটি মূলত ইওসু ক্যাকটাসের ভেতরের বাঁশের মতো শক্ত অংশকে বোঝায়। এই গাছের আরও অনেক ব্যবহার আছে। এটি গরু-ছাগলের চারণভূমি ঘিরে বেড়া তৈরি করতে লাগানো হয়; এর কচি ডাল ছাগলের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়; আর এর ফল ইগুয়ারায়া পিতাহায়ার মতো দেখতে এবং ওয়াইউদের মধ্যে জনপ্রিয় খাদ্য। যেহেতু ইওসুর ফল ও কাঠের চাহিদা মৌসুমি, কিছু সময়ে ফল, নির্মাণ সামগ্রী এমনকি বেড়া বানানোর জন্য কাটিংও পাওয়া যায় না। ওয়াইয়ুরা যেন সারাবছরই ইওসু ফলাতে পারে তার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে, তাদের সাথে বিশেষ চাষ প্রযুক্তির পরিচয় করানো হচ্ছে।

ইওসুর সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় অন্যান্য গাছও নির্মাণে ব্যবহৃত হয়, যেমন ত্রুপিয়ো বা তুরপিও (Prosopis juliflora), জাত্তা (Haematoxylum brasiletto), কাপচিপ (Capparis zeylanica), এবং কায়ুশ (পেরুভিয়ান অ্যাপল ক্যাকটাস, Cereus repandus)।[১৩]

ওয়াইয়ুদের হাতে তৈরি ব্যাগ

সঙ্গীত ও নৃত্য

[সম্পাদনা]

ওয়াইয়ুদের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, তারা তাদের গবাদি পশুর জন্য গান গায়। এছাড়া বৈঠক, উৎসব, এমনকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে শোকের আচারেও সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়। লা ইয়োনা একটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, যা অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে পরিবেশিত হয়।

মেয়েদের শেখানো হয় একটি বিশেষ নৃত্য, যা মাজায়ুরা নামের একটি আচারিক অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ। এটি হলো “তরুণ ওয়াইয়ু কুমারী”র প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আচার। এই অনুষ্ঠানে একটি মেয়েকে সম্ভাব্য পাত্রদের সঙ্গে বেইলে দি কর্টেজো নামক নাচ নাচতে হয়। মাথা ঢেকে, কাপড়ের শাল ও পোশাক পরে, সে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাত প্রসারিত করে পাখির মতো ভঙ্গিতে নাচতে থাকে। গ্রামের লোকদের তৈরি একটি বৃত্তের ভেতরে। পুরুষ সঙ্গীটি তার সামনে পিছিয়ে পিছিয়ে নাচে, মাঝেমধ্যে কাছে এসে আবার সরে যায়, এবং এই ঘূর্ণনের মধ্যে শেষমেশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা ঐতিহ্যবাহী ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে তাল মিলিয়ে থাকে। যদি পাত্রটি তার গোত্রে সম্মানিত হয় এবং গ্রহণযোগ্য হয়, তবে তাকে কনের মা ও পুরুষ আত্মীয়দের পণ দিতে হয়। অতীতে এই পণ সাধারণত ছাগলভেড়া আকারে দেওয়া হতো, যা গোত্রের আর্থিক সহায়তায় ব্যবহৃত হতো।[১৪]

তাদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে রয়েছে কাশি, সাওয়াওয়া (এক ধরনের বাঁশি), মা’আসি, তোতোয়, তালিরাই (নলাকার বাঁশি), উওতোরোইওই (এক ধরনের ক্ল্যারিনেট) এবং আরও অনেক কিছু।

ওয়াইয়ুদের হস্তশিল্প

[সম্পাদনা]

ওয়াইয়ু নারীরা খুব অল্প বয়স থেকেই বুনন শেখে। ওয়াইয়ুরা ক্যারিব ও অ্যারাওয়াক জনগোষ্ঠীর বংশধর, যারা তাদের শক্তিশালী বুনন ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। তারা এই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে।

