উমর ইবন হাফস হাজারমর্দ
উমর ইবনে হাফস হাজারমর্দ ( আরবি: عمر بن حفص هزارمرد; মৃত্যু: ২৭ নভেম্বর, ৭৭১) [১] ছিলেন আল-মুহাল্লাবি পরিবারের একজন সদস্য, যিনি খলিফা আল-সাফফাহ (শা: ৭৪৯-৭৫৪) ও খলিফা আল-মনসুরের (শা: ৭৫৪-৭৭৫) শাসনামলে আব্বাসীয় খিলাফতের প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৭৬৮ সালে ইফ্রিকিয়ায় তার নিয়োগ সেখানে প্রায় তিন দশকব্যাপী মুহাল্লাবি শাসনের সূচনা করে। [২] কিন্তু তিনি প্রদেশে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হন এবং একটি বড় খারিজি বিদ্রোহের সময় তিনি নিহত হন।
জীবনী
[সম্পাদনা]উমর আব্বাসীয় বিপ্লবের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন এবং ওয়াসিত অবরোধের সময় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।[৩] উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে আব্বাসীয়দের বিজয়ের পর তাকে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আবুল আব্বাসের শাসনামলে তিনি ৭৫০ সাল পর্যন্ত বসরার গভর্নর ছিলেন এবং পরে তাকে বাহরাইনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।[৪] এরপর আল-মনসুরের খিলাফতকালে তিনি আবারও দু’বার বসরার গভর্নর নিযুক্ত হন; প্রথমবার ৭৫৫ থেকে ৭৫৭ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়বার ৭৫৯ থেকে ৭৬০ সাল পর্যন্ত।[৫]
৭৬০ সালে তাকে সিন্ধুর গভর্নর করা হয়, যা উয়াইনা ইবনে মুসা আল-তামিমির নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু উয়াইনা নিজের ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে উমর তার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান এবং তাকে ১১ মাস যাবত অবরোধ করে রাখেন। শেষ পর্যন্ত উয়াইনা অঞ্চল ত্যাগ করে খলিফা আল মনসুরের কাছে ফিরে যেতে সম্মত হন।[৬][৭][৮]
সিন্ধুতে অবস্থানকালে উমর গোপনে মুহাম্মাদ আন-নাফস আল-যাকিয়্যার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন এবং তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ যখন সেখানে পৌঁছান, তখন তিনি তাকে সহায়তা করেন। এই বিষয়টি যখন আল মানসুর জানতে পারেন, তখন শাস্তি এড়ানোর জন্য উমরের পরিবারের একজন সদস্য তার বদলে দোষ স্বীকার করেন। [৯][১০]
৭৬৮ সালে আগলাব ইবনে সালিম নিহত হওয়ার পর তাকে সিন্ধু থেকে অপসারণ করে ইফ্রিকিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়।[১১][১২] তিনি পাঁচশত অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে কৈরবানে পৌঁছান এবং শহরের নেতাদের প্রতি উদার আচরণ করে তাদের সমর্থন অর্জন করেন। তার শাসনের প্রথম তিন বছর শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হয়।[১৩]
খারিজি বিদ্রোহ ও মৃত্যু
[সম্পাদনা]আল-মনসুরের নির্দেশ পাওয়ার পর উমর তুবনা শহরে যান, যাতে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা যায়। তিনি কৈরবানে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে হাবিব ইবনে হাবিব আল-মুহাল্লাবিকে রেখে যান। কিন্তু উমর যখন তুবনায় অবস্থান করছিলেন, তখন বারবাররা বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। হাবিব বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিহত হন। এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে বার্বার বিদ্রোহীরা ত্রিপোলি শহরের আশপাশে একত্র হয় এবং ইবাদি নেতা আবু হাতিম ইয়াকুব ইবন হাবিব আল-ইবাদির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। ত্রিপোলির গভর্নর সাহায্য চাইলে উমর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন, কিন্তু আবু হাতিম তাঁর সেই বাহিনীকে পরাজিত করে কাবিস পর্যন্ত পিছু হটাতে বাধ্য করেন।[১৩]
