একাত্তরের যীশু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
একাত্তরের যীশু: Jesus '71
একাত্তরের যীশু ছবির ভিসিডি প্রচ্ছদ.jpg
ভিসিডি কভার
পরিচালকনাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রযোজকঅনুপম চিত্রয়ন ট্রাস্ট
রচয়িতাশাহরিয়ার কবির (উপন্যাস)
শ্রেষ্ঠাংশেপীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়
হুমায়ুন ফরীদি
জহির উদ্দিন পিয়াল
আবুল খায়ের
আনওয়ার ফারুক
কামাল বায়েজীদ
ইব্রাহিম বিদ্যুৎ
শতদল বড়ুয়া বিলু
সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল
ফারুক আহমেদ
শহীদুজ্জামান সেলিম
ইউসুফ খসরু
দেলোয়ার হোসেন
সুরকারশিমুল ইউসুফ
চিত্রগ্রাহকবেবী ইসলাম
সম্পাদকনজরুল ইসলাম
পরিবেশকঅনুপম চিত্রয়ন ট্রাস্ট
মুক্তি১৯৯৩
দৈর্ঘ্য১০০ মিনিট
দেশ বাংলাদেশ
ভাষাবাংলা

একাত্তরের যীশু ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক একটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র[১]। লেখক শাহরিয়ার কবির-এর লেখা একাত্তরের যীশু (উপন্যাস)[২] অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করেছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। ছবির প্রধান প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন ফরীদি, জহির উদ্দিন পিয়াল, আবুল খায়ের, আনওয়ার ফারুক, কামাল বায়েজীদ ও শহীদুজ্জামান সেলিম। এছাড়াও বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইব্রাহিম বিদ্যুৎ, শতদল বড়ুয়া বিলু, সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল, ফারুক আহমেদ, ইউসুফ খসরু, দেলোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে।

কাহিনী সংক্ষেপ[সম্পাদনা]

প্রেক্ষাপট ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ভূখন্ডে ভীষণ যুদ্ধ চলছিল। গল্পটি এক জেলেপাড়া নিয়ে। তখনো যুদ্ধ গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েনি। জেলেপাড়ার জেলেরা মাছ ধরে, তারপর হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে। সে গ্রামে একটা চার্চও ছিল। গ্রামের বেশিরভাগ জেলেই ছিল খ্রিস্টান। প্রতি রবিবার চার্চের কেয়ারটেকার ডেসমন্ড সকালে গির্জার ঘণ্টা বাজাতেন। আর তারপর গ্রামের সব মানুষ আসতেন সেই গির্জায়। ফাদার তাদেরকে বাইবেল থেকে যীশুর গল্প শোনাতেন। সবকিছুই চলছিল ঠিকঠাক। কিন্তু একদিন ওদের গ্রামেও যুদ্ধ এসে পড়লো। সেদিন জেলেরা হাটে গিয়ে বসে বসে মাছি মারছিল; কেউই আর মাছ কিনতে আসে না। হঠাৎ ওরা শোনে কারা যেনো ‘জয় বাংলা’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে। আর তারপরই গুলির শব্দ। পাকবাহিনী আক্রমণ করেছে। জেলেরা যে যেদিকে পারলো পালাতে লাগলো। কিন্তু সবাই পালাতে পারলো না। ওদেরই একজন, হরিপদ পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে মারা গেল।

শহরে যুদ্ধ তখন চলছিলই। দলে দলে লোক শহর ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যেতে শুরু করেছে, যেখানে পাকবাহিনীর তাণ্ডব নেই। কেউ যাচ্ছে শুধুই আশ্রয়ের জন্য, আর কেউ ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে শত্রুকে ঘায়েল করবে- এজন্য। জেলেপাড়ার লোকগুলো দেখলো, দলে দলে মানুষ, কেবল হাঁটছে আর হাঁটছেই। খাওয়া নেই, দাওয়া নেই। রাতে শোওয়ার জায়গা নেই। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেই। লোকগুলো কেবলই হাঁটছে। কেউ মরে গেলে রাস্তার পাশে পড়ে থাকছে। যারা অসুস্থ তারাও হাঁটছে। জেলেপাড়ার মাস্টার সেখানকার সব লোককে জড়ো করলেন। আর তারপর শুরু করলেন এই শহর ছাড়া মানুষগুলোর সেবা। রাতারাতি তাদের জন্য তৈরি করলেন কতোগুলো তাঁবু। গ্রামের সবার কাছ থেকে চাদর আর মাদুর নিয়ে সেখানে রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। বাড়ি বাড়ি থেকে চাল-ডাল নিয়ে সবার জন্য খিচুড়ি রান্না করা হলো। কিন্তু চিকিৎসার বন্দোবস্ত জেলেপাড়ার লোকদের থেকে হলো না বলে মাস্টার গিয়ে গির্জার ফাদারকে বললেন, গির্জায় রাখা ওষুধ দিতে। আরো বললেন, সিস্টাররা যেনো অসুস্থ মানুষগুলোর চিকিৎসার ভার নেয়। এতে আবার ফাদার পড়লেন আরেক চিন্তায়— গির্জাকে তিনি এই যুদ্ধের মধ্যে জড়াবেন কিনা। কিন্তু এতো মানুষের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ফাদার, সিস্টারদের অনুমতি দিলেন সবার চিকিৎসার ভার নেওয়ার জন্য। রাতভর মাস্টার, তার ছাত্ররা, বুড়ো ডেসমন্ড আর সিস্টাররা মিলে শহর ছেড়ে পালিয়ে আসা লোকদের সেবা করলেন, খাওয়ালেন, চিকিৎসা করলেন।

