ঋজু শিলাখণ্ড




ঋজু শিলাখণ্ড বা ঋজু একাশ্ম বলতে সাধারণত ইউরোপের ইতিহাসের মধ্য ব্রোঞ্জ যুগে প্রাগৈতিহাসিক মানবদের দ্বারা মাটিতে স্থাপিত বিভিন্ন বৃহৎ উল্লম্ব শিলাখণ্ডকে বোঝায়। এগুলিকে এককভাবে একাশ্ম হিসেবে, অথবা সদৃশ শিলাখণ্ডের একটি দলের অংশ হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। ঋজু শিলাখণ্ডগুলি বিভিন্ন আকারের হতে পারে, তবে প্রায়শই এগুলি উপরের দিকে সরু হয়ে থাকে।
ঋজু শিলাখণ্ডগুলি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাতে পাওয়া গেলেও এগুলির সিংহভাগই পশ্চিম ইউরোপে, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপ এবং ফ্রান্সের ব্র্যতাইন অঞ্চলে অবস্থিত। এগুলি নির্মাণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক অনুমানভিত্তিক তত্ত্ব আছে। ড্রুইডীয় আচারানুষ্ঠান থেকে শুরু করে অঞ্চল চিহ্নিতকারক বা কোনও ভাবাদর্শিক ব্যবস্থার উপাদান, ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্দেশ্য অনুমান করা হয়েছে। কিছু কিছু ঋজু শিলাখণ্ডে খোদাইকর্ম থাকে, যেগুলির মধ্যে নরত্বারোপমূলক চিত্র এবং প্রতীক থাকে। এগুলি প্রায়শই প্রাচীন ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান এবং সমাধি কক্ষের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]ফরাসি ভাষাতে ঋজু শিলাখণ্ডগুলি মেনির (menhir) নামে পরিচিত। এই ফরাসি শব্দটি ১৯শ শতকের প্রত্নতাত্ত্বিকরা ফরাসি ভাষা থেকে ইংরেজিতে গ্রহণ করেন। সাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যবহারে এই শব্দটির প্রবর্তন করেন ১৮শ শতকের ফরাসি সামরিক কর্মকর্তা তেওফিল কোরে দ্য লা তুর দোভের্ন।[১] এটি ফ্রান্সের কেল্টীয় ব্র্যতোঁ ভাষার দুটি শব্দের সংমিশ্রণ: maen এবং hir। আধুনিক ওয়েলসীয় ভাষায় এগুলিকে maen hir বা "দীর্ঘ পাথর" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক ব্র্যতোঁঁ ভাষাতে peulvan শব্দটি ব্যবহৃত হয়, peul এর অর্থ "খুঁটি" এবং van, যা maen শব্দের একটি কোমল রূপান্তর যার অর্থ "পাথর"। জার্মানি এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় বাউটা (Bauta) শব্দটি ব্যবহৃত হয় (জার্মান: Bautastein বাউটাষ্টাইন; নরওয়েজীয়: bautastein ) এবং এই পরিভাষাটি মাঝে মাঝে "bauta stone" (বাউটা স্টোন) হিসেবে ইংরেজিতে প্রবেশ করে।

ইতিহাস
[সম্পাদনা]যারা ঋজু শিলাখণ্ডগুলি নির্মাণ করেছিলেন, তাদের সামাজিক সংগঠন বা ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তাদের ভাষাও অজানা। তবে জানা যায় যে তারা তাদের মৃতদেহ সমাধিস্থ করত ও তাদের ফসল ফলানো, কৃষিকাজ, মৃৎশিল্প, পাথরের হাতিয়ার ও অলংকার তৈরির দক্ষতা ছিল। ঋজু শিলাখণ্ডগুলির উদ্দেশ্য বা ব্যবহার শনাক্ত করা এখনও অনুমাননির্ভর। সম্প্রতি পর্যন্ত, এই শিলাখণ্ডগুলি ঘণ্টাকৃতির পানপাত্র সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হত, যে সংস্কৃতির মানুষেরা ইউরোপে নব্যপ্রস্তর যুগের শেষভাগ ও ব্রোঞ্জ যুগের প্রথমভাগে[২] বাস করত, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগে (আনু. ২৮০০ – ১৮০০ খ্রিস্টপূর্ব)। তবে ব্র্যতাইনের মহাশ্ম যুগের উপরে সাম্প্রতিক গবেষণাতে দৃঢ় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে আরও অনেক প্রাচীন যুগে, সম্ভবত আজ থেকে ছয় থেকে সাত হাজার বছর আগে এগুলির উৎপত্তি ঘটে।[৩]
ইউরোপীয় মধ্যযুগে মানুষ বিশ্বাস করত যে বাইবেলে আখ্যাত বন্যার আগে বসবাসকারী দৈত্যরা এই ঋজু শিলাখণ্ডগুলি তৈরি করেছিল। অনেক মহাশ্ম প্রাথমিক যুগের খ্রিস্টানরা ধ্বংস বা বিকৃত করে দেয়। অনুমান করা হয় যে একসময় উত্তর ইউরোপে প্রায় ৫০ হাজারের মতো মহাশ্ম বা বৃহৎ শিলাখণ্ড ছিল, যেগুলির মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার অবশিষ্ট আছে।[৪] বিশ্বের অন্যান্য অনেক স্থানেও ঋজু শিলাখণ্ড পাওয়া গেছে।
