বিষয়বস্তুতে চলুন

এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন
উসমানীয় পোশাকে লেন, রিচার্ড জেমস লেন নির্মিত প্লাস্টার ভাস্কর্যে
জন্ম(১৮০১-০৯-১৭)১৭ সেপ্টেম্বর ১৮০১
হেরেফোর্ড, ইংল্যান্ড
মৃত্যু১০ আগস্ট ১৮৭৬(1876-08-10) (বয়স ৭৪)
জাতীয়তাব্রিটিশ
পরিচিতির কারণআরবি-ইংরেজি অভিধান
বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন
কর্মক্ষেত্রপ্রাচ্যবিদ্যা

এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন (১৭ সেপ্টেম্বর ১৮০১ – ১০ আগস্ট ১৮৭৬) ছিলেন একজন ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ, অনুবাদক এবং অভিধান প্রণেতা। তিনি Manners and Customs of the Modern Egyptians, আরবি-ইংরেজি অভিধান, সহস্র এক রজনী-র অনুবাদ এবং কুরআন থেকে নির্বাচিত অংশ অনুবাদের জন্য পরিচিত।[]

জীবদ্দশায়, লেন মিশর ও দেশটির প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে একটি বিশদ বিবরণ লেখেন। তবে এই গ্রন্থ Description of Egypt শিরোনামে মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এটি প্রথম প্রকাশ করে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো প্রেস ২০০০ সালে এবং এরপর কয়েকবার পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে।[]

প্রারম্ভিক জীবন

[সম্পাদনা]

লেন ইংল্যান্ডের হেরেফোর্ড শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রেভারেন্ড ড. থিওফিলাস লেনের তৃতীয় পুত্র এবং মাতৃপক্ষ থেকে চিত্রশিল্পী থমাস গেইনসবরো-এর প্রপৌত্র।[] ১৮১৪ সালে তার পিতার মৃত্যুর পর লেনকে পাঠানো হয় ব্যাথ শহরের ব্যাকরণ স্কুলে এবং পরে হেরেফোর্ডে[] সেখানে তিনি গণিতে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। তিনি ক্যামব্রিজ ভ্রমণ করেন, তবে কোনো কলেজে ভর্তি হননি।[]

এর পরিবর্তে, লেন লন্ডনে তার ভাই রিচার্ডের সঙ্গে থাকতেন এবং তাঁর সঙ্গে খোদাই বিদ্যা (এনগ্রেভিং) শেখা শুরু করেন। একইসঙ্গে, তিনি স্বশিক্ষায় আরবি ভাষা শেখা শুরু করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে স্বাস্থ্যোন্নতি এবং নতুন একটি পেশার উদ্দেশ্যে তিনি মিশরের উদ্দেশে যাত্রা করেন।[]

মিশর ভ্রমণ

[সম্পাদনা]

লেনের মিশর ভ্রমণের কয়েকটি কারণ ছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আরবি ভাষা অধ্যয়ন করছিলেন। বেলজোনির প্রদর্শনী এবং ভিভঁ দেনো-র Travels in Upper and Lower Egypt during the campaigns of General Bonaparte in that country (১৮০৩) প্রকাশের কারণে ইংল্যান্ডে মিশর-মুগ্ধতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে, লন্ডনে বসবাসের সময় লেনের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং তিনি অনুভব করেন যে শীতকালে উষ্ণ আবহাওয়াযুক্ত অঞ্চলে বসবাস তার পক্ষে উপকারী হবে। তৎকালীন সময়ে আরবি ভাষায় পারদর্শী এবং নিম্ন প্রাচ্যের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেতেন। এসব কারণেই লেন ১৮ জুলাই ১৮২৫ সালে মিশরের উদ্দেশে যাত্রা করেন।[]

লেন ১৮২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আলেকজান্দ্রিয়া পৌঁছান এবং সেখান থেকে দ্রুত কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি আড়াই বছর মিশরে ছিলেন। এ সময় তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিশে যান, তৎকালীন উসমানীয় প্রভাবের কারণে তুর্কি পোশাক পরিধান করতেন এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ সংরক্ষণ করতেন। পুরাতন কায়রোতে তিনি বাব আল-হাদিদের কাছে বাস করতেন এবং শেখ মুহাম্মদ আইয়াদ আল-তানতাওয়ি (১৮১০–১৮৬১)-এর কাছ থেকে আরবি শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এই শিক্ষককে সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়ায় পড়াতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।[]