পরদিন সকালে সব লোক আবার ভারতের পথে যাত্রা শুরু করলো। তাঁবুগুলো আবার ফাঁকা হয়ে গেলো। কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে বুড়ো ডেসমন্ড দেখেন একটা গাছের গোড়ায় একটা ফুটফুটে মেয়ে রয়ে গেছে সেই সব শরণার্থীদের থেকে। ডেসমন্ড ওর কাছে নাম, গ্রামের নাম জানতে চাইলে মেয়েটা কিছুই বলতে পারলো না। পরে ডেসমন্ড বুঝতে পারলেন, মেয়েটা বোবা! ডেসমন্ড এবার মেয়েটার পিছনে সময় দিতে লাগলো। ওকে গল্প শোনায়- যীশুর গল্প। পাতার বাঁশি বানিয়ে দেয়, বাজিয়ে শোনায়।

আরেকদিন গ্রামে খবর এলো, হাটে পাকবাহিনী এসেছে। তারা হাট জ্বালিয়ে দিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে মারছে। আরেক গ্রামের গির্জার ফাদারকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। শিশু-বৃদ্ধ, জোয়ান-বুড়ো, ফাদার-জেলে, কাউকে ওরা ছাড়ছে না, সবাইকে মারছে। গ্রামের সব লোক ভয়ে পালাতে লাগলো। গির্জা ছেড়ে পালিয়ে গেলেন স্বয়ং ফাদারও। কেবল থেকে গেলেন বুড়ো ডেসমন্ড আর ঐ ফুটফুটে মেয়েটা। ওদিকে এই জেলেপাড়াতেও পাকবাহিনী এসে পড়লো। ডেসমন্ড মেয়েটাকে বললেন ঘর থেকে না বের হতে। আর নিজে দেখতে গেলেন বাইরের অবস্থা। ওদিকে পাকবাহিনী এসে সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে করে মারতে লাগলো। ডেসমন্ড গ্রামে ফিরে দেখেন, পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে আর কিছু বাদ রাখেনি পাকবাহিনী। যতো বাড়ি ছিল, সব জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। যতো মানুষ ছিল সবাইকে মেরে রেখে গেছে। কেউ বেঁচে নেই। মেয়েদেরও ওরা মেরে ফেলেছে। আর সেসব লাশেরই মাঝে পড়ে রয়েছে সেই ফুটফুটে বোবা মেয়েটার লাশ। ডেসমন্ড মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ওকে কবর দিয়ে ছোট্ট ক্রুশ পুঁতে দিলেন ওর মাথার কাছে। এবার পৃথিবীতে একেবারেই একা হয়ে গেলেন ডেসমন্ড।

ওদিকে মাস্টার তো অনেক আগেই যুদ্ধে চলে গেছেন। তাঁর বাহিনীর কয়েকটা ছোটো দলের থাকার জায়গা দরকার। মাস্টার ওদের একটা দলকে পাঠিয়ে দিলেন ডেসমন্ড কাকার কাছে। আর ডেসমন্ড কাকাও অনেক আগেই বুঝে গেছেন, এ যুদ্ধ সবারই যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ তাঁর জীবনের যুদ্ধ। সবাইকেই এখন কিছু না কিছু করতে হবে। ডেসমন্ডও ওদেরকে আশ্রয় দিলেন। তিনি তখনো সেই গির্জার পাশে তার ছোট্ট ঘরে থাকেন। সেখানে ওদেরকেও থাকতে দিলেন। ওদের খাওয়ালেন, ওদের যত্ন নিলেন। আর ওরা এখান থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলো।