এরপর বিদ্রোহটি পুরো প্রদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সুফরীয় নেতা আবু কুররা আল-ইফরানি, আব্দুর রহমান ইবন রুস্তম, আবু হাতিম, আসিম আল-সিদরাতি আল-ইবাদি প্রমুখের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ খারিজি জোট গঠিত হয়। তারা তুবনার দিকে অগ্রসর হয়ে শহরটি অবরোধ করে। এই বিদ্রোহীদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম থাকা সত্ত্বেও উমর কৌশল অবলম্বন করে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি আবু কুররার কিছু লোককে ঘুষ দিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে বাধ্য করেন এবং যুদ্ধে ইবনে রুস্তমকে পরাজিত করেন। এরপর অবশিষ্ট খারিজিরা আবু হাতিমের নেতৃত্বে তুবনার অবরোধ ত্যাগ করে কৈরবানের দিকে রওনা দেয় এবং সেখানে গিয়ে শহরটিকে আট মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রাখে।[১৪][১৫]
উমর প্রথমে তুবনায় থেকেই যান এবং খারিজিদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আক্রমণের কথা ভেবে শহরের প্রতিরক্ষা জোরদার করেন। কিন্তু পরে তিনি খবর পান যে, কৈরবানেও খাদ্যের মজুদ অত্যন্ত কমে গেছে। তখন তুবনায় একটি সৈন্যদল রেখে তিনি নিজেই বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় অগ্রসর হন। প্রথমে বারবাররা পথে তার ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে সাময়িকভাবে তিউনিসে পিছু হটতে বাধ্য করে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি কৈরবান পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং সঙ্গে করে খাদ্য, বাহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে আসেন। [১৬]
উমরের আগমনের পর আবু হাতিম পুনরায় ফিরে এসে শহরটি নতুন করে অবরোধ করে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়। অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে; খাদ্যের সংকট তীব্র হয়ে ওঠে এবং প্রতিরক্ষাকারীরা তাদের পশু খেতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত উমর নিজেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু এতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তার মৃত্যুর পর অবশিষ্ট রক্ষীরা আবু হাতিমের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছে তুবনায় সরে যায়। এর ফলে বারবাররা কৈরবান দখল করে শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।[১৭][১৮][১৯][২০]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Ibn al-Athir 1987, পৃ. 197।
- ↑ Kennedy 1981, পৃ. 190।
- ↑ Al-Tabari 1985–2007, v. 27: p. 186।
- ↑ Khalifah ibn Khayyat 1985, পৃ. 412, 413।
- ↑ Khalifah ibn Khayyat 1985, পৃ. 417, 420, 431।
- ↑ Al-Tabari 1985–2007, v. 28: p. 78।
- ↑ Al-Ya'qubi 1883, পৃ. 448।
- ↑ Khalifah ibn Khayyat 1985, পৃ. 420, 433।
- ↑ Al-Tabari 1985–2007, v. 29: pp. 51 ff.।
- ↑ Ibn al-Athir 1987, পৃ. 193-94।
- ↑ Al-Ya'qubi 1883, পৃ. 464-65।
- ↑ Khalifah ibn Khayyat 1985, পৃ. 434।
- 1 2 Ibn al-Athir 1987, পৃ. 195।
- ↑ Ibn al-Athir 1987, পৃ. 195-96।
- ↑ Kennedy 1981, পৃ. 190-91।
- ↑ Ibn al-Athir 1987, পৃ. 196।
- ↑ Ibn al-Athir 1987, পৃ. 196-97।
- ↑ Kennedy 1981, পৃ. 191।
- ↑ Al-Ya'qubi 1883, pp. 464-65, has 'Umar's death occurring in the prior year
- ↑ Al-Tabari 1985–2007, v. 29: p. 65।
সূত্র
[সম্পাদনা]- Ibn al-Athir, 'Izz al-Din (১৯৮৭)। Al-Kamil fi al-Tarikh, Vol. 5. (আরবি ভাষায়)। Beirut: Dar al-'Ilmiyyah।
- Kennedy, Hugh (১৯৮১)। The Early 'Abbasid Caliphate: A Political History। London: Croom Helm। আইএসবিএন ০-৩৮৯-২০০১৮-২।
- Khalifah ibn Khayyat (১৯৮৫)। al-'Umari, Akram Diya' (সম্পাদক)। Tarikh Khalifah ibn Khayyat, 3rd ed (আরবি ভাষায়)। Al-Riyadh: Dar Taybah।
- Al-Tabari, Abu Ja'far Muhammad ibn Jarir (১৯৮৫–২০০৭)। Ehsan Yar-Shater (সম্পাদক)। The History of Al-Ṭabarī.। খণ্ড ৪০ vols.। Albany, NY: State University of New York Press।
- Al-Ya'qubi, Ahmad ibn Abu Ya'qub (১৮৮৩)। Houtsma, M. Th. (সম্পাদক)। Historiae, Vol. 2. (আরবি ভাষায়)। Leiden: E. J. Brill।