অনেক ঋজু শিলাখণ্ডের উপরে মহাশ্মীয় শিল্পকলা খোদাই করা আছে, যেগুলি কিছু কিছুতে নরত্বারোপমূলক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যান্য সাধারণ খোদাইগুলিকে পাথরের কুঠার, লাঙল, রাখালদের কুঠার এবং জোয়ালের ছবি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং এই মূলভাবগুলির নাম অনুসারে সেগুলির নামকরণ করা হয়েছে। তবে পাথরের কুঠারের প্রতিচ্ছবি ছাড়া অন্যান্য শনাক্তকরণগুলির সঠিকতা নিশ্চিত নয় এবং এই নামগুলিকে মূলত বর্ণনা করার সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ঋজু শিলাখণ্ড ভেঙে পরবর্তীতে সরুপথ সমাধিগুলিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে পূর্ববর্তী চিত্রগুলিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে নতুন মহাশ্মীয় শিল্পকর্ম খোদাই করা হয়েছিল। এই পুনঃব্যবহার ইচ্ছাকৃত ছিল, নাকি সরুপথ সমাধি নির্মাতারা ঋজু শিলাখণ্ডগুলিকে কেবল পাথরের সুবিধাজনক উৎস হিসেবে দেখেছিলেন, তা জানা যায়নি।[৫]
যেসব স্থানে ঋজু শিলাখণ্ডগুলিকে দলবদ্ধভাবে এবং প্রায়শই বৃত্তাকার, ডিম্বাকৃতি, বেষ্টনীবেদী (হেঞ্জ) আকৃতি বা অশ্বখুরাকৃতি হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। এগুলিতে কদাচিৎ মহাশ্মীয় স্মৃতিস্তম্ভ নামে ডাকা হয়। এগুলি প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পীঠস্থান, এবং কখনও কখনও এগুলিতে সমাধিকক্ষ ধারণ করা থাকে।[৬] ইউরোপীয় প্রাগৈতিহাসিক যুগে ঋজু শিলাখণ্ড ঠিক কী কাজে ব্যবহৃত হত, সেই বিষয়টি অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন মত অনুযায়ী এগুলিকে ড্রুইডরা মানব বলিদানের জন্য ব্যবহার করত, ভৌগোলিক অঞ্চল চিহ্নিতকারক হিসাবে ব্যবহার করত, একটি জটিল ভাবাদর্শিক ব্যবস্থার উপাদান হিসাবে ব্যবহার করত, অথবা মৌখিক সংস্কৃতির জন্য স্মৃতিবর্ধক ব্যবস্থা হিসাবে ব্যবহার করত,[৭] কিংবা প্রাথমিক দিকের পঞ্জিকা হিসাবে কাজ করত।[৮] উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরাকীর্তির বিশেষজ্ঞদের প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল না। তাদের একমাত্র প্রসঙ্গবিন্দুগুলি ধ্রুপদী সাহিত্যে অবস্থিত ছিল। তেজস্ক্রিয় কার্বনভিত্তিক কালনিরূপণ এবং বৃক্ষচক্রীয় কালনিরূপণের বিকাশের ফলে এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি লাভ করেছে।
ভৌগোলিক বন্টন
[সম্পাদনা]ঋজু শিলাখণ্ডগুলি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের ব্যাপক এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তবে পশ্চিম ইউরোপে এদের সংখ্যা সর্বাধিক। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, গ্রেট ব্রিটেন এবং ব্রতাইন অঞ্চলের এগুলির প্রায় ৫০,০০০ দৃষ্টান্ত রয়েছে।[৯] এছাড়া উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সে এগুলির আরও প্রায় ১,২০০টি নজির রয়েছে।[১০] ঋজু শিলাখণ্ডগুলির বয়স নির্ধারণ করা সাধারণত কঠিন। ইউরোপ ও কাছাকাছি অঞ্চলের বৃহত্তর মহাশ্মীয় সংস্কৃতির অংশ হিসাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভিন্ন পর্বে এগুলি নির্মিত হয়েছিল। কিছু কিছু ঋজু শিলাখণ্ড এমন সব ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলি অতীতে বা বর্তমানে ধর্মীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এরকম একটি উদাহরণ হল ডেভনের সাউথ জিল ঋজু শিলাখণ্ড, যা দ্বাদশ শতাব্দীতেসাধারণ সন্ন্যাসীদের দ্বারা নির্মিত একটি মঠের ভিত্তি তৈরি করেছিল। মঠটি পরে সাউথ জিলের অক্সেনহ্যাম আর্মস হোটেলে পরিণত হয় এবং ঋজু শিলাখণ্ডটি বর্তমানে হোটেলের একান্ত পানঘর বা স্নাগ বারে স্থাপিত করা হয়েছে।[১১][১২]
কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে মহাশ্ম যুগের ধর্মের অনুশীলনকারীরা সমুদ্রপথে ভ্রমণ করতেন, কারণ ঋজু শিলাখণ্ডগুলির বেশিরভাগই উপকূল, দ্বীপ ও উপদ্বীপে অবস্থিত।[১৩]