লেন মিশরে থাকাকালীন কফিশপ, স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি, মসজিদ পরিদর্শন করেন এবং ইসলাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। তিনি একই সময়ে কায়রোতে বসবাসরত অপর ব্রিটিশ পর্যটক জন গার্ডনার উইলকিনসন-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। পরে তিনি নাইল নদী ধরে নুবিয়া সফর করেন এবং বহু প্রাচীন স্থান পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ নোট করেন।[] এ সফরে তিনি অ্যাবিডস, দেন্ডেরা, লাক্সর, কম ওম্বো, ফিলাই, আবু সিম্বেল সহ বহু প্রাচীন স্থান পরিদর্শন করেন।[১০] তিনি ৭ এপ্রিল ১৮২৮ সালে মিশর ত্যাগ করেন।[১১]

Description of Egypt

[সম্পাদনা]

লেনের প্রাচীন মিশরের প্রতি আগ্রহ সম্ভবত জিওভান্নি বাতিস্তা বেলজোনির উপস্থাপন দেখে উদ্দীপ্ত হয়েছিল।[১২] তিনি মিশরের প্রাচীন নিদর্শনগুলির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করার লক্ষ্য নিয়ে Description of Egypt গ্রন্থের পরিকল্পনা করেন। লন্ডনের প্রকাশক জন মারি প্রাথমিকভাবে প্রকাশনার আগ্রহ দেখালেও পরে সরে দাঁড়ান। কারণ বইটিতে বিশদ বিবরণ, প্রচুর চিত্র এবং আরবি, প্রাচীন মিশরীয় (হায়ারোগ্লিফিক) ও প্রাচীন গ্রিক ভাষার পাঠ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ছাপার খরচ বাড়াত। তৎকালীন সময়ে বড় মাপের প্রকাশনা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল এবং লেন তখনও খ্যাতনামা লেখক ছিলেন না। অর্থনৈতিক কারণে তিনি বইটি নিজে প্রকাশ করতে পারেননি এবং এটি অপ্রকাশিতই থেকে যায়। অবশেষে ২০০০ সালে এটি প্রকাশিত হয়।[১৩]

লেনের আঁকা রামেসিয়াম-এর চিত্র

Description of Egypt-এ লেন মিশরের বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা ও ইতিহাস প্রদান করেন। তিনি নগরভূগোলবিদ হিসেবে ছিলেন একনিষ্ঠ, যার প্রমাণ তার কায়রো নিয়ে লেখা পাঁচটি অধ্যায়। এতে শহরের প্রবেশদৃশ্য, পুরাতন কায়রোর বিবরণ, বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ, আশেপাশের প্রকৃতি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।[১৪] তিনি গ্রামীণ অঞ্চল সম্পর্কেও লেখেন।[১৫]

লেন মিশরের প্রাকৃতিক দৃশ্য, মরুভূমি, নাইল নদী ও তার গঠন, কৃষিকাজ এবং আবহাওয়া সম্পর্কেও আলোচনা করেন।[১৬] একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় মুহাম্মদ আলি পاشা-র উপর ভিত্তি করে মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা।[১৭]

এ গ্রন্থটি মূলত প্রাচীন মিশর নিয়ে কেন্দ্রিত, এবং মিশরতাত্ত্বিক রীতির অনুসরণ করে লেখা। সংযোজিত অংশ On the Ancient Egyptians-এ লেন মিশরীয়দের উৎস ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সভ্যতার সূচনা, হায়ারোগ্লিফিক, প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম ও আইন, পুরোহিত শ্রেণি, রাজতন্ত্র, জাতিভেদ, সামাজিক রীতি, ধর্মীয় স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কৃষি ও বাণিজ্য বিষয়ে আলোচনা করেন।[১৮] বন্ধু হ্যারিয়েট মার্টিনো-কে লেখা এক চিঠিতে লেন উল্লেখ করেন যে, তিনি প্রাচীন মিশরের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট ছিলেন যে বিষয়টি তার কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিত। আট বছর ধরে তিনি ইচ্ছা করেও প্রাচীন মিশর নিয়ে কোনো বই পড়েননি।[১৯]

