এশিয়ায় বাহাই ধর্ম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বাহাই ধর্মবিশ্বাস উনবিংশ শতাব্দীতে ইরানে বাহাউল্লাহ প্রতিষ্ঠিত একটি বিচিত্রতর ও বিস্তৃত ধর্ম। বাহা সূত্রমতে বিশ্বব্যাপী বাহাই জনসংখ্যা ৫ মিলিয়নেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। [১] বেশিরভাগ এনসাইক্লোপিডিয়া এবং অনুরূপ উৎসগুলো ২১ শতকের গোড়ার দিকে বিশ্বে ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন বাহাই আছে বলে ধারণা করে।[২][৩] ধর্মটি পুরোপুরি একটি একক, সংগঠিত, শ্রেণিবদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে। তবে বাহাই জনসংখ্যা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এবং নৃগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং খ্রিস্টান ধর্মের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভৌগলিকভাবে বিস্তৃত ধর্ম হিসাবে স্বীকৃত।[২][৪] দেখুন বাহাই পরিসংখ্যান

আফগানিস্তান[সম্পাদনা]

১৮৮০-এর দশকে বাহাইদের পদচারণা দিয়ে আফগানিস্তানে বাহাই বিশ্বাস শুরু হয়েছিল। তবে ১৯৩০ এর দশক পর্যন্ত কোনও বাহাই সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেননি।[৫] ১৯৪৮ সালে কাবুলে প্রথমবারের মতো একটি বাহাই স্থানীয় আধ্যাত্মিক পরিষদ নির্বাচিত হয়েছিল[৬] এবং কয়েক বছর পরে ১৯৬৯ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়।[৭] যদিও জনসংখ্যা সম্ভবত হাজারে পৌঁছেছিল, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ এবং তালেবানদের কঠোর শাসনের অধীনে বাহাইরা কোনও প্রতিষ্ঠানে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে এবং অনেকে পালিয়ে যায়। ২০০৭ সালের একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুসারে, আফগানিস্তানে বাহাইদের সংখ্যা প্রায় ৪০০ জন।[৮] তবে অ্যাসোসিয়েশন অফ রিলিজিয়ন ডেটা আর্কাইভ অনুমান করেছে যে, ২০০৫ সালে আফগানিস্তানে প্রায় ১৫০০০ বাহাই ছিল।[৯]

বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে বাহাই ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে এর স্বাধীনতা লাভের বেশ কিছু আগে থেকে। সেসময় বাংলাদেশ ছিলো ব্রিটিশ ভারতের একটি অংশ। এ অঞ্চলে বাহাই ধর্মের বিস্তৃতি শুরু হয় ১৮৪৪ সালের দিকে। সেটি ছিলো বাবিবাদের শুরুর সময়কার পরিস্থিতি।[১০] বাহাউল্লাহর জীবদ্দশায়, ধর্মটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি তার কিছু অনুসারীকে ভারতে যাবার জন্য উৎসাহিত করেন।[১১] ধারণা করা হয়, তাদের মধ্যে জামাল এফেন্দি-ই হচ্ছেন প্রথম যিনি একাধিকবার ঢাকায় এসেছিলেন।[১২] বার্মায় থাকাকালীন সময়ে বর্তমান বাংলাদেশে অবস্থিত চট্টগ্রামের একটি গোষ্ঠী বাহাই ধর্মকে গ্রহণ করে।[১৩] ১৯৫০-এর দিকে এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, এবং তারা চট্টগ্রাম ও ঢাকায় লোকাল স্পিরিচুয়াল এসেম্বিলি গঠন করে।[১৪] ২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড ক্রিশ্চিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়ার এক জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে বাহাই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১০,০০০।[৯]

কম্বোডিয়া[সম্পাদনা]