জনসংস্কৃতিতে
[সম্পাদনা]অ্যাস্টেরিক্স নামক ফরাসি কমিক বই ধারাবাহিকে যে ওবেলিক্স চরিত্রটি চিত্রিত করা হয়েছে, সে ঋজু শিলাখণ্ডের নির্মাতা ভাস্কর ও বিলিকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।[১৪]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]- আশেরা খুঁটি
- বাইতুল
- কারলিন পাথর
- কার্নাক পাথর
- আচারানুষ্ঠানিক খুঁটি
- ক্ষুদ্র প্রস্তরবেষ্টনী (ঋজু শিলাখণ্ড)
- শিলাখণ্ড বৃত্ত
- হরিণ-খোদিত শিলাখণ্ড
- প্রস্তর সমাধিকক্ষ
- ফুলখট ফিয়া
- গউক স্টেইন
- বেষ্টনী বেদী (হেঞ্জ)
- উচ্চস্থান
- ইনুকসুক
- কিগিলিয়াখ
- লে রেখা
- একক শিলাখণ্ডের তালিকা
- বৃহত্তম মহাশ্মের তালিকা
- মহাশ্ম
- মোয়াই
- নাপাকিভি
- প্রকৃতির উপাসনা
- চতুষ্কোণ প্রস্তরস্তম্ভ
- ওবেলিক্স
- ঋজু প্রস্তরখণ্ড (প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য)
- মাৎসেভা.
- ঋজু শিলাখণ্ড মূর্তি
- স্টেলে
- প্রস্তর বৃত্ত
- প্রস্তর সারি
- প্রস্তরতরী
- আয়ত প্রস্তরখণ্ড
- পুরাণে বৃক্ষ
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Landru, Philippe (২৩ আগস্ট ২০০৮)। "La Tour d'Auvergne (Théophile Malo Corret de la Tour d'Auvergne : 1743–1800)"। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জানুয়ারি ২০১৮।
- ↑ De Breffny, Brian (১৯৮৩)। Ireland: A Cultural Encyclopedia। Thames and Hudson। পৃ. ২২৯।
- ↑ Aviva, Elyn (অক্টোবর ১৯৯৮)। World and I।
{{ম্যাগাজিন উদ্ধৃতি}}:|title=অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য) - ↑ Olsen, Brad (ফেব্রুয়ারি ২০০৪)। "Carbnac"। Sacred Places Around the World: 108 Destinations By Brad Olsen। Consortium of Collective Consciousness। পৃ. ২৩২। আইএসবিএন ১-৮৮৮৭২৯-১০-৪। সংগ্রহের তারিখ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০।
- ↑ Le Roux, C. T. (১৯৯২)। "The Art of Gavrinis Presented in its Armorican Context and in Comparison with Ireland"। Journal of the Royal Society of Antiquaries of Ireland। ১২২: ৭৯–১০৮।
- ↑ Roberts, Chris (২০০৬)। Heavy Words Lightly Thrown: The Reason Behind Rhyme। Thorndike Press। আইএসবিএন ০-৭৮৬২-৮৫১৭-৬।
- ↑ Kelly, Lynne (২০১৫)। Knowledge and Power in Prehistoric Societies: Orality, Memory, and the Transmission of Culture। Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-১১০৭০৫৯৩৭৫। ওসিএলসি 910935575।
- ↑ Patton, Mark. (১৯৯৩)। Statements in Stone: Monuments and Society in Neolithic Brittany। Routledge। পৃ. ৪।
- ↑ Greene, Janice (২০০৬)। Strange But True Stories। Saddleback Pub। আইএসবিএন ১-৫৯৯০৫-০১০-২। সংগ্রহের তারিখ ২৫ আগস্ট ২০১১।
- ↑ Oliphant, Margaret (১৯৯২)। The Atlas Of The Ancient World। পৃ. ৮১।
- ↑ "Oxenham Arms — Standing Stone (Menhir)"। The Megalithic Portal। ১৬ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুন ২০২২।
- ↑ "Dartmoor Site: The Oxenham Arms standing stones"। www.dartmoorwalks.org.uk।
- ↑ Carrington, Dorothy (২০১৫)। Granite Island: Portrait of Corsica (ইংরেজি ভাষায়)। Penguin UK। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৪-১৯১৮১৯-৮। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২০।
- ↑ "Reach for the sky with Astérix"। ১৭ অক্টোবর ২০২৩।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- Mohen, Jean-Pierre (২০০০) [1998]। Standing Stones: Stonehenge, Carnac and the World of Megaliths। New Horizons series। Baker, Dorie B.; Baker, David J. কর্তৃক অনূদিত। London: Thames & Hudson। আইএসবিএন ০-৫০০-৩০০৯০-৯।