লেন গিজার পিরামিড চত্বরে ৩২ দিন অবস্থান করেন এবং অঙ্কন, চিত্রায়ন ও নোট গ্রহণ করেন।[২০] তিনি উল্লেখ করেন, সেখানে শ্রমিকরা গ্রেট স্ফিংক্স অব গিজা থেকে পাথর সরিয়ে নিয়ে আধুনিক ভবন নির্মাণে ব্যবহার করছিলেন।[২১] তিনি রাজার উপত্যকায় ১৫ দিন ছিলেন এবং রামেসেস X-এর সমাধিতে রাত্রিযাপন করেন। প্রতিটি সমাধির বিস্তারিত বিবরণ দেন এবং মন্তব্য করেন যে উপত্যকায় এখনো গোপন সমাধি থাকতে পারে।[২২]

এই গ্রন্থে মোট ১৬০টি চিত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।[২৩]

Manners and Customs of the Modern Egyptians

[সম্পাদনা]
লেনের চিত্রাঙ্কন: মিশরের মধ্য ও উচ্চ শ্রেণির পোষাক (১৮৩৬)

Description of Egypt গ্রন্থটি প্রকাশে ব্যর্থ হওয়ার পর, প্রকাশক জন মারির পরামর্শে লেন মূল গ্রন্থের একটি অধ্যায় প্রসারিত করে একটি স্বতন্ত্র বই তৈরি করেন। এর ফলাফল ছিল Manners and Customs of the Modern Egyptians (১৮৩৬), যা প্রকাশ করে Society for the Diffusion of Useful Knowledge। এই গ্রন্থ আংশিকভাবে আলেকজান্ডার রাসেল-এর The Natural History of Aleppo (১৭৫৬) অবলম্বনে রচিত।[২৪] বইটি প্রকাশের আগে, ১৮৩৩ সালে লেন আবার মিশর ভ্রমণ করেন অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে।[২৫] গ্রন্থটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে (এখনো মুদ্রিত হয়) এবং লেনকে প্রাচ্যবিদ্যার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়।

লেন উনিশ শতকের মিশরে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন, যা পরবর্তী গবেষকদের জন্য অমূল্য উৎস হয়ে ওঠে। আর্থার জন আরবেরি এক শতাব্দী পর মিশর ভ্রমণ করে বলেন, লেন যেসব বিষয় লিখেছিলেন, তার কিছুই তখন আর দেখা যায় না—যেন এক ভিন্ন গ্রহে প্রবেশ করেছেন।[২৬]

লেন নিজেও বুঝতেন, লিঙ্গ বিভাজনের কারণে মিশরীয় নারীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না—যা তার পাঠকদের জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয় ছিল। তিনি লিখেছেন:

মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির অনেক স্বামী তাঁদের হেরেমের বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন, যদি তারা দেখে যে শ্রোতা তাদের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত; তবে অবশ্যই কোনো দোভাষীর মাধ্যমে নয়।[২৭]

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে তিনি তার বোন সোফিয়া লেন পুল-কে মিশরে আমন্ত্রণ জানান। তিনি নারীদের জন্য নির্ধারিত স্থান যেমন হেরেম ও স্নানাগার পরিদর্শন করে সেসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।[]

এর ফল ছিল The Englishwoman in Egypt: Letters from Cairo, written during a residence there in 1842, 3 & 4, with E.W. Lane Esq., Author of "The Modern Egyptians" By His Sister। (গ্রন্থটিতে লেখকের নাম হিসেবে সোফিয়ার নাম নেই।) এই বইয়ের বেশিরভাগ অংশই লেনের অপ্রকাশিত লেখার সম্পাদিত রূপ, যেখানে "আমার ভাই" শব্দটি যুক্ত করে পাঠ্যটিকে সোফিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে।[২৮] তবে এতে সোফিয়ার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, বিশেষ করে নারীদের অভ্যন্তরীণ জগৎ যা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।

The One Thousand and One Nights

[সম্পাদনা]

লেনের পরবর্তী বড় কাজ ছিল সহস্র এক রজনী অনুবাদ। এটি প্রথমে মাসিক ধারাবাহিক হিসেবে ১৮৩৮ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৮৪০ সালে তিন খণ্ডে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৫৯ সালে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক সংস্করণের বিশদ টীকাসমূহ পরবর্তীকালে ১৮৮৩ সালে তার প্রপৌত্র স্ট্যানলি লেন-পুল Arabian Society in the Middle Ages শিরোনামে আলাদাভাবে প্রকাশ করেন।[২৯]

