বিষয়বস্তুতে চলুন

উলুক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
উলুক
মহাভারত চরিত্র
লিঙ্গপুরুষ
পেশাযোদ্ধা, দূত
আত্মীয়
  • শকুনি (পিতা)
  • শকুনির নামহীন উত্তরসূরী (ভাই)
  • সুবল (পিতামহ)
  • অচল, বৃষক এবং শকুনির অন্যান্য ভাই (চাচা)
  • গান্ধারী (ফুপু)
  • কৌরব (ফুপাত ভাই)
উদ্ভবগান্ধার

উলুক (সংস্কৃত: उलूक) প্রাচীন ভারতের দুটি প্রধান সংস্কৃত মহাকাব্যের অন্যতম মহাভারতের একটি চরিত্র। তাকে গান্ধার রাজ্যের রাজপুত্র এবং এর শাসক শকুনি’র জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শকুনি এই মহাকাব্যে একজন ধূর্ত জুয়াড়ি হিসেবে সুপরিচিত। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে উলুক তার ফুপাতো ভাই দুর্যোধনের শেষ দূত হিসেবে পাণ্ডবদের কাছে শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের বার্তাটি পৌঁছে দেন। উলুক কৌরবদের পক্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তার পিতার মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে, এই সংঘর্ষ চলাকালে কনিষ্ঠতম পাণ্ডব সহদেবের হাতে নিহত হন।

সাহিত্যিক পটভূমি

[সম্পাদনা]

মহাভারত, ভারতীয় উপমহাদেশের দুটি সংস্কৃত মহাকাব্যের অন্যতম, অপর মহাকাব্যটি হলো রামায়ণ । এটি প্রধানত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা ও তার পরবর্তী পরিণতি বর্ণনা করে, যা ছিল কৌরব এবং পাণ্ডব নামক দুই রাজবংশীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তরাধিকারের যুদ্ধ। এই গ্রন্থটি ধ্রুপদী সংস্কৃতে রচিত এবং এটি বহু শতাব্দী ধরে পরিমার্জন, সম্পাদনা এবং সংযোজনের একটি সংকলিত রচনা। পাঠ্যটির বিদ্যমান সংস্করণে প্রাচীনতম অংশগুলো প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের হতে পারে। মহাভারত আঠারোটি পর্বে বা ‘গ্রন্থে’ বিভক্ত।[১]

উলুকের উপস্থিতি প্রথম গ্রন্থ, আদি পর্বে লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু তার সবচেয়ে বিশিষ্ট ভূমিকা উন্মোচিত হয় পঞ্চম গ্রন্থ, উদ্যোগ পর্বে । পণ্ডিত জে. এ. বি. ভ্যান বুইটেনেন -এর নথি অনুসারে, উলুককে প্রাথমিকভাবে কৈতব উপাধি দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়—যার অর্থ “জুয়াড়ির পুত্র”—যা শকুনির প্রতি একটি ইঙ্গিত। পরবর্তী গ্রন্থগুলোয় এই পরিচয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।[২] উদ্যোগ পর্বের (সমালোচনামূলক সংস্করণ) ১৫৮-১৬০ অধ্যায়দ্বয় উলুকের দূতযাত্রার জন্য উৎসর্গীকৃত এবং এই অধ্যায়গুলোকে উলুকদূতগমন পর্ব নামক একটি উপ-গ্রন্থ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।[৩]

ব্যুৎপত্তি এবং উপাধি

[সম্পাদনা]

উলুক (সংস্কৃত: उलूक) নামটি প্রধানত “পেঁচা” বোঝায় এবং এটি ঋগ্বেদ (১০.১৬৫.৪), অথর্ববেদ (৬.২৯.১), যজুর্বেদ, তৈত্তিরীয়সংহিতা, মহাভারত এবং মনুস্মৃতি সহ বেশ কয়েকটি বৈদিক ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়। উণাদি-সূত্র (৪.৪১)-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই শব্দটি √বল মূল থেকে উদ্ভূত। উলুক মহাভারতের একটি দেশের নামও।[৪]

শকুনির পুত্র হওয়ায়, মহাকাব্যে উলুককে একাধিক উপাধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শাকুনি, কৈতক, সৌবল্যাসুত এবং কৈতব্য ।[৫]

জীবনী

[সম্পাদনা]

পরিবার এবং শৈশবের জীবন

[সম্পাদনা]

উলুক গান্ধারের রাজপরিবারে রাজা শকুনির জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। উলুকের পিসি ছিলেন গান্ধারী, কুরু রাজ্যের রানী এবং দুর্যোধনের নেতৃত্বে কৌরব ভাইবোনদের মা।[৬] মহাকাব্যে উলুকের মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং এটিও প্রমাণিত যে তার একজন ভাই ছিল, যিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরেন এবং যুদ্ধের পরে গান্ধারের শাসক হন।[৭]