কিছুদিন পরে একটা ছোটোখাটো অপারেশনে বের হলো ওরা। একটা পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করতে হবে। খুব একটা বড়ো নয় ক্যাম্পটা। ওদের দলটাই যথেষ্ট অপারেশনটা করতে। ডেসমন্ড কাকার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে ওরা বের হয়ে গেলো। আর তারপর প্রচন্ড যুদ্ধ করে হারিয়ে দিলো ক্যাম্পে থাকা পাক আর্মিদের। ওদের সবাইকেই যুদ্ধে মেরে ফেললো ওরা। এবার করা হবে একটা বড়ো অপারেশন। আশেপাশে পাকিস্তানিদের সবচেয়ে বড়ো ক্যাম্প কমলগঞ্জে। ওরা এই ক্যাম্পটাই আক্রমণ করবে। পিছন দিক আর একপাশ থেকে আক্রমণ করবে দুইটা-দুইটা চারটা দল। আরেকপাশে থাকবে ওদের দলসহ তিনটা দল। আর সামনে থেকে আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে মাস্টারের দলসহ তিনটা দল। মোট ১০টা দল মিলে সাঁড়াশি আক্রমণ করে ওরা দখল করে নেবে কমলগঞ্জের পাকিস্তানি ক্যাম্প। সব প্রস্তুতি নিয়ে ডেসমন্ড কাকার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো। কমলগঞ্জ ক্যাম্পে শুরু হলো যুদ্ধ। সে এক ভীষণ যুদ্ধ! ওখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ডেরাও ভীষণ মজবুত, কোনোভাবেই দখল করা যাচ্ছে না।[৩]

যুদ্ধে জয় হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। তারপর সেখান থেকেই ক'জন মুক্তিযোদ্ধা খুশি হয়ে জয় নিয়ে ফিরছিল। পথিমধ্যে অন্ধকার জঙ্গুলে পথে পাকবাহিনীর অ্যাম্বুশে পড়ে তারা। কোনো রকমে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় গির্জায়। সেখানে মারা যায় কেউ কেউ। যারা বেঁচে যায়, গুলি খরচ করে শেষ করে ফেলে, কিন্তু পাকবাহিনীর সদস্যদের মারতে পারে না। অবশেষে তারা পাক আর্মির কাছে ধরা পড়ে। গির্জার কেয়ারটেকার ডেসমন্ডকে সামনে পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় জানতে চায় তারা। কিন্তু ডেসমন্ড নিজের প্রাণ বাঁচাতে অস্বীকার করে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচিতি, অথচ এদেরকেই লালন করেছেন তিনি এই ক'দিন। পাক আর্মি, গির্জার সামনে রাখা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি দেখে অনুরূপভাবে ক্রুশবিদ্ধ করে এই তিন মুক্তিযোদ্ধাদের, মাঠের মধ্যে টানিয়ে দেয়। প্রচণ্ড বিষাদ নিয়ে কাঁদতে থাকেন ডেসমন্ড। তাঁর কি করার কিছুই ছিল না?

শ্রেষ্ঠাংশে[সম্পাদনা]

  • পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায় -
  • হুমায়ুন ফরীদি - ডেসমন্ড, গীর্জার কেয়ারটেকার
  • জহির উদ্দিন পিয়াল -
  • আবুল খায়ের -
  • আনওয়ার ফারুক
  • কামাল বায়েজীদ -
  • ইব্রাহিম বিদ্যুৎ
  • শতদল বড়ুয়া বিলু
  • সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল -
  • ফারুক আহমেদ -
  • শহীদুজ্জামান সেলিম
  • ইউসুফ খসরু -
  • দেলোয়ার হোসেন -
  • পলাশ -
  • লিটন -
  • সাজ্জাদ -
  • পাবেল -
  • সোয়েব -
  • বাদল -
  • ফ্লোরেন্স শর্মিলী গোমেজ -

সম্মাননা[সম্পাদনা]

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার[সম্পাদনা]

  • শ্রেষ্ঠ সংলাপ: সেলিম আল দীন ১৯৯৩

বাচসাস পুরস্কার[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক সম্মাননা[সম্পাদনা]

  • মনোনয়ন: লন্ডন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ১৯৯৪
  • মনোনয়ন: এডিনবার্গ (স্কটল্যান্ড) আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ১৯৯৩
  • মনোনয়ন: ব্রিসবেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ১৯৯৪

সংগীত[সম্পাদনা]

একাত্তরের যীশু ছবির সঙ্গীত পরিচালনা ও গীত রচনা করেছেন শিমুল ইউসুফ।

গানের তালিকা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. 'একাত্তরের যীশু' (চলচ্চিত্র)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] তথ্য সংগ্রহ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১
  2. 'একাত্তরের যীশু' (উপন্যাস) তথ্যসুত্রঃ দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১১ ডিসেম্বর ২০১০, তথ্য সংগ্রহঃ ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১১
  3. কাহিনী সংক্ষেপ: 'একাত্তরের যীশু' (চলচ্চিত্র)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] তথ্য সংগ্রহ, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১১

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]