লেনের অনুবাদটি সংযমিত এবং চিত্রাঙ্কন করেন উইলিয়াম হার্ভে

লেনের অনুবাদের মান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। স্ট্যানলি লেন-পুল মন্তব্য করেন, “লেনের অনুবাদ অন্য যেকোনো ইংরেজি সংস্করণের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং মূলের চেতনা ও ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”[৩০] তবে গবেষক রবার্ট আরউইন বলেন, “লেনের ভাষা গুরুগম্ভীর ও বাইবেলিক ঢঙে রচিত... বাক্য গঠন অপ্রয়োজনীয়ভাবে উল্টে যায়... কখনো উঁচু সুরে আবার কখনো অতি আক্ষরিক এবং নিরুত্তাপ হয়ে পড়ে... এতে ল্যাটিন ঘরানার শব্দও ভরপুর।”[৩১]

লেন নিজেই সহস্র এক রজনী গ্রন্থটিকে শিক্ষনীয় মনে করতেন। তিনি Manners and Customs গ্রন্থের ভূমিকায় লেখেন:

একটি গ্রন্থ আছে, যা আরবদের এবং বিশেষ করে মিশরীয়দের আচার-আচরণের অনন্য ছবি তুলে ধরে। এটি হচ্ছে 'The Thousand and One Nights; or, Arabian Nights' Entertainments'। যদি ইংরেজ পাঠকদের কাছে এর একটি নির্ভুল অনুবাদ ও পর্যাপ্ত টীকার সঙ্গে উপস্থাপন থাকত, তাহলে হয়তো আমার এই গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন হতো না।[৩২]

অভিধান ও অন্যান্য রচনা

[সম্পাদনা]
আরবি-ইংরেজি অভিধান-এর প্রথম খণ্ডের শিরোনাম পৃষ্ঠা

১৮৪২ সাল থেকে লেন সম্পূর্ণভাবে তাঁর বিশাল প্রকল্প আরবি-ইংরেজি অভিধান রচনায় নিবেদিত হন। যদিও তিনি মাঝেমধ্যে Deutsche Morgenländische Gesellschaft-এর পত্রিকায় কয়েকটি প্রবন্ধও প্রকাশ করেন।[৩৩] ওই বছর তিনি স্ত্রী, দুই সন্তান ও বোন সোফিয়া লেন পুল-সহ আবার মিশরে আসেন। সোফিয়া তখন The Englishwoman in Egypt গ্রন্থের উপকরণ সংগ্রহ করছিলেন।[৩৪] লেন এই সফরে টানা সাত বছর মিশরে অবস্থান করেন এবং সপ্তাহে ছয় দিন করে অভিধান রচনার কাজ চালিয়ে যান।[৩৫]

এই কাজে একজন স্থানীয় পণ্ডিত ইব্রাহিম আল-দিসকুই তাঁকে সহায়তা করেন। আল-দিসকুই পান্ডুলিপি সংগ্রহ ও প্রুফরিডিং-এ সহযোগিতা করেন। এই সময়ে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা অভিধান প্রকাশের পরও অব্যাহত থাকে।[৩৬]

তবে গবেষক মানফ্রেড উলমান এই অভিধানের মান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন:[৩৭]

লেনের আরবি-ইংরেজি অভিধান একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তির রচনা, যার আরবি সাহিত্য সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো জ্ঞান ছিল না... তিনি কোনো কবির দিওয়ান বা গদ্যরচনা পড়েননি, সহস্র এক রজনী ছাড়া... অভিধানটি ক্বাফ (আরবি বর্ণমালার ২১তম অক্ষর) পর্যন্ত গিয়েই থেমে যায়... তাও অসম্পূর্ণ, কারণ তিনি বহু দুর্লভ মূল ও শব্দ বাদ দিয়েছেন, যেগুলো দ্বিতীয় অংশে যোগ করার কথা থাকলেও তা আর প্রকাশিত হয়নি... মূলত এটি তাজ আল-আরুস-এর অনুবাদ, তবে কোনো সমালোচনামূলক বাছ-বিচার ছাড়াই... তিনি ক্রিয়া-রূপ নির্ধারণ করেননি, উৎসসূত্রও দেননি। এই অভিধান পূর্ববর্তী অভিধানকারীদের তুলনায় একটি পশ্চাদপদ কাজ।