কথিত আছে, ওয়াইয়ুরা বুনন শিখেছিল ওয়ালেকেরু নামের এক পৌরাণিক মাকড়সার কাছ থেকে। এই মাকড়সা মুখ থেকে সুতা বের করে জাদুকরী সব জিনিস তৈরি করত। সে-ই ওয়াইয়ু নারীদের বুনন শেখায়। যেমন ঘুমানোর জন্য দোলনা বা হ্যামক, পুরুষদের জন্য বেল্ট, জুতো, ব্রেসলেট এবং বিভিন্ন আকার ও পদ্ধতিতে তৈরি ওয়াইয়ু ব্যাগ, যা নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতো। বর্তমানে এই দক্ষতা ওয়াইয়ু সম্প্রদায়ের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

আগে ওয়াইয়ু ব্যাগ এখনকার মতো উজ্জ্বল ও রঙিন ছিল না। লা গুআহিরা অঞ্চলে তখন তুলা উৎপাদন হতো, তাই ব্যাগ বানানো হতো প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে। এগুলো রঙ করা হতো গাছপালা ও আশেপাশের প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে, ফলে বাদামি, লাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক রঙ ধারণ করত।

আজ অনেকেই ভুল করে মনে করেন ওয়াইয়ু ব্যাগ তুলো দিয়ে তৈরি। আসলে, ওয়াইউ সম্প্রদায়ের সব ক্রোশে কাজ অ্যাক্রিলিক সুতা দিয়ে করা হয়, যেমন মিরাটেক্স কোম্পানির তৈরি উজ্জ্বল রঙের সুতা, যা প্রাকৃতিক তন্তুর মতো সহজে রঙ হারায় না।[১৫]

বুনন ও ক্রোশে তাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ, বিশেষ করে নারীদের জন্য। বর্তমান সময়ে প্রায় সব নারীই বুনন করে বা জীবনের কোন না কোন সময় করে থাকে। পুরুষেরাও এই শিল্পে যুক্ত, তারা ব্যাগের স্ট্র্যাপ তৈরি করে, উপকরণ জোগাড় করে এবং শহরে পণ্য পরিবহন করে। প্রতি বছর ওয়াইয়ুরা লক্ষ লক্ষ উচ্চমানের হস্তশিল্প পণ্য তৈরি করে। এই কারুশিল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, আর ওয়াইউরা সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাদের মোচিলা ওয়াইয়ু বা ওয়াইয়ু ব্যাগের জন্য।

আজ ওয়াইয়ু ব্যাগ পুরো কলম্বিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানিকৃত হস্তশিল্প। তবে ওয়াইয়ুরা একটি ব্যাপারে খুবই হতাশা বোধ করে। যারা এই হস্তশিল্পের কাজ করে তারা যোগ্য পারিশ্রমিকও পান না। বরংচ, বিদেশীরা তাদের কাজগুলো থেকে আরও বেশি মুনাফা অর্জন করে থাকে।[১৬]

মিডিয়াতে ওয়াইয়ুরা

[সম্পাদনা]
  • ১৯২১ সালের প্রামাণ্যচিত্র Blandt Syd-Amerikas urskovsindianere (দক্ষিণ আমেরিকার অনেক আগেকার আদিবাসী)-এ চিত্রিত জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ওয়াইয়ুরা অন্যতম।
  • পাখিদের ঋতু (Pájaros de verano, Birds of Passage, ২০১৯) চলচ্চিত্রটির পটভূমি ১৯৭০-এর দশকের গুআহিরা উপদ্বীপ ও ওয়ায়ু সমাজ। ক্রিস্টিনা গালেগোসিরো গুয়েরার পরিচালনায় এই ছবিতে অভিনয় করেছেন হোসে আকোস্তা ও কারমিনা মার্তিনেস। ছবিটিতে অনেক অনভিজ্ঞ ওয়াইয়ু অভিনেতাও অংশ নিয়েছেন এবং অধিকাংশ সংলাপ ওয়াইয়ু ভাষায়। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে উপজাতির কিছু সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে, এবং বিপুল অর্থ ও সহিংসতার কারণে তাদের ঐতিহ্যবাহী গোত্র সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে।
  • এছাড়া জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা জেন্স শান্সে-র লা বুয়েনা ভিডা (La Buena Vida) চলচ্চিত্রটি ওয়াইউ জনগোষ্ঠীর তামাকুইতো শহর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ নিয়ে। যেখানে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানি গ্লেনকোর ও তাদের কলম্বিয়ান শাখা এল সেরেখন কয়লা খনির জন্য ওয়াইয়ুদের জমি দখল করতে চায়।