যৌবনকালে উলুক মহাকাব্যের নায়িকা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।[৫]

দূত হিসেবে ভূমিকা

[সম্পাদনা]

বহু বছর পরে, যুদ্ধের ঠিক আগে এক সংকটময় মুহূর্তে, দুর্যোধন উলুককে ডেকে পাঠান এবং যুধিষ্ঠির ও ভীমের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাকে একটি উস্কানিমূলক বার্তা দেন — এটি ছিল পাণ্ডবদের অপমান ও উস্কে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত একটি উত্তেজক ভাষণ।[৬][৩][৫] উলুক পাণ্ডব শিবিরে এসে সমবেত নেতাদের সামনে ভাষণ দেন। বার্তাটিতে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে দ্রৌপদীর প্রকাশ্য অপমান, পাণ্ডবদের বনবাস এবং পাশা খেলায় তাদের পরাজয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবশেষে, সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের সম্মান ও রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আহ্বান জানানো হয়।[২]

এতে তীক্ষ্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কৌশলগত বিদ্রূপও রয়েছে। দুর্যোধন, উলুকের মাধ্যমে, দুঃশাসনের রক্ত পানের জন্য ভীমের শপথকে উপহাস করে এবং অর্জুনের আপাত নিষ্ক্রিয়তাকে বিদ্রূপ করে। সে ভীষ্ম এবং দ্রোণের মতো যোদ্ধাদের পরাজিত করার ক্ষেত্রে পাণ্ডবদের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে, এই ধরনের প্রচেষ্টাকে মেরু পর্বত উৎপাটন করা বা গন্ধমাদন আরোহণের চেষ্টার সাথে তুলনা করে। উলুক কৌরব জোটের দুর্ভেদ্য গঠনের উপর জোর দেয়, যার মধ্যে কম্বোজ, শক, পুলিন্দ এবং দ্রাবিড়ের মতো অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন এবং শক্তিশালী বাহিনী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং দাবি করে যে তাদের সম্মিলিত শক্তি অজেয়।[২]

এই ভাষণ পাণ্ডবদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভীম ক্রোধে কাঁপতে থাকেন, আর অর্জুন তাঁর প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করেন। কৃষ্ণ শান্ত কিন্তু দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উত্তর দেন এবং দুর্যোধনকে একটি কঠোর পাল্টা বার্তা দিয়ে উলুককে বিদায় দেন। তিনি আশ্বাস দেন যে পাণ্ডবদের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হবে এবং কৌরবদের ঔদ্ধত্যের বিচার হবে। এরপর উলুক দুর্যোধনের কাছে ফিরে গিয়ে পাণ্ডবদের প্রতিক্রিয়া জানান। দুর্যোধন অবিচলিত থেকে যুদ্ধরথগুলিকে জোয়াল পরানোর আদেশ দেন, যা আসন্ন সংঘাতের চূড়ান্ত প্রস্তুতির সূচনা করে।[২]

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

অন্যান্য গান্ধার যোদ্ধাদের সাথে উলুকও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভীষ্ম পর্ব অনুসারে, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি চেদির রাজা ধৃষ্টকেতুর মুখোমুখি হন। একই গ্রন্থের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে, তিনি সহদেবের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। দ্রোণ পর্বে বর্ণিত আছে যে, উলুক অর্জুনের কাছেও পরাজিত হন। কৌরব সেনাপতি দ্রোণের মৃত্যুর পর, দ্রোণ পর্বে লিপিবদ্ধ আছে যে উলুক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে, কর্ণ পর্বে বর্ণিত আছে যে উলুক যুদ্ধে যুযুৎসুকে পরাজিত করতে সক্ষম হন।[৫]

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ দিনে, যে যুদ্ধে তার পিতা শকুনি মৃত্যুবরণ করেন, সেই একই যুদ্ধে উলুক নিহত হন। শল্য পর্ব অনুসারে, শকুনি যখন সহদেবের দিকে অগ্রসর হন, তখন সহদেবও এক ঝাঁক বাণ ছুড়ে পাল্টা জবাব দেন। এই সময়ে উলুক যুদ্ধে প্রবেশ করেন এবং তার পিতাকে সমর্থন করার চেষ্টায় ভীমকে দশটি বাণ দিয়ে আঘাত করেন। এরপর শকুনি একটি বর্শা দিয়ে সহদেবের মাথায় আঘাত করে তাকে ক্ষণিকের জন্য অক্ষম করে দেন। শকুনিকে উদ্ধার করার জন্য উলুক তার আক্রমণ আরও তীব্র করেন এবং ভীমের দিকে সাতটি ও সহদেবের দিকে সত্তরটি বাণ নিক্ষেপ করেন। ভীমও এর জবাবে উলুককে অসংখ্য বাণ দিয়ে আঘাত করেন এবং চৌষট্টিটি বাণ দিয়ে শকুনিকে আহত করেন। পূর্বের আঘাত থেকে সেরে উঠে সহদেব একটি চওড়া ফলাযুক্ত বাণ দিয়ে উলুকের শিরশ্ছেদ করেন। উলুকের মৃত্যুতে শকুনি সুস্পষ্ট শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। আবেগাপ্লুত হয়ে শকুনি স্বর্ণখচিত বর্শা হাতে সহদেবের দিকে ধেয়ে যান। সহদেব স্বর্ণপালক খচিত চওড়া ফলাযুক্ত একটি লোহার বাণ দিয়ে পাল্টা আক্রমণ করলেন, যা নিপুণভাবে শকুনির মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে।[৮]

মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

জে. এ. বি. ভন বুইটেনেনের মতে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগের কূটনৈতিক আদান-প্রদানের সময় প্রেরিত চারজন দূত স্বতন্ত্র যোগ্যতাসম্পন্ন এবং সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন ধরনের বার্তাবাহকের প্রতিনিধিত্ব করেন। যুধিষ্ঠির সর্বোচ্চ বৈদিক বিশুদ্ধতার একজন ব্রাহ্মণকে পাঠান, যিনি দ্রুপদ রাজার গৃহযাজকও ছিলেন। কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্রের দূত হলেন সঞ্জয়, তাঁর ব্যক্তিগত কবি এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত। কৃষ্ণ একজন রাজপুত্র হিসেবে শান্তি উদ্যোগে সচেষ্ট হন, যিনি উভয় পক্ষের প্রতি অনুকূল মনোভাবাপন্ন এবং আপোষকামী। এর বিপরীতে, দুর্যোধন উলুককে বেছে নেন, যাঁর পিতৃনাম কৈতব্য, যার অর্থ “জুয়াড়ির পুত্র”। ভন বুইটেনেনের মতে, উলুককে একজন নিম্ন মর্যাদার ব্যক্তি বলে মনে হয় এবং তাঁকে দূত হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তটিকে একটি শ্লেষাত্মক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভন বুইটেনেন পর্যবেক্ষণে, দুর্যোধনের পক্ষে পাণ্ডবদেরকে তার চূড়ান্ত আহ্বান জানানোর বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, আর তা সেই জুয়াড়ির পুত্রের মাধ্যমেই করা হয়েছে, যার পিতি যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করে তাঁকে সর্বস্বান্ত করেছিল।[২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ Brockington, J. L. (১৯৯৮)। The Sanskrit Epics। Brill Academic। পৃ. ২৬। আইএসবিএন ৯৭৮-৯-০০৪১০-২৬০-৬।
  2. 1 2 3 4 5 Buitenen, J. A. B. van (১৪ আগস্ট ২০১৪)। The Mahabharata, Volume 3: Book 4: The Book of the Virata; Book 5: The Book of the Effort (ইংরেজি ভাষায়)। University of Chicago Press। পৃ. ১৩৫–১৩৬, ৪৭৫–৪৮১। আইএসবিএন ৯৭৮-০-২২৬-২২৩৭১-১।
  3. 1 2 Sinha, Seema; Bhattacharya, Kumar Sankar (১৩ মার্চ ২০২৫)। An Alternative Reading of the Other in The Mahabharata: Celebrating the Marginal (ইংরেজি ভাষায়)। Taylor & Francis। আইএসবিএন ৯৭৮-১-০৪০-৩২৫৬৭-৪।
  4. ↑ Monier-Williams, Sir Monier (১৮৭২)। A Sanskṛit-English Dictionary Etymologically and Philologically Arranged: With Special Reference to Greek, Latin, Gothic, German, Anglo-Saxon, and Other Cognate Indo-European Languages (ইংরেজি ভাষায়)। Clarendon Press।
  5. 1 2 3 4 Mani, Vettam (১৯৭৫)। Puranic encyclopaedia : a comprehensive dictionary with special reference to the epic and Puranic literature। Robarts - University of Toronto। Delhi : Motilal Banarsidass। পৃ. ৮০৫। আইএসবিএন ৯৭৮০৮৪২৬০৮২২০।{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: প্রকাশকের অবস্থান (লিঙ্ক)
  6. 1 2 Hiltebeitel, Alf (২৭ জুলাই ২০১১)। Reading the Fifth Veda: Studies on the Mahābhārata - Essays by Alf Hiltebeitel (ইংরেজি ভাষায়)। BRILL। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০-০৪-১৮৫৬৬-১।
  7. ↑ Brodbeck, Simon Pearse (২ মার্চ ২০১৭)। The Mahabharata Patriline: Gender, Culture, and the Royal Hereditary (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃ. ২০৬। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৩৫১-৮৮৬৩০-৭।
  8. ↑ Narasimhan, Chakravarthi V. (১৯৯৯)। The Mahābhārata: An English Version Based on Selected Verses (ইংরেজি ভাষায়)। Motilal Banarsidass Publ.। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-১৬৭৩-২।