লেনের আরেকটি কাজ Selections from the Qur'an, ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। এটি সমালোচনামূলক বা বাণিজ্যিক দিক থেকে সফল ছিল না। বইটি ছাপা হওয়ার সময় তিনি তৃতীয়বারের মতো মিশরে অবস্থান করছিলেন এবং অভিধান রচনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ফলে তাতে অনেক মুদ্রণ-ত্রুটি রয়ে যায়।[৩৮]

লেন তার অভিধান সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তিনি ক্বাফ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, কিন্তু ১৮৭৬ সালে ওয়ার্থিং, সাসেক্স-এ তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তাঁর প্রপৌত্র স্ট্যানলি লেন-পুল অসমাপ্ত অংশের খসড়া থেকে কাজটি শেষ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে অভিধানটি পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়।[৩৯]

১৮৫৪ সালে একটি নামবিহীন গ্রন্থ The Genesis of the Earth and of Man প্রকাশিত হয়, যা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র রেজিনাল্ড স্টুয়ার্ট পুল সম্পাদনা করেন। অনেকেই এই কাজটি লেনের রচনাই মনে করেন।[৩৩]

Description of Egypt-এ কায়রোর প্রাচীন ইতিহাস ও ভৌগোলিক বিবরণ নিয়ে একটি অধ্যায় ছিল, যা আল-মাকরিজি-র রচনা এবং লেনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে রচিত। রেজিনাল্ড স্টুয়ার্ট পুল ১৮৪৭ সালে এটি সংশোধন করে ১৮৯৬ সালে Cairo Fifty Years Ago নামে প্রকাশ করেন।[৪০]

সমালোচনা

[সম্পাদনা]

লেনের রচনায় মিশরের কপ্টিক খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের প্রতি তাঁর অসংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সমালোচনা করা হয়েছে। তিনি এক মিশরীয় ব্যক্তির বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে কপ্টদের বর্ণনা দেন, যিনি নিজেকে কপ্ট পরিচয় দিলেও পরবর্তী গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ওই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে একজন মুসলমান ছিলেন।[৪১] তাঁর লেখায় কপ্টদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘ওরা বিমর্ষ স্বভাবের, অত্যন্ত লোভী এবং জঘন্য ভণ্ড; পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো তোষামোদকারী, কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ।’’[৪২] এস.এইচ. লিডার-এর মতো গবেষকরা মন্তব্য করেছেন, ‘‘কপ্টদের প্রতি যে ব্যাপক নেতিবাচক মনোভাব প্রচলিত হয়েছে, তার পেছনে লেনের লেখার বড় ভূমিকা রয়েছে।’’[৪৩]

ব্যক্তিগত জীবন

[সম্পাদনা]

লেন ছিলেন একটি খ্যাতনামা প্রাচ্যবিদ পরিবার থেকে আগত। তাঁর বোন সোফিয়া লেন পুল নিজেও একজন প্রাচ্যবিদ ছিলেন। ভ্রাতুষ্পুত্র রেজিনাল্ড স্টুয়ার্ট পুল-ও একই ধারার গবেষক ছিলেন। তাঁর ভাই রিচার্ড জেমস লেন ছিলেন ভিক্টোরীয় যুগের খ্যাতিমান খোদাইবিদ ও লিথোগ্রাফ শিল্পী, যিনি প্রতিকৃতি আঁকার জন্য পরিচিত ছিলেন।

১৮৪০ সালে লেন বিবাহ করেন নাফিসা নামক একজন গ্রিক-মিশরীয় নারীকে, যিনি শুরুতে হয় তাকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়েছিলেন অথবা তিনি একজন দাসী হিসেবে ক্রয় করেছিলেন, তখন তার বয়স প্রায় আট বছর। পরে লেন তার শিক্ষার দায়িত্ব নেন এবং তাঁকে বিয়ে করেন।[]