বাহাই অনুসারী অধ্যুষিত এমন একটি অঞ্চলে বাট্টামবাংএর একটি চিহ্ন

কম্বোডিয়ায় বাহাই বিশ্বাসের প্রবর্তন হয় ১৯২০ সালে, ফ্রান্স ইন্দোচীনের পর কম্বোডিয়াকে বাহাই শিক্ষকদের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসাবে আবদুল-বাহা উল্লেখ করার পরবর্তীকালে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ জুড়ে ভ্রমণকারী শিক্ষকদের বিক্ষিপ্ত পরিদর্শন করার পরে, ভারত থেকে বাহাই শিক্ষকদের আগমনের মধ্য দিয়ে কম্বোডিয়ায় প্রথম বাহাই গোষ্ঠীটি ১৯৫৬ সালে নমপেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে খেমার রুজের শাসনকালে কম্বোডিয়ান বাহাইদের সাথে সমস্ত কার্যকর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। থাইল্যান্ডের কম্বোডিয়ান শরণার্থী শিবিরে কর্মরত বাহাই শিক্ষকদের প্রচেষ্টার ফলে খেমার রুজের চালানো গণহত্যা অভিযান থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের মধ্যে স্থানীয় আধ্যাত্মিক সম্মেলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল

জাপান[সম্পাদনা]

টোকিও বাহাই কেন্দ্র, সিনজুকু ওয়ার্ডের বাইরে লেখা সংকেত

আবদুল-বাহা দ্বারা ১৮৭৫ সালে প্রথমবার দেশটির কথা উল্লেখ করার পরে জাপানের সাথে বাহাই বিশ্বাসের প্রথম পরিচয় হয়।[১৫] ১৯০২ সালে কানিচি ইয়ামামোটো (山本寛一) হাওয়াইয়ের হুনুলুলুতে বাস করছিলেন বলে পশ্চিম থেকে আসা এই ধর্মের সাথে জাপানিদের যোগাযোগ হয়েছিল; এর সাথে দ্বিতীয় পরিচয়কারী ব্যক্তি ছিলেন সাইচিরো ফুজিটা (藤田左弌郎)

১৯১৪ সালে দুজন বাহাই, জর্জ জ্যাকব আগুর এবং অ্যাগনেস আলেকজান্ডার তাদের পরিবারসহ জাপানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে আলেকজান্ডারের শেষ বিদায়ের আগ পর্যন্ত প্রায় ৩১ বছর অবধি তিনি জাপানে বেঁচে ছিলেন। জাপানের মাটিতে ধর্মান্তরিত প্রথম বাহাই হলো কিকুতারো ফুকুতা (福田菊太郎), যিনি ১৯১৫ সালে বাহাই ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।[১৬] আবদুল বাহা ১৯১১-১৯১২ সালে বেশ কয়েকটি ভ্রমণ করেছিলেন এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর, প্যারিস,[১৭] লন্ডন,[১৮] এবং নিউইয়র্কের[১৯] জাপানি ভ্রমণকারীদের সাথে দেখা করেছিলেন। আবদুল বাহা শিকাগোতে ফুজিটার সাথে এবং সান ফ্রান্সিসকোতে ইয়ামামোটোর সাথেও দেখা করেছিলেন।[২০]

আবদুল বাহা ১৯১৬-১৯১৭ সালে ট্যাবলেটস অব দ্য ডিভাইন প্ল্যান শীর্ষক বইয়ের একসাথে একটি পত্রসংকলন বা ট্যাবলেট লিখেছিলেন, যা ১৯১৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থাপন করা হয়নি।[২১] ১৯৩৩ সালে প্রথম বাহাই আধ্যাত্মিক সংসদ টোকিওতে নির্বাচিত হয় এবং ১৯৩৩ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়। তখন পুরো জাপানে ১৯জন বাহাই সদস্য ছিল। [২২][২৩][২৪]