বিখ্যাত ওয়াইয়ু

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  1. "XIV Censo Nacional de Población y Vivienda, 2011."। Instituto Nacional de Estadística (INE)। ২২ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯
  2. "Resultados del Censo Nacional de Población y Vividenda 2018" (পিডিএফ)। Dane Información para todos। ২৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০২০
  3. Heller, Melissa. (2016). Peru, Abancay & Hezbollah: The Party Of God In The City Where The Gods Speak. ICT. Pg.4.
  4. 1 2 3 (স্পেনীয় ভাষায়) Luis Angel Arango Library: The Guajira rebellion
  5. 1 2 3 4 Linder, Peter (১৯৯৪)। "Coerced Labor in Venezuela, 1880–1936"The Historian৫৭ (1): ৪৩–৫৮। আইএসএসএন 0018-2370জেস্টোর 24449161
  6. Landers, Jane; Gómez, Pablo; Acuña, José Polo; Campbell, Courtney J. (২০১৫), Kominko, Maja (সম্পাদক), "Researching the history of slavery in Colombia and Brazil through ecclesiastical and notarial archives", From Dust to Digital, Ten Years of the Endangered Archives Programme (1st সংস্করণ), Open Book Publishers, পৃ. ২৫৯–২৯২, আইএসবিএন ৯৭৮-১-৭৮৩৭৪-০৬২-৮, সংগ্রহের তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৪
  7. 1 2 Lombardi, John V (১৯৭৩)। The Decline and Abolition of Negro Slavery in Venezuela, 1820–1854। Westport, Connecticut: Greenwood Publishing Corporation।
  8. "Luis Angel Arango Library: The Capuchins mission and the Wayuu Culture" (স্পেনীয় ভাষায়)। ১৫ মে ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০০৮
  9. (স্পেনীয় ভাষায়) National Natural Parks of Colombia: National natural Park of Macuira/PAGE 13[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  10. "Colombia's resilient Wayuu resist global and local threats"। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১।
  11. "El Wayuunaiki impreso, Articulo Impreso Archivado"। ১৯ জুন ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  12. Saler, Benson (গ্রীষ্ম ২০০৫)। "Finding Wayú Religion"Historical Reflections / Réflexions Historiques৩১ (2): ২৬২–২৬৬।
  13. 1 2 Villalobos et al. (2007)
  14. Vílchez Faría, Jacqueline (২০০৩)। "Taliraai: Música, género y parentesco en la cultura wayúu" (স্পেনীয় ভাষায়)। Opción। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯
  15. Diana, Miller (২ মে ২০১৮)। "The Wayuu Artisan Industry" (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। Wayuu Market। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০১৮
  16. "Wayuu Bag: un negocio redondo a costa del patrimonio cultural"Las2orillas (স্পেনীয় ভাষায়)। ২৫ মার্চ ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০১৮

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • Villalobos, Soraya., Enao Luis G. and Mengual Misdalis. 2017. Use history of the fungus Podaxis pistillaris, Inonotus rickii and Phellorinia hercualeana (Basidiomycetes) by the Wayuu aboriginal peoples in the Colombian Alta Guajira. [Spanish with English abstract] Revista Mexicana de Etnobiologia 15: 64–73. PDF fulltext ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে
  • Villalobos, Soraya; Vargas, Orlando & Melo, Sandra 2007: Uso, manejo y conservacion de "yosú", Stenocereus griseus (Cactaceae) en la Alta Guajira colombiana [Usage, Management and Conservation of yosú, Stenocereus griseus (Cactaceae), in the Upper Guajira, Colombia]. [Spanish with English abstract] Acta Biológica Colombiana 12(1): 99–112. PDF fulltext

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]