১৮৬৭ সালে তাঁর বোনের পুত্র এডওয়ার্ড স্ট্যানলি পুল মৃত্যুবরণ করলে, লেন ও তাঁর বোন যৌথভাবে তাঁর তিন অনাথ সন্তান—এক কন্যা ও দুই পুত্র স্ট্যানলি লেন-পুল (প্রাচ্যবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ) এবং রেজিনাল্ড লেন পুল (ইতিহাসবিদ ও সংরক্ষণাগারিক)-কে লালন-পালন করেন।[৪৪]

লেন ১০ আগস্ট ১৮৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং ওয়েস্ট নরউড কবরস্থানে সমাহিত হন। তাঁর পান্ডুলিপি ও চিত্রাবলি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিফিথ ইনস্টিটিউট-এ সংরক্ষিত রয়েছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Thompson 1996, 565
  2. 1 2 3 Thompson, Jason। "An Account of the Journeys and Writings of the Indefatigable Mr. Lane"। Saudi Aramco World। ২৯ আগস্ট ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ জুন ২০০৮
  3. Arberry, 87
  4. Tomlinson, Howard (২০১৮)। Hereford Cathedral School: a history over 800 years। Herefordshire। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৯১০৮৩৯-২৩-২ওসিএলসি 1030612754{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অবস্থানে প্রকাশক অনুপস্থিত (লিঙ্ক)
  5. Arberry, 87-8
  6. Arberry, 88
  7. Lane-Poole 1877, 14–15
  8. Arberry, 89-92; Irwin (2006), 164
  9. Thompson 1996, 566–567
  10. Lane 2001, 225–492
  11. Thompson 1996, 567
  12. Roper, 244; Irwin (2006), 163
  13. Thompson 1996, 571–572
  14. Lane 2001, 67–97
  15. Lane 2001, 215–291
  16. Lane 2001, 25–47
  17. Thompsen 1996, 577–578
  18. Lane 2001, 508–574
  19. Thompson 1996, 578
  20. Lane 2001, 159
  21. Thompson 1996, 190
  22. Lane 2001, 372–387
  23. Lane 2001, 575–579
  24. Roper, 244; Irwin (2006), 122 & 164
  25. Arberry, 92
  26. Arberry 1997, 98
  27. Lane, 175
  28. Thompson 2010, 574
  29. Arberry, 104
  30. Arberry, 105
  31. Irwin (1994), 24
  32. Lane, xxiv
  33. 1 2 Roper, 249
  34. Arberry 1997, 108
  35. Arberry 1997, 109–111
  36. Kudsieh 2016, 54–56
  37. Wörterbuch der klassischen arabischen Sprache ii.2464 sqq.
  38. Arberry, 106-7
  39. Arberry, 115
  40. Roper, 245
  41. Dowling 1909, 4
  42. Lane 2001, 373–374
  43. Leeder 1918, 107
  44. Bailey, Simon। "Poole, Reginald Lane"। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব ন্যাশনাল বায়োগ্রাফি (অনলাইন সংস্করণ)। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। ডিওআই:10.1093/ref:odnb/35568 {{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}: অবৈধ |ref=harv (সাহায্য); উদ্ধৃতিতে খালি অজানা প্যারামিটারs রয়েছে: |HIDE_PARAMETER15=, |HIDE_PARAMETER13=, |HIDE_PARAMETER21=, |HIDE_PARAMETER30=, |HIDE_PARAMETER14=, |HIDE_PARAMETER17=, |HIDE_PARAMETER32=, |HIDE_PARAMETER16=, |HIDE_PARAMETER25=, |HIDE_PARAMETER24=, |HIDE_PARAMETER9=, |HIDE_PARAMETER3=, |HIDE_PARAMETER4=, |HIDE_PARAMETER2=, |HIDE_PARAMETER28=, |HIDE_PARAMETER18=, |HIDE_PARAMETER20=, |HIDE_PARAMETER5=, |HIDE_PARAMETER19=, |HIDE_PARAMETER10=, |HIDE_PARAMETER33=, |HIDE_PARAMETER31=, |HIDE_PARAMETER29=, |HIDE_PARAMETER11=, |HIDE_PARAMETER26=, |HIDE_PARAMETER8=, |HIDE_PARAMETER7=, |HIDE_PARAMETER23=, |HIDE_PARAMETER27=, এবং |HIDE_PARAMETER12= (সাহায্য) (সাবস্ক্রিপশন বা যুক্তরাজ্যের গণগ্রন্থাগারের সদস্যপদ প্রয়োজন।)