এবনে গোলাম সামাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
এবনে গোলাম সামাদ
Abney Golam Samad by porag.jpg
এবনে গোলাম সামাদ ২০১৬
জন্ম(১৯২৯-১২-২৯)২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯
মৃত্যু১৫ আগস্ট ২০২১(2021-08-15) (বয়স ৯১)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ[১]
জাতীয়তাবাংলাদেশী
শিক্ষাশিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর
রাজশাহী কলেজ
তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট
পেশাশিক্ষকতা, লেখক
কর্মজীবন১৯৬৫
নিয়োগকারীরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
পরিচিতির কারণলেখক ও কলামিস্ট
পিতা-মাতা
  • মো: ইয়াসিন (পিতা)
  • নছিরন নেসা (মাতা)
স্বাক্ষর
Abney Golam Samad Signature.svg

এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর, ১৯২৯ - ১৫ আগস্ট ২০২১) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক এবং কলামিস্ট।[১] তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক ছিলেন।[২]

শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

১৯৪৮ সালে শিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর থেকে বি. কোর্স পাশ করেন যা তখনকার মাধ্যমিকের সমমান পাশ ছিলো। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৪৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন এবং তেঁজগাও কৃষি ইনিস্টিটিউট থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করার পরে উদ্ভিদ রোগতত্ত্বের ওপরে গবেষণা করতে বিলেতে পাড়ি জমান। ফ্রান্সে প্ল্যান্ট ভাইরাস এর ওপরে ৪ বছর গবেষণা করে পুয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।[৩][৪]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯৬৩ সালে দেশে ফিরে ১১ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় চলে যান। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরে আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। অধ্যাপনা থেকে এবনে গোলাম সামাদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে অবসর নেন।[৪]

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

এবনে গোলাম সামাদ এর পিতা মো: ইয়াসিন একজন স্টেশন মাষ্টার ছিলেন। তার মাতার নাম নছিরন নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৪ ছেলে এবং ২ মেয়ের জনক।[৩]

লেখালিখি[সম্পাদনা]

ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। এর সৃষ্টি হতে পেরেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে এক বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে। এতে ছিল তদানীন্তন বাংলার মুসলিম জনসমাজের বিশেষ অবদান। দ্বিজাতিতত্ত্বের, অর্থাৎ হিন্দুরা হলেন একটি জাতি আর মুসলমানেরা হলেন আরেকটি জাতি’; এই ধারণার উদ্ভব হয় ব্রিটিশ শাসনামলের সময়। এর সাথে ছিল না প্যান ইসলামিক মতবাদের (নিখিল মুসলিম ভ্রাতৃত্ববাদের) প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল এই উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যেই বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এতে একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল ইসলাম ধর্ম। তবে ধর্মই এর একমাত্র উপাদান ছিল না। গ্রেট ব্রিটেনের বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী হারবার্ট হেনরি অ্যাসকুইথ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউজ অব কমন্সে ১৯০৯ সালে বলেন, ভারতে হিন্দু-মুসলমান পার্থক্য শুধু ধর্মের পার্থক্য নয়। ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিনীতির দিক দিয়েও তারা স্বতন্ত্র।’ ভারতে হিন্দু-মুসলমান সমস্যাকে কেবল ধর্মীয় বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভুল করা হয়। ১৯০৯ সালে মর্লি-মিন্টো শাসন সংস্কারে ভারতের মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এবং মুসলমানদের প্রদান করা হয় স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচনের রাজনৈতিক অধিকার। মর্লি-মিন্টোর সংস্কারে মুসলমানদের দেয়া হয়েছিল সংখ্যাতিরিক্ত আসন। এই নীতি অনুসারে তদানীন্তন বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীতে মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার ছিল। অধিকন্তু বাংলার পাঁচটি বিশেষ মুসলিম আসন নির্দিষ্ট হয়েছিল স্বতন্ত্র নির্বাচনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ দেয়া হয়েছিল এ পাঁচটি আসনে কেবল মুসলমান ভোটের মাধ্যমে কেবল মুসলিম সদস্যদের নির্বাচনের অধিকার। ”

— এবনে গোলাম সামাদ

তিনি কলাম লেখক হিসেবে বাংলাদেশে সমধিক পরিচিত। তার প্রায় ১০০ গবেষণা প্রবন্ধ ও প্রায় ১৫টি গ্রন্থ দেশ-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে।[৩][৫] তিনি মূলত রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে বেশি লিখতেন।[৬] ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে অনেকদিন কাজ করেছেন।

তার লেখায় মুক্তচিন্তার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এক স্থানে তিনি লিখেছেন: “ইংরেজি ভাষা এখন কার্যত হয়ে উঠেছে বিশ্বের প্রধান ভাষা। কিন্তু ইংরেজি ভাষার কোনো ‘একাডেমি’ নেই। ভাষাটা গড়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে নয়। কিন্তু আমরা গড়েছি বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার উন্নতির লক্ষ্যে। বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।”