১৯৬৮ সালে জাপানি বাহাইগণই জাপানের বাইরে ভ্রমণ শুরু করে। ১৯৭১ সালে ওকিনাওয়া প্রথম স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বাহাই ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তারা জাপানের বাহাই স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি অনুমোদিত সংগঠন সংগঠিত করে যা এর পর থেকে নিয়মিত বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করে,[২৫] সংবাদপত্র প্রকাশ করে এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কাজ সমন্বিত করে আসছে।[২৬] রিলিজিয়ন ডেটা আর্কাইভ অ্যাসোসিয়েশন (ওয়ার্ল্ড খ্রিস্টান এনসাইক্লোপিডিয়ার উপর নির্ভর করে) ২০০৫ সালে জাপানে প্রায় ১৫,৬৫০ জন বাহাই আছে বলে অনুমান করেছিল[৯] এবং সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ২০০৬ সালে প্রায় ১২০০০ জাপানি বাহাই আছে অনুমান করেছিল।[২৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Baháʼí International Community (২০০৬)। "Worldwide Community"। Baháʼí International Community। ১৩ জুন ২০০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩১ মে ২০০৬ 
  2. Encyclopædia Britannica (২০০২)। "Worldwide Adherents of All Religions by Six Continental Areas, Mid-2002"। Encyclopædia Britannica। Encyclopædia Britannica। 
  3. adherents.com (২০০২)। "Major Religions of the World Ranked by Number of Adherents"। adherents.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ আগস্ট ২০০৫ 
  4. MacEoin, Denis (২০০০)। "Baha'i Faith"। Hinnells, John R.। The New Penguin Handbook of Living Religions: Second EditionPenguinআইএসবিএন 0-14-051480-5 
  5. Hassall, Graham। "Notes on Research Countries"Research notes। Asia Pacific Bahá'í Studies। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুলাই ২০০৯ 
  6. Cameron, G.; Momen, W. (১৯৯৬)। A Basic Bahá'í Chronology। Oxford, UK: George Ronald। পৃষ্ঠা 277, 391। আইএসবিএন 0-85398-404-2 
  7. "Bahá'í Faith in Afghanistan"। ১৬ জুলাই ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০০৭ 
  8. U.S. State Department। "Afghanistan – International Religious Freedom Report 2007"। The Office of Electronic Information, Bureau of Public Affairs। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুলাই ২০০৯ 
  9. "Most Baha'i Nations (2005)"QuickLists > Compare Nations > Religions >। The Association of Religion Data Archives। ২০০৫। ২০১০-০৪-১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৭-০৪  উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ অবৈধ; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "WCE-05" নাম একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  10. "The Bahá'í Faith -Brief History"Official Website of the National Spiritual Assembly of India। National Spiritual Assembly of the Bahá'ís of India। ২০০৩। ২০০৯-০৪-১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-০৪ 
  11. Momen, Moojan। "Bahá'í History"Draft A Short Encyclopedia of the Baha'i Faith। Bahá'í Library Online। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-০৪  অজানা প্যারামিটার |coauthors= উপেক্ষা করা হয়েছে (|author= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য)
  12. Momen, Moojan (২০০০)। "Jamál Effendi and the early spread of the Bahá'í Faith in Asia"Baha'i Studies Review। Association for Baha'i Studies (English-Speaking Europe)। 09 (1999/2000)। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-০৪. 
  13. Ali, Meer Mobeshsher। "Bahai"Banglapedia: Entry Title Index। Online। Asiatic Society of Bangladesh। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-০৪ 
  14. Compiled by Hands of the Cause Residing in the Holy Land। "The Bahá'í Faith: 1844-1963: Information Statistical and Comparative, Including the Achievements of the Ten Year International Bahá'í Teaching & Consolidation Plan 1953-1963"। পৃষ্ঠা 51, 107। 
  15. `Abdu'l-Bahá (১৯৯০) [1875], The Secret of Divine Civilization, Wilmette, Illinois, USA: Bahá'í Publishing Trust, পৃষ্ঠা 111, আইএসবিএন 0-87743-008-X 
  16. Alexander 1977, পৃ. 12–4, 21।
  17. Lady Blomfield (১৯৬৭) [1940], The Chosen Highway, Wilmette, Illinois, USA: Bahá'í Publishing Trust, পৃষ্ঠা 229, আইএসবিএন 978-0-85398-509-9 
  18. Sims 1989, পৃ. 24।
  19. Alexander 1977, পৃ. 4–5।
  20. Sims 1989, পৃ. 1–2।
  21. `Abdu'l-Bahá (১৯৯১) [1916-17], Tablets of the Divine Plan (Paperback সংস্করণ), Wilmette, Illinois, USA: Bahá'í Publishing Trust, পৃষ্ঠা 43, আইএসবিএন 0-87743-233-3 
  22. Sims 1989
  23. Sims 1989, পৃ. 20।
  24. Sims 1989, পৃ. 64।
  25. "Annual Conferences"Official Webpage of the Japanese affiliate of the Association of Bahá'í Studies। Japanese affiliate of the Association of Bahá'í Studies। ২০০৮। ৪ মার্চ ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০০৮ 
  26. Yerrinbool Report on Scholarship 1999 Affiliate Associations for Bahá'í Studies-Japan
  27. "Japan Profile"About Asia। Overseas Missionary Fellowship International। ২০০৬। ২০ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৮