বিষয়বস্তুতে চলুন

এনায়েতপুর থানায় হামলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলা-এর ঘটনাটি ঘটে। ২০২৪ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানায় আক্রমণ চালিয়ে ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এদের বেশিরভাগই আক্রমণের ফলে আত্মসমর্পণ অথবা আশেপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।[][][] এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।[]

প্রেক্ষাপট

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে জনঅসন্তোষ এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থির এক সময়ে এনায়েতপুর থানায় হামলার ঘটনা ঘটে।[] সেইদিনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করা হয়। ফলে সারা দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আন্দোলনকারীরা মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে।[] প্রায় ২৬টি থানায় সংঘবদ্ধ হামলার সম্পর্কে জানা যায়।[][] কিন্তু এনায়েতপুর থানায় হামলার ঘটনা পুলিশের উপর হামলার যেকোনো ঘটনার যেয়ে ভয়াবহ রূপ লাভ করে।[] পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী নিচের থানাগুলোতে হামলা চালানো হয়:[]

পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।[]

আক্রমণ

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ পুলিশের সূত্রমতে, ৪ আগস্ট বিকালে অজ্ঞাতনামা একদল বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় আক্রমণ করে।[] থানায় আক্রমণ করে ভাঙচুর করে এবং ভবনের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়।[] থানায় দায়িত্বরত ১৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।[] এর মধ্যে আটটি মরদেহের শরীরের পোষাক ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং পার্শ্ববর্তী মসজিদের সামনে স্তূপ করে রাখা হয়।[] কিছু মরদেহ থানার পাশের পুকুরে নিক্ষেপ করা হয় এবং একটি মরদেহকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।[] থানায় হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।[] আক্রমণকারীরা খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজের দিক থেকে আসছিলেন এবং তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীছাত্রশিবিরের কর্মীরা ছিল বলে পরবর্তীতে জানা যায়।[] প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আক্রমণকারীরা স্থানীয় এবং তাদের বয়স ২২ বছরের আশেপাশে ছিল।[]

এনায়েতপুর থানায় হামলার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ জেলায় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে ২৭ জনের প্রাণহানী ঘটে। এর মধ্যে রায়গঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আক্রমণে ছয়জন নিহত হন।[] পরবর্তীতে আরও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর বাসভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলে সেখান থেকে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।[]

পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এনায়েতপুর থানায় হামলার ঘটনায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহতের পাশাপাশি দেশব্যাপী সহিংসতায় ৩০০-এর অধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।[]

প্রতিক্রিয়া

[সম্পাদনা]

কর্তৃপক্ষ এই হামলার ঘটনাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে এর নিন্দা জানায়।[] দেশব্যাপী জননিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারে তদন্ত শুরু করা হয়।[] সরকার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও নিহতদের পরিবারের পক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা জানায়।[] তবে ঘটনার পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করেন।[] ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।[]

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, জুলাই–আগস্ট মাসের আন্দোলনে ৪৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।[] তন্মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানায় সবচেয়ে বেশি ১৫ জন নিহত হন।[] এছাড়া যাত্রাবাড়ী থানায় আটজন এবং উত্তরা থানায় পাঁচজন নিহত হন।[] পুলিশ সদরদপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।[] একইসাথে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অপতথ্য না ছড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে যাচাই করার জন্য বলা হয়।[]

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার কৃতিত্ব দাবি করে বলেন যে, সরকারের পতনে এই হত্যাকাণ্ড প্রয়োজনীয় ছিল।[১০] তিনি এই ঘটনাকে “পুলিশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত” করা হয়েছে বলে দাবি করেন।[১০]

পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত এক মামলায় সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবং সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাসকে আটক করা হয়।[১১] ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় সিরাজগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশের উপপরিদর্শক আব্দুল মালেক জানান।[১১][১২] ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল এই ঘটনায় আরেকজন আওয়ামী লীগের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।[১২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 "How Bangladeshi Protesters Beat to Death Policemen Who Sought to Surrender"দ্য গার্ডিয়ান শ্রীলঙ্কা (ইংরেজি ভাষায়)। শ্রীলঙ্কা: দ্য গার্ডিয়ান। ৬ আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  2. "13 cops killed in attack on police station"দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ৪ আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  3. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 "13 policemen beaten to death in attack on police station in Sirajganj"ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  4. "Sheikh Hasina forced to resign: What happened and what's next?"আল জাজিরা (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  5. "Attacks on 26 police establishments including 19 police stations"বিডিনিউজ২৪.কম (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  6. 1 2 3 4 5 "Witnesses describe the killing of 13 policemen in Sirajganj, hanging of body"বিডিনিউজ২৪.কম (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  7. "Bangladesh: Prime Minister Hasina Resigns amid Mass Protests"হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  8. হাসনাত, সাইফ; ওয়ালিদ, শায়েজা; দাস, অনুপ্রীতা (৬ আগস্ট ২০২৪)। "Nobel Laureate Tapped to Lead Interim Government in Bangladesh"দ্য নিউইয়র্ক টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  9. 1 2 3 4 5 "44 policemen killed during student movement, highest in Sirajganj: CA Press Wing"দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (ইংরেজি ভাষায়)। ২৫ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  10. 1 2 "BNP leader admits killing 15 policemen to topple state authority in Bangladesh"বর্ডার লেন্স (ইংরেজি ভাষায়)। পার্বত্য চট্টগ্রাম। ১৩ জানুয়ারি ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  11. 1 2 "Ex-minister Abdul Latif sent to jail over Enayetpur police killings"ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫
  12. 1 2 "সিরাজগঞ্জে থানায় হামলা-অগ্নিসংযোগের মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার"প্রথম আলো। ২ এপ্রিল ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৫