তার ইতিহাস জ্ঞান পাঠকের জন্য একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা: “অনেকেরই জানা নেই যে, ভারতের জাতীয় সঙ্গীত একটি নয়, দুইটি। একটি হলো রবীন্দ্রনাথ রচিত ও সুরারোপিত গান ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’, আরেকটি হলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত গান ‘বন্দেমাতরম’। বন্দেমাতরম গানটি ২৬ পঙতির; এর মধ্যে বিশ ছত্র সংস্কৃত ভাষায় রচিত আর কেবল মাত্র ছয় ছত্র বাংলা ভাষার। গানটি আছে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস আনন্দমঠ-এ। গানটিতে দেশমাতৃকাকে তুলনা করা হয়েছে ‘মা দুর্গা’র সাথে। বলা হয়েছে, ‘ত্বংহি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী’। গানটিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোনো সুর দেননি। রবীন্দ্রনাথ এ গানটির প্রথম স্তবকে সুর প্রদান করে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে নিজে গেয়ে শোনান। সেই থেকে গানটির প্রথম স্তবক তার দেয়া সুরেই গীত হচ্ছে। ভারতের সংবিধান রচনা পরিষদের সভায় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ২৪ জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ ও রবীন্দ্রনাথের সুর দেয়া বন্দেমাতরম গানের প্রথম স্তবককে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ভুক্ত।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আত্মজীবনী রচনা সম্পর্কে তার মন্তব্য: “শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ মনে হয়েছে একটি বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এতে ধরা পড়েছে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন। এখন আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে থাকা বাম বুদ্ধিজীবীরা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে, পাকিস্তান আন্দোলনটা ছিল একটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। কিন্তু শেখ মুজিব তার জীবনীতে বলেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। তিনি তার আত্মজীবনীর এক জায়গায় বলেছেন, ‘তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে। সভা করি বক্তৃতা করি। খেলার দিকে আর নজর নাই। শুধু মুসলিম লীগ, আর ছাত্রলীগ — পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নাই।’ — আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, শেখ মুজিব ছিলেন খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু শেখ মুজিব তার জীবনীতে বলেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো, আমরা মুসলমান, আরেকটা হলো, আমরা বাঙালি।’ অর্থাৎ শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল একটি মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ; যেমন ছিল বাঙালিত্ব।”[৪]

বই[সম্পাদনা]

উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র হয়েও শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লিখেছিলেন, যা ৭০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। কলাম লেখা ছাড়াও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসভিত্তিক পাঠ্যতালিকা এবং পাঠ্যতালিকার বাইরে বেশ কিছু বই রয়েছে তার। তার প্রকাশিত কিছু বই এর নাম এবং প্রকাশকের নাম উল্লেখ করা হলো:[৪]

  • বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি; প্রকাশক: পরিলেখ প্রকাশনী (পিডিএফ)
  • আত্মপক্ষ; প্রকাশক: আবিষ্কার পাবলিকেশন
  • আত্মপরিচয়ের সন্ধানে; প্রকাশক: পরিলেখ প্রকাশনী
  • বাংলাদেশ : সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া; প্রকাশক: পরিলেখ প্রকাশনী
  • মানুষ ও তার শিল্পকলা; প্রকাশক: ম্যাগনাম ওপাস
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ; প্রকাশক: অনন্যা
  • প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব; প্রকাশক: অনন্যা
  • বায়ান্ন থেকে একাত্তর, প্রকাশক : পরিলেখ প্রকাশনী (২০১৭)
  • আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা এবং আরাকান সংকট, প্রকাশক : পরিলেখ প্রকাশনী (২০১৮) (পিডিএফ)
  • ইসলামী শিল্পকলা, বাংলা একাডেমি (১৯৭৮)
  • শিল্পকলার ইতিকথা, সমকাল প্রকাশনী (১৯৬০)
  • বাংলাদেশে ইসলাম
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ
  • বর্তমান বিশ্ব ও মার্কসবাদ
  • বাংলাদেশের মানুষ ও ঐতিহ্য
  • উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব, বাংলা একাডেমি
  • জীবাণুতত্ত্ব, বাংলা একাডেমি
  • উদ্ভিদ সমীক্ষা
  • নৃতত্ত্ব, বাংলা একাডেমি (১৯৬৭)

মৃত্যু[সম্পাদনা]

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন থেকেই তিনি বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।[১][৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদ আর নেই"। দৈনিক ইনকিলাব। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০২১ 
  2. "বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবনে গোলাম সামাদ আর নেই"এনটিভি। ১৫ আগস্ট ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২১ 
  3. "অধ্যাপক ড. এবনে গোলাম সামাদ আর নেই"। banglanews24। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০২১ 
  4. "এবনে সামাদ"রকমারি। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০২১ 
  5. "এবনে গোলাম সামাদের দৃষ্টিতে আমাদের চিত্রকলা"দৈনিক নয়া দিগন্ত। সংগ্রহের তারিখ ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  6. "এবনে গোলাম সামাদ"নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট। ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  7. "এবনে গোলাম সামাদ আর নেই"। জাগো নিউজ। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০২১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]